দুই দুয়ারী-পর্ব-(৭)-হুমায়ুন আহমেদ

জুবায়ের ঘরে ঢুকেই বলল, কেমন আছেন? ছি ভালআমার নাম মােহম্মদ জুবায়েরআপনার নাম কি জানতে পারিআমার নাম জুলাই। তিনদিন পর নাম বদল হবার সম্ভাবনা আছে

দুই দুয়ারীবসুনবসব না দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছিজিজ্ঞেস করুনতবে আমার মনে হয় আপনার বেশীর ভাগ প্রশ্নেরই জবাব 

দিতে পারব না। 

জবাব দিতে পারবেন না এমন কোন প্রশ্ন আমি আপনাকে করব নাতবে ইচ্ছা করে জবাব না দিলে তাে কিছুই করার নেই। 

আমি যা জানি আপনাকে বলবঅবশ্যই বলবপাগল সাজার চেষ্টা করছেন কেন

কথা ঠিক বুঝতে পারছি নাশুনলাম চারঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছেনআপনার এই কাজের পেছনে পাগল সাজার সূক্ষ্ম চেষ্টা লক্ষ্য করছিকারণটা জানতে চাচ্ছি।” | মিস্টার জুলাই শান্ত গলায় বলল, আপনি বােধ হয় একটা জিনিস জানেন না পাগলরা কখনাে বৃষ্টিতে ভিজে নাপানি আর আগুন এই দুটা জিনিসকে পাগলরা ভয় পায়এই দুটা জিনিস থেকে এরা অনেক দূরে থাকেকখনাে শুনবেন না কোন পাগল পানিতে ডুবে মারা গেছে বা আগুনে ঝাপিয়ে পড়েছেজুবায়ের প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলল, আপনি কি সিগারেট খান

একটা খান আমার সঙ্গেখেয়ে দেখুন কেমন লাগে| লােকটা সিগারেট নিলআগুন ধরিয়ে টানতে লাগলজুবায়ের বলল, আপনার কয়েকটা জিনিস আমি মিলাতে পারছি নাদুয়ে দুয়ে চার হচ্ছে নাআপনি বলছেন আপনার আগের কথা কিছুই মনে নেইস্মৃতিবিলুপ্তি ঘটেছেঅথচ পাগল পানি এবং আগুন ভয় পায় এটা মনে আছেএকটা মনে থাকবে, একটা থাকবে না তা কেমন করে হয়। 

লােকটা জবাব দিল নানিজের মনে সিগারেট টানতে লাগল। 

জুবায়ের চলে যাবার আগে এষাকে বলে গেল সাবধান থাকবেখুব সাবধানখুবই সন্দেহজনক ক্যারেকটারতােমার বাবাকে বলবে অতি দ্রুত তিনি যেন লােকটাকে ডিসপােজ করার ব্যবস্থা করেনলােকটার কোন একটা বদ মতলব আছে। 

এষা হাসতে হাসতে বলল, তােমার কি ধারণা কি করবে সে? গভীর রাতে আমাদের খুন করে পালিয়ে যাবে? 

বিচিত্র কিছু নাকরতেও তাে পারে। 

লােকটাকে দেখে খুনী খুনী মনে হয় নাফর ইওর ইনফরমেশন ইয়াং লেডি খুনীদের আলাদা কোন চেহারা হয়

ফর ইওর ইনফরমেশন ইয়াং ম্যান রাত পৌনে বারটা বাজে তােমার .. এখন চলে যাওয়া উচিত। 

আমি যাচ্ছি কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি বি কেয়ারফুল, নেভার ট্রাস্ট স্ট্রেঞ্জার। 

সুরমা খেতে বসেছেনখাবার ঘরে শুধু তিনি এবং মতিন সাহেবসুরমা খাবার সময় কথাবার্তা বিশেষ বলেন নাকেউ কথা বললে, এমনভাবে তাকান যেন বিরক্ত হচ্ছেনমতিন সাহেব বললেন, মাথাব্যথা কমেছে

সুরমা তাঁর দিকে না তাকিয়েই বললেন, না। 

রােজ রােজ মাথা ধরে এটা তাে ভাল কথা নাএকজন ডাক্তার দেখাওসাধারণত চোখের কোন প্রবলেম হলে মাথা ধরেতােমার কি চোখের কোন সমস্যা আছে। 

জানি না, থাকতে পারেকাল আমার সঙ্গে চল আমার চেনা একজন চোখের ডাক্তার আছেনকাল আসুক তখন দেখা যাবে। 

সুরমা উঠে পড়লেনপ্লেটে খাবার পড়ে আছেঅল্প কিছু মুখে দিয়েছেনতাঁর বমি বমি আসছেবেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললেন, তােমার লােকের কোন গতি করতে পারলে

নাসে কি স্থায়ীভাবে এই বাড়িতেই থাকবে? না তা কেনকয়েকটা দিন দেখে বিদেয় করে দেবমিতু ওর সঙ্গে মাখামখি করে, আমার এটা পছন্দ নামিতুকে নিষেধ করে দিও। 

তােমার ছেলেমেয়েরা কেউ আমার কথা শুনে না ওদের কিছু বলতে ইচ্ছা করে নাহরিপ্রসন্ন বাবু এসেছেন, জান?” 

এষা বলেছেকি জন্যে এসেছেন তা জান?না। 

সুরমা কঠিন মুখে বললেন, কোথাও থাকার জায়গা নেই বলে এসেছেনতাঁর ধারণা তিনি অল্প কিছুদিন বাঁচবেনসেই অল্প কিছুদিন এই বাড়িতে থাকতে চান। 

তুমি না করে দিয়েছ তাে?” 

আর্মি না করব কেন? অপ্রিয় কাজগুলি তুমি সব সময় আমাকে দিয়ে করাতে চাওএটা ঠিক নাতােমার যদি কিছু বলার থাকে তুমি বলবে। 

হরিপ্রসন্ন বাবুর সঙ্গে মতিন সাহেবের যােগাযােগের একমাত্র সূত্র হচ্ছে মতিন সাহেবের বড় মেয়ে নিশাহরিবাবু নিশাকে কিছুদিন অংক শিখিয়েছেননিশার কোন শিক্ষকই বেশীদিন পছন্দ হয় নাতাঁকেও পছন্দ হয় নিসে দুমাস অংক করেই বলল, বাবা উনাকে বদলে দাও। 

মতিন সাহেব বলেছিলেন, কেন মা? এত ভাল টিচার ... নিশা ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, উনি কেমন করে জানি তাকান আমার ভাল লাগে মতিন সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কেমন করে তাকান? | আমি তােমাকে বলতে পারব না। 

মতিন সাহেবের বিস্ময়ের সীমা রইল নাতাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেলতিনি হরিবাবুকে ছাড়িয়ে দিলেন। 

মজার ব্যাপার হচ্ছে হরিবাবু কখনাে কোন বিশেষভাবে নিশার দিকে তাকান নিতাঁর মুখে মাজননী ছাড়া অন্য কোন ডাকও ছিল নাষাট বছর বয়েসী একজন বৃদ্ধ ক্লাস টেনের একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে বিশেষ ভঙ্গিতে তাকানাের প্রশ্নও উঠে নাসেই সময় নিশার ধারণা হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর সব পুরুষই তার দিকে বিশেষভাবে তাকায়তার সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করে। 

হরিবাবু চলে গেলেও তিনি এই বাড়িতে আসাযাওয়া বন্ধ করেন নাপ্রায়ই দেখা যায় বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছেননিশাকে খবর পাঠাতেনসে ঘাড় বাঁকিয়ে বলতাে আমি যেতে পারব নাকেন আসে শুধু শুধুভদ্রলােককে অনেকক্ষণ একা বসে থাকতে হতশেষ পর্যন্ত নিশা অবশ্যি আসতশুধু আসতাে না হাসি মুখে অনেকক্ষণ গল্প করত। 

হরিবাবুর নিকট বা দূর কোন আত্মীয়স্বজন ছিল নাস্ত্রী মারা গেছেনযৌবনে বিয়ের এক বছরের মাথায়দুই ভাই পার হয়ে গেছেন ইন্ডিয়ায়তিনি বাসাবাে এলাকায় টিনের দুকামরার একটা ঘরে কুড়ি বছর একাই কাটিয়ে দিয়েছেনফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষক ছিলেনচাকরি থেকে অবসর নেবার পর ভয়াবহ সমস্যায় পড়ে গেলেনপ্রাইভেট স্কুল

পেনসনের ব্যবস্থা নেইপ্রাভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকাও পুরােটা পেলেন নাযা পেলেন তাও দ্রুত শেষ হয়ে গেলগৃহশিক্ষকতা করার ক্ষমতা নেইছাত্রছাত্রী কেউ আসেও নাবয়সের নানান আদি ব্যাধিতে পুরােপুরি কাবু হয়ে গেলেনএকমাত্র কাজ দাঁড়াল পুরানাে ছাত্রছাত্রীকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে কিছুদিন করে থাকার ব্যবস্থা করা যায় কি না সেই চেষ্টা করাবাসাবাের বাড়িটি দুমাস আগে ছেড়ে দিয়েছেনবাসা ধরে রাখার কোন অর্থও নেইতাঁর হাত শূন্যঅর্থ এবং বিত্তের মধ্যে আছে তাঁর স্ত্রীর কানের একজোড়া দূলস্ত্রীর মৃত্যুর পর সে দুলজোড়া তিনি নিজের হাতে স্ত্রীর কান থেকে খুলে রেখেছিলেন। 

Leave a comment

Your email address will not be published.