ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হাতে নস্যির কৌটো। হঠাৎ বলে উঠলেন, –অ্যাঃ! পিচাশ!…….হাসি চেপে বললাম, –কথাটা পিশাচ হালদারমশাই!

উত্তেজিত হলেই ঢ্যাঙা গড়নের এই গোয়েন্দা ভদ্রলোক আরও ঢ্যাঙা হয়ে ওঠেন যেন। গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপে। বললেন, –মশায়! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে সার্ভিস করছি। অন্ধকারে বনবাদাড়ে শ্মশানেমশানে ঘুরছি। কখনও পিচাশ দেখি নাই।

কর্নেলস্যার, দেখছেন নাকি?……….কর্নেল নীলাদ্রি সরকার একটা গাবদা পুরোনো বই পড়ছিলেন। দাঁতের ফাঁকে আটকানো চুরুটের নীল ধোঁয়া তার চকচকে টাকের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে খেলা করছিল। ঋষিসুলভ সাদা দাড়িতে একটুকরো চুরুটের ছাই আটকে ছিল।

মুখ তুলতেই তা খসে পড়ল। বললেন, -কী হালদারমশাই?………..পিচাশ!…………–নাহ। দেখিনি। তবে শুনেছি পিশাচ নাকি শ্মশানের আশেপাশে থাকে। মড়া খায়।

ধূমগড়ের পিচাশ ব্যাবাক একটা মড়া খাইয়া ফ্যালাইছে। –হালদারমশাই আবার একটিপ নস্যি নিলেন। উত্তেজনার সময় দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলাও ওঁর অভ্যাস। বললেন : জয়ন্তবাবুগো পেপার না লিখলে কথা ছিল। ছয় লক্ষ সার্কুলেশন।

তাই না জয়ন্তবাবু?………….বললাম, -আজ রোববারে ছ লাখ। অন্যদিন চার লাখ। কিন্তু দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার ওই খবরটা মোটেও এক্সক্লুসিভ নয়। নিউজ এজেন্সির পাঠানো খবর। কাজেই এ খবরকে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়। আসলে পাতা ভরানোর জন্য অনেক সময় বাজে খবরও ঢোকাতে হয়। আবার সাংবাদিকরাও মাঝে মাঝে রাজনীতির কচকচি থেকে পাঠকদের রিলিফ দিতে মজার-মজার খবর তৈরি করেন।

বিশেষ করে আজ রোববার ছুটির দিন পাঠকদের একটু আনন্দ দেওয়া মন্দ কী?………..কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন- জয়ন্তের কথায় কান দেবেন না হালদারমশাই! ধূমগড়ের শ্মশানে সত্যিই পিশাচের ডেরা আছে। পিশাচটা একটা মড়ার পেট চিরে নাড়িভুড়িও খেয়েছে।…….গোয়েন্দা ভদ্রলোক তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যথারীতি যাই গিয়া বলে জোরে বেরিয়ে গেলেন।

বললাম, –সর্বনাশ! হালদারমশাই সত্যিই ধূমগড়ে গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছেন নাকি?……….কর্নেল বললেন, -গেলে একটা রোমঞ্চকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। তুমিও ওঁর সঙ্গ ধরলে পারতে।

–কী আশ্চর্য! আপনি এই গাঁজাখুরি খবরে বিশ্বাস করেন?……–করি বইকী। বিশ্বপ্রকৃতিতে রহস্যের কোনো শেষ নেই ডার্লিং!……….–কর্নেল! আপনি কী বলছেন? পিশাচ-টিশাচ মানুষের আদিম বিশ্বাস। কুসংস্কার মাত্র।

আমার বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বন্ধু একটু হেসে বললেন, তুমি ডারউইনের বিবর্তনবাদের কথা ভুলে যাচ্ছ জয়ন্ত! ক্রোম্যাগনন মানুষ এবং হোমো স্যাপিয়েন-স্যাপিয়েন অর্থাৎ আধুনিক মানুষের মধ্যেকার পর্যায়ে অবস্থা কী ছিল, এখনও বিশেষ জানা যায়নি। তাই মিসিং লিংক কথাটা বলা হয়। কে বলতে পারে পিশাচ সেই মিসিং লিংক নয়? বিশেষ করে ধূমগড় জায়গাটা আমি দেখেছি। পাহাড় জঙ্গল নদী আর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রহস্যময় অনেক কিছুই থাকতে পারে। ওখানকার শ্মশানটাও ঐতিহাসিক।

কর্নেল বইটা টেবিলে রাখলেন। এতক্ষণে চোখে পড়ল, মলাটে সোনালি হরফে লেখা আছে : ধূমগড়ের রাজকাহিনি। বললাম, –তা হলে বোঝা যাচ্ছে, পিশাচের গল্প এই বইটাতেও আছে।….কর্নেল হাসলেন, -নাহ। এটা ধুমগড়ের প্রাচীন রাজবংশের কাহিনি। ১৮৯০ সালে রাজাবাহাদুর জন্মেজয় সিংহের লেখা পারিবারিক ইতিহাস।

ব্যাপারটা সন্দেহজনক কিন্তু।…..–কেন?…..কাগজে ধূমগড়ে পিশাচের খবর বেরুল, আর বইটাও আপনার হাতে চলে এল।…………ষষ্ঠীচরণ আরেক দফা কফি আনল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, -বইটা আমার হাতে উড়ে আসেনি। গত মাসে ধূমগড় গিয়েছিলাম অর্কিডের খোঁজে। ওই সময় ওখানকার রাজাদের বংশধর রণজয় সিংহের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। কথায়-কথায় বংশের লম্বাচওড়া গল্প শোনালেন। গল্পগুলো যে সত্যি, তা প্রমাণের জন্য এই বইটা আমাকে পড়তে দিলেন।

আমি উঠেছিলাম নদীর ধারে ফরেস্ট-বাংলোয়। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। হ্যারিকেনের আলোয় বইটা পড়তে শুরু করলাম। সকালে ফেরত দেবার কথা ছিল। হঠাৎ রণজয় সিংহ রাতদুপুরে গিয়ে হাজির। ভেবেছিলাম পারিবারিক ইতিহাসের বইটা নিয়ে কেটে পড়েছি কিনা দেখতে এসেছেন। কিন্তু তা নয়। ভদ্রলোক চুপিচুপি একটা অদ্ভুত কথা বললেন। বইয়ের ভেতর একটা ধাঁধা আছে।

ওটার জট ছাড়াতে পারলে আমাকে সাধ্যমতো পুরস্কৃত করবেন। ধাঁধাটা হল :……পাষণ্ডের পা………..কভু ধরিস না…………মস্তকে ঘা…………কী জ্বলে রে বাবা।………কর্নেল কফিতে আবার চুমুক দিলেন। বললাম, -সেকেলে লোকেরা শুনেছি কথায়-কথায় ধাঁধা আওড়াতেন। কিন্তু এ ধাঁধাটা একেবারে গোলকধাঁধা।

আমি হেসে উঠলাম। কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, -কী বললে? কী বললে? গোলকধাঁধা?………….হ্যাঁ। গোলকধাঁধাই বলা চলে।……….কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন হঠাৎ। তারপর টেলিফোনের কাছে গেলেন। ডায়াল করে সাড়া পেয়ে বললেন, -সঞ্জয়বাবু! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। আপনার জ্যাঠামশাই, … চলে গেছেন? … ঠিক আছে। রাখছি।

টেলিফোন রেখে উজ্জ্বল হেসে কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। বললেন, –ব্রিলিয়ান্ট, ডার্লিং ব্রিলিয়ান্ট! এ বেলা আমার ঘরে তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন।…………অবাক হয়ে বললাম ব্যাপার কী? হঠাৎ আমার এত প্রশংসার কী হল?………..একটি জটিল রহস্যের সমাধান তোমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। –বৃদ্ধ রহস্যভেদী বাকি কফিটুকু শেষ করে চুরুট ধরালেন। বললেন : আসলে অনেকসময় আমরা জানি না যে আমরা কী জানি। অবশ্য তফাত শুধু একটা ও-কারের। ও-কার জুড়লেই তো সব জল হয়ে গেল।

আরও অবাক হয়ে বললাম, -কী অদ্ভুত!………..অদ্ভুত তো বটেই। -কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন : তবে এবার পিশাচটাকে খুঁজে বের করা দরকার। সেজন্যই ধূমগড়ে ছুটতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে জয়ন্ত, হালদারমশাই পিশাচটার পাল্লায় পড়লে আর জ্যান্ত ফিরে আসতে পারবেন না।

কথাটা যদি দৈবাৎ কিছুক্ষণ আগে তোমার মুখ দিয়ে বেরুত!…………..ও-কার রহস্য……….রাত এগারোটা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমে দেখি ছোট্ট স্টেশন। নিরিবিলি সুনসান চারদিক। আমি ভেবেছিলাম ধূমগড় নাম এবং রাজারাজড়ার রাজধানী ছিল যখন, তখন স্টেশনটা বেশ বড়োসডোই হবে। কর্নেল আমার মনের খবর কী করে টের পেয়ে বললেন, –আমরা ওল্ড ধূমগড়ে নেমেছি। নিউ ধূমগড় পরের স্টেশন। দূরত্ব তিন কিলোমিটার। ওটা বড়ো স্টেশন।

বললাম, তা হলে এখানে নামলেন কেন?………..আমাদের টিকিট ওল্ড ধূমগড় অব্দি।…….–কিন্তু এখানে তো লোকজন দোকানপাট দেখছি না। যানবাহনও চোখে পড়ছে না।…….সেটাই তো সুবিধে। –বলে কর্নেল পা বাড়ালেন!

গেটে টিকিট নেওয়ারও লোক নেই। স্টেশনঘরের ভেতর স্টেশনমাস্টার একলা বসে টরে টক্কা করছেন। উর্দিপরা এক রেলকর্মী প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সম্ভবত আকাশের তারা গুনছিল। সে আমাদের কথা শুনতে পেয়ে হনহন করে এগিয়ে এল। ভেবেছিলাম টিকিট চাইবে। কিন্তু সে টিকিট চাইল না। চাপা স্বরে বলল, – এত্তা রাতমে আপলোগ টিশনকে বাহার মাত্ যাইয়ে সাব। খতরনাক হো যায়ে গা।

কর্নেল বললেন, -হাম শুনা ইধার এক পিশাচ নিকলা। সাচ?……..-সাচ বাত সাব! দেখিয়ে না, ইয়ে টিসনমে কোই প্যাসিঞ্জার নেহি উতরা। সব আগলে টিসনমে উতরেগা।…..-হামলোগ পিশাচ পাকাড়নে আয়া।

–তামাশা মাত কিজিয়ে সাব। মেরা বাত শুনিয়ে।….কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, -গভমেন্ট হামকো পিশাচ পাকড়নেকে লিয়ে ভেজা। ইয়ে দেখো, ক্যায়সে হাম উনকো পাকড়ায়েগা!..কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতিধরা নেট-স্টিক বের করে কর্নেল বেতাম টিপলেন। স্টিকের ডগায় সূক্ষ্ম সবুজ রঙের জাল ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ল। রেলকর্মী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কর্নেল জাল গুটিয়ে স্টিক কিটব্যাগে গুঁজে গেট দিয়ে বেরুলেন।

স্টেশনের পেছনে একটা খাঁ-খাঁ চত্বর। তার ওধারে সংকীর্ণ একটা পিচের রাস্তা অব্দি আলো পৌঁছেছে। তারপর গাঢ় অন্ধকার। কর্নেল টর্চ ফেলে বললেন, -তোমার টর্চও রেডি রেখো।…ততক্ষণে আমি টর্চ বের করেছি। বললাম, –কিন্তু এভাবে আমরা যাচ্ছি কোথায়?…………-বনবাংলোয়।

–সেটা কতদূরে?………….কাছেই।……..অস্বস্তি হচ্ছিল। টর্চের আলোয় দুধারে ঘন জঙ্গল আর বড়ো-বড়ো পাথরের চাই দেখা যাচ্ছিল। কিছুদূর উতরাইয়ের পর চড়াই শুরু হল। বারবার পিছনে এবং ডাইনে-বাঁয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখে নিচ্ছিলাম। কলকাতার কর্নেলের ড্রয়িংরুমে বসে যে পিশাচের অস্তিত্ব অবাস্তব মনে হয়েছিল, এখানে এখন তা একেবারে বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। কর্নেল বললেন, -টর্চের ব্যাটারি খরচ কোরো না জয়ন্ত! আমার ধারণা, পিশাচ শ্মশানের কাছাকাছিই আছে। শ্মশান এখান থেকে দুরে।

একখানে পিচরাস্তাটা ছেড়ে খোয়াঢাকা একফালি পথ ধরলেন কর্নেল। পথটা চড়াইয়ে উঠেছে। ওপরে খানিকটা দূরে আলো জুগজুগ করছিল। এবার দেখলাম, আমরা একটা টিলার ঢাল বেয়ে উঠছি।……..একটু পরে সেই আলোটার দিক থেকে কেউ বলে উঠল, -কৌন বা?

কর্নেল গলা চড়িয়ে বললেন, -চতুর্মুখ নাকি?…………জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর। তারপর দৌড়ে এল একজন খাঁকি প্যান্টশার্ট পরা লোক। তার একহাতে বন্দুক। বুঝলাম ফরেস্ট গার্ড। সে স্যালুট ঠুকে বলল, –কর্নিলসাব! আপ?……..– হ্যাঁ চতুর্মুখ। দয়ারাম আছে তো? নাকি পিশাচের ভয়ে বাড়ি পালিয়েছে?……………চতুর্মুখ হাসল, –জি, হাঁ কর্নিলসাব। তবে আপনার কিছু অসুবিধা হবে না। আমি আছি। মানিকলালভি আছে।

কথা বলতে বলতে আমরা হাঁটছিলাম। চতুর্মুখ লোকটি সাহসী বোঝা গেল। তার মতে, পিশাচের সত্যিমিথ্যা সে জানে না। তবে এমনও হতে পারে, গুজব রটিয়ে চোরা শিকারি বা কাঠ পাচারকারীরা এই মওকায় জঙ্গল লুঠবে! তাই রেঞ্জারসায়েব তাদের দুজনকে রাত জেগে নজর রাখতে বলেছেন। উঁচু কাঠের টাওয়ারের দিকে ঘুরে চতুর্মুখ চেঁচিয়ে বলল, -মানিকলাল! কলকত্তাসে কর্নিলসাব আয়া!

সেখান থেকে সাড়া এল, -সেলাম কর্নিলসাব!……বাংলোটা কাঠের তৈরি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। লণ্ঠনের আলোয় দেখলাম, বেশ ছিমছাম সাজানো-গোছানো। জানালাগুলো খুলে দিলে হাওয়া খেলতে লাগল। পেছনে নদীর জলের কলকল ছলছল শব্দ। খাওয়া আমরা ট্রেনেই সেরে নিয়েছিলাম। কর্নেল তার প্রিয় পানীয় কফি চিনি, টিনের দুধ এবং কিছু স্ন্যাক্স এনেছেন সঙ্গে। চতুর্মুখ ঝটপট কিচেনে কেরোসিন কুকার জ্বেলে কফি করে আনল।

পিশাচের গল্পটা চতুর্মুখ সবিস্তারে শোনাল এবং আগেই বলে দিল, সবই তার শোনা কথা। দিন চারেক আগে রাজবাড়ির একজন বয়স্ক চাকর হঠাৎ ধড়ফড় করতে করতে মারা পড়ে। তখন রাত প্রায় নটা-দশটা। ডাক্তার ডাকা হয়েছিল। ডাক্তার নাকি বলেছিলেন, হার্টফেল। রাজবাড়ি এখন নামেই। অবস্থা পড়ে এসেছে। দালানকোঠা দিনেদিনে মেরামতের অভাবে ভেঙে পড়েছে।

তো লোকটাকে শ্মশানে দাহ করতে নিয়ে গেছে, এমন সময় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সব কাঠ ভিজে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। তাই দুজনকে বসিয়ে রেখে বাকি লোকেরা শুকনো কাঠ আনতে গিয়েছিল। তখন বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু বিজলি চমকাচ্ছে। মেঘ ডাকছে। হঠাৎ লোকদুটো নাকি বিজলির ছটায় দেখে, কালো কী একটা জন্তু দুই পায়ে হেঁটে মড়ার খাটিয়ার কাছে এল। মুখের দু-পাশে দুটো বড়োবড়ো দাঁত।

বীভৎস মুখ। লোকদুটো পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে লাঠিসোঁটা বন্দুক বল্লম টর্চ নিয়ে অনেক লোক শ্মশানে ছুটে আসে। দেখে, খাটিয়ার মড়া নেই। খুঁজতে খুঁজতে একটু তফাতে জঙ্গলের ভেতর মড়া পাওয়া যায়। কিন্তু পেটের নাড়িভুড়ি সবটাই খুবলে তুলে সেই দুপেয়ে জন্তুটা খেয়ে ফেলেছে। এবার সবাই ধরে নেয়, জন্তুটা পিশাচ। মড়াটা অবশ্য দাহ করা হয়।

পরদিন রাতে রাজবাড়ির বড়োতরফ রণজয় সিংহের কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। জানলার ধারে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। টর্চের আলো জ্বালতেই নাকি পিশাচটাকে দেখতে পান। ভিতু মানুষ। হাত থেকে টর্চ পড়ে যায়। পরে চ্যাঁচামেচি করেন। ততক্ষণে পিশাচ উধাও। গুজব এত বেশি রটেছে যে, ধূমগড়ের অনেকেই নাকি পিশাচটা দেখেছে। তাই সন্ধ্যার পর বাজার দোকানপাট রাস্তাঘাট সুনসান ফাঁকা হয়ে যায়। কেউ নাকি সন্ধ্যার পর পারতপক্ষে একা বেরোয় না।

ঘটনাটা শুনিয়ে চতুর্মুখ হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। তবে সে বলে গেল, পিশাচ না আসুক, নদী পেরিয়ে জঙ্গল থেকে বাঘ-ভালুক আসতেও পারে। কাজেই আমরা যেন দরজা ভালো করে এঁটে শুই।

খবরের কাগজে মোটামুটি ওইরকম বিবরণই বেরিয়েছে। তবে রণজয়বাবুর জানলায় পিশাচের আবির্ভাবের কথা বেরোয়নি। সন্ধ্যার পর সব নিরিবিলি হওয়ার কথাও বেরোয়নি।…..কর্নেল দরজা এঁটে জানলা ধারে বসে চুরুট ধরালেন। বললেন, -শুয়ে পড়ো জয়ন্ত!

-আপনি কি পিশাচের জন্য রাত জাগবেন নাকি?…..–নাহ। ধূমগড়ের রাজকাহিনির শেষ কয়েকটা পাতা পড়ে নিয়ে ঘুমোব।……–আর পড়ে কী লাভ? আপনি তো বলছিলেন, একটা জটিল রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, -তোমারই সাহায্যে হয়ে গেছে।

-গোলকধাঁধা শুনে?……………..–একটা ওকার জুড়েই সব জল হয়ে গেছে।………–প্লিজ কর্নেল! হেঁয়ালি করবেন না। ও-কারের চোটে মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।…….–গোলকধাঁধার গোলকের একটা ও-কার দরকার ছিল। অর্থাৎ গোলোক। রাজবাড়ির যে বয়স্ক চাকর হঠাৎ ধড়ফড় করে মারা গেছে, তার নাম ছিল গোলোক।

-বুঝলুম। গোলোক থেকে কী করে রহস্য ফাস হল?…….রাতবিরেতে হঠাৎ ধড়ফড় করতে করতে মরে গিয়ে গোলোকই রহস্য ফাঁস করেছে।…………–তার মানে?……….–ওই শোনো! ফেউ ডাকছে। কাছাকাছি কোথাও বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়ো।………..বিরক্ত হয়ে চুপ করলাম। সত্যিই ফেউ ডাকছে। …

.ধাঁধার জট ছাড়ল……….কর্নেল অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে আমার ঘুম ভাঙালেন। বললেন, -দয়ারামকে সাহস দিয়ে নিয়ে এলাম। চতুর্মুখ আর মানিকাল রাত জেগে ডিউটি করে। ওদের ঘুমোনো দরকার।

দয়ারাম বাংলোয় চৌকিদার। সেও খুব ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে পিশাচকাহিনি শোনাল। সে জনৈক ফোটোগ্রাফার রামবাবুর কথা বলল। রামবাবু নাকি পিশাচটার ফোটো তুলেছেন। রাতে ওঁর জানালায় পিশাচটা গিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। উপস্থিত বুদ্ধি খাঁটিয়ে রামবাবু ক্যামেরায় ফ্ল্যাশবালবের সাহায্যে ছবি তোলেন।

ব্রেকফাস্টের পর কর্নেলের সঙ্গে বেরোলাম। প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর বসতি এলাকা চোখে পড়ল। বাঁ-দিকে নদী। নদীর ধারে প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। টিলার গায়ে একটা কেল্লাও দেখতে পেলাম। কেল্লা আর আস্ত নেই। কেল্লার নীচে দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর বিশাল প্রাচীন একটা শিবমন্দির দেখলাম। মন্দিরের ওপাশে ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটাই রাজবাড়ি।

গেট ধসে পড়েছে। দুধারে পামগাছের সারি পুরোনো আভিজাত্যের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখতে পেয়ে রোগা এবং পাতাচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে গায়ের রং এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। রাজবংশের বড়োতরফ রণজয় সিংহ।

রণজয়বাবু বললেন, -আপনি দুদিন পরে আসবেন বললেন। তাই চলে এলাম কলকাতা থেকে।…কর্নেল বললেন, -হঠাই চলে এলাম। আমার এই তরুণ সাংবাদিক বন্ধু রাজাবাহাদুর জন্মেজয় সিংহের ধাঁধার জট ছাড়াতে সাহায্য করেছে।

রণজয়বাবুর মুখে বিস্ময় এবং আনন্দ ফুটে উঠল, –কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, খুঁজে পাচ্ছি না কর্নেলসায়েব! চলুন, ঘরে গিয়ে বসা যাক।…….-পরে বসা যাবে। প্রথমে আমাকে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন।–বলুন!

বৃহস্পতিবার রাতে গোলোক কি মন্দির চত্বরে মারা গিয়েছিল?………..–হ্যাঁ। মন্দির চত্বরে।…..–আপনার চোখের সামনেই তো ধড়ফড় করতে করতে মারা গিয়েছিল?……..-হ্যাঁ। আমি ওকে ভোরে কলকাতায় আমার ভাইপো সঞ্জয়ের কাছে পাঠাব ভেবেছিলাম। তাই ওকে খুঁজছিলাম। ইদানীং প্রায় দেখতাম সন্ধ্যার পর গোলোক মন্দির চত্বরে গিয়ে বসে থাকত। জিজ্ঞেস করলে বলত, মনে সুখ নেই বড়োবাবু দেবতার কাছে শান্তি খুঁজছি।

গোলোক বলত?…………-বলত বলেই মন্দিরে খুঁজতে গিয়েছিলাম। যেই গোলোক বলে ডেকেছি, অমনি কেন যেন চমকে উঠল। মন্দির চত্বরের ওপর বাড়ির দোতলার ঘরের আলো পড়ে। সব স্পষ্ট দেখা যায়। ওকে চমকে উঠতে দেখে বললাম, কী হয়েছে রে? সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বুক চেপে ধরে পড়ে গেল। তারপর কাটা পাঁঠার মতো ধড়ফড় করতে করতে স্থির হয়ে গেল।

ডাক্তার এসে কী বললেন?……..–হার্টফেল।……………রণজয়বাবু! সত্যিই কি ডাক্তার এসে বললেন হার্টফেল? আমার ধারণা, ডাক্তার বলেছিলেন, আত্মহত্যা করেছে গোলোক। পুলিশের ঝামেলার ভয়ে আপনি ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিলেন হার্টফেলের উল্লেখ করে ডেথ সার্টিফিকেট দিতে।

রণজয়বাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন- হ্যাঁ। গোলোক সায়ানায়েড জাতীয় কিছু খেয়েছিল। কোনও কারণে ইদানীং ওর চালচলনে কেমন যেন অস্থিরতা লক্ষ্য করতাম। গত বছর ওর বউ মারা যায়। ছেলেপুলে ছিল না। কাজেই মানসিক অশান্তিই ওর আত্মহত্যার কারণ।

-রণজয়বাবু! আপনারা তো দু’ভাই?……–আমি আর সঞ্জয়ের বাবা ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয় ক্যানসারে মারা যায়।…………–আপনার কাছে আপনার শ্যালক থাকেন বলছিলেন। কী যেন নাম?……..–চণ্ডী।…–চণ্ডীবাবু আছেন?…….রণজয়বাবু বাঁকা মুখে বললেন, –চণ্ডী কখন আছে, কখন নেই বলা কঠিন। বাউন্ডুলে স্বভাব। সামান্য যা জমিজমা আছে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু খায়দায় আর টো-টো করে ঘোরে। বয়সের তো লেখাজোখা নেই।

অথচ নাবালক থেকে গেল এখনও। ধর্মের ষাঁড় আর কী!…..কর্নেল পা বাড়িয়ে একটু হেসে বললেন, -চলুন তাহলে। ধর্মের ষাঁড়টিকে দেখে আসি।………-ওকে পাচ্ছেন কোথায়?…..–মন্দিরেই পাব। শিবের বাহন শিবমন্দিরেই থাকা উচিত।…….–মন্দিরে তো ওকে …………………..–চলুন তো!

যে বিশাল মন্দিরটার পাশ দিয়ে এসেছি, এবার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সেখানে ঢুকলাম। চত্বরে গিয়ে কর্নেল বললেন- গোলোক কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল?…….উঁচু মন্দিরের সিঁড়ির নীচেটা দেখিয়ে দিলেন রণজয়বাবু, –এই সিঁড়ির ধাপেই বসে থাকত গোলোক।

কর্নেল সিঁড়ির শেষ ধাপে খোলা একটুকরো বারান্দার দিকে আঙুল তুলে বললেন, –ওই তো ধর্মের ষাঁড়। শিবের বাহন।……….কথাটা বলেই সিঁড়িতে কয়েক ধাপ উঠে গেলেন। তারপর সেই ধাঁধাটা আওড়ালেন :

পাষণ্ডের পা………কভু ধরিস না………….মস্তকে ঘা।………….কী জ্বলে রে বাবা।………………………রণজয়বাবু অবাক হয়ে বললেন, -কী ব্যাপার কর্নেলসায়েব?………কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, -ষাঁড়ের মাথা কে ভাঙল রণজয়বাবু?……………রণজয়বাবু উঠে গেলেন, –সে কী। মাথাটা ভাঙা লক্ষ্য করিনি তো!

কর্নেল বললেন, -ধাঁধার জট ছাড়াতে বলেছিলেন। ছাড়িয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হল না।…………..রণজয়বাবু চমকে উঠে বললেন, -লাভ হল না?

না। -কর্নেল মাথা নাড়লেন : পাষণ্ডের পা কভু ধরিস না। এর মানে হচ্ছে, পাষণ্ড শব্দের পা ধরা হবে না। পা না ধরলে বাকি রইল ষণ্ড। অর্থাৎ কি না ষাঁড়। এবার মস্তকে ঘা। তার মানে, ষাঁড়ের মাথায় ঘা মারতে হবে। ঘা মারলে মাথা ভেঙে যাবে। তারপর বলা হয়েছে, কী জ্বলে রে বাবা! এই জ্বলে শব্দে বোঝায় জ্বলজ্বল করছে।

উজ্জ্বলতা। কীসের এই উজ্জ্বলতা? হিরের! মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করার জন্য আপনাদের পূর্বপুরুষকে বাদশাহ আকবর যে হিরে উপহার দিয়েছিলেন, সেই হিরে। জন্মেজয় সিংহ বংশধরদের জন্য এই হিরেটা এই ষাঁড়ের মাথার ভেতরে লুকিয়ে রেখে ধাঁধা তৈরি করেছিলেন। ধুম্রগড়ের রাজকাহিনি বইয়ে। বাদশাহের দেওয়া হিরের কথা আছে। কিন্তু কোথায় আছে, তা ধাঁধায় বলা হয়েছে।

রণজয়বাবু প্রায় আর্তনাদ করলেন-কে ষাঁড়ের মাথা ভাঙল?………–গোলোক ভেঙেছিল।………..–কিন্তু হিরে কোথায় গেল?………….–গোলোকের পেটে।……..–কী সর্বনাশ!……………..–হ্যাঁ, সর্বনাশ!

-হ্যাঁ, সর্বনাশ তো বটেই। হিরে সাংঘাতিক বিষ। আপনাকে আসতে দেখে হিরের টুকরোটা গোলোক গিলে ফেলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিষক্রিয়ায় ওর মৃত্যু হয়।………–কিন্তু গিলল কেন হতভাগা? লুকিয়ে ফেলতে পারত জামা কাপড়ের তলায়।…….–বোকা গোলোক কারও হুকুম পালন করেছিল টাকার লোভে। ওকে বলা হয়েছিল, ধরা পড়ার উপক্রম হলে যেন সে ওটা গিলে ফেলে। গোলোক জানত না হিরে মারাত্মক বিষ।

 

Read more

ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য (২য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.