ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য (২য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রণজয়বাবু হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কর্নেল বললেন- আপাতত এই পর্যন্ত। তবে আশাকরি, আপনাদের বংশের ঐতিহাসিক হিরে উদ্ধার করে দিতে পারব। …………….পিশাচ দর্শন……….রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললাম-তা হলে কলকাতায় বসে ঠিকই রহস্যের জট ছাড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু পিশাচ ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না।

বোঝা যাবে। আগে সেই রামবাবু ফোটোগ্রাফারের দোকানে যেতে হবে।…– বলে কর্নেল রাস্তায় একটা সাইকেল-রিকশা ডাকলেন।……..বাজার এলাকায় গিয়ে রামবাবুর দোকানের খোঁজ পাওয়া গেল। দোকানের নাম জয় মা কালী স্টুডিয়ো। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড। কর্নেলকে দেখেই বেঁটে নাদুসনুদুস চেহারার এক ভদ্রলোক সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন, –কী সৌভাগ্য! কী সৌভাগ্য! কর্নেলসায়েব যে! আসুন। পায়ের ধুলে দিন। এবার কতগুলো প্রজাপতি আর অর্কিডের ছবি তুললেন? গত মাসে তো অনেক তুলেছিলেন।

বুঝলাম রামবাবুর স্টুডিয়োতে কর্নেল ছবি প্রিন্ট করিয়েছিলেন। কর্নেল ভেতরে ঢুকে বললেন, ছবি এখনও তুলিনি। তুলব। তবে আগে পিশাচ দর্শন করতে চাই। আপনি নাকি পিশাচের ছবি তুলেছেন।

রামবাবুর মুখে ভয়ের ছবি ফুটে উঠল। চাপা স্বরে বললেন, -ভয়ের ঘটনা কর্নেলসায়েব! তবে আমার পেশার লোকদের এই একটা অভ্যাস আছে। আসলে ক্যামেরায় ফিল্ম লোড করা ছিল। ফ্ল্যাশ ফিট করা ছিল না।………..– তাহলে পিশাচ যেন আপনার কাছে ছবি ওঠাতেই এসেছিল।

রামবাবু হেসে ফেললেন, – তা যা বলেছেন স্যার। ফ্ল্যাশ ফিট করে ছবি তুললাম। তখন জানালার ধার থেকে থপথপ করে চলে গেল। বাগানে ঢুকে পড়ল।…….পিশাচটা পাবলিসিটি চাইছে আর কী!–কর্নেল হাসলেন : যাই হোক, কই দেখি পিশাচের ছবি।

রামবাবু ড্রয়ার টেনে বললেন, পুলিশ এসে নেগেটিভটা সিজ করেছে। মোট তিরিশখানা প্রিন্ট বেচেছি। দু-খানা প্রিন্ট পুলিশ নিয়েছে। একখানা লুকিয়ে রেখেছিলাম। এই থেকে নেগেটিভ করব। মনে হচ্ছে প্রচুর বিক্রি হবে।

রঙিন ছবিটা দেখে শিউরে উঠলাম। জানলার গরাদের বাইরে একখানা ভয়ংকর মুখ উঁকি মেরে আছে। দুখান সুচালো কষধাঁত বেরিয়ে আছে। লাল ঠোঁটে চাপচাপ রক্ত। গোরিলা নয়। কর্নেল ঠিকই বলেছিলেন, ক্রোম্যাগননের পরবর্তী কোনও পর্যায়ের নরবানর। বীভৎস ছবি।

কর্নেল আতশ কাচে খুঁটিয়ে দেখে বললেন, -রেখে দিন।……..রামবাবু চাপা স্বরে বললেন, -কদিন আছেন তো? একটা কপি আপনার জন্য রাখব।………….রাখতে পারেন। -বলে কর্নেল বেরিয়ে এলেন।……….রাস্তায় গিয়ে বললাম, -হালদারমশায়ের জন্য ভয় হচ্ছে। ওঁকে খুঁজে বের করা উচিত কর্নেল!

কর্নেল বললেন, –চলো! এবার শ্মশানতলায় যাওয়া যাক। একটু দূর হবে। রিকশ ডাকি।……..কিন্তু কোনো রিকশই শ্মশানতলায় যেতে রাজি হল না। শুধু একজন বলল, সে রাস্তার মোড় অব্দি যাবে। দশ টাকা লাগবে। কর্নেল রাজি হলেন।

রাজবাড়ি এলাকা ছাড়িয়ে গিয়ে রাস্তার মোড় এল। রিকশওয়ালা বলল, -ইধার সিধা চলা যাইয়ে।…………….এবড়োখেবড়ো খোয়াঢাকা রাস্তার দুধারে জঙ্গল আর টিলা। কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখতে দেখতে হাঁটছিলেন। আমার ভয় হচ্ছিল, বিরল প্রজাতির কোনও পাখির পিছনে উধাও হয়ে না যান। গেলে পরে আমাকে একা পেয়ে নিশ্চয়ই পিশাচটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমার নাড়িভুড়ি খেয়ে ফেলতে দেরি করবে না।

কর্নেল উধাও হলেন না। কিছুক্ষণ পরে আমরা শ্মশানে পৌঁছোলাম। চারদিকে ডালপালা ছড়ানো ঝুরি নামানো আদ্যিকালের বটগাছ। তারওধারে শরৎকালের ভরা নদী। এখানে-ওখানে। চিতার ছাই আর ভাঙা মাটির কলসি পড়ে আছে। একপাশে কয়েকটা পাথরের ঘর মুখ থুবড়ে। পড়েছে। তার কাছে একটা পাথরের মন্দির। কতকটা বৌদ্ধস্তূপের গড়ন। খানিকটা ফোকর দেখা যাচ্ছে স্কুপে। ওটাই সম্ভবত দরজা ছিল। মাটিতে বসে গেছে। ঝোপেও ঢাকা পড়েছে। বললাম, কর্নেল! পিশাচটা ওই স্কুপের ভেতর থাকে না তো?

কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে বটতলায় একটা ঝুরির কাছে গেলেন। তারপর বললেন এখানে কোনও সন্ন্যাসী ধুনি জ্বালিয়েছিল দেখছি। ছাইটা টাটকা। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়নি, মাটি দেখে বোঝা যাচ্ছে। একটা ছোট্ট ত্রিশূল আর-মড়ার খুলি!

কর্নেল খুলিটা কুড়িয়ে নিয়েই ফেলে দিলেন। ঠকাস করে শব্দ হল। হাসতে হাসতে বললেন, প্লাস্টিকে তৈরি নকল খুলি। কাজেই হালদারমশাই ছদ্মবেশী সাধু সেজে এখানে ধুনি জ্বেলেছিলেন, এতে আমি নিঃসন্দেহ।………………বললাম, -উনি গেলেন কোথায়?…কর্নেল মাটিতে দৃষ্টি রেখে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে থমকে দাঁড়ালেন। কী একটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, -একটুকরো জটা! মেড ইন চিতপুর।

পাটের তৈরি জটা! জয়ন্ত, হালদারমশাইয়ের নকল জটা ছিঁড়ে পড়ার একটাই অর্থ হয়। ওঁকে কেউ আক্রমণ করেছিল।……….– সর্বনাশ! তাহলে পিশাচের পাল্লায় পড়েছিলেন গোয়েন্দা ভদ্রলোক। কিন্তু ওঁর কাছে তো রিভলভার থাকে।

কর্নেল স্তূপটার কাছে এগিয়ে গেলেন। পিঠের কিটব্যাগ থেকে টর্চ বের করে সেই ফোকরের কাছে গুঁড়ি মেরে বসলেন। টর্চ জ্বেলে ভেতরটা দেখেই বলে উঠলেন, –জয়ন্ত। দেখে যাও!

দৌড়ে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, খটখটে পাথুরে মেঝেয় চামচিকের নাদির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছেন আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভ। হাত এবং পা বাঁধা। মুখে টেপ সাঁটা ছিল। খুলে গেছে। তার চেয়ে বিচিত্র ব্যাপার, টর্চের আলোয় চামচিকের ঝক ছত্রভঙ্গ হয়ে ওড়াউড়ি করছে। হালদারমশাইয়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। কিন্তু ওঁর সাড়া নেই।

অজ্ঞান হয়ে আছেন নাকি?…………কর্নেল ডাকলেন- হালদারমশাই! হালদারমশাই!………..গোয়েন্দা ভদ্রলোক পিটপিট করে তাকালেন। বললেন, -জ্বালাতন! তোরা আমারে মারস। ক্যান! যা! যা! আবার মারে! চামচিক্যা কি আর সাধে কয়?…………………………..হালদারমশাই! হালদারমশাই!

অ্যাঁ? হালদারমশাই মাথা ঘোরালেন : হালার পিচাশ? আবার আইছ? একখান দাঁত উড়া ফ্যালাইছি। আরেক খান রাখুম না! কাম অন!……………..কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! এই ছুরি নিয়ে ভেতরে ঢোকো। বাঁধন খুলে ওঁকে বের করে আনন। আমার এই প্রকাণ্ড শরীর ভেতরে ঢোকানো যাবে না।

আঁতকে উঠে বললাম, -বড় চামচিকে যে!………………….-দেরি কোরো না। চামচিকের চাঁটিতে মাথা খুলে যাবে। ঢোকো।……………চোখ বুজে ঢুকে পড়লাম। চামচিকের ঝাঁকের চাটির পর চাটি খেতে খেতে বাঁধন কেটে গোয়েন্দাকে টেনে বের করলাম। তখনও উনি গর্জাচ্ছেন! শাসাচ্ছেন পিচাশের বাকি দাঁতটাকে উপড়ে দেবেন বলে। আধখানা নকলদাড়ি মুখের পাশে ঝুলছে। জটার খানিকটা আটকে আছে। পরনে লাল খাটো লুঙি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ছিঁড়ে ঝুলছে। গোঁফের কোনায় সেলোটেপও ঝুলছে। বাইরে বেরিয়ে ওঁর হুঁশ হল।

চোখ মুছে বললেন, -হালার পিচাশটা গেল কই?………..কর্নেল বললেন, -নদীর জলে মুখ-কাঁধ রগড়ে ধুয়ে নিন হালদারমশাই!…………হালদারমশাই তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর খিকখিক করে হেসে বললেন, কর্নেলস্যার! জয়ন্তবাবু! আপনারা আইয়া পড়ছেন? পিচাশটারে আমি জব্দ করছি! একখান দাঁত………….– নদীতে চলুন হালদারমশাই! গোঁফের পাশে টেপ ঝুলছে। জল না দিলে আটকে থাকবে।

কর্নেল ওঁকে টানতে টানতে নদীর ধারে নিয়ে গেলেন!…………….হিরের খোঁজে…………হালদারমশাইয়ের মুখে জানা গেল, কলকাতা থেকে এসে তিনি নিউ ধূমগড়ে একটা হোটেলে উঠেছিলেন। তারপর কাল রাত নটায় শ্মশানতলায় এসে ধুনি জ্বেলে সাধু সেজে বসেন। শেষ রাতে, ঘুমের দুলুনি চেপেছিল। হঠাৎ পেছনে থেকে পিচাশের গায়ে জোর বলেও নয়, বেকায়দায় পড়ে হালদারমশাই বন্দি হন। তাকে টানতে টানতে স্যুপের ভেতর ঢোকায় হালার পিচাশ। মুখে টেপ সেঁটে দিয়েছে। চাঁচানোরও জো ছিল না।

কর্নেল বললেন, -জয়ন্ত! এই অবস্থায় হালদারমশাই হোটেলে ফিরতে গেলে পাগল ভেবে লোক জমে যাবে। এখান থেকে সোজা নাকবরাবর হেঁটে গেলে ফরেস্টবাংলো দেখতে পাবে। ওঁকে নিয়ে গিয়ে তোমার একপ্রস্ত পোশাক পরতে দাও। ওঁর কিছু খাওয়াদাওয়াও দরকার। দেরি কোরো না। আমি অন্যদিকে যাচ্ছি।

হালদারমশাই হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন, –আমার রিভলবার গেল কই? আসনের তলায় রাখছিলাম।………মেড ইন চিতপুর নকল বাঘছালের আসনটা খুঁজে পাওয়া গেল না। কর্নেল বললেন, –পিশাচ আপনার রিভলভারের লোভ ছাড়তে পারেনি।

হালদারমশাই চিন্তিতমুখে বললেন- ফায়ার আর্মস পিচাশের কোন্ কামে লাগব?………কর্নেল আর কোনও কথা না বলে চলে গেলেন। এর পর হালদারমশাইকে নিয়ে আমি কীভাবে যে বাংলোয় পৌঁছুলাম কহতব্য নয়। সারা পথ বুক ঢিপঢিপ করছিল। এই বুঝি পিশাচটা ঝোপের আড়াল থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

চৌকিদার দয়ারাম হাঁ করে তাকিয়ে গোয়েন্দা ভদ্রলোককে দেখছিল। বললাম, –শিগগির ওঁকে কিছু খাইয়ে দাও, দয়ারাম। হালদারমশাই আপনি বরং স্নান করে নিন। ওই দেখুন কুয়ো আছে!…..দয়ারামের কাছে জানা গেল, কুয়োটা আসলে এই টিলার মাথায় একটা প্রস্রবণ। ওটা ছিল বলেই বনদফতর এখানে বাংলো তৈরি করেছিল।

স্নান করে আমার পাঞ্জাবি-পাজামা পরে হালদারমশাই শুধু দুখানা টোস্ট আর এক কাপ কফি খেলেন। তারপর আমার বিছানায় শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে থাকলেন।…..কর্নেল এলেন বেলা দুটো নাগাদ। হালদারমশাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বললেন, –আপনার রিভলভারটা উদ্ধার করেছি। এই নিন। উনি কিটব্যাগ থেকে রিভলভার বার করে দিলেন।

অবাক হয়ে বললাম, -কোথায় পেলেন ওটা?………পিশাচের ডেরায়। সিন্থেটিক বাঘছালে মোড়া ছিল। বাঘছালটা একই অবস্থায় রেখেছি।…………-জায়গাটা আপনি খুঁজে বের করেছেন?……-হ্যাঁ। পশুপাশি কীটপতঙ্গ সব প্রাণীরই ডেরা থাকে। কাজেই পিশাচেরও একটা ডেরা থাকা উচিত। যাইহোক, এখন আর কোনও কথা নয়। হিরে উদ্ধার বাকি আছে। লাঞ্চ খেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে বেরুব।

বেলা তিনটে নাগাদ আমরা বেরোলাম বাংলো থেকে! কর্নেল বললেন- হালদারমশাই! একটা কথা। দৈবাৎ যদি আমরা পিশাচটাকে জঙ্গলে দেখতে পাই, সাবধান! যেন গুলি ছুঁড়বেন না। তবে রিভলভার বের করে ওকে ভয় দেখাতে পারেন। কিন্তু কক্ষনো গুলি ছুঁড়ে বসবেন না। পিচাশটাকে আমরা অক্ষত অবস্থায় ধরতে চাই।

অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল।……কর্নেল বনবাদাড় ভেঙে হাঁটছিলেন। মাঝে মাঝে পাথরে উঠে বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিচ্ছিলেন। বললাম, -কর্নেল! আপনি কি পিচাশের ডেরায় যাচ্ছেন?………………….কর্নেল বললেন, -নাহ, শ্মশানতলায়।

-শ্মশানতলায় কেন?………কর্নেল হাসলেন, –আপত্তি আছে তোমার? আমাদের সবাইকে তো একদিন শ্মশানে যেতেই হবে। কী বলেন হালদারমশাই?………….হালদারমশাই গম্ভীরমুখে বললেন, -হঃ!……….বললাম, জায়গাটা অস্বস্তিকর। মড়াপোড়ানো ছাইয়ের গাদা। বিশেষ করে চিতার ছাই দেখলেই আমার গা ছমছম করে।

কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন, –কী বললে? চিতার ছাই?…………– হ্যাঁ। কিন্তু এতে চমকে ওঠার কী আছে?……………………….কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। হালদারমশাই লম্বা পা ফেলে ওঁকে অনুসরণ করলেন। পিছিয়ে পড়ার ভয়ে আমিও প্রায় জগিং শুরু করলাম।

শ্মশানতলায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, -হালদারমশাই, দেখুন তো! এলোমেলো অনেক চিতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে টাটকা চিতা কোটা হতে পারে? যতদূর জানি, বৃহস্পতিবার রাতে গোলোকের মড়া পোড়ানোর পর পিশাচের ভয়ে এ শ্মশানে আর কোনও মড়া পোড়ানো হয়নি। নিউ ধূমগড়ের নতুন শ্মশানে সবাই মড়া পোড়াচ্ছে।

গোয়েন্দা ভদ্রলোক ঘোরাঘুরি করে দেখতে দেখতে বললেন, -বৃষ্টিবাদলায় সবগুলি হেভি ধুইয়া গেছে। তবে আপনি কার চিতা কইলেন য্যান?……….–রাজবাড়ির স্যারভ্যান্ট গোলোকের। মানে যার মড়ার নাড়িভুড়ি খেয়ে ফেলেছিল পিশাচ।

–তবে তো ওনার চিতার ছাই হেভি হইব। বলে হালদারমশাই লাফ দিয়ে এগোলেন।……………….-লাস্ট বার্নিং কর্নেল স্যার! হেভি অ্যাশ! এই যে।

কর্নেল গিয়ে বৃষ্টির জল থিকথিকে পাঁকের মতো ছাইগুলো ঘাটতে শুরু কলেন। বললাম, -ও কী করছেন?…………………………….কর্নেল আওড়ালেন, –যেখানে দেখিবে ছাই/উড়াইয়া দেখ তাই পাইলে পাইতে পার অমূল্য রতন।

হালদারমশাইও হাত লাগাতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল তাকে নিষেধ করলেন! একটু পরে ছাইগাদার তলা থেকে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে কর্নেল নদীর ধারে দৌড়ে গেলেন। জলে সেটা ধুয়ে পকেটে ঢুকিয়ে হাসলেন, –জয়ন্ত! শ্মশানতলায় আসছিলাম পিশাচটার জন্য ওত পাততে। কারণটা পরে বলছি। তবে এবারও তুমি রহস্যের দ্বিতীয় পর্ব ফাঁস করেছ! ধন্যবাদ ডার্লিং! অসংখ্য ধন্যবাদ! হিরে উদ্ধার হয়ে গেল।

–বলেন কী! ওই জিনিসটা হিরে? গোলোকের চিতার ছাইয়ে কে লুকিয়ে রেখেছিল?……………….–কেউ না। হিরেটা গিলে গোলোক মারা পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু পাকস্থলীতে হিরে পৌঁছোনোর কথা নয়। গলার নলিতেই আটকে যাওয়া উচিত। কারণ হিরে খাঁজকাটা ধাতু।

হালদারমশাই বললেন, কই দেখি!……………….– পরে দেখাব। এবার পিশাচের জন্য ওত পাততে হবে। বটগাছের আড়ালে চলুন।…………..বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে এগিয়ে গুঁড়ির আড়ালে তিনজনে বসে পড়লাম। সামনে ঝোপজঙ্গলে ঢাকা ঢালু মাটি নদীতে নেমেছে। এখানে-ওখানে বড়ো বড়ো পাথর পড়ে আছে। হঠাৎ দমকা বাতাসে উৎকট গন্ধ ভেসে এল। নাক ঢাকলাম।

চাপা স্বরে বললাম, -এ কিসের দুর্গন্ধ?………..কর্নেল ইশারায় চুপ করতে বললেন। বেলা পড়ে এসেছে। পাখিরা তুমুল হল্লা জুড়েছে। সামনে একটা পাথরের আড়ালে একটা শেয়াল এসে দাঁড়াল। তারপর আমাদের দেখতে পেয়েই থমকে দাঁড়াল। তারপর প্রায় জান্তব গলায় কার গর্জন শোনা গেল, –যাঁ! যাঁঃ! যাঁঃ!

হালদারমশাই উত্তেজনায় ফিশফিশ করে বললেন, পিচাশ! পিচাশ!……..এবার পিশাচের শরীরের খানিকটা দেখতে পেলাম। কালো লোমশ শরীর। মুখ এদিকে ঘোরাতেই শিউরে উঠলাম। একটা কষদাঁত সুচোলো হয়ে বেরিয়ে আছে। অন্যটা হালদারমশাই ভেঙে দিয়েছেন বলছিলেন। ভাটার মতো চোখ। ভয়ঙ্কর মুখ। পাথরটার পাশে সে বসে পড়ল। তারপর বুঝলাম, সে খন্তাজাতীয় কিছু দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। দুর্গন্ধটা বাড়ছে।

কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, –তিনজন তিনদিক থেকে ঘিরে ফ্যালো।…….আগে হালদারমশাই, তারপরে কর্নেল, শেষে আমি গিয়ে পিশাচটাকে ঘিরে ধরলাম। কর্নেল এবং হালদারমশাইয়ের হাতে রিভলভার। পিশাচটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অবাক হয়ে দেখলাম, সে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল।

পিশাচটা গর্জন করতেই কর্নেল বললেন, –এক পা নড়লেই খুলি ফুটো হয়ে যাবে।………….পিশাচটা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগেই হালদারমশাই এক লাফে তার সামনে গেলেন, -হালার পিচাশ! ঘুঘু দ্যাখছ, ফান্ দ্যাখো নাই!…………….কর্নেল গিয়ে পিশাচের মুখে চাটি মারার মতো বাঁ-হাত চালালেন এবং হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ যে দেখছি পিশাচের মুখোশপরা একটা লোক।

কর্নেল বললেন, -চণ্ডীবাবু! গোলোকের পাকস্থলীতে খাঁজকাটা হিরে পৌঁছোনোর কথা নয়। কাজেই ওর নাড়িভুড়ি কেটে তুলে এনে এখানে পুঁতে রোজ একবার করে তা কাটাকুটি করে হিরে হাতড়ানোর মানে হয় না। খামোখা রোজ ওই পচা দুর্গন্ধ জিনিসগুলো ঘাঁটা পণ্ডশ্রম।

হালদারমশাই একটানে কালো লোমশ আবরণ খুলে রণজয়বাবুর শ্যালক চণ্ডীবাবুকে বের করলেন। চকাস করে একটা ছুরিও পড়ল। হালদারমশাই বললেন, –চিতপুরে কিনছিল। তবে ছুরিখানা রিয়্যাল ছুরি। শৃগালটা গেল কই? পচা নাড়িভুঁড়িগুলো শৃগালের প্রাপ্য।

কর্নেল চণ্ডীবাবুর জামার কলার খামচে ধরে বললেন, -চলুন চণ্ডীবাবু! এবার অন্য শ্বশুররালয়ে আপনার থাকার ব্যবস্থা হবে।…………চণ্ডীবাবু হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, -মাইরি, মা কালীর দিব্যি স্যার! আমি হিরে চুরি করিনি।

– না, না। হিরে নিজের হাতে চুরি করেননি। ষাঁড়ের মাথা ভাঙার ঝুঁকি নিতে চাননি। গোলোকের হাত দিয়ে কাজটা সারতে চেয়েছিলেন। আপনি ধুরন্ধর চণ্ডীবাবু! আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করা উচিত। জন্মেজয় সিংহের ধাঁধার জট ছাড়িয়েছিলেন আপনি। তারপর অনবদ্য আপনার পরিকল্পনা। গোলোক হাতেনাতে ধরা পড়লে পাছে আপনার কারচুপি ফাঁস করে দেয়, তাই আপনি ওকে হিরেটা গিলে ফেলতে বলেছিলেন।

তারপর পিশাচ সেজে শ্মশানে ভয় দেখিয়ে লোকগুলোকে তাড়িয়ে গোলোকের নাড়িভুড়ি কেটে এনে এখানে পুঁতেছিলেন। পিশাচ যে সত্যিই গোলোকের নাড়িভুড়ি খেয়েছে এবং বিশেষ করে সত্যিই এখানে পিশাচের আবির্ভাব ঘটেছে, তা এস্টাব্লিশ করার জন্য শুধু রণজয়বাবুর জানালায় নয়, ফোটোগ্রাফার রামবাবুর জানলাতেও হাজির হয়েছিলেন।

আপনি জানতেন, রামবাবু ফোটো না তুলে ছাড়বেন না। তাই অতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতে আপনার পাবলিসিটি হবে। তবে রামবাবুর কাছে আপনার পিশাচমূর্তির ফোটো আতশকাচে খুঁটিয়ে দেখেই বুঝেছিলাম, এটা মুখোশ মাত্র। তারপর এখানে এসে দুর্গন্ধ টের পেয়েছিলাম।

কথা বলতে বলতে কর্নেল আসামিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার একটা পুলিশের জিপ আসতে দেখা গেল এবড়োখেবড়ো রাস্তায়। জিপ এসে থামল। একদল পুলিশ বেরিয়ে পড়ল। একজন অফিসার সহাস্যে বললেন তাহলে আমরা আসার আগেই পিশাচ ধরে ফেললেন কর্নেলসায়েব! শেষ দৃশ্য দেখার সুযোগ দিলেন না।

কর্নেল আসামিকে কনস্টেবলদের হাতে সঁপে দিয়ে বললেন, -বেলা থাকতে থাকতে পিশাচ এসে মাটি খুঁড়বে জানতাম না। ভেবেছিলাম, সন্ধ্যা না হলে আসবে না। কিন্তু ওর তর সইছিল না। আপনারা থানায় চলুন। আমরা রাজবাড়ি হয়ে থানায় যাব।

পুলিশের গাড়ি চলে গেল।……হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, কর্নেলস্যার! হালপিচাশের ডেরা- হোয়্যার ইজ দ্যাট প্লেস?…….কর্নেল হাসলেন, -রাজবাড়িতেই রাজবাড়ির শ্যালকের ডেরা থাকা কি স্বাভাবিক নয়? রণজয়বাবুর কাছে ওঁর শ্যালকের ঘরের চাবি ছিল না। আমার কাছে সবসময় মাস্টার-কি থাকে। তাই দিয়ে খুলোম। আপনার বাঘছালে মোড়া রিভলভার পেলাম।

কয়েকটা চিঠি পেলাম। কলকাতার এক জুয়েলার কোম্পানি হিরে কিনতে চেয়েছিল। তাদের গতকাল এখানে পৌঁছুনোর কথা। নিউ ধূমগড়ে হোটেল প্যারাডাইসে তারা অপেক্ষা করবে। দুপুরে সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলাম। তাদের সঙ্গে চণ্ডীবাবু লাঞ্চ খাচ্ছিল ডাইনিং হলে। সেখান থেকে ভাগ্যিস বাড়ি ফেরেনি। তাহলে ঘরে ঢুকে সব টের পেয়ে সাবধান হয়ে যেত। যাক গে। রণজয়বাবু অপেক্ষা করছেন। হিরেটা তার হাতে পৌঁছে দিয়ে আমার ছুটি।প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন, -হিরেখানা একবার দ্যাখাইবেন না কর্নেলস্যার?………কর্নেল কপট গাম্ভীর্যে বললেন, -চোখ জ্বলে যাবে।

ধুম্রগড়ের রাজকাহিনির ধাঁধায় বলা আছে :…………পাষণ্ডের পা……….কভু ধরিস না।……….মস্তকে ঘা………….কী জ্বলে রে বাবা……….হালদারমশাই আনমনে বললেন, -হঃ! বুঝছি।…………………………………..কী বুঝলেন তা অবশ্য বললেন না……………..।

 

Read more

ঝানু চোর চানু – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

Leave a comment

Your email address will not be published.