নন্দিত নরকে পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

নন্দিত নরকে পর্ব:০১

রাবেয়া ঘুরে ঘুরে সেই কথা কটিই বার বার বলছিল।রুনুর মাথা নিচু হতে হতে থুতনি বুকের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। আমি দেখলাম তার ফর্স কান লাল হয়ে উঠেছে। সে তার জ্যামিতি-খাতায় আঁকিবুকি কাটতে লাগল। শেষ পর্যন্ত হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দাদা একটু পানি খেয়ে আসি বলে ছুটতে ছুটিতে বেরিয়ে গেল। রুনু বারো পেরিয়ে তেরোতে পড়েছে। রাবেয়ার অশ্লীল কদৰ্য কথা তার না বোঝার কিছু নেই। লজ্জায় সে লাল হয়ে উঠেছিল। হয়তো সে কেঁদেই ফেলত। রুনু অল্পতেই কাঁদে। আমি রাবেয়াকে বললাম, ছিঃ রাবেয়া, এসব বলতে আছে? ছিঃ! এগুলি বড় বাজে কথা। তুই কর্তা বড় হয়েছিস।

রাবেয়া আমার এক বৎসরের বড়ো। আমি তাকে তুই বলি। পিঠা পিঠি ভাইবোনেরা এক জন আরেক জনকে তুই বলেই ডাকে। রাবেয়া আমাকে তুই বলে। আমার প্রতি তার ব্যবহার ছোটবোনসুলভ। সে আমার কথা মন দিয়ে শুনল। কিছুক্ষণ ধরেই বালিশের গায়ে চাদর জড়িয়ে সে একটা পুতুল তৈরি করছিল। আমার কথায় তার ভাবান্তর হল না। পুতুল তৈরি বন্ধ রেখে লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পা নাচাতে নাচাতে সে নোংরা কথাগুলি আগের চেয়েও উঁচু গলায় বলল। আমি চুপ করে রইলাম। বাধা পেলেই রাবেয়ার রাগ বাড়বে; গলার স্বর উঁচু পর্দায় উঠতে থাকবে। পাশের বাসার জানালা দিয়ে দু-একটি কৌতূহলী চোখ কী হচ্ছে দেখতে চেষ্টা করবে।রাবেয়া বলল, আমি আবার বলব।বেশ।কী হয় বললে? আমি কাতর গলায় বললাম, সে ভারি লজ্জা রাবেয়া। এটা খুব একটা লজ্জার কথা। তবে যে ও আমাকে বলল।কে?

আমি বুঝতে পারছি, রাবেয়া নিশ্চয়ই কথাগুলি বাইরে কোথাও শুনে এসেছে। কিন্তু রাবেয়াকে, যার বয়স গত আগষ্ট মাসে বাইশ হয়েছে, তাকে সরাসরি এমন একটি কদৰ্য্য কথা কেউ বলতে পারে ভাবি নি।আমি বললাম, কে বলেছে? আজ সকালে বলেছে।কে সে? ঐ যে লম্বা ফর্সা।রাবেয়া সেই ছেলেটির আর কোনো পরিচয়ই দিতে পারবে না। আবারও রাবেয়াবেড়াতে বেরুবে, আবার হয়তো কেউ এমনি একটি ইতর অশ্লীল কথা বলে বসবে তাকে।খোকা তোর দুধ।মা দুধের বাটি টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। কাল রাতে তাঁর জ্বর এসেছিল। বেশ বাড়াবাড়ি রকমের জ্বর। বাবা মাঝরাত্তিরে আমার দরজায় ঘা দিয়েছিলেন। আমার ঘুমের ঘোর না কাটতেই শুনলাম, তোর কাছে এ্যাসপিরিন আছে খোকা?

স্বপ্ন দেখছি এই ভেবে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ার উদ্যোগ করতেই মায়ের কান্না শুনলাম। মা অসুখ-বিসুখ একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। অল্প জ্বর, মাথা ব্যাথা–এতেই কাহিল।বাবা আবার ডাকলেন, খোকা, তোর কাছে এ্যাসপিরিন আছে? তোষকের নিচে আমার ডাক্তারখানা। এ্যাসপিরিন, ডেসপ্রোটেব এই জাতীয় ট্যাবলেট জমান আছে। অন্ধকারেই আমি মাঝারি সাইজের ট্যাবলেট খুঁজতে লাগলাম। এ ঘরে আলো নেই। কোথায় যেন তার জ্বলে গেছে। রাতে হ্যাঁরিকেন জ্বালান হয়। ঘুমুবার সময় রুনু হারিকেন নিবিয়ে দেয় আলোতে রুনুর ঘুম হয় না। বাবা বললেন, খোকা, পেয়েছিস?

হুঁ। কী হয়েছে? তোর মার জ্বর।জ্বরে এ্যাসপিরিন কী হবে? খুব মাথাব্যথাও আছে।অ।তিনটি ট্যাবলেট হাতে নিয়ে দরজা খুলতেই বারান্দায় লাগান পঁচিশ পাওয়ারের বাল্ব্বের আলো এসে পড়ল। কী বাজে ব্যাপার! একটিও এ্যাসপিরিন নয়। বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, ঘরে দেশলাই রাখতে পারিস না? মনে পড়ল ড্রয়ারে একটি নতুন দেশলাই আর তিনটি বৃস্টল সিগারেট রয়েছে। সারা দিনে পাঁচটার বেশি খাব না ভেবেও সাতটা হয়ে গেছে। আর এখন এই মধ্যরাতে একটা তো জ্বালাতেই হবে। কিছুক্ষণের ভেতরই একটু সিগারেট ধরাব, এতেই মনটা ভরে উঠল। বাবা এ্যাসপিরিন নিয়ে চলে গেলেন। দেশলাই জ্বালাতেই চোখে পড়ল, রাবেয়া বিশ্ৰীভাবে শুয়ে রয়েছে। প্রায় সমস্তটা শাড়ি পাকিয়ে পুটলি বানিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে রেখেছে। শীতের সময় মশা থাকে না, মশারির আবুও সেই কারণেই অনুপস্থিত। বাবোব গলা শোনা গেল, নাও শানু, খেয়ে ফেল ট্যাবলেটটা।

আশ্চর্য! বাবা এমন আদুরে গলায় ডাকতে পারেন! আমার লজ্জা করতে লাগল। বাবা আবার ডাকলেন, শানু শানু।শাহানা নামটাকে কী সুন্দর করে ভেঙে শানু ডাকছেন বাবা। আমার আর বাবার ঘরের ব্যবধানটা বাঁশের বেড়ার ব্যবধান। উপরের দিকে প্রায় দু হাত খানিক ফাঁকা। সামান্যতম শব্দের কথাও আমার ঘকে ভেসে আসে। আমি একটা চুমুর শব্দও শুনলাম।আমার মাঝে মাঝে ইনসমনিয়া হয়। আমার তোষকের নিচে চারটে ভেলিয়াম-টু ট্যাবলেট আছে। কিন্তু আমি কখনো ভেলিয়াম খাই না। ঘুমের ওষুধ হার্ট দুর্বল করে। আমার বন্ধু সলিল ঘুমোনর জন্য দুটি মাত্র বড়ি খেয়ে মারা গিয়েছিল। তার হার্টের অসুখ ছিল। আমারও হয়তো আছে। আমার মাঝে মাঝে বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা হয়।

আমি হাজার ইনসমনিয়াতেও ঘুমের ওষুধ খাই না। মাঝে মাঝে এ জন্যে আমার বেশ অসুবিধা হয়। মাঝরাতে বাবা যখন শানু শানু, এই শাহানা বলে ডাকতে থাকেন, তখন আমার কান গরম হয়ে ওঠে। নাক ঘামতে থাকে। হার্টের স্পন্দন দ্রুত ও স্পষ্ট হয়। রাতের নাটকের সব কটি কথা আমার জানা। মা বলেন, আহা করি কি? ছি! বাবা ফিসফিস করে কী বলেন। তাঁর গলা খাদে নেমে আসে। মা জড়িত কণ্ঠে হাসেন। আমি দু হাতে আমার কান বন্ধ করে ফেলি। নিজের বুকের শব্দটা সে সময় বড়ো বেশি স্পষ্ট মনে হয়। কিছুক্ষণের ভিতরই আবার সব নীরব হয়।রুনু আর রাবেয়া ঘুমের ঘোরে বিজবিজ করে। টেবিল ঘড়ির টক টিক টক টক শব্দ আবার ফিরে আসে। আমি টেবিলে রাখা জগে মুখ লাগিয়ে ঢকঢ়ক করে পানি খেয়ে বাইরে এসে দাঁড়াই।

বারান্দার এক পাশে দুটি হাস্নুহেনা গাছ আছে। মা বলেন হাছনাহেনা। দুটোই প্রকাণ্ড। রাতের বেলায় তার পাশে এসে দাঁড়ালে ফুলের গন্ধে নেশার মতো হয়। হামুহেনার গন্ধে নাকি সাপ আসে। মন্টু এই গাছের নিচেই এক বার একটা মস্ত সাপ মেরেছিল। চন্দ্রবোড়া সাপ। মা দেখে আঁতকে উঠে বলেছিলেন, কি করলি রে মন্টু, এর জোড়াটা যে এবার তোকে খুঁজে বেড়াবে।আমি যদিও এ-সব বিশ্বাস করতাম না, তবু আমার ভয় লাগছিল। আমি তন্ন তন্ন করে অন্য সাপটাকে খুঁজলাম। বাড়ির চারপাশে কার্বলিক এসিড দেওয়া হল। মাস্টার চাচা বললেন, যে সাপটা রয়ে গেছে সেটা পুরুষ সাপ। সাপ দেখে তিনি স্ত্রী-পুরুষ বলতে পারতেন। কদিন সবাই খুব ভয়ে ভয়ে কাটালাম, যদিও সেই পুরুষ সাপটিকে কখনো দেখা যায় নি।রাবেয়া বলল, মা আমি দুধ খাব।

মার কাল রাতে জ্বর এসেছিল। তাঁর মুখ শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। রাবেয়ার কথা শুনে মারি মুখ আরো শুকিয়ে গেল। তাঁকে বাচ্চা খুকির মতো দেখাতে লাগল। আমি জানি আমরা কেউ যখন কোনো একটা জিনিসের জন্যে আব্দার করি এবং মা যখন সেটি দিতে পারেন না। তখন তাঁর মুখ এমনি লম্বাটে হয়ে বাচ্চা খুকিদের মতো দেখাতে থাকে। তাঁর নাকের পাতলা চামড়া তিরতির করে কাঁপতে থাকে। ছোট বয়সে মার এই ভঙ্গিটাকে আঁমার খুব খারাপ লাগত। আমি একটি জিনিস চেয়েছি, মা সেটি দিতে পারছেন না। তাঁর মুখ বাচ্চা খুকিদের মতো হয়ে গিয়েছে। নাকের ফর্সা পাতলা পাতা তিরতির করে কীপছে। মায়ের এই ভঙ্গিটাকে আমার অপরাধীর ভঙ্গি বলে মনে হত। আমি মাকে কী করে কষ্ট দেওয়া যায় তা ভাবতে থাকতাম। মোর গায়ে একটি টিকটিকি ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে হত। মা টিকটিকিকে বড়ো ভয় পান।

মুখে বলেন। ঘৃণা, কিন্তু আমি জানি এ তাঁর ভয়। এক বার মা ভাত খেতে বসেছেন, হঠাৎ ছাদ থেকে একটা টিকটিকির বাচ্চা এসে পড়ল তাঁর মাথায়। তিনি হড়হড় করে বমি করে ফেললেন। মার উপর রাগ হলেই আমি টিকটিকি খুঁজতাম। কিন্তু টিকটিকি খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। পেলেও ধরা যেত না। কাপড়ের বল বানিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারতাম দেয়ালে টিকটিকির গায়। টুপ করে তার ল্যাজ খসে পড়ত। সেই ল্যাজও মা ঘেন্না করতেন। মা কখনো আমাদের কিছু বলতেন না। মা বড়ো বেশি ভালোমানুষ। বাবা মারতেন প্রায়ই ভীষণ মার। মা বুলতেন, আহা কী করা! আহা ব্যথা পায় না? বাবা বলতেন, যাও, সরে যাও সামনে থেকে। আদর দিয়ে মাথায় তুলেছ তুমি। মাকে তখন বড়ো বেশি অসহায় মনে হত। আর আমার ইচ্ছে হত কাল ভোরেই বাড়ি থেকে পালাব। আর কখনো আসব না।

মা আমাকে দুধ দাও। রাবেয়া জোন করতে লাগল। আমি বাটিটি তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। মা মৃদু। কণ্ঠে বললেন, আহা, খা না তুই, তোর পরীক্ষা।দুধের বিলাসিতাটুকু আমার জন্যেই। সামনেই এম.এস.সি ফাইনাল, রাত জেগে পড়ি। নটার দিকে মা দুধ নিয়ে আসেন। আমি দুধে চুমুক দিতেই মা নীরবে রাবেয়ার শাড়ি থেকে একটি একটি করে সেফটিপিন খুলতে থাকেন। রাবেয়ার শাড়িতে গোটা দশেক সেফটিপিন সারা দিন লাগান থাকে। সমস্ত দিন সে ঘুরে বেড়ায়। তার অনাবৃত শরীর ভুলেও যেন কারুর চোখে না পড়ে, এই ভয়েই মা এ করেন। রাবেয়াকে ঘরে আটকে রাখা যাবে না।–তাকে সালোয়ার কামিজও পরান যাবে না। তার সে-বয়স নেই। অথচ সবাই রাবেয়ার দিকে অসংকোচে তাকাবে। বয়স হলেই ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকায়। সেই তাকানীয় লজ্জা থাকে, দৃষ্টিতে সংকোচ থাকে। কিন্তু রাবেয়ার ব্যাপারে সংকোচ বা লজ্জার কোনো কারণ নেই। রাবেয়াকে যে-কেউ অতি কুৎসিত কথা বললেও সে হাসিমুখে সে-কথা শুনবে। বাড়ি এসে অনায়াসে সবাইকে বলে বেড়াবে।

মা রাবেয়ার পাশে বসে রাবেয়ার মাথায় হাত রাখলেন। আমি একটি ছোট কিন্তু স্পষ্ট দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ শুনলাম। রাবেয়া ঢকচক করে দুধ খাচ্ছে। রাবেয়া হয়তো ঠিক রূপসী নয়। কিংবা কে জানে হয়তো রূপসী। রং হালকা কালো। বড়ো বড়ো চোখ, স্বচ্ছ দৃষ্টি, সুন্দর ঠোঁট। হাসলেই চিবুক আর গালে টোল পড়ে। যেসমস্ত মেয়ে হাসলে টোল পড়ে, তারা কারণ্যে-অকারণে হাসে। তারা জানে হাসলে তাদের ভালো দেখায়। রাবেয়া তা জানে না, তবু সে হাসে। কারণে-অকারণে হাসে। রাবেয়ার কপালে, ঠিক মাঝখানে একটা কাটা দাগ আছে। ছোটবেলায় চৌকাঠে পড়ে গিয়েছিল। দুধ শেষ করে রাবেয়া বলল, বাজে দুধ। ছিঃ! মা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, শুভাপুরের পীর সাহেবের কাছে যাবি এক বার? শুভাপুরে এক পীর সাহেব থাকেন। পাগল ভালো করতে পারেন বলে খ্যাতি। শুভাপুর এখান থেকে আট মাইল। সাইকেলে ঘণ্টাখানেক লাগে, কিন্তু আমি জানি পীর-ফকিরে কিছু হবে না। বড়ো ডাক্তার যদি কিছু করতে পারে। কিন্তু আমাদের পয়সা নেই। আমার ছোট হয়ে যাওয়া শার্ট মন্টু পরে। আমরা কাপড় কিনি বৎসরে এক বার, রোজার ঈদে।

রুনু এল একটু পরেই। আড়চোখে দু-তিন বার তাকাল রাবেয়ার দিকে। না, রাবেয়া সেই কুৎসিত কথাগুলি আর বলছে না। রুনু হাই তুলল। তার ঘুম পাচ্ছে। চোখ ফুলে উঠেছে। রাবেয়ার নোংরা কথা শুনে রুনুর কেমন লেগেছিল কে জানে। রুলুর বয়স এখন তেরো। আগামী নভেম্বরে চৌদ্দতে পড়বে। রুনুর বৃশ্চিক রাশি। আমার যখন এমন বয়স ছিল, তখন এ ধরনের কথা শুনে বেশ লাগত। সেই বয়সে মেয়েদের কথা ভাবতে আমার ভালো লাগত। টগর ভাইয়ের বাসায় সন্ধ্যাবেলা অঙ্ক বুঝতে যেতাম। নীলু বলে তার একটা ছোট বোন ছিল। বড়ো হয়ে এই মেয়েটিকে বিয়ে করব ভেবে বেশ আনন্দ হত আমার। নীলুর সঙ্গে কথা বলতেও লজ্জা লাগত, কথা বেধে যেত মুখে। নীলু। যখন আমার হাত ধরে টেনে বলত, আসুন না। দাদু ভাই, লুড়ু খেলি। তখন অকারণেই আমার কান লাল হয়ে উঠত। গলার কাছটায় ভার-তার লাগাত।

রুনুরও কি কোনো ছেলেকে ভালো লাগে? রুনুও কি কখনো ভাবে, বড়ো হয়ে আমি এই ছেলেটিকে বিয়ে করব? কে জানে। হয়তো ভাবে, হয়তো ভাবে না। রুনু বড় লক্ষ্মী মেয়ে। এত লক্ষ্মী আর এত কোমল যে আমার মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। কেন জানি না। আমার মনে হয়, এ ধরনের মেয়েরা সুখ পায় না জীবনে। আমি রুনুকে অনেক বড়ো করব। রুনু ডাক্তার হবে বড়ো হলে। ষ্টেথোসকোপ গলায়, কালো ব্যাগ হাতে মেয়ে ডাক্তারদের বড়ো সুন্দর দেখায়। রুনু অঙ্ক ভালো পারে না। আমি তাকে নিজের পড়া বন্ধ রেখে এ্যালজেবরা বোঝাই। ডাক্তারী পড়তে অবশ্যি অঙ্ক লাগে না।সেদিন রুনুর অঙ্কখাতা উন্টে চমকে গিয়েছিলাম। বেশ গোটা গোটা করে লেখা আমি ভালোবাসি। পরের কথাগুলি পড়ে অবশ্যি আমি লজ্জাই পেলাম। সেটি একটি ছেলেমানুষী কবিতা। আমি পৃথিবীর এই সৌন্দর্য ভালোবাসি, গাছপালা-গান ভালোবাসি–এই জাতীয়। আমি বললাম, সুন্দর কবিতা হয়েছে রুনু।

রুনু লজ্জায় গলদা চিংড়ির মতো লাল হয়ে বলল, যাও, ভারি তো। এটা মোটেই ভালো হয় নি।আমি বললাম, তাহলে তো মনে হয়। অনেক কবিতা লিখেছিস।উঁহু। রুনু মাথা নিচু করে হাসতে লাগল।আমি বললাম, দেখা রুনু, লক্ষ্মী মেয়ে তুই।রুনু আরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে আমার ট্রাঙ্ক খুলল। তার যাবতীয় গোপন সম্পত্তি আমার টাঙ্কে থাকে। এই বয়সে কত তুচ্ছ জিনিস অন্যের চোখের আড়াল করে রাখতে হয়। কিন্তু রুনুর নিজস্ব কোনো বাক্স নেই। আমার ট্রাঙ্কের এক পাশে তার দুটি বড়ো বড়ো চারকোণা বিস্কুটের বাক্স থাকে। আর কিছু খাতাপত্রও থাকে দেখছি। বুনু হাতির ছবি আকা একটা দুনাম্বরী খাতা নিয়ে এসে লজ্জায় বেগুনি হয়ে গেল।আমি বললাম, তুই পড়ে শোনা আমাকে।না, তুমি পড়।দে তাহলে আমার হাতে।

রুনু খাতাটা গুঁজে দিয়ে দৌড়ে পালাল। দেখলাম সব মিলিয়ে বারোখানা কবিতা। দুটি মায়ের ওপর, একটি পালার ওপর। (পলা আমাদের পোষা কুকুর। এক দুপুরে কোথায় যে চলে গেল!) একটি মন্টুর সাপ মারা উপলক্ষে– মন্টু ভাই তো মারলেন মস্ত বড়ো সাপ চার হাত লম্বা সেটি–কী তার প্রতাপ! মনে মনে ভাবলাম, রুনুকে একটি ভালো খাতা কিনে দেব। রুনু খাতা ভর্তি করে ফেন্সবে কবিতায়। রবীন্দ্রনাথের একটি গল্পে বাচ্চা মেয়ের একটি চরিত্র আছে। মেয়েটি লিখতে শিখে আদি ঘরের দেয়াল, বইয়ের পাতা, মার হিসেবের খাতায় যা মনে আসত তাই লিখে বেড়াত। মেয়েটির দাদা তাকে একটি চমৎকার খাতা দিয়েছিল, যা তার জীবনে পরম সখের সামগ্ৰী হয়েছিল। কিন্তু আমার হাতে টাকা ছিল না।

তবু আমি মনস্থির করে ফেললাম, রুনুকে একটা খুব ভালো খাতা কিনে দেব। আমার মনে পড়ল হাতি মার্ক যে-খাতাটায় রুনু কবিতা লিখেছে, রুলু সেটি আমার কাছ থেকেই চেয়ে নিয়েছিল। যেখানে আমার নাম ছিল, সেটি কেটে রুলু বড়ো বড়ো করে নিজের নাম লিখেছে। দিনে কঘণ্টা পড়ছি তার হিসেব রাখার জন্যে খাতাটি কিনেছিলাম। সপ্তাহ দুয়েক যাবার পরও যখন কিছু লেখা হয় নি, তখন এক দিন রুনু সংকুচিতভাবে আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সাপের মতো একেবেঁকে বলল, দাদা খাতাটা আমাকে দাও না।কোন খাতা?

এইটে।যা, নিয়ে যা।রুলু খাতা হাতে চলে গেল। তার মুখে সেদিন যে—খুশির আভা দেখেছি, আমি আবার তা দেখব। সাড়ে তিন টাকা দিয়ে প্লাষ্টিকের সুদৃশ্য কাভারের চমৎকার একটি খাতা কিনে দেব তাকে।আমার হাতে যদিও টাকা ছিল না, তবু আমি রুনুকে খাতা কিনে দিয়েছিলাম। রুণুকে বড়ো ভালোবাসি। আমি। বড়ো ভালোবাসি। রুনুকে দেখলেই আমার আদর করতে ইচ্ছে হয়। রুলু বড়ো লক্ষ্মী মেয়ে। রুনুর ভালো নাম সালেহা। রুনু নামটা আমারই দেওয়া। রুনুর জন্যে রুনু নামটাই মানানসই। রুনু নামে কেমন একটা বাজনার আমেজ আসে। আবার যখন দীর্ঘ স্বরে ডাকা হয় রুউউউউ নুউউউউ তখন কেমন একটা আমেজ আসে। রুনু বলল, দাদা, আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

 

Read more

নন্দিত নরকে পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.