নবনী পর্ব – ১০ হুমায়ূন আহমেদ

নবনী পর্ব – ১০

শোন নবনী, তুমি একটা অসম্ভব ভাল মেয়ে। আমি চাই না আমার কারণে তোমার কোন ক্ষতি হোক।আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, ক্ষতির কথা আসছে কেন? কি আবোল তাবোল কথা বলছেন? স্যার আরেকটা কথা আমি কোন চিঠি ফিঠি কাউকে লিখিনি— আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই মৌলবীকে চিঠি লিখব। অসুখে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আপনার এখানে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে।

স্যার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, আমি আর আপনার কাছে খাবার নিয়ে আসব না।সেদিন রাতে খুব বৃষ্টি। আমি আবার তাঁর খাবার নিয়ে গেলাম। স্যারের ঘরে পা দেয়া মাত্র ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। স্যার ব্যস্ত গলায় বললেন, দাঁড়াও দাঁড়াও মোমবাতি আছে। মোমবাতি জ্বালাচ্ছি।আমি অদ্ভুত গলায় বললাম–না মোমবাতি জ্বালাতে হবে না। অন্ধকারই ভাল।স্যার চমকে উঠে বললেন, নবনী ঘরে যাও। প্লীজ ঘরে যাও। আমি বললাম, না।

কি প্ৰচণ্ড ঝড় হল সে রাতে। আমাদের শিরীষ গাছের একটা ডাল প্ৰচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ে গেল। হোক যা ইচ্ছা হোক। আজ আমার আর কিছুই যায় আসে না। প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। হোক বর্ষণ। সারা পৃথিবী তলিয়ে যাক।আমাদের ড্রেসিং টেবিলটা চলে এসেছে। গাবদা ধরনের একটা জিনিস। আয়নাটাও বোধহয় সস্তা— মুখ কেমন বাঁকা দেখা যায়। যে পালিশের জন্যে এতদিন দেরী হল সেই পালিশে ড্রেসিং টেবিলের কোন উন্নতি বলে মনে হল না। ম্যাট ম্যাটে রঙ।

নোমান হাসি মুখে বলল, কি জিনিসটা সুন্দর না?

আমি বললাম, সুন্দর। খুব সুন্দর।

সস্তায় পেয়ে গেছি। সেগুন কাঠ। ঘুণ ধরবে না। দুশ বছর পরেও কিছু उश नां।।

আমি বললাম, দুশ বছর পর্যন্ত আমাদের কোন ড্রেসিং টেবিল কিনতে হবে। না। এটা দিয়েই চালিয়ে দেব।সে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে অস্বস্তি। আমার রসিকতটা বোধহয় বুঝতে পারছে না। এটা দোষের কিছু না। অধিকাংশ মানুষই রসিকতা বুঝতে পারে না। আমার বাবাও পারেন না। অথচ তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান।

নোমানকেও আমার বুদ্ধিমান মনে হয়। সরল ধরনের বুদ্ধি। এই জাতীয় বুদ্ধির মানুষ রসিকতা করতেও পারে না। রসিকতা বুঝতেও পারে না। এরা খুব কর্মঠ হয়। বিশ্বস্ত হয়। এরা যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করে সেই প্রতিষ্ঠানের জন্যেই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তবে তাদের কোন উন্নতি হয় না। নিজের অবস্থার উন্নতির জন্যে এদের মাথা ব্যথা থাকে না। এরা অল্পতেই তুষ্ট।

ড্রেসিং টেবিলটা ঘরে আসার পর থেকে তার হাসিমুখ দেখে আমার খুব মজা লাগছে। এর মধ্যে গামছা দিয়ে সে দুবার এটা মুছল। কাছ থেকে, দূর থেকে নানান ভঙ্গিমায় নিজেকে দেখল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব কায়দা করে চুল আঁচড়াল তার চুল আঁচড়ানোই ছিল— দুই হাতে সেই চুল আউলা ঝাউলা করে আবার আঁচড়াল। আশ্চর্য ছেলেমানুষী।

নবনী।

বল।

ড্রেসিং টেবিলের জন্যে একটা ঢাকনি বানানো দরকার। নয়ত ধুলা পড়ে পালিশ নষ্ট হয়ে যাবে।ড্রেসিং টেবিলে ঢাকনি থাকে না।কে বলল থাকে না। ড্রেসিং টেবিলে ঢাকনি বেশি দরকার। রাতের বেলা আয়না ঢেকে রাখতে হয়। রাতের বেলা আয়নায় মুখ দেখা খুবই অলক্ষণ। তুমি বোধহয় এসব বিশ্বাস কর না? না।পামিস্ট্রি বিশ্বাস কর? হাত দেখা। না।অহনা আবার এসব খুব বিশ্বাস করে। কেউ হাত দেখতে জানে বললেই হল সে হাত মেলে দিবে।ও আচ্ছা।

একবার সে খবর পেয়েছে হ্নীলা বলে একটা জায়গা আছে সেখানে খুব বড় একজন পামিস্ট্র থাকেন। যুগানন্দ আচার্য। স্কুলের সংস্কৃতের টিচার। সে সেখানে যাবেই। সফিক বিরক্ত হয়ে বলল, নোমান তুই ওকে নিয়ে যা। ঝামেলা চুকিয়ে আয়।তুমি নিয়ে গেলে? না নিয়ে উপায় আছে? অহনা মুখ দিয়ে যা বলবে তা করে ছাড়বে। সে বিরাট ইতিহাস। জায়গাটা হল টেকনাফের কাছাকাছি। অতি দুৰ্গম।

আমি মাইক্ৰবাস নিয়ে আগে চলে গেলাম। অহনা প্লেনে করে গেল কক্সবাজার। সেখান থেকে ওকে নিয়ে মাইক্রবাসে করে রওনা হলাম। রাস্তা গেছে পানিতে ডুবে। রাস্তার দুই ধারে লাল ফ্ল্যাগ পুঁতে রেখেছে। ফ্ল্যাগ দেখে দেখে যাওয়া। এর মধ্যে টায়ার গেল পাংচার হয়ে।শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল যুগান্দ আচার্যকে? মজাতো এই খানেই। কেউ এই লোকের নামও শুনে নাই। স্কুলই নেই। স্কুল টিচার কোত্থেকে আসবে? তোমরা কি করলে ফিরে এলে?

ফিরে আসব কি করে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঐ সব অঞ্চলে সন্ধ্যার পর গাড়ি ঘোড়া চলে না। ডাকাত পড়ে। তারচেয়ে বড় কথা কয়েকদিন ধরে পাহাড়ে বুনো হাতি নেমেছে, তিনটা মানুষ মেরেছে। আমারতো মাথায় বাড়ি। কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। হোটেল নেই রেস্ট হাউস নেই। কিছুই নেই। গেলাম টেকনাফ। সেখানে বনবিভাগের একটা রেষ্ট হাউস পাওয়া গেল।

একটাই রুম। আহনাকে সেখানে রেখে আমি মাইক্রবাসের ভেতর শুয়ে আছি। খবর পাওয়া গেছে রাস্তায় হাতি নেমে গেছে। সব বাতি টাতি নিভিয়ে দিতে বলেছে। বাতি দেখলেই না-কি হাতি ছুটে আসে। কত কাণ্ড! চা করতো নবনী।চা খাই! আর তুমি এক কাজ কর পাউডার টাউডার এইসব দিয়ে ড্রেসিং টেবিলটা সুন্দর করে সাজাও অহনা দেখতে আসবে।

উনি এই ড্রেসিং টেবিল দেখতে আসবেন?

হ্যাঁ। তাকেও বলেছি।

ভাল করেছ।

আমি চা বানাতে গেলাম। নোমান একটা মোড়া নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রইল। আনন্দিত মুখ, সুখী সুখী চেহারা।আজ তার অফিস আছে। অথচ সারাদিন দিব্যি অফিস বাদ দিয়ে ঘরে বসে আছে। অফিসে তার কাজটা কি আমি জানি না। আমার ক্ষীণ সন্দেহ তার প্রধান কাজ বন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে থাকা। ফুট ফরমাশ খাটা। একদিন জিজ্ঞেসও করেছিলাম–অফিসে তোমার কাজটা কি বলতো?

সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। যেন খুব বোকার মত প্রশ্ন করেছি। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, যখন যে কাজ দেয় সেটাই করতে হয়। ধরা বাধা কিছু না। এড ফ্লিম করার জন্যে আর্টিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ তাদের আনা নেয়া–কাজের কি শেষ আছে? প্রয়োজনে লাইটবয়ের কাজও করতে হয়।সেটা কি? আর্টিস্টের উপর লাইট ফেলা।ও আচ্ছা। খুব কঠিন কাজ?

দেখে মনে হবে খুব সহজ কাজ আসলে তা না। কঠিন আছে। টেকনিক্যাল কাজ সবই কঠিন।তুমি যে কাজটা কর সেটার নাম কি? তোমার কথাই বুঝতে পারছি না— নাম আবার কি? অফিসে কত রকম পোস্ট আছে–কেউ ম্যানেজার, কেউ সুপারভাইজার, কেউ ক্যাশিয়ার, হেড ক্লার্ক… তুমি কি? ও আমার অজ্ঞতায় হো হো করে কিছুক্ষণ হেসে বলল— আমাদের এসব কিছু নেই। তবে আমার বেতন হয় অহনার পি এ এই খাতে।তুমি অহনার পি এ?

কাগজে কলমে তাই। আসলে অফিসের কাজ করে ফুরসুত পাই না।আজ অফিসে গেলে না? আমার হল স্বাধীন চাকরির মত— ইচ্ছা হল গেলাম ইচ্ছা হল গেলাম না। আজ ছুটি নিলাম। চল বিকালে তোমাকে নিয়ে বের হব মিরপুরের দিকে যাব।তুমি না বললে— অহনা আসবেন।

সে এলেও আসবে রাত নটার পরে। তার লেডিস ক্লাবের মিটিং আছে।অহনার সঙ্গে তার স্বামীর যে সমস্যা ছিল সেটা মিটে গেছে? হুঁ মিটে গেছে। এখন আবার গলায় গলায় ভাব।তোমাদের ছবির স্যুটিং শুরু হবে না? হবে। এইবার তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার অবশ্যি ভাল লাগবে না। খুবই বিরক্তিকর কাজ। ছবি মানে ধৈর্য পরীক্ষা আর কিছু না।চা খেতে খেতে নোমান বলল, কাপড় পরে নাও চল ঘুরে আসি।কোথায় যাবে চিড়িয়াখানায়?

হ্যাঁ। আর কোথায়? এই পর্যন্ত আমরা ছবার বাইরে গেছি। এই ছবারের মধ্যে পাঁচবারই গিয়েছি চিড়িয়াখানায়। খানিকক্ষণ ঘুরেই সে এসে দাঁড়াবে বান্দরের খাঁচার সামনে। মুগ্ধ বিস্ময়ে বলবে–কি আজিব জানোয়ার। সে অবাক হয়ে আজিব জানোয়ার দেখে, আমি দেখি তাকে। বাঁদরদের সঙ্গে সে নানা কথাবার্তা বলে সেইসব শুনতেও মজা লাগে।এই লাফ দে। লাফ দে… কিচ কিচ কিচ… ঐ লম্বুটার ল্যাজ ধরে টান মার না। দেখছিস কি? আবার দেখি হাসে… কিচ কিচ কিচ…

আমাদের চিড়িয়াখানায় যাওয়া হল না। কাপড় চোপড় পরে বেরুবার মুখে অহনা এসে উপস্থিত হলেন। চোখ ধাঁধানো উগ্ৰ পোশাক। শাড়ি এমন পাতলা যে এই শাড়ি গায়ে থাকা না থাকা অর্থহীন। ব্লাউজটিও ভিন্ন ধরনের কাচুলী জাতীয়–নাচের মেয়েরা বোধহয় এরকম পরে। ঠোঁটে তিনি এমন লিপিষ্টিক মেখেছেন যে দেখে মনে হয় ঠোঁটে আগুন লেগে গেছে।

এমন আগুন রঙা লিপিষ্টিক আমি আগে দেখি নি। অহনা এসেছেন নোমানের ড্রেসিং টেবিল দেখতে। তিনি নানা দিক থেকে ঘুরে ফিরে ড্রেসিং টেবিল দেখলেন। মুগ্ধ স্বরে বললেন, অপূর্ব! নোমান বলল, অরিজিনাল সেগুন কাঠ দুশ বছরেও কিছু হবে না।অহনা বললেন, সেগুন কাঠ ছাড়া এত ভাল পালিশ হত না। অদ্ভুত সুন্দর। আয়নাটায় একটু ঢেউ ঢেউ ভাব আছে। এটা এমন কিছু না।

অহনা আমাদের খাটে পা বুলিয়ে বসলেন। পা দুলাতে দুলাতে বললেন, নোমান জিলাপী খাব। তোমার সেই বিখ্যাত জিলাপী নিয়ে এসো। ভাল কথা তোমরা কি কোথাও বেরুচ্ছিলে? হুঁ। আরেকদিন যাব অসুবিধা নেই।যাচ্ছিলে কোথায়? বাঁদর দেখতে নিশ্চয়ই। বাঁদর দেখা মোটেই জরুরি নয়। আমি খুব জরুরি কাজ নিয়ে এসেছি। গোরানে একজন পামিস্ট আছে। আমি ঠিকানা নিয়ে এসেছি। তুমি আমাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। পারবে না?

অবশ্যই পারব।অহনা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, আপনার স্বামীকে কিছুক্ষণের জন্যে ধার নিচ্ছি। পামিস্টের কথা শুনলে আমার আবার মাথায় ঠিক থাকে না। আমার পামিস্ট প্রীতির কথা নোমান আপনাকে বলে নি? বলেছে।পামিস্ট নিয়ে আমার অসংখ্য গল্প আছে। কিছু কিছু বোধহয় শুনেছেন। হীলাতে পামিষ্টের খোজে গিয়ে যে পাগলা হাতির খপ্পরে পড়েছিলাম। সেই গল্প শুনেছেন?শুনেছি।

অহনা পা দুলিয়ে দুলিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলেন। জিলাপী খেলেন চা খেলেন। মদিনার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করলেন, ময়নাটার সঙ্গেও কিছু কথা বললেন। খাঁচাটাকে দোলা দিয়ে বললেন, এই ময়না বল দেখি, অহনা! অহনা! অহনা।ময়না সঙ্গে সঙ্গে বলল, অহনা! অহনা! আহনা! যাবার সময় তিনি মদিনাকে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে গেলেন। মদিনা সারা সন্ধ্যা এই নোট হাতে বারান্দায় স্থানুর মত বসে রইল।

মদিনা তার পাঁচশ টাকার নোট নিয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে বারান্দায় বসে আছে। আমি চলে এসেছি ছাদে। এই বাড়িটার ছাদটায় ওঠা এক সমস্যা। খানিকটা অংশ দেয়ালের গায়ে আটকানো খাড়া লোহার সিড়ি বেয়ে উঠতে হয়। শুরুতে এই ছাদটা আমার পছন্দ হয় নি। এখন পছন্দ। খুব নিরিবিলি। হঠাৎ কেউ ছাদে উঠে আসবে সে সম্ভাবনা নেই। কেউ আসবে না। তাছাড়া বাড়ির চারদিকে পুরানো পুরানো গাছ আছে বলেই ছাদটায় এক ধরনের আব্রু আছে।

ইরার গল্পের বইটা এক হাতে নিয়ে বেশ ঝামেলা করে ছাদে উঠলাম। গল্পের বই পড়ার জন্য ছাদে আমি সুন্দর একটা জায়গা বের করেছি। পশ্চিম দিকের ছাদে পানির ট্যাঙ্কে হেলান দিয়ে বসলেই হয়। খুব সুন্দর জায়গা। মজার ব্যাপার হচ্ছে বই পড়ার এত সুন্দর জায়গা থাকলেও আমি এখন এখন পর্যন্ত একটা বইও পড়ে শেষ করতে পারি নি। তিথির নীল তোয়ালে বইটা কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরই হাই উঠে। বই বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকি।

হাতে একটি বই থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে সব সময় মনে হবে। আমি অকারণে বসে নেই। আমার একটা কাজ আছে।আমি পানির ট্যাঙ্কে হেলান দিয়ে বসে আছি। গাছের মাথায় রোদ এখনো ঘণ্টা খানিক সময় আছে। বইটা খুলতেই ইরার চিঠি বের হয়ে এল। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি দিচ্ছে। এটা সর্বশেষ চিঠি কিনা বুঝতে পারছি না। ইরা চিঠিতে তারিখ থাকে না।

আপা,

তোমার কি হয়েছে বলা তো? তোমাকে এত করে আসতে লিখলাম, আসলে না। বড় মামা প্ৰচণ্ড জ্বর নিয়ে তোমার ওখান থেকে গেলেন। খুব ভুগলেন। প্রায় যমে-মানুষে টানাটানি। তুমি মামাকেও চিঠি দাও নি। আমাকে সেই যে প্ৰথম একটা চিঠি লিখলে তারপর আর না। বাবাকে দায়সারা গোছের একটা চিঠি দিয়েছ।

বড় মামার ধারণা–তুমি সবার উপর রাগ করে আছ, কারণ তোমাকে গরিব ধরনের একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আসল কারণটা কি আপা বলা তো? আমি ভাইয়াকে বলেছি আমাকে তোমার ওখানে নিয়ে যেতে। আমি নিজের চোখে দেখতে চাই ব্যাপারাটা কি | ভাইয়া প্ৰতিবারই বলে— আচ্ছা। আচ্ছা। ফুটবল খেলতে গিয়ে সে।

মাথায় চোট পেয়েছে বলেছিলাম না? এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার কোমরে কি না-কি হয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বাঁকা হয়ে দাঁড়ায়। বাঁকা হয়ে হাঁটে। ঐ দিন বাবা কি কারণে ভাইয়্যার উপর রাগ করে। বললেন, এই যে বক্রবার, শুনে যাও। এতে ভাইয়ার খুব লেগেছে। সে বিছানা-বালিশ নিয়ে চলে গেছে। তার এক বন্ধু আছে— সজল। এখন তাদের বাড়িতে থাকে। মাঝে মাঝে বাঁকা হয়ে আমাদের দেখতে আসে।

আমার বিয়ের ব্যাপারে যে কথাবার্তা হচ্ছিল তা আরো কিছুদূর এগিয়েছে। জামালপুর থেকে বরের বোন আমাকে দেখতে এলেন। ওজন পাঁচ মণের কাছাকাছি। আমাদের খাটে বসলেন। খাটে মটমট শব্দ হতে লাগল। আমি ভাবছি সর্বনাশ! এখন উনি যদি খাট ভেঙে পড়েন তাহলে আমাদের খাঁটও যাবে বিয়েও যাবে। যাই হোক, খাট ভাঙে নি। তবে বিয়ে ভেঙে গেছে। ভদ্রমহিলার আমাকে পছন্দ হয় নি। কাজেই, আপা, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আমার মন খারাপ। তোমার পায়ে পড়ি, আমার মন ঠিক করার জন্যে হলেও এসো।

ইতি

ইরা!

পুনশ্চঃ আপা, তুমি আসার সময় অবশ্যি লাইব্রেরির বইটা নিয়ে আসবে। অনেক ফাইন হয়ে গেছে।ইরার বিয়ে ভেঙে গেছে–এটা বড় ধরনের দুঃসংবাদ। বিয়ে একবার ভাঙতে শুরু করলে শুধু ভাঙতেই থাকে। তখন বিয়ের কোন সম্বন্ধ এসেছে শুনলেই আতঙ্ক লাগে।ইরার বিয়ে কি আমার জন্যে ভাঙল? সে যদিও কিছু লিখে নি তবু আমার তাই ধারণা। তবে আমার বড় মামা যতদিন আছেন।

ততদিন কোন চিন্তা নেই। তিনি একের পর এক সম্বন্ধ আনতেই থাকবেন এবং এক শুভলগ্নে দেখা যাবে ইরারও বিয়ে হয়ে গেছে। মামা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলবেন, যাক, দায়িত্ব শেষ হয়েছে।এই পৃথিবীতে কেউ কেউ প্রচুর দায়িত্ব নিয়ে জন্মায়, আবার কেউ কেউ জন্মায় কোন রকম দায়-দায়িত্ব ছাড়া। যেমন আমার বাবা। তাঁর জীবনের একমাত্র দায়িত্ব সম্ভবত খবরের কাগজ পড়া।

এই দায়িত্বটি তিনি খুব ভালভাবে পালন করেন। ইলেকশনের সময় এলে হঠাৎ দেখা যায় তিনি স্বতন্ত্র দল থেকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। বাবার যুবক বয়সের কালো চশমা-পরা একটা ছবির পোস্টারে সারা নেত্রকোনা শহর ঢেকে ফেলা হয়। গুণ্ডা-পাণ্ডা ধরনের কিছু ছেলেপুলে এই সময় আমাদের বাড়িতে চা-নাশতা খেতে থাকে এবং হাতখরচ নিতে থাকে। তারা প্ৰত্যেকেই না-কি বিরাট অর্গানাইজার। এতসব অর্গানাইজার চারপাশে নিয়েও বাবা যথারীতি ফেল করেন।

বেশির ভাগ সময়ই তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ইলেকশনের রেজাল্টের পর তিনি দরজা বন্ধ করে ঘণ্টা দুইতিনেক শুয়ে থেকে গম্ভীর মুখে মাকে ডেকে বলেন, বুঝলে মিনু, এই দেশে রাজনীতি করে লাভ নেই, বরং ছাতা সেলাই করাতেও লাভ। রাজনীতি আর করব না। হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললাম— No more politics, যে দেশের মানুষ সৎ-অসৎ বুঝে না সেই দেশে কিসের পলিটিকস্?

মা জানতেন, আমরাও জানতাম, এগুলো বাবার কথার কথা। আবার কোন নির্বাচন চলে আসবে। বাবার চারপাশে কিছু লোকজন জুটে যাবে, যারা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বাবাকে বলবে— আরো চৌধুরী সাহেব, আপনি না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে! একটা-দুটা সৎ মানুষ তো থাকা দরকার, যাদের পিছনে আমরা থাকব।

সৎ মানুষের সঙ্গে হারাতেও আনন্দ।বাবা বলবেন, না না, ইলেকশনের নাম আমি শুনতে চাই না। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি কানে ধরেছি।চৌধুরী সাহেব, আপনার শিক্ষা হলে তো হবে না। দেশবাসীর একটা শিক্ষা হওয়া দরকার। এইবার আমরা জিতে এই শিক্ষাটা দিব।না না, টাকা পয়সাও নেই।

টাকা পয়সা নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। দশের লাঠি একের বোঝা। এইবার আমরা পকেট থেকে পয়সা খরচ করে ইলেকশন করব। আপনাকে ঘর থেকে বের হতেও হবে না। আপনি দরজা বন্ধ করে নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। দেখেন আমরা কি করি।বাবা তখন খানিকটা নরম হয়ে জিজ্ঞেস করেন–দাঁড়াচ্ছে কে কে কিছু খবর পেয়েছ?

 

Read more

নবনী পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.