নবনী পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

নবনী পর্ব – ১১

যারা দাঁড়াচ্ছে তারা কেউ আপনার নখের কাছাকাছিও না। আপনার সামনে চেয়ারে বসার যোগ্যতাও তাদের নেই। তারা একটা জিনিসই পারে–রিলিফের গাম বেচে দেয়া। একজনের তো নামই পড়ে গেল আবদুল মজিদ গমচোরা।মজিদ ইলেকশন করছে? চক্ষুলজ্জাও দেখি নাই।তবে আমরা আপনাকে বলছি কি?

বাবা নড়েচড়ে বসেন। গলা উঁচিয়ে আমাকে ডাকেন, নবু কইরে, তোর মাকে বল চা বানাতে।আমরা বুঝে ফেলি–আবারও বাবা কিছু ধানী জমি বিক্রি করবেন।আমার দাদাজান মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অমানুষিক পরিশ্রম করে যে সম্মানজনক বিষয়-সম্পত্তি করে গিয়েছিলেন আমার বাবা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার সর্বনাশ করে যাচ্ছিলেন।

সবই শেষ করে দিতেন, বড় মামার জন্যে পারলেন না। নেত্রকোনায় আমাদের একটা বড় ফার্মেসী, একটা রাইস কল এবং দুটা বাড়ি বাবা অনেক চেষ্টা করেও বিক্রি করতে পারলেন না। পারলেন না মূলত বড় মামার জন্যে। মামা এইসব যক্ষের ধনের মত আগলে রাখতেন। বাবা ভীরু ধরনের মানুষ ছিলেন। বড় মামাকে যমের মত ভয় পেতেন। তাকে অগ্রাহ্য করার মত সাহস তিনি কোনদিনই সঞ্চয় করে উঠতে পারেন নি।

আমার এই সরল ধরনের রাজনীতি পাগল বাবার কাছে এক সকাল বেলা আমার স্যার উপস্থিত হলেন। বাবা তখন বারান্দায় চায়ের এবং আগের দিনের বাসি কাগজ নিয়ে বসেছেন। স্যার বাবার সামনে বসলেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আপনার কাছে আমার একটা প্ৰস্তাব আছে।বাবা খুব উৎসাহের সঙ্গে বললেন, বল। বল।আমি আপনার বড় কন্যাকে বিবাহ করতে চাই।

বাবার মুখ হা হয়ে গেল। তার কোল থেকে খবরের কাগজ মাটিতে পড়ে গেল। এই সম্ভাবনা হয়ত তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। বাবা বললেন, কি বললে? আমি ওকে অত্যন্ত পছন্দ করি। সেও করে…। কি বললে তুমি? নবনী পছন্দ করে। নবনী নবনী… বাবা চটি ফটফট করে আমার খোঁজে এলেন। আমি তখন পড়তে বসেছি। বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, মৌলনা এসব কি বলছে?

আমি শঙ্কিত গলায় বললাম, কি বলছেন?

তোকে বিয়ে করার কথা বলছেন কেন?

আমিতো জানি না। বাবা কেন?

এই হারামজাদার কথায় তো আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। বলে কি নবনী আমাকে পছন্দ করে। ব্যাটা তুই কোথাকার রসোগোলা যে আমার মেয়ে তোকে পছন্দ করবে? তুই নিজেকে ভাবিস কি? চাল নাই। চুলা নাই। মানুষ হয়েছিস এতিমখানায় তুই কোন সাহসে এত বড় কথা বললি? বাবার চিৎকারে মা ছুটে এলেন, ইরা ছুটে এল। আমাদের কাজের মেয়ে বিন্তি এল। মা সব শুনে ভীত গলায়–ও এসব কেন বলছেরে নবনী?

আমি বিড় বিড় করে বললাম, আমি জানি না মা।ইরা বলল, আপা যে উনার কাছে রোজ দুবেলা করে খাবার নিয়ে যায়। এই জন্যেই বোধহয় তাঁর ধারণা হয়েছে আপা তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।বাবা বললেন, হাবুডুবু খাওয়া আমি বের করছি। কত বড় সাহস। কানে ধরে আমি তাকে চর্কি ঘুরান ঘুরাব।আমি ভীত গলায় বললাম, এইসব করার কোন দরকার নেই বাবা–তুমি উনাকে বড় মামার কথা বল। বলে দাও বিয়ে-টিয়ের ব্যাপার সব বড়মামা জানেন।

মা বললেন, এইটাই ভাল। লোক জানাজানি করার কোন দরকার নেই। আজেবাজে কথা ছড়াবে।বাবা হুংকার দিলেন, ছড়াক কথা। আমি কি কাউকে ভয় পাই? নির্বোধ মানুষরা কাউকে ভয় পায় না। যা মনে আসে করে ফেলে। বাবাও তাই করলেন। স্যারের জিনিসপত্র নিজেই ছুড়ে ছুড়ে রাস্তায় ফেলতে লাগলেন।চারদিকে লোক জমে গেল। স্যার বললেন, আপনি অকারণে বেশি রকম উত্তেজিত হয়েছেন। আপনি শান্ত হয়ে আমার দুটা কথা শুনুন।

বাবা হুংকার দিলেন, চুপ যথেষ্ট হয়েছে।

স্যার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।

ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এমন মুখরোচক ঘটনা মফস্বল শহরে সচরাচর ঘটে না। লোকজনদের উৎসাহের সীমা রইল না। সন্ধ্যা বেলায় চলে এল বাবার অতি পেয়ারের লোেকরা। তারা গভীর মুখে বলল, এইসব কি শুনছি। চৌধুরী সাহেব? বাবা ফ্যাকাশে হাসি হেসে বললেন, কিছু না। কিছু না।শুনলাম আপনার মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে। অশ্লীল প্ৰস্তাব দিয়েছে।না না। এসব কিছু না। অন্য ব্যাপার।জারজ সন্তানের কাছ থেকে এরেচে বেশি কি আশা করা যায়? এখন বলুন কি করব?

কিছু করার দরকার নেই। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। আর কি? আপনি ক্ষমা করলেতো হবে না। আমাদের একটা দায়িত্ব কর্তব্য আছে না? বাদ দেন। ঘটনা যা ভাবছেন তা না। বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ভদ্র ভাবেই দিয়েছিল।শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কোন দরকার নাই চৌধুরী সাহেব। ঘটনা সবই জানি। আপনি কাটান দেয়ার চেষ্টা করলেও লাভ হবে না। উচিত শিক্ষা দেয়া হবে।লোকজন বাড়তেই লাগল। সবাই আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

মা আমাকে নিয়ে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখলেন। অন্তুকে পাঠানো হল পোস্টাপিস থেকে বড় মামাকে টেলিফোন করার জন্যে। তিনি যেন এক্ষুণি চলে আসেন।রাত দুটার দিকে হাজার হাজার মানুষ গিয়ে স্যারকে ধরে নিয়ে এল। আমি কাঁদছি এবং সমুদ্রের গর্জনের মত মানুষের গর্জন শুনছি। কি হচ্ছে বাইরে? সব কোলাহল ছাপিয়ে স্যারের গলা শুনলাম— আতংকে অস্থির হয়ে তিনি চিৎকার করে ডাকছেন— নবনী! নবনী।

তাকে তখন রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়েছে। একদল মানুষ চেষ্টা করছে ইট দিয়ে মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। মা ছুটে গেলেন স্যারকে বাঁচানোর জন্যে। ইরাও ছুটে গেল।স্যারের মৃত্যু হয় সীমাহীন অপমান ও সীমাহীন যন্ত্রণায়। প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোনা হাসপাতালে। সেখানের ডাক্তাররা জবাব দেবার পর তাঁকে পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহে। পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে স্যারকে যে ট্রেনে ময়মনসিংহ নেয়া হচ্ছিল। আমিও সেই ট্রেনেই বড় মামার সঙ্গে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। অথচ আমি কিছুই জানতাম না। আমাকে বলা হয়েছে স্যার নেত্রকোনা হাসপাতালে আছেন। মাথায় চোট পেয়েছেন। তবে এখন ভাল হওয়ার পথে। ভয়ের কিছু নেই।সে বছর আমার পরীক্ষা দেয়া হয় নি, কারণ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সে অসুখ বিচিত্র এবং ভয়াবহ। আমি মাঝে মাঝেই কাউকে চিনতে পারতাম না।

পরিচিত কারো সঙ্গে হয়ত কথা বলছি, হঠাৎ এক সময় অস্বস্তি এবং বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, যার সঙ্গে কথা বলছি তাকে চিনতে পারছি না। ভয়ে শরীর যেন কেমন করতে থাকে। আমি কথা বলা বন্ধ করে দেই, আর তখনি দেখি দু-তিনটা কাক অপরিচিত মানুষটার চারদিকে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছে। এদের মধ্যে একটা কাককে আমি চিনি-বুড়ো কাক। কাকগুলো হাঁটে অবিকল মানুষের মত। যেন এরা কাক না। ছোট ছোট মানুষ যারা কালো রঙের চাদর গায়ে দিয়েছে।

মাঝে মাঝে আমি স্যারকেও দেখতাম-। তাকে দেখে মোটেও ভয় লাগত না। বরং ভরসা পাওয়া যেত। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন এমনভাবে যেন তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা হত খুব ঘরোয়া ধরনের। যেমন, তিনি এসে বললেন, নবনী, পেন্সিলটা কোথায় রাখলাম দেখেছ? আমি বললাম, না তো। কলম আছে। কলমে হবে? না, হবে না। আমার দরকার পেন্সিল। একটু আগে কাজ করছিলাম। হঠাৎ কোথায় গেল! বাবু নিয়ে যায় নি তো?

নিতে পারে।

ছেলে তো বড় দুষ্ট হয়েছে। ডাক তো দেখি। আজ একটা ধমক দেব।

না না, ধমকাতে পারবে না। ছেলেমানুষ।

অতিরিক্ত আদর দিয়ে তুমি ওকে নষ্ট করছ।

নষ্ট করছি ভাল করছি। আরো নষ্ট করব।

এ কি! রেগে গেলে কেন?

রেগেছি। ভাল করেছি। আরো রাগব…

আমাদের সঙ্গে সব সময় একটা শিশু থাকত। কখনো সে ছেলে, তার নাম বাবু; কখনো-বা মেয়ে, নাম টিনটিন। এদের অবশ্যি আমি কখনো দেখি নি।আমি কতদিন অসুখে ভুগেছি। আমি নিজেও জানি না। কেউ আমাকে কখনো পরিষ্কার করে কিছু বলে নি। আমি শুধু অস্পষ্টভাবে জানি, আমার এই অসুখ দীর্ঘদিন ছিল। বড় মামা আমাকে চিকিৎসা করান। আমার পেছনে টাকা

বাসা ভাড়া করে থাকতেন। কেউ যেন অসুস্থ অবস্থায় আমাকে বিরক্ত করতে না পারে সে জন্যে ঐ বাসার ঠিকানাও তিনি কাউকে দেন নি। বাবা-মা, ইরা, অন্তু কেউই আমাকে দেখতে যেতে পারত না। এক সময় আমি সুস্থ হয়ে উঠি। বড় মামা আমাকে ফিরিয়ে দেন। বাবা-মার কাছে।বড় মামা সব সময়ই কম কথার মানুষ। আমাকে সুস্থ করে বাবা মার কাছে রেখে যাবার সময় হঠাৎ তাঁর কি হল, তিনি বললেন, বড় খুকী, আয় তোকে আদর করে যাই। আমি এগিয়ে গেলাম।

বড় মামা গম্ভীর গলায় বললেন, শোন বড় খুকী, তুই নিশ্চিন্ত মনে থাকিবি। তোর অসুখটা পুরোপুরি সেরে গেছে। আর কোনদিন হবে না। ডাক্তাররা আমাকে বলেছেন। তারচেয়েও বড় কথা, আমি খাস দিলে আল্লাহ্পাকের কাছে দোয়া করেছি। আমার দোয়া আল্লাহ্পাক কবুল করেছেন। বুঝলি বড় খুকী, আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন মাগরেবের ওয়াক্তে শুধুই তোর জন্যে দুরাকাত নফল নামায পড়বা। আচ্ছা এখন যা।

আমি বললাম, আদর করবার জন্যে ডাকলেন–কই আদর তো করছেন না।বড় মামা হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলেন না বা মাথায়ও হাত রাখলেন না। তিনি যেভাবে বসেছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন। শুধু দেখা গেল, তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে বললেন, ট্রেনের সময় হয়ে গেল, চলি রে।

প্রায় ন মাস পর বাড়িতে গিয়েছি।নিখুঁত হিসাব হল আট মাস সতেরো দিন। নোমান আমার সঙ্গে আসতে পারে নি। তার ছবির কাজ পুরোদমে চলছে। তাদের না-কি দু মাসের মধ্যে ছবি শেষ করতে হবে। চল্লিশ মিনিটের ছবি। তারা চেকোস্লোভাকিয়ায় শর্ট ফ্রিম ফেষ্টিভ্যালে ছবি পাঠাবে। সময় পেলে ইংরেজিতে ডাব করবে। সময় না পেলে সাব টাইটেল করা হবে।

নোমানের উৎসাহ এবং ব্যস্ততা দেখার মত। মনে হচ্ছে সে-ই ছবির পরিচালক, সে-ই নায়ক এবং সে-ই ক্যামেরাম্যান। যদিও আমার ধারণা তার মূল কাজ ছোটাছুটি করা এবং অন্যদের ধমক খাওয়া। কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের দেখলেই মনে হয় এদের ধমক দিলে এরা রাগ করবে না। এদের ধমক দেয়া যায়। শুধু ধমক না, অতি তুচ্ছ কাজও এদের দিয়ে করিয়ে নেয়া যায়। নোমান সেই জাতীয় একজন মানুষ।

আমাদের সঙ্গে মদিনাও দেশের বাড়িতে যাচ্ছে। তার গায়ে নতুন জামা। পায়ে নতুন রবারের জুতা। তার আনন্দ চোখে দেখার মত। মনে হচ্ছে এই মেয়েটির জীবনে এমন আনন্দময় মুহুর্ত আর আসে নি।আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অন্তু। নোমান স্টেশনে তুলে দিতে এসেছে। ট্রেন আজ এক ঘণ্টা লেট আমরা অনেক আগে ভাগে এসে পড়েছি। নোমানের মুখ শুকনো।

বুঝতে পারছি তার মন খারাপ লাগছে। সে এই মন খারাপ ভাবটা লুকাতে পারছে না। সে অন্তুকে বলল, তোমাদের টিকিট দুটা দাওতো অন্তু।অন্তু বলল, টিকিট দিয়ে কি করবেন? আহা দাও না।অন্তু টিকিট দিল। সে টিকিট নিয়ে হন হন করে চলে গেল। অন্তু বলল, আপা দুলাভাই টিকিট দিয়ে কি করবে? আমি বললাম, জানি না। দুলাভাই সঙ্গে গেলে খুব ভাল হত। সবাই আশা করে আছে, তোমরা দুজন একসঙ্গে যাবে।

ছবি নিয়ে ব্যস্ত। ছবি না থাকলে যেত।

কি ছবি?

ওর বন্ধু একটা শর্ট ফ্রিম বানাচ্ছে।

তাতো জানি। গল্পটা কি?

নির্দিষ্ট কোন গল্প নেই। গ্রামের একটা মেয়ে পুকুরে গোসল করতে করতে একসময় ঠিক করল সে তার স্বামীকে খুন করবে। ঠিক করার পর থেকে খুন করার আগ পর্যন্ত মেয়েটার মনের অবস্থা।স্বামীকে খুন করবে কেন?

সেটা কখনো বলা হয় না। ছবির জন্যে এটা না-কি অপ্রয়োজনীয়।অভিনয় কারা করছে? একজনই অভিনেত্রী। সফিক সাহেবের স্ত্রী অভিনয় করছেন। তার নাম অহনা।ছবিটা কি ভাল হচ্ছে? নোমানের ধারণা অসাধারণ হচ্ছে। এই ছবি দেখলে না-কি মৃণাল সেনের ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে যাবে। সত্যজিৎ রায়ের মাইন্ড স্ট্রোক হবে।

নোমান আসছে। তার হাতে একগাদা ম্যাগাজিন। দু প্যাকেট বিসকিট। পানির বোতল। অন্তু বলল, টিকিটগুলো কি করলেন দুলাভাই? চেঞ্জ করে নিয়ে এসেছি। ফার্স্টক্লাস করে আনলাম। আরাম করে যাও। তোমরা চা খাবে না-কি? অন্তু বলল, না।ট্রেন ছাড়তেতো এখনো দেরী আছে চল না।যাই। এখানে ভাল রেস্টুরেন্ট আছে।অন্তুর যাবার তেমন ইচ্ছা নেই। আমি বললাম, অন্তু তুই জিনিসপত্র নিয়ে এখানে বসে থাক। আমি চা খেয়ে আসি, আমার চা খেতে ইচ্ছা করছে।

আমরা চা খেলাম। ও একটা সিগারেট ধরিয়ে শুকনো মুখে টানতে লাগল। আমি বললাম, তুমি কি ছবি বানানোর এক ফাঁকে চলে আসতে পারবে? মনে হয় না। আমি চলে এলে কাজ কর্মের খুব ক্ষতি হবে।ক্ষতি হলে থাক।এদিকে অহনাকে আবার সামলে সুমলে রাখতে হয়। ওর মেজাজেরতো কোন ঠিক নেই।তুমি ছাড়া আর কেউ ওকে সামলাতে পারে না? তা না। ও আমার কথা শুনে। অনেকদিন থেকে দেখছি তো।ও আচ্ছা।

তারপর ধর হঠাৎ তার মাথায় এসে গেল কোন একজন পামিস্টের কাছে যাবে তখন তাকে সেখানে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। কে নিয়ে যাবে? সেটা বিরাট সমস্যাতো বটেই। তাহলে তুমি একটা কাজ কর তাঁকে বল নেত্রকোনায় বড় একজন পামিস্ট আছে তাহলে দেখবে সব ছেড়ে ছুড়ে তোমাকে নিয়ে নেত্রকোনায় চলে আসবে।সে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। আমি বললাম, ট্রেন ছাড়তে কত দেরি?এখনো কুড়ি মিনিট। আরেক কাপ চা খাবে?

আমি বললাম, খাব। আর দেখতো আমার জ্বর কি-না কেমন জানি জ্বর জ্বর লাগছে। সে আমার আমার কপালে হাত রেখে বলল, জ্বর নাতো! আমি হেসে ফেললাম। সেও হাসল। জ্বর দেখার আমাদের এই পুরানো এবং একান্ত গোপন কৌশল ব্যবহার করতে এত ভাল লাগে। রেস্টুরেন্ট ভর্তি মানুষ–এরা কেউ কিছু ভাববে না। সবাই জানবে একজন অসুস্থ মানুষের জ্বর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ও প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে। ওর দিকে তাকাতে আমার খুব কষ্ট লাগছে। আমি ব্যস্ত হয়ে ম্যাগাজিনের ছবি দেখছি। শুধু অন্তু গলা বের করে খুব হাত দুলাচ্ছে। হঠাৎ অন্তু বিস্মিত গলায় বলল, আপা দেখ দেখ দুলাভাই কাঁদছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ও সত্যি সত্যি পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মুছছে। আমাকে দেখে সে চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

আমি অন্তুকে বললাম, তোর দুলাভাইকে এইভাবে হাঁটতে নিষেধ কর— পরে হুমড়ি খেয়ে ট্রেনের চাকার নিচে পড়বে।বলতে বলতে আমার গলা ধরে গেল। চোখ ভিজে উঠল। ট্রেনের গতি বাড়ছে আমার মনে হচ্ছে। আমি এই পৃথিবীর সব প্রিয়জন ছেড়ে—অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। ট্রেনের চাকায় ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। ট্রেনটা যেন তালে তালে বলছে–ভালবাসি। ভালবাসি।

আমাকে দেখে বাড়িতে একটা হৈচৈ পড়ে গেল। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে বাবা ভুরু কুঁচকে বললেন, মরা কান্না জুড়ে দিলে কেন? বড়ই যন্ত্রণা হল তো। ইরা তোর মাকে নিয়ে যাতো। মা আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কেউ আমাকে ছাড়ছে না। সবারই মনে অসংখ্য কথা জমা হয়ে আছে। সবাই আমাকে একসঙ্গে সব কথা শুনাতে চায়।

ইরা চাচ্ছে আমাকে নিয়ে ছাদে চলে যেতে। তার নাকি অসম্ভব জরুরি কিছু কথা এক্ষুণি না বললেই না। তার জরুরি কথার আভাস পেয়েছি। মা কাঁদতে কাদতেই এক ফাঁকে আমাকে বলে ফেলেছেন। ইরার ভাঙা বিয়ে আবার জোড়া লেগেছে। ইরার ভাবি বর না-কি বলেছে, এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। প্রয়োজন হলে সবার অমতে সে কোর্টে বিয়ে করবে।

 

Read more

নবনী পর্ব – ১২ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.