নবনী পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

নবনী পর্ব – ৪

ছোটখালা ওকে হাত ধরে আমার পাশে বসিয়ে দিয়ে বললেন, নবনীর মত সুন্দর মেয়ে কি তুমি এর আগে কখনও দেখেছি? বল হ্যাঁ কিংবা না।ও হাসল। ছোটখালা আমাদের চা খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে রইলেন। যাবার সময় বাতি নিভিয়ে গেলেন। ও উঠে গিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ছিটিকিনি লাগল। খাটের দিকে আসতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আমি উঠে এসে তাকে ধরলাম। ও লাজুক গলায় বলল, মোটেও ব্যথা পাই নি। তোমাকে ধরতে হবে না।

আমি হাত ধরে তাকে খাটের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। মনে মনে ভাবছি–ইরার উপন্যাসের সেই নায়ক শুভ্ৰকেও কি তার স্ত্রী ধরে ধরে খাটের দিকে নিয়ে যেত? নবনী! উঁ।তুমি খুব বেশি সুন্দর। আরেকটু কম সুন্দর হলে ভাল হত।কম সুন্দর হলে ভাল হত কেন? এম্নি বললাম, কথার কথা। সফিক তার স্ত্রীকে সবসময় এই কথা বলে।উনার স্ত্রী কি খুব সুন্দর? হ্যাঁ খুব সুন্দর। কালো কিন্তু সুন্দর। তার নামটাও অদ্ভুত। অহনা। আর কোন মেয়ের এমন নাম শুনেছ?

না।

নবনী!

কি?

আমি এর আগে কখনও কোন মেয়ের হাত ধরি নি। এই যে তোমার হাত ধরেছি। কেমন যেন ভয়-ভয় লাগছে। এই দেখ, আমার শরীর কাঁপছে।ওর কথা শুনে আমার কি যে ভাল লাগল! চোখে পানি এসে গেল। বাসররাতে সব মেয়েই বোধহয় কোন-না-কোন উপলক্ষে চোখের পানি ফেলে। আমি ফেললাম। আমার সেই চোখের পানিতে আনন্দ ছিল, সুখ ছিল। সেই সুখ ও আনন্দের তেমন কোন কারণ ছিল না। অকারণ সুখ অকারণ আনন্দও তো মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে আসে।

রাত এখন কত আমি জানি না। আমার হাতে ঘড়ি নেই। একটা ঘড়ি ছিল। ইরার বান্ধবীরা ঘড়ি খুলে নিয়েছে। বাসর ঘরে না-কি ঘড়ি নিয়ে ঢুকতে নেই। ঘড়ি নিয়ে ঢুকলেই কিছুক্ষণ পরপর ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করবে। বাসর রাতটা হবে এমন যেখানে সময় বলে কিছু থাকবে না। আমি ইরার বান্ধবীদের সঙ্গে কোন তর্ক করি নি। ওরা ঘড়ি খুলতে চেয়েছে। আমি খুলে দিয়েছি। ওরা যদি ভাবে ঘড়ি খুলে রাখলেই সময় বন্ধ হয়ে যাবে-ভাবুক।

ও বিছানার একপাশে গুটিশুটি মেরে ঘুমুচ্ছে। খাটের একেবারে শেষপ্রান্তে চলে গেছে। আমার কেবলই ভয় হচ্ছে এই বুঝি গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল। ইচ্ছে করছে তাকে নিজের কাছে টেনে নেই। ইচ্ছে করলেও সম্ভব না। মানুষের সব ইচ্ছা পূর্ণ হবার নয়। তবে আমি বেতের চেয়ারটি খাটের পাশে এনে রেখেছি। গড়িয়ে পড়লেও মেঝেতে পারবে না। চেয়ারের উপর পারবে।

বৃষ্টি কিছু সময়ের জন্যে থেমেছিল। এখন আবার প্রবল বেগে শুরু হয়েছে। বাতাসও দিচ্ছে। শো শো শব্দ হচ্ছে। এ বাড়ির কেউই বোধহয় ঘুমায়নি। বারান্দায় তাদের হাঁটাহাটির শব্দ পাচ্ছি। হাসাহাসির শব্দও হচ্ছে। সবচে বেশি। হাসছে ইরা। খিলখিল খিলখিল। হাসছেতো হাসছেই। ইরা বোধহয় আজ হাসির বিশ্ব রেকর্ড করল। কি নিয়ে তাদের এত হাসাহাসি? কাদাখেলা কি শেষ হয় নি? না-কি আজ সারারাতাই চলবে?

আমার ঘুম আসছে না। আমি ভোর হবার জন্যে অপেক্ষা করছি। ভোরবেলা একা একা ছাদে খানিকক্ষণ হাটব। ও যদি জেগে থাকে–ওকেও সঙ্গে নেব। আমার ধারণা এই পৃথিবীতে অল্প যে কয়টি সুন্দর জায়গা আছে আমাদের বাসার ছাদটা তার একটা। উঁচু রেলিং দিয়ে ছাদটা ঘেরা। শ্যাওলা জমে রেলিং হয়েছে গাঢ় সবুজ। মনে হয় ইট পাথরের রেলিং নয়–সবুজ লতার রেলিং।

বাড়ির পেছনের প্রকাণ্ড শিরীষ গাছটা বেঁকে এসে ছাতার মত ছায়া ফেলেছে ছাদের উপর। গাছ ভর্তি টিয়া পাখি। সকাল এবং সন্ধ্যায় বাক বেঁধে টিয়া পাখি উড়তে থাকে। তীক্ষ্ণ গলায় ডাকে ট্যা ট্যা। টিয়া পাখিগুলো খুব অদ্ভুত এরা মানুষের দেয়া খাবার কখনো খায় না। আমি কতবার ছাদে চাল ছড়িয়ে দিয়েছি–কাক এসে খেয়ে গেছে। টিয়ারা কাছে আসে নি।

ভোরবেলা যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে আমি ইরাকে বলব আমাদের দুজনকে ছাদে চা দিতে। ইরা মনে মনে হাসবে। পরে হয়ত ঠাট্টাও করবে। করুক ঠাট্টা। এমন একটা সুন্দর জিনিস ওকে না দেখিয়ে নিয়ে যাব তা হয় না। তাছাড়া আমি ঠিক করেছি–চা খেতে খেতে ভোরের প্রথম আলোয় ওকে বলব–আমার জীবনের ভয়াবহ সমস্যার কথা। ওকে সমস্যাটা বলে রাখা দরকার।

সব শোনার পর সে যদি বলে—নবনী! তুমি এইখানেই থাক। তোমাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব না। তাহলে এখানেই থেকে যাব। বিশাল এই বৃক্ষের ছায়ায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে আমার খুব খারাপ লাগবে না। সেই মানসিক প্ৰস্তুতি আমার আছে।ওকে আমি কি ভাবে কথাটা বলব? শুরু করাটাই সমস্যা। একবার শুরু করলে বাকিটা আমি তরতার করে বলে যেতে পারব। শুরু করব কি ভাবে? এই ভাবে কি শুরু করা যায়?

এই শোন, আমার এক সময় একজনের সঙ্গে খুব ভাব ছিল।না এভাবে শুরু করা যায় না। পৃথিবীর কোন স্বামীই বিয়ের পরদিন এ ধরনের কোন কথা শুনতে চায় না। কোন স্বামীই গোপন সত্য শুনতে চায় না। তারা শুনতে চায় মধুর মিথ্যা।একসময় একজনের সঙ্গে খুব ভাব ছিল এটা এমন ভয়াবহ কোন ব্যাপারও নয়। ভাবতো থাকতেই পারে। তবে খুব ভাব ছিল— সমস্যাটা এইখানেই। খুব বলে একটা ছোট্ট বিশেষণ আছে। আমি ইচ্ছা করে বসাই নি। নিজের অজান্তেই চলে এসেছে।উনার নাম…।

থাক নামটা বাদ থাক। নামের দরকার নেই। উনি ছিলেন। আমাদের কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক। বয়স অল্প। পাস করে প্রথমেই এই কলেজে এসেছেন। এখানেই তার চাকরি জীবনের শুরু। তাকে দেখে আমাদের মেয়েদের মধ্যে খুব হাসা।হাসি পরে গেল। হাসাহাসির প্রধান কারণ তাঁর পরনে জোব্বা ধরনের পোশাক। গোড়ালী পর্যন্ত পায়জামা। থুতনীতে ছাগল দাড়ির মত ফিনফিনে এক গোছা দাড়ি।

তিনি চোখে সুরমা দেন। ক্লাসে যখন পড়ান। তখন কখনো মেয়েদের দিকে তাকান না। মেঝের দিকে তাকিয়ে পড়ান। হঠাৎ কারো চোখে চোখ পড়ে গেলে লজ্জায় লাল হয়ে যান। তবে পড়ান খুব সুন্দর। এরকম অল্প বয়স্ক একজন মৌলানাকে বেছে বেছে তারা মেয়েদের কলেজে কেন দিল কে জানে। কলেজের সব স্যারদের নাম থাকে। তাঁর নাম হল চেংড়া হুজুর।

আমরা নানাভাবে তাকে যন্ত্রণা করি। যেমন তিনি রেজিস্ট্রার খাতা হাতে যখন ক্লাসে ঢুকেন তখন আমরা সব কয়টি মেয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলিআসসালামু আলায়কুম। আমাদের এই সমবেত চিৎকারে কলেজ কেঁপে উঠে। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অসহায় ভঙ্গিতে বলেনওয়ালাইকুম সালাম। তাঁকে ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে হয়। যেমন একদিন ক্লাসের পড়া শেষ করে বললেন, কারো কোন প্রশ্ন আছে। আমাদের ক্লাসের সবচে স্মার্ট মেয়ে মবকুলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জ্বি স্যার আছে।

বল।আপনি এমন অদ্ভুত পোশাক পরে ক্লাসে আসেন কেন? অদ্ভুত পোশাকতো না। আমাদের নবীজী এই পোশাক পরতেন।নবীজীতো উটে চড়ে ঘোরাফেরা করতেন। আপনি উটে না চড়ে রিকশায় আসেন কেন? উটের প্রচলন। এখানেই নেই। থাকলে হয়ত আসতাম।হো হো করে আমরা হেসে উঠলাম। স্যার চোখ মুখ লাল করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে করুণ গলায় বললেন, আচ্ছা যাই আসসালামু আলায়কুম।আমরা সমস্বরে হুংকার দিয়ে উঠলাম— ওয়ালাইকুম সালাম। আমাদের হুংকারে কলেজ বিল্ডিং কেঁপে উঠল।

একদিন বিকেলে ছাদে হাঁটছি, মা এসে বলল, বাইরে এক ভদ্রলোক এসেছেন। তোর বাবা চা চাচ্ছে। চা দিয়ে আয়। আমি দুকাপ চা নিয়ে ঢুকে অবাক হয়ে দেখি— আমাদের চেংড়া হুজুর। আজ তাঁর পোশাক আরো চমৎকার। মাথায় পাগড়ি পরেছেন। বিয়ের আসরে ছেলেরা পাগড়ি পরে বলে জানি কিন্তু কেউ যে পাগড়ি পরে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে আসতে পারে তা জানা ছিল না। ভদ্রলোক কি উন্মাদ? তিনি আমাকে দেখে মাথা নিচু করে ফেললেন। বাবা বললেন, নবনী উনি মহিলা কলেজের একজন শিক্ষক। আমাদের যে বাড়তি দুটা ঘর আছে। ঐ ঘর দুটা তিনি ভাড়া নেবেন।

আমি বললাম, বাবা আমি উনাকে চিনি। উনি আমাদের ইতিহাস পড়ান।ইতিহাস পড়ান? বলিস কি। আমিতো ভেবেছি এরাবিকের টিচার।স্যার মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনারেল হিস্ট্রীতে এম. এ. করেছি।বাবা উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ও আচ্ছা। তাহলে তো ভালই হল। গুড। ভেরী গুড। একসেলেন্ট।আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, কেমন আছেন স্যার? তিনি ঠিক আগের মতই মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাল। তুমি ভাল আছ নবনী?

স্যার যে আমার নাম জানেন তা জানতাম না। আমি চমকে উঠলাম।চা নিন স্যার। চুমুক দিয়ে দেখুন চিনি হয়েছে কি-না।স্যার আমার দিকে তাকালেন। কি আশ্চর্য এত সুন্দর চোখ! কি শান্ত! কি মায়াকাড়া! না-কি এসব আমার কল্পনা। স্যার চোখ নামিয়ে নিয়েছেন। আমার বলতে ইচ্ছা করছে, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে চা খানতো স্যার। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? মেঝেতে কি আছে দেখার?

টিয়া পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শোনা যাচ্ছে।ভোর হয়ে গেছে। বৃষ্টি এখনো থামে নি। আমি দরজা খুলে বাইরে এসে দেখি আমাদের বিদায়ের আয়োজন চলছে। ভোর বেলা ট্রেন। এক্ষুণি রওনা না হলে ট্রেন ধরা যাবে না। বড় মামা সবাইকে তাড়া দিচ্ছেন।আমার সমস্যার গল্প আজ আর বলা হল না।আমি ঢাকায় ওর বাসায় উঠে এলাম।

সেগুন বাগিচায় অফিসের সাথেই বাসা। একতলা দোতলা জুড়ে অফিস। দোতলার পেছন দিকে ওর বাসা। একটা মোটে ঘর। বারান্দার খানিকটা অংশ আলাদা করে রান্নাঘর। গ্যাসের ব্যবস্থা নেই। কেরোসিনের চুলায় রান্না। বারান্দায় অন্য মাথায় বাথরুম। বাথরুম এবং রান্নাঘরের মাঝের ফাঁকা জায়গাটার আট-দশটা ফুলের টব। সপ্তম আশ্চর্যের মত সেখানে একটা পাখির খাঁচায় ময়না পাখি।

ও খুব আগ্রহ করে বলল, বুঝলে নবনী! এই ময়না মানুষের চেয়ে সুন্দর করে কথা বলে। দুদিন যাক, দেখবে তোমার গলা হুবহু নকল করবে। ও নকলে খুব ওস্তাদ।ময়না বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। কোন কথা বলছে না। আমি বললাম, কই, কথা বলছে না তো? হঠাৎ তোমাকে দেখেছে— এই জন্যে। কয়েকদিন যাক, তারপর দেখবে ওর কথার যন্ত্রণায় থাকতে পারবে না। আমার বাড়ি-ঘর তোমার পছন্দ হয় নি, তাই না নবনী? হয়েছে।

পছন্দ যে হয় নি সেটা তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। একা মানুষ তো, বিরাট বাড়ি নিয়ে কি করব? তাছাড়া বাড়িটা কিন্তু ভাল। খুব হাওয়া। ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। ছাদে যাওয়া যায়। ছাদে যাবে? আচ্ছা, পরে তোমাকে নিয়ে যাব। টায়ার্ড হয়ে এসেছ, এখন রেষ্ট নাও। আমি চা নিয়ে আসি।ও ঘর থেকে ফ্লাস্ক নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে গেল। এই বাসার সব কিছুই ছোট ছোট। সে যে ফ্লাস্কটা নিয়ে বের হয়েছে সেটিও ছোট। এক কাপ চা ধরবে কি-না কে জানে। আমি ঘুরে-ফিরে তার সংসার দেখতে লাগলাম।

শোবার ঘরে একটা খাট। সেই খাটে একটাই বালিশ। আমার জন্যে দ্বিতীয় বালিশ কেনে নি। হয়ত আজি সন্ধ্যাবেলা বালিশ কিনতে যাবে। কিংবা কে জানে হয়তো একটা বালিশেই দুজনকে ভাগাভাগি করে ঘুমুতে হবে। একটা লেখার টেবিল খাটের সঙ্গে লাগানো। টেবিলের সঙ্গে চেয়ার নিই। কাজই ধরে নেয়া যায় লেখালেখির কাজ খাটে বসে। সারা হয়। টেবিলের পাশে মিটাসেফের মত আছে।

সেখানে নতুন একটা টি-সেট। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই টি-সেট এখনো ব্যবহার করা হয় নি। কাপড় রাখার আলনা আছে। আলনায় কাপড় নেই। কয়েকটা তোয়ালে এবং গামছা–ভাজ করে রাখা। কে জানে হয়ত তোয়ালে রাখার জন্যেই এই আলনা।দেয়ালে কিছু বাঁধানো ছবি আছে। একটি তার বাবার ছবি। চেহারার মিল থেকে বলে দেয়া যায়। তার পাশের ছবিটি বোধহয় তার মার। এই মহিলা খুব রূপবতী ছিলেন।

ফ্রেম বাধানো নজরুল ইসলামের একটা হাতে আঁকা ছবি আছে। ছবির নিচে লেখা Art by Noman Class VIII, Section B. সাহেব তাহলে ছেলেবেলায় শিল্পী ছিলেন।খাটের নিচে রাজ্যের জিনিস। তার মধ্যে মাটির পালকি এবং পুতুল আছে। এইগুলি কি জন্যে রাখা কে জানে। জিজ্ঞেস করতে হবে।

আমি হাত-মুখ ধোবার জন্যে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমটা ঝকঝকে। আমাদের নেত্রকোনার বাড়ির বাথরুমের মত অন্ধকার এবং স্যাঁতসেঁতে নয়। সবচে বড় কথা-বাথরুমের উপরের দিকে ভেন্টিলেটারের মত আছে, যে ভেন্টিলেটার দিকে আকাশ দেখা যায়। গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে আকাশ দেখার মত আনন্দের আর কি আছে?

মুখে পানি ঢালতেই শরীর জুড়িয়ে গেল। হঠাৎ করে মনে হল আমাদের দুজনের জন্য এরকম একটা ঘরেরই দরকার ছিল।ও শুধু চা আনেনি, একটা ঠোঙায় কিছু জিলাপী। আরেক ঠোঙায় কিছু নোনতা বিসকিট। সে মিটসেফ থেকে কাপ বের করছে। আমি দেখলাম, দুটা না, সে একটা কাপ বের করেছে। ঐ কাপটি সে এগিয়ে দিল আমার দিকে। নিজে চা ঢালিল ফ্লাস্কের মুখে। যেন আমি খুব সম্মানিত একজন মেহমান। বাইরের কেউ।নবনী! টি-সেটটা নতুন কিনেছি। সুন্দর না?

হ্যাঁ, খুব সুন্দর।সেট হিসেবে কিনলে দাম বেশি লাগে। আমি আলাদা আলাদা কিনে সেট বানিয়েছি অনেক সস্তা পড়েছে।আচ্ছা।বিকালে তোমাকে নিয়ে বের হতে হবে। টুকটাক অনেক জিনিস কিনতে হবে। তোমার কি কোলবালিশ লাগে?না।তোমার জন্য একটা ড্রেসিং টেবিল কিনেছি। এগার তারিখ ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল, নিতে গেলাম, বলে–পালিশ হয় নাই। এখন বোধহয় পালিশ হয়ে গেছে, নিয়ে আসব। আরেকটু চা দেই, ফ্লাস্কে চা আছে। তিন কাপ চা আটে।

আমি ওকে খুশি করার জন্যেই আরেকটু চা নিলাম। শরবতের মত মিষ্টি চা। মুখে দিলেই পেটের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত মিষ্টি হয়ে যায়।নবনী শোন, আমি অফিসে যাই। কিছু জরুরি কাজ ছিল। তুমি একা থাকতে পারবে তো? পারব।গোসল সেরে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়। তুমি টায়ার্ড হয়ে আছ তোমার ঘুম দরকার।

ও আচ্ছা।

এক-একা ভয় পাবে না তো?

ভয় পাবার কিছু আছে কি?

ভয় পাবার কিছুই নেই। খুব সেইফ জায়গা। অফিসের তিনজন দারোয়ান আছে। এরা সব সময় পাহারা দেয়। আর আমি তো আছিই। আমি মাঝে মাঝে খোঁজ নিয়ে যাব।খোঁজ নিতে হবে না। আমি ভালই থাকব।ছোট বাসা দেখে তোমার মন খারাপ হয়নি তো নবনী? না।

দিন এরকম থাকবে না। নিজেই এক সময় ব্যবসা শুরু করব। এ্যাড ব্যবসার ব্যাপার-স্যাপার। আমি এখন সবই জানি। সাহস করে শুরু করলেই হয়। আরেকটু চা দেই? ফ্রাস্কে আছে খানিকটা।ও চা ঢেলে দিল। তার মুখ হাসি-হাসি। বারান্দায় ময়নাটার কাছে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে বলল–কথা বল, এই ময়না, কথা বল। বল দেখি– নবনী! নবনী!

ময়না খাঁচার ভেতর ছটফট করছে। কথা বলছে না। আমি খাটে বসে। দেখছি, ও পকেট থেকে কলা বের করে খোসা ছাড়িয়ে সে ময়নাকে দিচ্ছে। গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে প্রায় অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলছে–কথা বল না রে বাবা। বলী–নবনী! নবনী! কি হয় কথা বললে? আমাকে শুনানোর জন্যেই বেচারার এই চেষ্টা। এই পৃথিবীতে তার যা কিছু দেখানোর আছে সবই সে আমাকে দেখাতে চায়। আমাকে অভিভূত করাই তার व्लझा। ऊाद्ध अgशा७न छिल्ल না।

আমি বললাম, নজরুলের এই ছবি কি তোমার আঁকা? সে লজ্জিত গলায় বলল, হুঁ। ফেলে দেয়া উচিত। ফেলতে পারি না। মায়া লাগে।ফেলার দরকার কি সুন্দর ছবিতো। এখনো কি ছবি আঁক? না না। কিযে তুমি বল। স্কুলে পড়ার সময় খুব আঁকতাম। নবনী আমি যাই। তাড়াতাড়ি চলে আসব।

 

Read more

নবনী পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.