নবনী পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

নবনী পর্ব – ৫

সম্পূর্ণ নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। অচেনা ঘরের অচেনা খাটে আমি শুয়ে আছি। ঘরের আলো কমে এসেছে। আবারও মেঘ করেছে। মনে হয়। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। নামুক বৃষ্টি, সব ভাসিয়ে নিয়ে যাক। বৃষ্টি নামলে ময়নাটা ভিজবে। আমি কি ওকে নিয়ে আসব ভেতরে? না-কি ওর পানিতে ভিজে অভ্যাস আছে?

নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন না, একটা পাখির কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। গাঢ় ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শুনলাম বৃষ্টি পড়ছে। ঘুমের মধ্যেই পাখিটার ছটফটানি কানে গেল এবং একসময় পাখিটা নবনী নবনী বলে আমাকে ডাকতেও লাগল। এটা হয়ত আমার ভুল। হয়ত আমার স্বপ্নের ক্ষুদ্র অংশ। কিছু কিছু সময়ে মানুষের স্বপ্ন ও সত্য মিলে-মিশে এক হয়ে যায়।

পাখিটা আমাকে ক্ৰমাগত ডাকছে— নবনী, নবনী। কি মিষ্টি, কি সুরেলা তার গলা! বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারদিক।আমার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। বৃষ্টি নেই— চারদিক খটখট করছে। পুরোটাই তাহলে স্বপ্ন ছিল? আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। নোমানকে দেখা যাচ্ছেহাতে পলিথিনের দুটা ব্যাগ। ব্যস্ত ভঙ্গিতে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। সে কি অফিস থেকে আবার বাজারে গিয়েছিল?

বারান্দার দরজা খুলে আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি। ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। ও আসুক। ও এলেই বাতি জ্বালাব।নবনী, খুব দেরি করে ফেললাম। অফিস থেকে বের হতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। নতুন একটা পার্টি এসেছে। কাজ নেই, শুধু বকর বকর করে। অফিস থেকে বের হয়েই একবার উঁকি দিয়েছি। দরজা বন্ধ কয়েকবার ঠিক ঠক করলাম। দরজা খুলল না। বুঝলাম তুমি ঘুমোচ্ছ চলে গেলাম ড্রেসিং টেবিলটার খোঁজে। ওদের সঙ্গেও নানান ঝগড়া।ঝগড়া কেন?

আর বল কেন? এখনো পালিশ হয় নি। কারিগর না-কি ছুটিতে গেছে। পুরো টাকা অ্যাডভান্স দেয়া, নয়ত অন্যখান থেকে কিনতাম। তোমার ঘুম হয়েছে? হ্যাঁ।চল আমরা বের হই। মেলা কাজ। টুকটাক জিনিস কিনব। রাতে আবার দাওয়াত।দাওয়াত খেতে ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছা না করলেও যেতে হবে। উপায় নেই। আমার বস দাওয়াত দিয়েছে। সফিক। তোমাকেতো আগেই বলেছি আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। তারই এ্যাড ব্যবসা। সফিকের আমার বিয়েতে যাবার কথা ছিল। যেতে পারল না–ব্যাংকক যেতে হল। ও আজ সকালের ফ্লাইটে এসেছে।তোমার খুব ভাল বন্ধু?

অবশ্যই ভাল বন্ধু। তুই তোকারি সম্পর্ক। আমি যে এত ছোট একটা কাজ করি এটা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। শুধু যে আমার সাথেই এই ব্যবহার তা না, সবার সাথে। অফিসের দারোয়ানের মেয়ের বিয়ে। অফিসের কেউ যায় নি–সফিক গিয়েছিল। তোমাকে নিয়ে এসেছি শুনে তৎক্ষণাৎ সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসছিল। তুমি ঘুমোচ্ছ ভেবে আনি নি।

এলে সমস্যাও হত। তাকে বসাতে কোথায়? শোবার ঘর ছাড়া এখানে আর ঘর কোথায়? শোবার ঘরেই বসতাম। সমস্যা নেই। ও পা মেলে মেঝেতে বসে কতদিন চা খেয়েছে। মানুষ হিসেবেও অসাধারণ। দেখলেই বুঝবে। ফ্লাস্কটা দাও তো নবনী। চা নিয়ে আসি। চা খেয়েই বের হয়ে পড়ি।ঘরে চা বানানোর ব্যবস্থা নেই?

না। আজ সব কিনব। আমি চা খাই না তো, এই জন্যে ব্যবস্থা রাখি নি। তুমি তো আবার খুব চা খাও।কে বলল? বাসররাতে তোমার ছোটখালা চা নিয়ে এলেন, তুমি খুব আরাম করে খেলে— সবটা চা শেষ করলে। সেখান থেকেই বুঝলাম।ও হাসছে। সুন্দর করে হাসছে। আমার গোপন রহস্য ধরে ফেলেছে, সেই রহস্যভেদের হাসি। আনন্দ ও তৃপ্তির হাসি।

ফ্লাস্ক নিয়ে যাবার পথে ও আবার ময়নাটার সামনে দাঁড়াল। আবার সেই অনুনয়-বিনয়–বল ময়না, বল, বল— নবনী। বল তো দেখি। সুন্দর করে বল— নবনী। ন-ব-নী। কলা খেতে দেব। কলা।ময়না কথা বলার সেই আশ্চর্য বিদ্যা গোপন করেই রাখল। একবার ডেকে ফেললে কি হয়? বেচারা এত চেষ্টা করছে। কে জানে আমার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই সে হয়ত নবনী ডাক শেখানোর চেষ্টা করছে।

ও ফ্লাস্ক নিয়ে চলে যাবার পরপরই ময়না ডেকে উঠল। অবিকল ওর মত গলায় ডাকল— নবনী! নবনী! আমার সারা গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। শরীর ঝিম ঝিম করতে লাগল। কি অদ্ভুত ব্যাপার! নোমান গেটের কাছ থেকে আবার ফিরে আসছে। হনাহন করে আসছে। পাখির কথা শুনতে পেয়ে আসছে বলে মনে হয় না। পাখির গলা এতদূর যাবে না। অন্য কিছু হবে। হয়ত মানিব্যাগ ফেলে গেছে।

নবনী!

কি?

তোমার জ্বর-টর আসে নি তো? অফিস থেকে ফিরে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল জ্বর এসেছে।না, জ্বর আসে নি। তুমি কি জ্বরের খোেজ নেবার জন্যে ফিরে এসেছ?

হ্যাঁ। দেখি কাছে আস তো। জ্বর আছে কি-না দেখি।আমি ওর কাছে এগিয়ে এলাম। ও আমার কপালে হাত রাখল। বেচারা আমার শরীর ছুঁয়ে দেখার জন্যে ছুটে এসেছে। জ্বরের মত একটা বাজে অজুহাত তৈরি করেছে। আমার বলতে ইচ্ছা করছে— শোন, তোমার যখনই আমাকে ছয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, ছয়ে দেখবে। লজ্জা, দ্বিধা বা সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। আমি তা বলতে পারলাম না। কিছু কথা আছে যা অতি প্ৰিয়জনদেরও বলা যায় না।

তবে ওর এই ছেলেমানুষী কৌশল আমি আমার পরবর্তী জীবনে অনেক অনেকবার কাজে লাগিয়েছি।যখন আমার নিজের ইচ্ছে করেছে ও আমাকে ছুঁয়ে দেখুক, তখনি বলেছিএই, দেখ তো আমার জ্বর কি-না। শরীরটা ভাল লাগছে না। ও আমার কপালে হাত রেখে বলেছে— গা পানির মত ঠাণ্ডা, জ্বর নেই তো।আমি হোসে ফেলেছি। ও আমার হাসি দেখে হকচকিয়ে গেছে। তবে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে। বড়দের ছেলেমানুষী এক খেলা।দেখলে কত বড় বাড়ি?

সে এমনভাবে বলল যেন বাড়িটা ওর নিজের। আমি হাসলাম। ওর ছেলেমানুষিগুলো এখন আমার চোখে পড়তে শুরু করেছে। দোকানে কেনাকাটার সময় প্রথম চোখে পড়ল। যা দেখছে তা-ই দাম করছে। জাপানি একটা ডিনার সেট দাম করল। বাহান্ন পিসের সেট— দাম তের হাজার টাকা। সে গম্ভীর গলায় বলল, ফিক্সড প্রাইস? ভাবটা এ-রকম যেন ফিক্স্ড প্রাইস না হলে সে দরদাম করে কিনে ফেলবে। দোকানদাররা মানুষ চেনে।

কে কি কিনবে বা কিনবে না তা চট করে ধরে ফেলে। সে জবাব পর্যন্ত দিল না। নোমান তাতে অপমানিত বোধ করল না বা রাগ করল না, পাশের দোকানে ফুলদানি দরদম করতে লাগল। এক একটার দাম দুহাজার টাকা। এমনভাবে দাম করছে যেন দুহাজার টাকা দামের ফুলদানি কয়েকটা কিনবে।সফিক সাহেবের বাড়িতে ঢোকার পর থেকে সে আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছে যে এত সুন্দর বাড়ি এই শহরে আর নেই।

বাড়িতে কয়টা ঘর, কয়টা বাথরুম সমানে বলে যাচ্ছে। আমরা বসার ঘরে বসে আছি। ঝাড় বাতি টাতি দিয়ে এই ঘর এমন সাজানো যে এখানে বসে থাকতে ভাল লাগে না। মনে হয়। সিনেমার একটা বাড়িতে বসে আছি। সফিক সাহেবকে খবর পাঠানো হয়েছে। তিনি এখনো নামছেন না। আমরা যেখানে বসে আছি সেখান থেকেই দোতলার সিঁড়ি চলে গেছে। ভদ্রলোক এই সিঁড়ি ধরেই নামবেন। মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। এই সিঁড়িতে কোনদিন হয়ত এক কণা ধূলিও পড়ে থাকে না। আমি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছি।

নবনী, বল তো এ বাড়ির বৈশিষ্ট্য কি?

তা তো বটেই, এ ছাড়া কি?

বলতে পারছি না।

এ বাড়ির ছাদে কি আছে বল?

ফুলের বাগান?

বাগান তো আছেই। রোজ গার্ডেন। এ ছাড়া কি আছে বল তোমাকে আগে বলেছিলাম। বাসর রাতে। মনে নেই? মনে করতে পারছি না।সুইমিং পুল। বিশাল সুইমিং পুল। বাড়ির ছাদে সুইমিং পুল থাকে কখনো শুনেছ? না।সফিকের আছে। চাঁদনী রাতে যে কি সুন্দর দেখা যায়! পানিতে চাঁদের ছায়া পড়ে। তখন বাড়ির সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়।

মেজাজ ভাল থাকলে অহনা ভাবী গান গান। উনি খুব সুন্দর গান জানেন।তাই না-কি? হ্যাঁ। উনি টিভির এ গ্রেডের শিল্পী। তবে টিভিতে খুব কম যান। গত মাসে প্রোগ্রাম পেয়েছিলেন যান নি।সফিক সাহেব দোতলা থেকে নামছেন না। আমরা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। নোমানের তাতে অসুবিধা হচ্ছে না। সে বাড়ির গল্প করেই যাচ্ছে। আমার অস্বস্তি লাগছে।

মনে হচ্ছে খানিকক্ষণ পর দোতলা থেকে একটা কাজের লোক নেমে এসে বলবে, আজ উনার শরীরটা ভাল না, আরেকদিন আসুন। বুঝতে পারছি না। আমরা কতক্ষণ বসে থাকব। নোমানের মনে হয় বসে থাকতে ভালই লাগছে।নবনী! উঁ।ছাদের উপর এই যে এত বড় সুইমিংপুল কিন্তু সফিক এখন পর্যন্ত পানিতে নেমে দেখে নি।কেন? ও না-কি সুইমিং পুল বানিয়েছে পানি দেখার জন্যে। গোসলের জন্যে তার শাওয়ারই ভাল। অন্যের গোসল করা নোংরা পানিতে সে নামবে না। হা হা হা।

ওর কথাবার্তার তুমি কোন ঠিক পাবে না। তবে ও যা বলবে মনে হবে সেটাই সত্যি।উনাদের ছেলেমেয়ে কি? এখানো ছেলেমেয়ে হয় নি। মাত্র দুবছর আগে বিয়ে করেছে। ভাবী হলেন খুলনার মেয়ে।ও আচ্ছা।এত সুন্দর বাড়ি কিন্তু সফিকের পছন্দ না। ও তার নিজের ডিজাইনে আরেকটা বাড়ি বানাবে। ডিজাইন না-কি করা শুরু করেছে।উনি কি আর্কিটেক্ট? আরে না। পড়াশুনা করেছে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে, তবে সে ইচ্ছা করলে বাড়ি ডিজাইন আর্কিটেক্টের চেয়ে অনেক ভাল করবে।

যে কোন আর্কিটেক্টের কান কেটে নিয়ে আসবে। ও পারে না এমন জিনিস নেই। এখন কি ঠিক করেছে জান? ছবি বানাবে। মুভি ক্যামেরা, লাইট ফাইট কিনে এলাহি কারবার করেছে।তাই বুঝি? মুভি ক্যামেরার দামই পড়েছে ১৪ লাখ টাকা। টাকা অবশ্যি তার কাছে কোন ব্যাপার না। ওর কাছে ১৪ লাখ যা ১৪ হাজারও তা।উনি এখনো আসছেন না কেন? আসবে। কাজে আটকা পড়ে গেছে আর কি? তোমার কি বসে থাকতে খারাপ লাগছে?

হ্যাঁ লাগছে।এসো তাহলে সফিকের লাইব্রেরিটা দেখ। লাইব্রেরি দেখলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। দেখার মত জিনিস। হেন বই নাই যা তুমি লাইব্রেরিতে পাবে না। আসি তোমাকে লাইব্রেরি দেখাই।লাইব্রেরি দেখতে ইচ্ছা করছে না।ইচ্ছা করছে না কেন? বুঝতে পারছি না। মনে হয়। শরীর খারাপ করেছে।মাথা ধরেছে? হুঁ।জ্বর না-কি দেখি, কাছে আস তো।সে আমার জ্বর দেখল। আর তখনি সফিক সাহেব দোতলা থেকে নেমে এলেন।

ফর্সা লম্বা একজন মানুষ। মাথাভরতি কোঁকড়ানো চুল। বড় বড় চোখ। তার গায়ে নীল রঙের। হাফ হাওয়াই শার্ট। পরনের প্যান্ট ধবধবে সাদা। ভদ্রলোক নামছেন হাসতে হাসতে। পায়ে চটি থাকার জন্যেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে ফটফট শব্দ হচ্ছে। চটিতে এত শব্দ হবার কথা না। তিনি বোধহয় ইচ্ছে করেই শব্দ করছেন। কিংবা কে জানে বড়লোকরা হয়ত এই ভাবেই নামে।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভঙ্গিতে বললেন, দাঁড়িয়ে পড়েছ যখন তখন আর বসার দরকার নেই—চল আমরা সরাসরি গাড়িতে উঠবো। আর শোন নবনী, তোমার আমি তুমি করে বলছি। নোমানকে তুই করে বলি, তার স্ত্রীকে আপনি করে বলা সেই কারণেই শোভন না। তবু তোমার আপত্তি থাকলে এক্ষুণি বলে ফেল। প্রথমেই ডিসিসান হয়ে যাক। আপনি না তুমি?

আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।আমার ইচ্ছা ছিল এ বাড়িতেই তোমাদের খাওয়াব। আমার স্ত্রী সেই উপলক্ষে রান্নাবান্নাও করেছে। কিন্তু সন্ধ্যার পর ঝগড়া করে সে বাড়ি থেকে উধাও হয়েছে। কাজেই হোটেল ছাড়া গতি নেই। আমি যে নিচে নামতেই দেরি করেছি তার মূল কারণ অহনাকে টেলিফোনে ট্রেস করার চেষ্টা করছিলাম। ঢাকা শহরে তার একলক্ষ পরিচিত মানুষ। সে কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে।

নোমান বলল, ভাবী নেই! বলিস কি?

তুই দেখি আকাশ থেকে পড়লি! ও তো এরকম করেই।

আমি বললাম, আজ না হয় বাদ থাকুক। আমরা অন্য একদিন আসব।

অন্য একদিন যে অহনাকে পাওয়া যাবে তোমাকে কে বলল? হোটেলে রিজার্ভেশন নেয়া আছে। চল যাই।ভদ্রলোক এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। অপরিচিত একজন মানুষ যখন এভাবে তাকিয়ে থাকেন তখন অস্বস্তি লাগে। কিন্তু উনি যে তাকিয়ে আছেন— তাতে অস্বস্তি লাগছে না। কেন লাগছে না, তাও আমি বুঝতে পারছি না। তিনি হঠাৎ বললেন, নবনী দাড়াও।

তোমার একটা ছবি তুলে রাখি। এই মুহূর্তে তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। সৌন্দর্য কোন ধ্রুব ব্যাপার না। ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। আজ তোমাকে অপূর্ব লাগছে তার মানে এই না যে কালও লাগবে। সুন্দর যখন লাগছে তখন তা ধরে রাখা যাক। তুমি দাড়াও।আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। নোমান বলল ওর আচার-আচরণ আধা পাগলের মত। তুমি ওর কথায় অস্বস্তি বোধ করছ না তো? না।

অস্বস্তি বোধ করবে না। সফিকের স্বভাবই এরকম। ওর মধ্যে লোকাছাপার কোন ব্যাপার নেই।এত বড় হোটেলে আমি আগে কখনো আসি নি। পুরোপুরি হকচকিয়ে যাবার মত ব্যাপার। অথচ নোমান খুব সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছে। মনে হচ্ছে ও তার বন্ধুর সঙ্গে আগেও অনেকবার এসেছে।

সফিক সাহেব হোটেলে পা দেবার পর থেকে আমার দিকে তেমন লক্ষ্য করছেন না। তিনি তাঁর বন্ধুকেই নিচু গলায় ক্রমাগত কি-সব যেন বলছেন। সেও খুব চিন্তিত মুখে শুনছে। আমি যে তার সামনে আছি। এটা বোধহয় সে আর জানে না।ডাইনিং হলের ঠিক মাঝখানে চারজনের টেবিলে আমরা আছি। আমি এবং নোমান পাশাপাশি বসেছি। সফিক সাহেব বসেছেন আমাদের সামনে।

তিনি নোমানের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে হঠাৎ আমাকে বললেন, চারজনের টেবিল কেন নিয়েছি জানি নবনী? চারজনের টেবিল নিয়েছি, কারণ হঠাৎ অহনা এসে উপস্থিত হতে পারে। তার রাগ যেমন চট করে উঠে আবার তেমনি চট করে পড়ে যায়। যদি এ রকম কোন ঘটনা ঘটে তাহলে সে খুঁজে পেতে বের করবে আমরা কোথায় আছি। তারপর হাসিমুখে উপস্থিত হবে। যেন কিছুই হয় নি। এ জন্যেই আমি খাবারের অর্ডার এখনো দিচ্ছি না। অপেক্ষা করছি। তোমার খিদে পায় নি তো?

জি না।গুড। খিদেটা জমুক। খিদে ভালমত না জমলে খেতে পারবে না। যে হোটেল যত জমকালো তার খাবার তত খারাপ। নোমান, তুই মৃণালদের বাড়িতে একবার টেলিফোন করে দেখ তো। অহনা সেখানেও থাকতে পারে। আমি করেছিলাম, আমাকে নো বলে দিয়েছে। তোকে বোধহয় বলবে না।ও উঠে চলে গেল। সফিক সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে আমার দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ করে বললেন, নবনী শোন! তোমার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা

কথা শুনে ওর মনে বোধহয় কনফিউশন তৈরি হয়েছিল। আমি তাকে বলেছি এসব কথাবার্তায় কান না দিতে। মফস্বল শহরে মোটামুটি যারা রূপবতী তাদের নিয়ে নানা গল্পগাথা তৈরি হয়। মেয়েগুলোর জীবন হয় অতিষ্ঠ। তুমিতো আর মোটামুটি রূপবতী না। ভয়ঙ্কর রূপবতী। তোমাকে নিয়ে একশ একটা গল্প তৈরি হবার কথা। যাই হোক আমি নোমানকে বলে দিয়েছি ও যেন তোমার অতীত নিয়ে কখনোই প্রশ্ন না করে। ওকি কিছু জিজ্ঞেস করেছে?

না।একবার যখন না বলে দিয়েছি তখন আর প্রশ্ন করবে না। আর যদি করেও তুমি কিছু বলবে না।আমার বলার মত কিছু নেই।থাকলেও বলবে না। নতুন বিয়ে হওয়া স্বামীর সঙ্গে দ্রুত ভাব করার জন্যে গড় গড় করে অনেক কিছু বলে দেয়। পরে সমস্যা হয়। নোমান ভাল ছেলে। আমি তাকে খুব পছন্দ করি। আমি চাই না— তুচ্ছ সব বিষয় নিয়ে…

 

Read more

নবনী পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.