নবনী পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

নবনী পর্ব – ৭

তোদের কথা আমি কিছুই জানতে চাচ্ছি না। জানি তুই নিজ থেকেই সব লিখবি। কিছুই বাদ দিবি না।তোকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার। সুটকেস খুলে দেখি লাইব্রেরি থাকে আনা উপন্যাসটা তিথির নীল তোয়ালে। তুই স্যুটকেসে দিয়ে দিয়েছিস। বই পড়ার সময় পাচ্ছি না। কাহিনী কি তাও ভুলে গেছি। আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। তোর চোখ কান এতটা খোলা তা বুঝতে পারি নি। তোর এত বুদ্ধি কেন?

ভাল থাকিস। ইতি তোর আপা।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দুটা দশ। ও বিছানায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে। বারান্দায় দরজা খোলা। তাকে যতটা সাবধানী এবং গোছানো বলে মনে হচ্ছিল। আসলে সে ততটা না। বারান্দার দরজা খোলা রেখে সে ঘুমাতো না।আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। চাঁদের আলো পড়েছে বারান্দায়। সরল ধরনের আলো আসত। সে রকম জটিল নকশাদার আলো নয়। ও জেগে থাকলে তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসা যেত। এমন চট করে ঘুমিয়ে পড়বে তা ভাবি নি। ওকে কি ডেকে তুলব?

আমি এসে তার গায়ে হাত রাখলাম। সে পাথরের মত হয়ে আছে। ঘুমন্ত মানুষের গা স্পর্শ করলে সে একটু না একটু নড়ে উঠবেই। নোমান নড়ল না। সমান তালে তার নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। আমরা দুজন পাশাপাশি হয়ে আছি। ওর গায়ের পুরুষ পুরুষ ঘামের গন্ধে আমি কি অভ্যস্ত হয়ে গেছি? আজতো তেমন খারাপ লাগছে না। বরং ইচ্ছা করছে। ওর গা ঘেঁসে ঘুমুতে। একটা হাত ওর শরীরে তুলে দিলে ওকি জেগে উঠবে? না-কি ঘুমের ঘোরে সে হাত সরিয়ে দেবে? দীর্ঘদিন ধরে সে নিশ্চয়ই একা একা ঘুমুচ্ছে। একা ঘুমিয়েই সে অভ্যস্ত। শরীরের উপর একটা বাড়তি হাতের চাপ কি সে সহ্য করবে?

জানালা গলে চাঁদের আলো আমাদের হাঁটুর উপর এসে পড়েছে। শরীরের একটি অংশ আলোকিত হয়ে আছে। নোমান বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। দুঃস্বপ্ন দেখছে কি? বারান্দায় কালো কাপড়ে ঢাকা ময়নাটাও ছটফট করছে। কে জানে হয়ত এরা দুজন একই সঙ্গে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে। পাখিদের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন বলে কি কিছু আছে?

আমি ওর গা থেকে হাত সরিয়ে নিজের মত শুয়ে পড়লাম। শাড়ির আঁচলে শরীর ঢেকে শোয়া। পাশ ফিরতেই খাট নড়ে উঠল। এই খাটের পায়াগুলো সমান না, বড় ছোট আছে। একটু নড়লেই খটখট শব্দ হয়। আমি একটা হাত ওর গায়ে রাখলাম ও ধড়মড় করে উঠে বসে ভয়ার্তা গলায় বলল, কে?

আমি বললাম, কেউ না। তুমি ঘুমাও।সে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল। আবার তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে যে উঠে বসে, কে বলে চেঁচিয়েছে তা ঘুমের মধ্যেই করেছে। ঘুমন্ত মানুষের আচার-আচরণ আমার মত ভাল কেউ জানে না। রাতের পর রাত আমি অম্বুমো কাটিয়েছি। আমার পাশে শুয়ে ঘুমিয়েছে ইরা। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি— ঘুমন্ত মানুষ কি করে। ঘুমন্ত মানুষের আচার আরণের ব্যাপারে আমাকে একজন এক্সপার্ট বলা যেতে পারে।

আজো ঘুম আসছে না। প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে। ওকে ডেকে তুলে বলি–এই শোন আমার ঘুম আসছে না। আমার খুব খারাপ ধরনের একটা অসুখ আছে। আমার রাতে ঘুম হয় না। একা একা জেগে থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি এসে আমার সঙ্গে বারান্দায় খানিকক্ষণ বস। আমার জীবনের ভয়াবহ একটা গল্প আছে। গল্পটা এখনো তোমাকে বলা হয় নি–আজ খানিকটা বলব।

চাঁদের আলো ওর হাঁটুর উপর থেকে সরে গেছে। এখন আলো এসে পড়েছে বিছানার উপর। যেন টর্চ ফেলে ফেলে কেউ বিছানাটা পরীক্ষা করছে।আমি উঠে বসলাম। খাটটা আবার ক্যাচ করে শব্দ করে উঠল। ও বলল, কে? আমি এবার কোন জবাব দিলাম না। ও আবারো গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ল। খাঁচার ময়না পাখি খচ খচ শব্দ করছে।–

আশ্চর্যের ব্যাপার আমাদের স্যারেরও একটা পাখি ছিল। তিনি একটা কাক পুষেছিলেন। তার কোন খাঁচা ছিল না। কাকটা এসে প্রায় সারাদিনই রেলিং-এ বসে থাকত। কাকটার বোধহয় বয়স হয়ে গিয়েছিল। খাবার খুঁজে বেড়াবার সামর্থ্য ছিল না। কিংবা কে জানে হয়ত স্যারকে তার পছন্দ হয়েছিল।স্যার যখন আমাদের বাড়িতে থাকতে এলেন তখন ব্যাপারটা আমার তেমন পছন্দ হয় নি। মৌলানা।

টাইপের একজন লোক বাসায় থাকবে। নানা ধরনের উপদেশ দেবে। কি দরকার? বাড়ি ভাড়া দিয়ে আমাদের যে টাকা পেতে হবে এমনও না। কিন্তু বাবার তাকে খুব পছন্দ হয়ে গেল। তিনি দরাজ গলায় বললেন, সুফি টাইপের একজন মানুষ থাকছে। থাক না। অসুবিধা কি? পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে। আল্লাহ বিল্লাহ করবে। এই বাড়ি থেকেতো আল্লাহ খোদার নাম উঠেই গেছে।মা ক্ষীণ গলায় বললেন, বাইরের একজন মানুষ! বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, সেতো আর তোমার বিছানায় এসে শুয়ে থাকবে না। সে থাকবে তার মত।

উত্তরের দরজাটা পার্মানেন্ট বন্ধ করে দিলেই সে আলাদা হয়ে যাবে। নিজের মত থাকবে। নিজে রান্না করে খাবে।উত্তরের দরজা আমরা ভেতর থেকে বন্ধ করে স্যারকে থাকতে দিলাম। তিনি তাঁর জিনিসপত্র নিয়ে একদিন দুপুর বেলা দুটা রিকশা করে উপস্থিত।প্রথম কিছুদিন আমি শঙ্কিত ছিলাম— হয়ত যখন স্যারকে দেখা যাবে আমাদের বসার ঘরে বসে আছেন। হয়ত ছাদে গিয়েছি দেখব জায়নামাজ হাতে তিনিও ছাদে উঠে এসেছেন নামায পড়ার জন্যে।

কিংবা কলেজে দেখা হলে তিনি পরিচিত ভঙ্গিতে বলবেন, এই যে নবনী খবর কি? আর ক্লাসের সব ছাত্রী আমাকে ক্ষেপাবে।বাস্তবে তার কিছুই হল না। স্যার কলেজে যান। কলেজ থেকে ফিরে বাসায় আসেন। আর তার কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। আমাদের বাড়ির একটা অংশে যে একজন মানুষ বাস করে তা মনেই হয় না। শুধু ছাদ থেকে আমি মাঝে মাঝে দেখি তিনি বারান্দায় রান্না চড়িয়েছেন। একদিন তাঁর পোষা কাকটাকে দেখলাম।

শুরুতে কাকটা রেলিং-এ বসেছিল। তারপর রেলিং থেকে নেমে গম্ভীর ভঙ্গিতে হেঁটে স্যারের পাশে বসে থাকল। ভাবটা এ রকম যেন সেও রান্নাবান্না তদারক করছে। এরকম মজার দৃশ্য আমি আমার জীবনে আর দেখি নি।আমি যখনই ছাদে উঠতাম কিছুটা সময় কাটাতাম কাকটাকে দেখার জন্যে। কি করে সে এ বাড়ির একজন সদস্যের মত চলাফেরা করে। গম্ভীর তার ভাবভঙ্গি।

একদিন ছাদে গিয়ে যথারীতি উঁকি দিয়েছি–দেখি বাঁশের চাটাই দিয়ে বারান্দার অংশটা ঢাকা। ছাদ থেকে বারান্দা দেখার কোনই উপায় নেই। আমার খুব মেজাজ খারাপ হল। কাণ্ডটা নিশ্চয়ই স্যার করেছেন। যাতে বারান্দা থেকে তাকে একজন তরুণী মেয়ের মুখ দেখতে না হয়। ধর্মে বাধা নিষেধ আছে। আমার কাছে মনে হল তিনি ইচ্ছা করে আমাকে অপমান করলেন।

সেদিন সন্ধ্যায়। মা তালের পিঠা করেছেন। ইরাকে বললেন, মাস্টার সাহেবকে কয়েকটা পিঠা দিয়ে আয়তো ইরা। বেচারা একা একা থাকে। কি খায় না খায় কে জানে? ইরা বলল, আমি পারব না। আপাকে পিঠা নিয়ে যেতে বল। ওর কলেজের স্যার। ওরই নিয়ে যাওয়া উচিত।আমি আপত্তি করলাম না। স্যারকে কিছু কঠিন কথা শুনাতে ইচ্ছা করছিল। পিঠা দিতে গিয়ে সেই কথাগুলো শুনিয়ে আসা যাবে।স্যার আমাকে দেখে এতাই অবাক হলেন যে বলার কথা নয়।

যেন এ রকম অস্বাভাবিক ঘটনা। এর আগে তাঁর জীবনে কখনো ঘটে নি। আমি বললাম, স্যার মা আপনার জন্যে কিছু তালের পিঠা পাঠিয়েছেন।তিনি হড়বড় করে বললেন, শুকরিয়া। শুকরিয়া। তোমার মাকে হাজার শুকরিয়া।স্যার আমাকে বসতে বলছেন না। আমি যে কথাগুলো বলব বলে ভেবে এসেছি সেগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলে চলে যাওয়া যায় না। আমাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বসতে হবে। আমি বললাম, স্যার আমি কি কিছুক্ষণের জন্যে আপনার এখানে বসতে পারি?

অবশ্যই পার। বোস। বোস।তিনি অতিরিক্ত রকমের ব্যস্ত হয় পড়লেন। নিজেই ছুটে গিয়ে বারান্দা থেকে চেয়ার নিয়ে এলেন। আমি বসলাম না। কঠিন গলায় বললাম, স্যার বসতে ভয় লাগছে। আমারতো বোরকা পরা নেই। এইভাবে আপনার সামনে আসাই হয়ত ঠিক হয় নি। মা পিঠা দিয়ে যেতে বললেন বলেই এসেছি। নয়ত আসতাম না। আপনাকে বিব্রত করার আমার কোন ইচ্ছা নেই।

আমি বিব্রত হচ্ছি না।অবশ্যই হচ্ছেন। বিব্রত না হলে বারান্দায় চাটাইয়ের বেড়া দিতেন না। এই কাণ্ডটা করেছেন কারণ চাটাইয়ের বেড়াটা না দিলে বোরকা নেই এমন একটা মেয়েকে মাঝে মাঝে আপনার দেখতে হয়। বিরাট একটা পাপ হয়। এত বড় পাপের শাস্তি হল দোজখ। আমাকে দেখার কারণে আপনি দোজখে যাবেন তা-কি হয়? দোজখে সুন্দর সুন্দর পরী অপেক্ষা করছে।

আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে শেষ করলাম। কঠিন কিছু কথা বলার ছিল বলতে পারলাম না, কারণ আমি দেখলাম। তিনি খুবই দুঃখিত ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম, স্যার যাই।তিনি বললেন, একটু বোস। এক মিনিট। আমার উপর এরকম রাগ করে চলে গেলে আমার খারাপ লাগবে। একটু বসে যাও।আমি বসলাম।

তিনি বললেন–চাটাইয়ের বেড়াটা আমি আমার জন্যে দেই নি। তোমার জন্যে দিয়েছি। আমার মনে হয়েছিল–তোমার একা একা ছাদে হাঁটার অভ্যাস— আমার জন্যে স্বাধীনভাবে তা করতে পারছ না। তোমাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেবার জন্যেই এটা করেছি। তুমি যে এমন রেগে যাবে বুঝতে পারি নি। তোমর রাগ কি একটু কমেছে?

আমি কিছু বললাম না। তিনি যেন নিজের মনে কথা বলছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন–বোরকা নিয়ে তোমার মনে বড় ধরনের ক্ষোভ আছে বলে মনে হয়। এরকম থাকা উচিত না। আমাদের প্রফেটের সময়ের যুগটা ছিল আলমে জাহিলিয়াতে যুগ। মানুষের প্রবৃত্তি ছিল পশুদের কাছাকাছি। মেয়েরা রাস্তায় বের হলে মানুষেরা নানাভাবে তাদের উত্যক্ত করত। মেয়েরাও যে ছেলেদের চেয়ে আলাদা ছিল তা না। তারাও এতে মজা পেত। তারাও চাইতো যেন পুরুষরা তাদের উত্যক্ত করে, তাদেরকে দেখে অশ্ৰীল অঙ্গ ভঙ্গি করে।

কারণ যুগটাই হচ্ছে পশুত্বের যুগ। কাজেই আমাদের নবী এমন একটা ব্যবস্থা করলেন যাতে সবাই বুঝতে পারে— মুসলমান মেয়েরা অন্যদের মত না। তারা পবিত্র। তারা আলাদা। তাদেরকে নিয়ে এসব করা যাবে না। তারা তা চায়ও না। কাজেই নবী আদেশ দিলেন মেয়েরা যেন চাদরে তাদের শরীর ঢেকে নিজেদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করে ফেলে। চাদরে ঢাকা একটা মেয়ে দেখলে সবাই যেন বোঝে এই মেয়ে আর দশটা মেয়ের মত না। এর সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতে হবে। তুমি কি বুঝতে পারছি নবনী?

আমি কিছু বললাম না। স্যার বললেন, বেহেশতে পরী পাওয়া সম্পর্কে তুমি যা বললে সেটা নিয়েও কথা আছে। তুমি যেমন স্থূলভাবে বললে তা কিন্তু না। পরে তোমাকে বুঝিয়ে বলব।আমাকে বুঝিয়ে বলার কোন দরকার নেই। আপনি বুঝলেই হল।আমি দাঁড়ালাম। স্যার হেসে ফেললেন। এত সুন্দর করে আমি বোধহয় কাউকে হাসতে দেখি নি। আমার সারা শরীর ঝনঝনি করে উঠল। ঘণ্টা বেজে উঠার মত শব্দ। এই ঘণ্টা সর্বনাশের ঘণ্টা। আমি প্ৰায় ছুটে চলে এলাম। মেয়েরা ঠিক কিভাবে ছেলেদের প্রেমে পড়ে?

একজনের প্রতি অন্যজনের তীব্র আকর্ষণটা কিভাবে তৈরি হয়। গল্প উপন্যাসের ব্যাপার। আর বাস্তবের ব্যাপার কি এক রকম না আলাদা? প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা তার ভালবাসও কি আলাদা? একজন আরেকজনকে দেখেই পাগলের মত হয়ে গেল এমনকি সত্যি কখনো হয়েছে? না-কি এগুলি শুধু কথার কথা? আমার কি হয়েছে? আমি কি এই মানুষটির প্রেমে পড়ে গেছি? প্রেমের মত কি আছে। এই মানুষটার? মানুষটি যদি বিবাহিত হত, তার কয়েকটা ছেলেমেয়ে থাকতো তাহলেও কি আমি ঠিক এইভাবেই আকৰ্ষিত হতাম।

সারারাত আমার ঘুম হল না। জীবনে এই প্রথম আমার ঘুমহীন রাত্রি যাপন। কি যে এক ভয়ঙ্কর কষ্ট। বিছানায় এপাশ ও পাশ করছি আর ভাবছি ভোর হচ্ছে না কেন? ভোর হোক। মনে হচ্ছে ভোর হলে আমার কষ্টটা কমবে।সূৰ্য উঠার আগে আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দরজা খুলে বারান্দায় এসে দেখি মা ফজরের নামাযের জন্যে অজু করছেন। আমাকে দেখে বললেন, কিরে আজ এত সকালে ঘুম ভাঙলো যে।

একবার ভোরবেলা উঠে দেখলাম কেমন লাগে।রোজ ভোরে উঠে ছাদে ঘোরাঘুরি করবি দেখবি শরীরটা কেমন ভাল লাগে।তুমি তাই কর না-কি মা?হুঁ। তোরা ছাদে যাস সন্ধ্যাবেলায় আমি যাই ভোরবেলায়।মা আনন্দিত ভঙ্গিতে হাসছেন। আমি ছাদে চলে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় মনে হতে লাগল আচ্ছা ছাদে উঠে যদি দেখি স্যার ছাদে হাঁটাহাঁটি করছেন। তাহলে কি হবে? ব্যাপারটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। খুবই স্বাভাবিক।

উনি নিশ্চয়ই নামায পড়ার জন্যে ভোরবেলায় উঠেছেন। একবার উঠলে ছাদে কি আর যাবেন না। এত সুন্দর একটা ছাদ।ছাদে কাউকে পেলাম না। আশাভঙ্গের তীব্ৰ কষ্টে প্রায় কান্না পাওয়ার মত হয়ে গেল। আমার ইচ্ছা করতে লাগল–এক্ষুণি ছুটে গিয়ে উনার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলি– স্যার আমাদের ছাদটা খুব সুন্দর। আসুন আপনাকে দেখাই। এখন থেকে রোজ ভোরবেলা ছাদে বেড়াতে আসবেন। এতে আপনার শরীর খুব ভাল থাকবে।

সিঁড়িতে কার পায়ের শব্দ। উনি কি আসছেন। ছাদে? অবশ্যই আসছেন। উনি ছাড়া আর কে হবে? আমি আমার শাড়িটার দিকে তাকালাম। বেছে বেছে আজকের দিনে আমি এমন একটা বাজে শাড়ি পরেছি। আচ্ছা আমার চোখে ময়লা জমে নেইতো? আমার বুক ধ্বক ধ্বক করছে। কি বলব আমি স্যারকে?

না। স্যার না। মা এসেছেন। মার হাতে দুকাপ চা। আমার জন্যে চা এনেছেন। এত ভাল আমার মা কিন্তু সেদিন ভোরবেলায় মাকে দেখে মনটা ভেঙে গেল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল, তুমি এসেছ কেন মা? কেন তুমি এসেছ? কে তোমাকে আসতে বলেছ?… চাঁদের আলো খাট থেকে নেমে গেছে। নোমানের ঘুম ভেঙে গেছে। সে উঠে বসতে বসতে অবাক হয়ে বলল, কি হয়েছে?

আমি বললাম, কিছু হয় নি?

ঘুমুচ্ছ না?

না। আমার ঘুম আসছে না।

শরীর খারাপ করেছে না-কি?

জ্বর? সে হাত বাড়িয়ে আমার কপাল স্পর্শ করল। আহ তার হাতটা কি ঠাণ্ডা।

অনেকক্ষণ ধরে দরজার কড়া নাড়ছে।

আমাদের বাসায় কলিংবেল নেই। কেউ এলে কড়া নাড়ে। বিশ্ৰী খটাং খটাং শব্দ হয়। আমি বাথরুমে গায়ে পানি ঢালছি আর কড়া নাড়ার শব্দ শুনছি। কে এসেছে ভর দুপুরে? আমি কি করব? ভেজা গায়ে দরজা খুলিব? কে হতে পারে?তাড়াতাড়ি গায়ে কোনমতে একটা শাড়ি জড়িয়ে দরজা খুলে দেখি বড়মামা। বড়মামার পেছনে ছোট্ট টিনের ট্রাঙ্ক হাতে নয় দশ বছর বয়েসী একটা মেয়ে। আমি চেঁচিয়ে বললাম, বড়মামা। আপনি?

কেমন আছিস মা?

ভাল। সাথে এটা কে?

তোর জন্যে কাজের মেয়ে নিয়ে এসেছি। তুই ইরার কাছে চিঠি লিখেছিস। চিঠি পড়ে বুঝলাম ঘরে কাজের লোক নেই। তাই নিয়ে এসেছি। এর নাম মদিনা। তুই কাপড় বদলে আয় ভেজা গায়ে ঠাণ্ডা লাগাবি। জামাই কোথায়?

ও ঢাকার বাইরে আছে।

তুই এক?

জ্বি।

আচ্ছা যা কাপড় বদলে আয়। পরে কথা বলব।বড়মামা বেশিক্ষণ থাকলেন না। দুপুরে কিছু খেলেনও না। রোজা রেখে এসেছেন। সন্ধ্যাবেলা ইফতার করবেন। অফিসের কাজ নিয়ে এসেছেন। এখন কােজ সারিতে যাবেন। রাতে আমার সঙ্গে দেখা করে ট্রেনে উঠবেন।চিঠি লেখার থাকলে লিখে রাখিস। হাতে হাতে নিয়ে যাব। জামাই কদিন ধরে বাইরে?

চার দিন।

আসবে কবে?

ঠিক নেই মামা। সপ্তাহ খানিক লাগবে বলেছিল। ছবির কি একটা কাজ করছে।একা ফেলে চলে গেল। এটা ঠিক হয় নাই। আমাকে খবর দিলে তোকে এসে নিয়ে যেতাম।আমার অসুবিধা হচ্ছে না মামা। রাতে দারোয়ানের বউটা এসে বারান্দায় শুয়ে থাকে।মামা কৌতূহলী চোখে আমার সংসার দেখছেন। খাটের নিচটাও এক ফাঁকে দেখলেন। চেয়ারে বসেছিলেন, চেয়ার ছেড়ে খাটে বসলেন। খাটটা নড়ে উঠল। ব্যাপারটা বোধহয় পছন্দ হল না। তিনি নিঃশ্বাস ফেললেন।

এখানকার খবরাখবর সব ভালতো?

জ্বি ভাল।

কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ও আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।

ওরা আসে না?

জ্বি না।

তোর আগের ব্যাপার ট্যাপার কিছু জানতে চায় নি তো?

জ্বি-না।

নিজ থেকে কিছু বলার দরকার নেই।

বাবার শরীর কেমন আছে মামা?

কিছু বুঝতে পারছি না। কখনো বলে ভাল। কখনো বলে মন্দ।

ইরার খবর কি?

ভাল। ওর বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। জামাই মংলা পোর্টের ইনজিনিয়ার। দেখে গেছে। পছন্দ হয়েছে বলেইতো মনে হয়। দেখি আল্লাহ আল্লাহ করছি। বিয়ে শাদীর ব্যাপার কলমা না পড়ানো পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। তোর বাসাটা বড় থাকলে তোর এখানে এনে রাখতাম। বিয়ের কোন আলাপ-আলোচনায় নেত্রকোনা হওয়া উচিত না। ফন্ট করে কেউ কান ভাঙনি দিবে। তোর বাসাওতো ছোট।জ্বি।জামাই কি বলে? বড় বাসা নেবে না। এইখানেই থাকবে?

এই নিয়ে কথা হয় নি মামা।তুই কিছু বলতে যাবি না। চাপ দেয়া ঠিক না। শুরুতে একটু কষ্ট করাই ভাল। কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না। সংসারে ভালবাসা থাকলে আর কিছু লাগে না। চাঁদের আলো ঢোকে ভাঙা ঘরে।পাকা দালানের জানোলা খুলে দিলেও আলো ঢোকে মামা।তার জন্যে জানোলা খুলতে হয় রে বড় খুকী। কয়জন আর জানালা খুলে? কেউ খুলে না।

বড়মামা শুধু যে মদিনাকে নিয়ে এসেছেন। তাই না। কয়েক ধরনের আচার এনেছেন। আমের আচার, তেঁতুলের আচার, চালতার আচার। একটিন মুড়ি এনেছেন। হরলিক্সের কোটায় এক কৌটা গাওয়া ঘি। একটা প্যাকেট খুলে দেখি ঘরে পরার দুটা শাড়ি। একটা গামছা।

বড় খুকী!

জ্বি মামা।

 

Read more

নবনী পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.