নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ২

খাওয়া শেষ করে একটা পান মুখে দিলাম। সিগারেট ধরালাম। বৃষ্টি তখনও পড়ছে। ভালোভাবেই পড়ছে। আমি বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে বৃষ্টি দেখছি। নলিনী বাবু আমার পাশের চেয়ারে বেশ আরাম করে পা তুলে বসেছেন। আমি বললাম, ভাই আপনার অসাধারণ খাবার খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি। মানুষ বাঁচার জন্য খায়। এখন মনে হচ্ছে শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য বেঁচে থাকাটাও খারাপ না।নলিনী বাবু হাসলেন। তার হাসি সুন্দর। বেশিরভাগ মানুষ শুধু ঠোঁট দিয়ে হাসে। কেউ কেউ ঠোঁটের সঙ্গে চোখ ব্যবহার করে। এদের হাসি দেখাতে ভালো লাগে। নলিনী বাবু দ্বিতীয় দলের।আমি বললাম, আপনি নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ কারণে আমার কাছে। এসেছেন। কারণটা বলুন।তেমন কোনো কারণ নেই, একজন জ্ঞানী মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানো।আমি জ্ঞানী মানুষ আপনাকে কে বলল?

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয় পড়ান। আপনি জ্ঞানী তো বটেই। এ ছাড়াও অন্য কারণ আছে। মিসির আলির যে বইটা আমি পড়েছি তার সঙ্গে আমার জীবনের খুব মিল আছে। মিলের ব্যাপারটা বলার শখ ছিল।বইটার নাম কী? নিষাদ। কাহিনী কি আপনার মন আছে, না ভুলে গেছেন? মনে আছে। আপনার কাহিনী কী? বলা শুরু করব? হ্যাঁ, শুরু করুন।বিরক্ত হবেন না তো? বিরক্ত তো হবই। লেখকরা নিজেরা গল্প তৈরি করেন। অন্যদের গল্প শুনে আনন্দ পান না।বৃষ্টির ছাট আসছে। আপনি এখানেই বসবেন নাকি ভেতরে যাবেন?

এখানেই বসব।নলিনী বাবু গল্প শুরু করলেন।গম্ভীর গলায় বললেন, আমি এই জগতের অতি দুঃখী মানুষদের একজন। আবার অতি সুখী মানুষদেরও একজন।আমি বললাম, আপনার গল্পের শুরুটা ভালো। আপনি একনাগাড়ে বলে যান। আমি আপনাকে মাঝখানে থামাব না। হুঁ দেব না। তারপর কী হলো বলব না, আপনি কথা বলে যাবেন নিজের মতো।ধন্যবাদ।গল্প শুরু করার আগে সামান্য বেয়াদবি করব। নিষাদ বইটি নামকরণের কোনো সার্থকতা আমি খুঁজে পাইনি।সব কিছুর সার্থকতা খোঁজার প্রয়োজন কি আছে?

আছে। নিষাদ নাম শ্লোকে প্রথম ব্যবহার করেন বাল্মীকি।

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং তমগমঃ শাশ্বতীঃ খমাঃ।

যৎ ক্রৌনৎঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ ॥

এর অর্থ নিষাদ, তুই চিরকাল প্রতিষ্ঠা লাভ করবি না, কারণ তুই ক্রৌঞ্চ মিথুনের একটিকে কামমোহিত অবস্থায় বধ করেছিস।

রামায়ণের গল্প থাকুক। নিজের গল্প শুরু করুন।

নলিনী বাবু গল্প শুরু করলেন।

আমার বাবার নাম শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য।

তিনি ময়মনসিংহ জজকোর্টের পেশকার ছিলেন। অসৎ উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন। একজন পুরুষ মানুষের যত রকম খারাপ অভ্যাস থাকা সম্ভব সবই তার ছিল। মদ-গাঁজা খেতেন, আফিম খেতেন। ললিতা নামে অল্প বয়সী এক মেয়েকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছিলেন। মাসে একবার খারাপ পাড়ায় যেতেন রুচি বদলাবার জন্যে। ললিতা ছাড়া দশ-এগারো বছরের একটি বালকও তার সঙ্গে থাকত। তার হাত-পা টিপে দিত। বালকের নাম সুরুজ। এই বালকের সঙ্গেও তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল। আমি কি বাবার বিষয়ে সম্পূর্ণ চিত্র আপনাকে দিতে পেরেছি? পেরেছেন।একটি সংস্কৃত শ্লোক বাবার চরিত্র পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে। যদি অনুমতি দেন শ্লোকটি বলি?

বলুন।

যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি জানামি

ধর্মং ন চ মে প্রবৃত্তি।

জানাম্যধমং ন চ মে নিবৃত্তিঃ ॥

এর অর্থ ধর্ম কি তা আমি জানি, কিন্তু তাহাতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। অধর্ম কি তাহাও আমি জানি, তাহা হইতে আমি নিবৃত্ত হইতে পারি না।শ্লোকটা সুন্দর, আমাকে লিখে দিয়ে যাবেন।অবশ্যই লিখে দিয়ে যাব। আমি সুন্দর সুন্দর শ্লোক জানি, একটা বড় খাতায় সব লিখে দিয়ে যাব। আপনি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন। এখন বাবার চেহারার বর্ণনা দেব? আপনি লেখক মানুষ। লেখকদের কাছে চেহারার বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ।চেহারার বর্ণনা দিন।

সুন্দরের বর্ণনায় আমরা রাজপুত্র শব্দটি ব্যবহার করি। বাবা ছিলেন রাজপুত্রদের রাজপুত্র। গাত্রবর্ণ গৌর। মাথা ভর্তি কুঁড়ানো চুল। বড় বড় চোখ। বাল্মীকি রামের শরীরের যে বর্ণনা দিয়েছেন বাবার সঙ্গে তার মিল আছে।–তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুষম ও সুবিন্যস্ত, বর্ণ স্নিগ্ধ, তিনি আয়াত নেত্র, লক্ষ্মীবান ও শুভ লক্ষণযুক্ত।ইন্টারেস্টিং।বাবা ময়মনসিংহ শহরে থাকতেন। মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রাতে নীলগঞ্জ আসতেন। ললিতা মেয়েটাকে নিয়ে আসতেন। দুদিন থেকে রোববার ভোরে চলে যেতেন। এই দুদিন আমি এবং মা আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকতাম।আমার মায়ের নাম বুকুল বালা সাধারণত দেখা যায় স্বামী রূপবান হলে স্ত্রী রূপবতী হন না। মার ক্ষেত্রে ঘটনা তা হয়নি। আমার মার মতো রূপবতী সচরাচর দেখা যায় না।

বাবা-মা পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হতো রাজপুত্র-রাজকন্য। তবে মায়ের গাত্রবর্ণ ছিল শ্যামলা। আমি মায়ের গাত্রবর্ণ পেয়েছি। মা ছিলেন স্বল্পভাষী তরুণী। তার প্রধান শখ গল্পের বই পড়তে পড়তে চোখের পানি ফেলা। বিয়ের সময় তিনি ট্রাংক ভর্তি করে বই নিয়ে এসেছিলেন। আমায বিভিন্ন লেখকের একটা একটা করে বই পড়েছি, মার কাছ থেকে নিয়ে পড়েছি। শুধু আপনার বইটা পড়েছি অনেক পরে। আমাদের স্কুলের এক ছাত্রীর কাছ থেকে ধার করে পড়েছি। ছাত্রীর নাম সুলতানা বেগম। দশম শ্রেণী, বিজ্ঞান শাখা। রোল দুই অতি ভালো মেয়ে।যে কথা বলছিলাম, দুদিনের জন্য এসে বাবা গজব করে ফেলতেন। মা বাবাকে ভয় পেতেন যমের মতো। প্রায়ই দেখেছি, মা বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো কারণ ছাড়াই ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন।

বাবা হয়তো বললেন, বকুল বালা ভালো আছ?মার মুখে কথা আটকে যেত। ভালো আছি বলতেও তার অনেক সময় লাগত।ললিতা মেয়েটা দুটি দিন খুবই আনন্দে কাটাতো। কুয়াতলাটা তার পছন্দের জায়গা ছিল। বেশিরভাগ সময় সে কুয়াতলায় বসে পায়ে আলতা দিত। চুল আঁচড়াত। মাথায় তেল দিত। তার মুখ থাকত হাসি হাসি। আমার সঙ্গে তার টুকটাক কথাও হতো। ছিপ ফেলে মাছ মারায় তার শখ ছিল। তার জন্য ছিপ, মাছের আধার কেঁচো জোগাড় করে রাখতে হতো। মাছ মারা হতো আমাদের পুকুরেই। বাবা তার অসৎ পয়সায় নীলগঞ্জে দোতলা দালান করেছেন। বাড়ির পেছনে বিশাল পুকুর কাটিয়েছেন। ঘাট বাঁধিয়েছেন।

মাছ মারার সময় ললিতার সঙ্গে আমাকে থাকতে হতো। আমার মা চাইতেন না আমি ললিতার সঙ্গে মিশি। আমি মার কাছে ভাব করতাম ললিতাকে পছন্দ করি না। সে ডাকলে যেতে চাই না। শুধু বাবার ভয়ে না করতে পারছি না। পুকুরে ছিপ ফেলে ললিতা নানা গল্প নিজের মনেই করত। যেমন একদিন বলল, টাকি মাছের জন্ম কি জন্য হয়েছে জানিস? আমি বললাম, না।টাকি মাছের জন্ম হয়েছে ভর্তা হওয়ার জন্য। টাকি মাছের ঝোল, ভাজি কেউ খায় না। সবাই ভর্তা খায়। মানুষের মধ্যেও মাছস্বভাব আছে। কিছু মানুষ আছে টাকি মাছ, যেমন–তোর মা। জন্ম হয়েছে ভর্তা হওয়ার জন্য।আমি বললাম, তুমি কি মাছ?

আমি হইলাম তিতপুঁটি। শরীরে লাল দাগ আছে। আসলে পুঁটি। তিতা বলে তিতপুঁটি।আর আমার বাবা কি মাছ? বাইম মাছ। কাদার ভেতরে থাকে, কাদার ভিতর বড় হয়। দেখতে সাপের মতো। বাইম মাছ নিজের ডিম নিজে খায় এটা জানিস? না।তাহলে জানিস কি? তুই তো গাধা। শিলুক দিলে ভাঙানি দিতে পারবি? জানি না।চেষ্টা করে দেখ পারিস কি না। বল দেখি–

সুতার আগায় ঝুলি

মিষ্টি কথায় ভুলি

আয় আমারে ধর

ফাঁস নিয়া মর।

বল এটা কি?

জানি না।

তুই তো গাধারও নিচে। এটা হইল বড়শি।

ললিতা মেয়েটাকে আমি পছন্দ করতাম। তবে তার কাছেও ভাব দেখাতাম পছন্দ করি না। দূরে দূরে থাকতাম। লক্ষ্য থাকত তার দিকে। সে যখন হাত ইশারায় ডাকত তখন এমন ভাব করতাম যেন অনিচ্ছার সঙ্গে যাচ্ছি।আমার বয়স তখন কত? নয় কিংবা দশ। পড়ি ক্লাস ফাইভে। মার সঙ্গে সুখেই থাকি। বাবার অনুপস্থিতিতে বাড়িটা আমাদের দুজনার। প্রতিদিন দুপুরে মার সঙ্গে দীঘিতে সাঁতার কাটি। বাড়ির ছাদে ওঠার জন্য লোহার একটা প্যাচানো সিঁড়ি আছে। প্রয়োজন ছাড়া ছাদে ওঠা সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। বাবার নিষেধ। কারণ ছাদে রেলিং নেই। বাবা লোহার সিঁড়ির মাথায় দরজা লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তার চাবি থাকত তার কাছে। মা গোপনে আলাদা চাবি বানিয়ে নিয়েছিলেন। আমরা প্রায় রাতেই তালা খুলে ছাদে উঠতাম।

নিষিদ্ধ একটা কাজ করছি–এই উত্তেজনায় দুজনই অস্থির হয়ে থাকতাম। মনে মনে বলতাম, বাবা যেন আর এ বাড়িতে না আসে। বাকি জীবনটা আমি এবং মা প্রম সুখে পার করে দেব।ললিতার উপস্থিতিতে মাতা-পুত্রের আনন্দময় জীবন বাঁধা পড়ত। আমরা দুজন আলাদা হয়ে পড়তাম।সন্ধ্যাবেলা ললিতা বাবার কাছ থেকে চাবি নিয়ে ছাদের দরজা খুলত। আমাকে নিয়ে ছাদে যেত। আমাকে বলত আমার কোলে মাথা রাখ আমি উকুন বাইছা দেই।আমি বলতাম, অন্ধকারে উকুন কিভাবে বাছাবে? এইটাও একটা কথা। আচ্ছা শুয়া খাক, মাথায় হাত বুলায় দেই। তুর মারে বলিস না। সে রাগ করব। সে ভাবব আমি তার পুলারে নিয়া নিছি।

একজনের পুলা কি অন্যজনে নিতে পারে? পারে না।

আমি তার কোলে মাথা রাখতাম।

ললিতা নানান কথা বলত। আমি খুব মজা পেতাম।

যেমন এক সন্ধ্যায় বলল,

কালো বামুন ধলা শূদ্র

বাঁইটা মুসলমান

ঘরজামাই আর পোষ্যপুত্র–

পাঁচ জনই হমান হমান।

ক দেহি এর অর্থ কি?

আমি বললাম, জানি না।

তুই দেখি কিছুই জানস না। এর অর্থ এই পাঁচ জনই সমান খারাপ। আমার নাম ললিতা। ললিতা কে জানস? না।ললিতা হইল শ্রী রাধিকার সবচে প্রিয় সখী। কৃষ্ণের সঙ্গে ললিতারও ঘটনা ছিল। কি ঘটনা বড় হইলে বুঝবি। এখন বুঝবি না। ললিতা যেই দেখত রাধা কাছে ধারে নাই ওম্নে ফুড়ুৎ কইরা কৃষ্ণের ঘরে ঢুকত।বর্ষাকালের শুরুতে আমার বড় মামা কলকাতা থেকে বোনকে দেখতে এলেন। কলকাতায় বড় মামার ফার্মেসি আছে। ফার্মেসির নাম বকুল বালা আরোগ্য বিতান। বোনের নামে ফার্মেসি দিয়েছেন। বোনের প্রতি তাঁর মমতা এখান থেকে বুঝা যায়।

মা তার ভাইকে জড়িয়ে দীর্ঘ সময় হাউমাউ করে কাঁদলেন। ভাইবোনের মধ্যে অনেক কথাবার্তাও হলো। কী কথা, আমি জানি না। আমার সামনে কোনো কথা হয়নি। তবে তারা দুজনে যে গোপন পরিকল্পনা করছেন তা বুঝতে পারলাম। দুপুরে ভাত খেতে বসেছি। বড় মামা বললেন, শোন ছোটন (মামা আমাকে ছোটন ডাকতেন) তোর মা এখানে ভয়াবহ কষ্টে আছে। আমি ঠিক করেছি তোর মাকে নিয়ে কলকাতা চলে যাব। সে সেখানেই থাকবে। তোর বাবার যদি মতিগতি ফেরে, তাহলে তোর মা আবার সংসার করতে আসবে। যদি না ফেরে তাহলে আর আসবে না। আমার সঙ্গেই থাকবে। তুই কি যাবি তোর মার সঙ্গে?

আমি বললাম, যাব।তোকে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। তুই পড়াশোনা করবি।আমি বললাম, আচ্ছা।তোর বাবার সঙ্গে যে যোগাযোগ থাকবে না, তা না। তুই চিঠিপত্র লিখবি। তোর বাপের যদি ছেলে দেখতে ইচ্ছা করে সে এসে দেখে যাবে। ঠিক আছে? হুঁ। ঠিক আছে।তাহলে কী কী সঙ্গে নিবি, গুছিয়ে ফেল। তোর বাবা যেন কিছু না জানে। শুধু বাবা কেন, কাকপক্ষীও যেন না জানে।কেউ জানবে না।ততাদের পাসপোর্ট করানো, ভিসা করানো–এসব অনেক ঝামেলা। গোপনে বর্ডার দিয়ে পাস করাব। আমার চেনাজানা লোক আছে। সমস্যা নাই। আমরা দহগ্রাম দিয়ে বর্ডার পাস করব। আমি কালই চলে যাব। সব ব্যবস্থা করে তিন-চার দিনের মাথায় চলে আসব। তুই আর তোর মা রেডি থাকবি। তোর হাতে একটা স্যুটকেস। তোর মার হাতে একটা। এর বেশি কিছু নেওয়া যাবে না।

পরদিন ভোরে মামা দহগ্রামে চলে গেলেন। বাবা গ্রামে আসেন বৃহস্পতিবারে। সেদিন সোমবার। হঠাৎ দুপুর বেলা বাবা চলে এলেন, সঙ্গে ললিতা। মার সঙ্গে অনেক দিন পর বাবা ভালো ব্যবহার করলেন। হাসিমুখে কথা বললেন। বাবা বললেন, কচুয়া কাচের চুড়ি তোমার পছন্দ। পাঁচ ডজন চুড়ি এনেছি। কচুয়া রঙের একটা শাড়িও এনেছি। শাড়ি পরো, হাত ভর্তি করে চুড়ি পররা, তারপর আমার সামনে এসে বসো এবং বলো তোমার বড় ভাই কী মতলবে এসেছে।মা ভয়ে ভয়ে বললেন, বোনকে দেখতে এসেছে।শুধু শুধু বোনকে দেখতে আসে নাই। তুমি পত্র লিখে তোমার ভাইকে আনায়েছ। ঠিক বলেছি? না।

বাবা নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, তুমি পত্রে কোনো কিছু জানাতে বাদ রাখে নাই। ললিতা মেয়েটার কথাও লিখেছ। সুরুজ মিয়ার কথা লিখছ। আমি খারাপ পাড়ায় যাই এটাও লিখেছ। কিছু বাদ দাও নাই। শুধু একটা জিনিস লিখতে ভুলে গেছ। আমি যে বোতল খাই এটা লৈখো নাই। কিভাবে জানি জানো? মা চুপ করে রইলেন। বাবা বিড়ি ধরাতে ধরাতে বললেন, পোস্টমাস্টার সাহেবের সঙ্গে আমার বন্দোবস্ত করা ছিল। কলকাতায় যেসব চিঠি তুমি পাঠাবে সেগুলো তিনি আগে আমাকে পড়াবেন, তারপর ব্যবস্থা নেবেন। তোমার ভাইকে লেখা তিনটা পত্র আমার পাঞ্জাবির পকেটে আছে। ইচ্ছা করলে পড়ে দেখতে পারো।

এখন যাও শাড়ি পরো। হাতে চুড়ি পরো। কুয়ার পাড়ে বসো। দুইজন সুখ-দুঃখের কিছু আলাপ করি।বাবা কুয়ার পাড়ে বসলেন, হাত ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি ভয়ে কাপতে কাঁপতে বাবার সামনে দাঁড়ালাম। বাবা বললেন, তোর টাউট মামাটা কই? আমি বললাম দহগ্রাম গিয়েছেন। তিন-চারদিন পরে ফিরবেন।দহগ্রামে কেন গেল? সেখানের মামলাটা কী? আমি চুপ করে রইলাম। বাবা চাপা গলায় বললেন, যা জিজ্ঞেস করি তার উত্তর দিবি। সঙ্গে সঙ্গে দিবি। উত্তর দিতে এক সেকেন্ড দেরি হলে খেজুর কাঁটা দিয়ে চোখ তুলে দেব। বল দহগ্রামে কী ঘটনা?

আমি চাপা গলায় বললাম, মা আর আমি দহগ্রামের বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাব।বাবা হাসিমুখে বললেন, বুদ্ধি তো ভালো বের করেছে। টাউটের টাউটামি বুদ্ধি। অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা অন্যের বউ ভাগায়ে নিয়ে চলে যাওয়া। উত্তম, অতি উত্তম। তুই এখন যা তোর মাকে নিয়ে আয়। ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার আগে তোদের দুজনের সঙ্গে কিছু গল্পগুজব করি। ললিতাও আমাদের সঙ্গে থাকুক, সেও শুনুক ঘটনা কি। ললিতাও কি ইন্ডিয়া যাইতে চাও? যাইতে চাইলে তাদের সাথে যাও। ভালো চরণদার আছে।ললিতা বলল, আমি কোনোখানে যাব না। বাবা বললেন, পাছায় লাথি পড়লে উড়াল দিয়া যাবি। লাথি পড়ে নাই বইলা যাইতে চাস না।আমরা চারজন বসে আছি। বাবার হাতে চায়ের কপি। ললিতার মুখ হাসি হাসি। আমার মা সবুজ শাড়ি পরেছেন। তার হাত ভর্তি সবুজ চুড়ি। কী সুন্দর যে তাকে দেখাচ্ছে! যেন স্বর্গের ইন্দ্রাণী।

বাবা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, তুমি তোমার টাউট ভাইয়ের সঙ্গে বর্ডার ক্রস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ বলে তোমার পুত্রের কাছে শুনলাম। ছেলেকে সঙ্গে না নেওয়া তোমার জন্য উত্তম হবে। কারণ তোমার টাউট ভাই পরে তোমাকে কুমারী বলে বিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করবে। পুত্র সঙ্গে থাকলে সমস্যা। আমি উপদেশ দেব তোমার ছেলেকে রেখে যেতে। তারপরও যদি তাকে সঙ্গে নিতে চাও আমার আপত্তি নাই। তোমাদের দুজনের উপর আমি অনেক অত্যাচার করেছি। তোমরা মুক্তির চেষ্টা নিবে এটাই স্বাভাবিক।মা চমকে তাকালেন। তার চোখে সংশয়। বাবার কথা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছেন না। তিনি একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছেন, একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন।

বাবা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে মা-পুত দুইজনেই যাও। কিছুদিন থাকে। যদি আমার জন্যে মন কাঁদে পত্র দিব। আমি নিয়া আসব। মন কাঁদার কোনো কারণ অবশ্য নাই।বাবা আরেকটা বিড়ি ধরালেন। ধোয়া টেলে কায়দা করে ললিতার মুখে ধোয়া ছাড়লেন। ললিতা চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, কী যে টং করেন।বাবা বললেন, আমার কথা যা বলার বলেছি। তোমার ভাইকে কয়েকবার টাউট বলেছি। কাজটা ঠিক হয় নাই। তিনি তোমার বড় ভাই, কাজেই বয়সে ছোট হলেও আমার গুরুজন। তাছাড়া সে টাউটও না। বোনের প্রতি তার মমতা আছে। যা-ই হোক, দহগ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা আমি করে দেব। আমার পরিচিত একজন আছে, সে জিপ কিনেছে। জিপে করে চলে যাবে। ঠিক আছে?

মা ক্ষীণস্বরে বললেন, ঠিক আছে।মন খোশ হয়েছে? হুঁ।তাহলে যাও, পাকশাক করো। তোমার হাতের রান্ধা ভালো। ললিতা মাগী বঁধতে পারে না। এইটাই সমস্যা।মা উঠে চলে গেলেন, ললিতা আমাকে নিয়ে মাছ মারতে বের হলো। সে আজ চাড় ফেলে মাছ ধরবে। কোনো এক নামকরা বলেকে দিয়ে সে মাছের চাড় বানিয়ে এনেছে। কাগজে করে মাছবন্ধন মন্ত্রও লিখে এনেছে। এই মন্ত্র তিন বার পড়ে বড়শিতে ফুঁ দিলেই মাছ বড়শি গেলার জন্য দিশাহারা হয়ে ছুটে আসবে।চার ফেলে পুকুরঘাটে আমার দুজুন বসে আছি। ললিতা পড়তে জানে না। কাজেই আমি কাগজে লেখা মন্ত্র তিন বার পড়ে বড়শিতে ফু দিলাম

আজা বাজা

মাছের পুত লাজা।

কালির মন্ত্র হুঙ্কার

আলি দিলেন টুঙ্কার।

বড়শি বলে আয়

দুনিয়ার মাছ ধরা খায়।

বড়শি ফেলে ললিতা বসে আছে। সে বলল, এখন কি মনে হয় তোর বাপ খুব ভালো মানুষ? আমি বললাম, হু।ললিতা বলল, যে মন্দ সে সবসময় মন্দ। একজন মন্দ মানুষ হঠাৎ হঠাৎ ভালো হয় না। এক মন্দ মানুষ আরেক মন্দ মানুষরে চিনে। আমি মন্দ, আমি তোর বাপরে চিনি। তোর বাপের খারাপ কোনো মতলব আছে।কী খারাপ মতলব? সেটা বুঝতেছি না। এখন কথা বন্ধ। মাছ বড়শিতে ঠোকরাইতাছে। একদম চুপ।নতুন চাড়ের গুণেই হোক বা মন্ত্রের কারণেই হোক ললিতা বিশাল এক কাতল মাছ ধরে বিকট চিৎকার করতে লাগল, পাইছিরে পাইছি। আইজ তোরে পাইছি।

ললিতার হইচই এবং তীক্ষ্ণ স্বরের চেঁচামেচিতে বাবা পুকুর পাড়ে উপস্থিত হলেন এবং বিস্মিত হয়ে বললেন, করছে কী! কত বড় মাছ ধরেছে। এই মাছ আমি পাকাব। মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট। ঘরে মুগডাল কি আছে? বাবা উঠানের চুলায় নিজেই মাছ রান্না করলেন। ললিতা এবং মা দুজনেই তার পাশে বসা। তারা রান্নায় সাহায্য করছেন। দেখে মনে হচ্ছে অতি সুখী পরিবার। বাবা ললিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা গীত গাও। ললিতা বলল, আমি গীত জানি না।বাবা ধমক দিয়ে বললেন, মাগী তরে গাইতে বলছি গী। তুই যে কাননবালা না এইটা আমি জানি।

ললিতা গানে টান দিল,

আমি কই যাব, কারে শুনাব

আমার মনের দুষ্কের কথা রে …

ললিতা বাড়িতে এলে আমাকে নিয়ে রাতে ঘুমাতেন। সেই রাতে ব্যতিক্রম হলো। বাবা সন্ধ্যারাতে মাকে ডেকে নিয়ে বললেন আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে ঘুমাও। চলে যাচ্ছি আর তো দেখা পাব না। বাকি জীবন কার না কার সঙ্গে ঘুমাবে। ভালো কথা, তোমার ছেলে কি একা ঘুমাতে পারবে? যদি ভয় পায় ললিতাকে বলি তার সঙ্গে ঘুমাতে।

মা বললেন, সে একা ঘুমাতে পারবে।আমি একাই ঘুমাতে গেলাম। শেষরাতে বিকট হইচই এবং কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙল। ললিতা আমার ঘরে ঢুকে হাত টেনে আমাকে বিছানায় তুলতে তুলতে বলল, সর্বনাশ হইছে গো। তোমার মা ফাঁস নিছে। তোমার বাপের সঙ্গে নাকি কথা কাটাকাটি হইছে। তার পরে পিন্দনের শাড়ি খুইল্যা গলায় পেঁচায়া ঝুইলা পড়ছে। রাম রাম, কী সর্বনাশ!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *