নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ৫

মাইক্রোবাস যাচ্ছে, কিন্তু যাচ্ছেটা কোথায়? আমার কাছে কোনো ঠিকানা নেই। নলিনী বাবুর কাছ থেকে জানি তার স্কুলের নাম নীলগঞ্জ গার্লস হাই স্কুল। তাঁর বাবী শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য ময়মনসিংহ থেকে নীলগঞ্জ আসতেন কাজেই জায়গাটা ময়মনসিংহ জেলায়।আমি মিসির আলির মতো মাথা খাটালাম। ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম নীলগঞ্জ গার্লস হাই স্কুল কোথায়? তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঠিকানা দিলেন।সালেহ চৌধুরী বললেন, তোমার ভালো বুদ্ধি। এইভাবে ঠিকানা বের করার কথা আমার মাথায় আসে নাই।আমি বললাম, আমার বুদ্ধি মিসির আলির চেয়েও বেশি।সালেহ চৌধুরী বললেন, না হবে না। মিসির আলি সাহেবের এ্যানালাইটিক্যাল রিজনিং অসাধারণ।

আমি এই ভেবে আনন্দ পেলাম যে সালেহ চৌধুরী মিসির আলিকে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে দেখছেন না। অতি বুদ্ধিমান মানুষও মাঝে মাঝে বাস্তব-অবাস্তব সীমারেখা মনে রাখতে পারেন না।নীলগঞ্জ গার্লস হাই স্কুলে উপস্থিত হলাম ঠিকই কিন্তু নলিনী বাবুকে পেলাম না। তিনি অসুস্থ। কোনো এক মানসিক রোগীদের ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। ক্লিনিকটা কোথায় পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারল না। হেডমাস্টার সাহেব বললেন, খুব সম্ভব চিটাগাংয়ে। নলিনী বাবুর এক আত্মীয় ডাক্তার। তিনি থাকেন চিটাগাংয়ে। নলিনী বাবু অসুস্থ হলে তিনিই চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

নীলগঞ্জ হাইস্কুলের ধর্মশিক্ষক বললেন, ক্লিনিকটা ঢাকায়। তিনি নাকি একবার কথায় কথায় জেনেছেন। হেডমাস্টার সাহেবের সঙ্গে কথাবার্তা যা হলো, তা এ রকম–

আমি : নলিনী বাবুর বাবা সম্পর্কে কি জানেন? শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য।

হেডমাস্টার : উনি মারা গেছেন।

আমি : মানুষ কেমন ছিলেন?

হেডমাস্টার : মৃত ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলাপ শোভন না। উনার কিছু দোষ-ত্রুটি ছিল। তবে নলিনী বাবু সর্বদোষমুক্ত মানুষ।

আমি : নলিনী বাবু সম্পর্কে বলুন।

হেডমাস্টার : বললাম না, উনি সর্বদোষমুক্ত মানুষ।

আমি : উনার অসুখ বিষয়ে বলুন।

হেডমাস্টার : মৃগী রোগ ছিল। মাথা খারাপের কিছু লক্ষণও ছিল।

আমি : নলিনী বাবুর বিশেষ কোনো কিছু কি আপনার চোখে পড়েছে?

হেডমাস্টার : না।

আমি : মাথা খারাপের কি লক্ষণ ছিল?

হেড মাস্টার : স্মরণে আসতেছে না।

আমি : তিনি অদ্ভুত কিছু দেখেন এইসব কখনো বলতেন?

হেড মাস্টার : শিক্ষার বাইরে অন্য আলাপ আমার স্কুলে নিষিদ্ধ। কারণ শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আমাদের নবিজি বলেছেন, শিক্ষার প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও।গ্রামের মানুষরা এমনিতে প্রচুর কথা বলে। বিপত্তি তখনই হয় যখন কথাবার্তার সময় একটা রেকর্ডিং ডিভাইস সামনে থাকে। হেডমাস্টার সাহেবের চোখ-মুখ শক্ত। তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার সামনে রাখা ক্যাসেট রেকর্ডারের দিকে। আমি ক্যাসেট রেকর্ডার সরিয়ে দিলাম, তাতেও লাভ হলো না।আমি তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য তাঁর হাত ধরে কোমল গলায় বললাম, হেড মাস্টার সাহেব, আপনার কাছে নলিনী বাবুর কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি?

জি না।হেকিম নামে কোনো কাঠমিস্ত্রিকে চেনেন? নলিনী বাবু বলেছিলেন সে খুব ভালো কাঠমিস্ত্রি। নলিনী বাবু তাকে দিয়ে আমার জন্যে একটা ইজি চেয়ার বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।হেকিম নামে আমি কাউকে চিনি না। আপনি ছোট বাজারে খোঁজ নেন।ছোট বাজার বড় বাজার সব বাজারেই গেলাম। হেকিম নামে কোনো কাঠমিস্ত্রির সন্ধান পাওয়া গেল না। সন্ধান পেলে তার কাছ থেকে কিছু জানা যেত।সুলতানা বেগম নামে দশম শ্রেণী খ শাখা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীটির খোঁজ করার চেষ্টা করলাম সে নীলগঞ্জে নেই। তার বিয়ে হয়ে গেছে। সে স্বামীর সঙ্গে আছে। স্বামী খুলনার মংলা পোর্টে আছে।সুলতানার ছোট বোনের নাম আফসানা। আমি তার কাছেও গেলাম। আমাকে দেখে কোনো কারণ ছাড়াই ভয়ে অস্থির হয়ে গেল। আমি বললাম, আফসানা তুমি কি আমাকে চেনো?

আফসানা বলল, আমি আপনাকে চিনি না। আমি গল্পের বই পড়ি না।আমি বললাম, তুমি যে আমাকে চেনো না বললে এটা ঠিক না। তুমি বলেছ তুমি গল্পের বই পড়ে না। যে আমাকে চেনে না তার জানার কথা না যে আমি গল্প লিখি। এখন বলো তুমি কি নলিনী বাবুকে চেনো? নাকি তাকেও চিনো না? আফসানা মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম, নলিনী বাবু কি তোমাদের বাড়িতে কখনো এসেছেন। তোমার বড় আপার কাছ থেকে গল্পের বই নিতে বা বই ফিরত দিতে।আফসানী বলল, কোনোদিন আসেন নাই। কেউ যদি এই কথা বলে সে শত্রুতা করে বলেছে।আফসানার সঙ্গে আর কথা বলা বৃথা আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম।

নলিনী বাবু বিষয়ে আমি কোনো নতুন তথ্যই পেলাম না। তার বাড়ি দেখতে গেলাম। বাড়ি একজন কেয়ারটেকার দেখাশোনা করে, তার নাম রামচন্দ্র। সে খুব আগ্রহ নিয়ে তালা খুলে বাড়িঘর দেখাল। তার অতিরিক্ত আগ্রহের কারণ আমার কাছে স্পষ্ট হলো না। একটু পরপর বলছে, রাতে একটু সেবা নিবেন। সেবা নেওয়ার অর্থ যে রাতে ডিনার করতে হবে তা বুঝতেও অনেক সময় লাগল।নলিনী বাবুর বাড়িতে রাতে সেবা নিলাম। সেবা না নিলেই ভালো হতো। তার প্রতিটি খাবারই অখাদ্য। মুরগি রান্না করেছে। লবণ যতটুকু প্রয়োজন তার তিনগুণ দিয়েছে। অতিরিক্ত লবণ সে পুষিয়ে দিয়েছে ডাল এবং সবজিতে। সেখানে একেবারেই লবণ নেই।

রাতেই ঢাকায় ফিরে যেতে চাচ্ছিলাম, মাইক্রোবাসের ড্রাইভার বলল, গাড়ির চাকা পাংচার হয়েছে। স্পেয়ার চাকায় হাওয়া নাই। নেত্রকোনা থেকে চাকা ঠিক করিয়ে আনতে হবে।বাধ্য হয়ে নলিনী বাবুর বাড়িতেই রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত নিলাম। রামচন্দ্রকে খুবই আহ্লাদিত মনে হলো।রামচন্দ্র পান নিয়ে এসেছে। আমি পান চিবাচ্ছি, সিগারেট টানছি। রাতের কুৎসিত খাবারের দুঃখ ভুলার চেষ্টা করছি তখন রামচন্দ্র ভয়ঙ্কর এক গল্প ফাঁদল। আমার শরীর কেঁপে উঠল। একবার নলিনী বাবুর বাবা তার শিশুপুত্রকে শায়েস্তা করার জন্য কুয়ার ভেতর ফেলে দিয়েছিলেন। অনেক ঝামেলা করে তাকে কুয়া থেকে উদ্ধার করা হয়।আমি বললাম, তখন নলিনী বাবুর বয়স কত?

চার-পাঁচ বছর।

এরপরই তার মধ্যে মৃগী রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

তুমি কতদিন এই বাড়িতে আছ?

দিনের হিসাব তো করি নাই। মেলা দিন ধইরা আছি। ত্রিশ-চল্লিশ বছর হইতে পারে। আমার স্ত্রী-পরিবার সব ইন্ডিয়াতে চলে গেছে। আমি পইরে আছি।কেন? বাড়িটার উপরে মায়া চইলা আসছে এইজন্যে। মায়া কঠিন জিনিস। এই বাড়ির কুয়াতে ভূত আছে। ভুতের জন্যে মায়া।সালেহ চৌধুরী বললেন, ভূতের জন্য মায়া মানে কী? রামচন্দ্র জানালা দীর্ঘদিন কোনো পশু-পাখির সঙ্গে বাস করলে তার জন্যে মায়া জন্মে। একইভাবে দীর্ঘদিন কোনো ভূতের সঙ্গে বাস করলে ভূতের প্রতি মায়া জন্মে।আমি বললাম, ভূতটা কুয়ায় বাস করে?

রামচন্দ্র বলল, হুঁ। স্যারের স্ত্রী কুয়াতে ঝাঁপ দিয়া পইড়া মারা গেছিলেন। তারপর থাইকা ভূত হইয়া কুয়ায় বাস করেন।আমি বললাম, নলিনী বা আমাকে বলেছিলেন, তার মা ফাঁস নিয়ে মারা যান।রামচন্দ্র বলল, ছোট স্যার পেরায়ই উল্টাপাল্টা কথা বলেন। আমারে পেরায়ই ডাকেন বড় মামা। আমি তো উনার মামা না। আপনারা কি ভূতের আলামত কিছু দেখতে চান? কী আলামত দেখাবে? কুয়াতলায় বইসা থাকবেন, রাইত গভীর হইলে শুনবেন, কুয়ার ভিতরে কেউ সাঁতার কাটতাছে। ভাগ্য ভালো থাকলে তার কথা শুনবেন।তুমি শুনেছ?

অনেকবার শুনেছি। ছোট স্যার যখন চিকিৎসার জন্যে ঢাকা যায়, তখন কুয়ার পাড়ে আমি যতবার বসছি, ততবারই উনার কথা শুনেছি।কী কথা? উনি বলেন, ও চন্দ্র! আমার ছেলে কই? তাকে একলা কেন ছাড়লি। তুই কেন সাথে গেলি না? তোমাকে চন্দ্র ডাকে? রামচন্দ্র ডাকে না? ভূত মুখে রামনাম নিতে পারে না। এই জন্য চন্দ্র ডাকে।এক সমস্যা জানতে এসে আমরা ভূত সমস্যায় জড়িয়ে পড়লাম। কুয়ার পাড়ে বসে ভূতের কথা শোনার অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার অর্থ হয় না। সঙ্গে ক্যাসেট রেকর্ডার আছে। রেকর্ডার চালু থাকবে। ভূত কোনো কথা বললে রেকর্ড হয়ে যাবে। বন্ধু-বান্ধবদের ভূত্রে গল্প শোনানোর সময় ভূতের কণ্ঠস্বর শুনিয়ে দেব।

কুয়াতলাটা সুন্দর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একটু দূরে প্রকাণ্ড কাঁঠাল গাছ। গাছের ডালপালা কুয়ার ওপর পর্যন্ত চলে এসেছে। আমি এবং সালেহ চৌধুরী কুয়ায় হেলান দিয়ে বসেছি। পঞ্চমীর চাঁদের আলো কাঁঠাল গাছের পাতা ভেদ করে আমাদের গায়ে পড়ে অদ্ভুত সব নকশা তৈরি করছে। দূরে কোথাও কামিনী ফুলের ঝাক আছে। বাতাসে মাঝে মাঝে ফুলের সৌরভ ভেসে আসছে। সারাক্ষণ এই গন্ধ নাকে লাগলে ভালো লাগত না। মাঝে মাঝে গন্ধ পাচ্ছি বলে ভালো লাগছে।আমরা কেউ কোনো কথা বলছি না। কারণ, ক্যাসেট প্লেয়ার চালু আছে। ভূতের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করা হবে।

সালেহ চৌধুরীর সমস্যা হচ্ছে (আমি তাকে নানাজি ডাকি), তিনি বেশিক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারেন না। কোনো না কোনো প্রসঙ্গে তার কথা বলতেই হবে। পাঁচ মিনিট পার হওয়ার আগেই তিনি বললেন, টিউবওয়েল আসার পর কুয়া উঠে গেছে। কুয়াতলা সুন্দর একটা জায়গা। টিউবওয়েলতলা বলে কিছু নেই।আমি বললাম, নানাজি চুপ করে থাকুন। ভৌতিক কণ্ঠস্বর রেকর্ড হবে।তিনি মিনিট দুই চুপ করে থেকে বললেন, কুয়াতে বালতি পড়ে গেলে আঁকশি নামের এক বস্তু দিয়ে তোলা হতো। তুমি আঁকশি দেখেছ?

আমি বললাম, আঁকশি দেখেছি। আপনি চুপচাপ বসে সিগারেট খান।তিনি সিগারেট ধরালেন। সিগারেট শেষ হওয়া পর্যন্ত চুপ করে থেকে নিজেই এক জ্বিন নামানোর গল্প শুরু করলেন। এই গল্প থেকে তাকে আর আটকানো গেল না। নানান শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে গল্প চলতেই থাকল। জিন থেকে কিভাবে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের গল্পে চলে এলেন। যুদ্ধ করতে গিয়ে কি বিপদে পড়েছেন, মিলিটারির তাড়া খেয়ে কিভাবে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়েছেন। এইসব গল্প শুরু হয়ে গেল। আমি জানি এখন আর তাঁকে থামানো যাবে না। হতাশ হয়ে ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ করে দিলাম।

নীলগঞ্জ থেকে খালি হাতেই ফেরার কথা ছিল। খালি হাতে ফিরলাম। হলুদ প্লাস্টিকের মলাট দেয়া একটা ডায়েরি নিয়ে ফিরলাম। ডায়েরি পাবার গল্প করা যেতে পারে।রাতে আমাদের দুজনের থাকার জায়গা হলো দোতলা ঘরে। প্রাচীন আমলের বড় কালো রঙের খাটে দুজনের শোবার ব্যবস্থা। রামচন্দ্র সব গুছিয়ে রেখেছে। ধোয়া চাদর, পরিষ্কার বালিশ, কোল বালিশ। নানাজি বললেন, ভালো ব্যবস্থা। আরাম করে ঘুম দেয়া যাবে। কিন্তু তিনি ঘুমের দিকে মোটেই গেলেন না। আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের এক অপারেশনের গল্প শুরু করলেন। এই গল্প আগেও কয়েকবার শুনেছি। একবার যখন শুরু হয়েছে আবারও শুনতে হবে। উদ্ধার পাবার পথ দেখছি না। নানাজি যখন গল্পের এক ফাকে রামচন্দ্রকে বললেন, ফ্লাস্কে করে চা দেয়া যাবে?

তখন আমি পুরোপুরি হতাশ হয়ে গেলাম। পরিষ্কার বুঝতে পারছি নানাজি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যাচ্ছেন।আমাকে উদ্ধার করল রামচন্দ্র। সে ফ্লাস্ক ভর্তি চা নিয়ে এসে বলল, আমি যে ঘরে আগে ঘুমাইতাম সেইখানে একটা পেততুনি থাকে। এই কারণে দোতলায় আর থাকি না।আমি নামাজিকে বললাম, পেততুনি যে ঘরে থাকে সেই ঘরটা একটু দেখে আসি। তারপর আপনার গল্পের বাকিটা শুনব।নানাজি বললেন, পেততুনির ঘর দেখার কি আছে?

আমি বললাম, যাব আর আসব। আপনি সিগারেট ধরান। আপনার সিগারেট শেষ হবার আগেই আমি উদয় হব।পেততুনির ঘর দোতলার শেষ মাথায়। গুদাম ঘর টাইপ। দুনিয়ার জিনিসপত্রে ঠাসা। কোনোমতে একটা চৌকি বসানো। চৌকির উপর পাটি বিছানো। পাটির উপর ঢাকনা দেয়া মটকি। সেখান থেকে মিষ্টি গন্ধ আসছে। বেশ বড়সড় আলমারি আছে। যার বেশিরভাগ কাচই ভাঙা। ভাঙা কাচের ভেতর দিয়ে কিছু বইপত্র দেখা যাচ্ছে। পঞ্জিকা, রামায়ণ, গীতাভাষ্য ধরনের বই। একটি বাড়িতে কি ধরনের বই পাঠ করা হয় তা থেকে বাড়ির বাসিন্দাদের মানসিকতা আঁচ করা যায়। আমি হারিকেন হাতে বইয়ের সংগ্রহের দিকে এগিয়ে গেলাম। রামচন্দ্র ধারা বর্ণনার মতো পেততুনি বিষয়ে বলে যেতে লাগল।স্যার পেততুনি কি জানেন? না।

অল্পবয়েসি মেয়ে ভূত। মেয়ে ছেলের যত বদমাইশি থাকে এরারও তাই থাকে। এই যে মুটকি দেখতেছেন, এর ভিতরে আছে রসা। রসা বুঝেন স্যার? খেজুর গুড়ের রস। পেততুনিটা রেজি রাইতে আইসা রসা খায়। খায় আর খিকখিক কইরা হাসে।রামচন্দ্র বকরবকর করে যাচ্ছে আর আমি বই ঘাটছি। তখনই হলুদ মলাটের একটা ডায়েরি পাওয়া গেল। পুরোটাই ইংরেজিতে লেখা। মাঝে মাঝে বাংলায় নোট। ডায়েরির প্রথম পাতায় বড় বড় করে লেখা–Dream Analogy. লেখক N. Vattachary, এই N. Vattacharyaই কি আমাদের নলিনী বাবু? আমি রামচন্দ্র এই ডায়েরিটা কি নলিনী বাবুর?

জানি না স্যার। তারপর শুনেন ঘটনা, এক রাইতের ঘটনা শুনেন। আমি শুইয়া আছি, হঠাৎ বুঝলাম কেউ একজন আমার পায়ে হাত দিছে। ঠাণ্ডা হত। চিকন আঙ্গুল। আমি তো চমকায় উঠলাম। বুঝছি পেততুনির খেলা। এখন করব কি ভাইবা পাইতাছি না। ঝাপটায়া ধরব? ঝাপটায়া ধরলে পেতৃতুনি কি করে তাও জানি না। স্যার আমার বিপদ বুঝতেছেন? আমি রামচন্দ্রের বিপদ বুঝতে না পারলেও নিজের বিপদ পরিষ্কার বুঝতে পারছি। নানাজির সঙ্গে থাকলে সারারাত মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশনের গল্প শুনতে হবে। আর রামচন্দ্রের সঙ্গে থাকলে শুনতে হবে পেতনির গল্প। আমাকে ঠিক করতে হবে আমি কি শুনতে চাই।

ব্যক্তিগত ডায়েরির প্রতি আমার আকর্ষণ আছে। তবে সেই সব ডায়েরি যা একদিন প্রকাশিত হবে ভেবে লেখা হয়নি। যেমন আনা ফ্রাংকের ডায়েরি।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা নিয়ে অনেক লেখকের ব্যক্তিগত ডায়েরি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি আমি মন দিয়ে পড়েছি। অনেক বার ধাক্কার মতো খেয়েছি। ডায়েরি পড়তে গিয়েই বুঝেছি বিষয়টা বানানো। একটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করছি।আজ … তারিখ বৃহস্পতিবার। বাসায় গরুর মাংস রান্না হয়েছে। আমার মন বিক্ষিপ্ত বলে না খেয়ে শুয়ে আছি। রেডিও পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার ভাষণ শুনে মন আরো খারাপ হলো। মন ঠিক করার জন্য ডায়েরি লিখতে বসেছি। কি লিখলে মন ভালো হবে তাও বুঝতে পারছি না।

এইটুকু পড়ে কি করে বুঝলাম বানানো? কারণ ঐ তারিখে ইয়াহিয়া খান বেতারে কোনো ভাষণ দেননি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কারণ আমি প্রতিদিনকার ঘটনা আলাদা করেছি।এন ভট্যাচারিয়ার ডায়েরিতে ফিরে যাই। এন যে নলিনী বাবু তা বোঝা যাচ্ছে। ডায়েরির লেখাগুলি অত্যন্ত গোছানো। বেশিরভাগ ইংরেজি ভাষায় লেখা। আমি ভাষান্তর করেছি। প্রতিটি লেখার আলাদা শিরোনাম আছে। যেমন–

মুদ্রিত স্মৃতি

(Imprint memory)

কিছু স্মৃতি মস্তিষ্কে জন্মের পর পর তৈরি হয়। আগে থাকে না। হাঁসের বাচ্চার মুদ্রিত স্মৃতি হচ্ছে–চলমান বস্তুটি তোমার মা। জন্মের পর পর হাঁসের বাচ্চা চলমান কিছু দেখলেই তাকে মা মনে করে। তার পেছনে পেছনে চলতে থাকে।অস্ট্রিয়ান জীববিজ্ঞানী কোনরাড লরেঞ্জ এই নিয়ে চমৎকার একটি পরীক্ষা করেন। ডিম থেকে বাচ্চা বের হবার পর পর তিনি চলমান বস্তু হিসেবে নিজেই আবির্ভূত হলেন। তিনি যেখানে যান, হাঁসের বাচ্চারা তাঁর পেছনে পেছনে যায়। তিনি পানিতে নামলে হাঁসের বাচ্চারাও তাঁর সঙ্গে পানিতে নামে। লরেঞ্জ তখন হাঁসের বাচ্চাদের মাকে উপস্থিত করলেন। বাচ্চারা ফিরেও তাকাল না। তারা লরেঞ্জের পেছনে পেছনেই ঘুরতে থাকল।

টিকা

প্রকৃতি হাঁসের বাচ্চাদের চলমান বস্তুকেই মা ভাবতে শিখিয়েছে কারণ হাঁস নিজে তা দিয়ে ডিম ফুটায় না। মুরগিকে এই কাজটা করতে হয়।

ডায়েরি পড়ে আমি নিজে খানিকটা চমকালাম কারণ আমি নিজেও জানতাম না যে হাঁস ডিমে তা দেয় না। হাঁসও যে কোকিলের মতো তা জানা ছিল না। নাগরিক লেখকরা গ্রামবাংলার অনেক সাধারণ তথ্যই জানেন না।

ডায়েরির লেখক ষয়েই লিখে গেছেন। আরেকটা উদাহরণ দেই।

সহজাত স্মৃতি

পাখিকে বাসা তৈরি করতে শেখাতে হয় না। মাকড়সাকে জাল বুনতে শেখাতে হয় না। এইমাত্র ডিম ফুটে বের হয়েছে মুরগির ছানারা তাদের গায়ে বা আশেপাশে উড়ন্ত শিকারি চিলের ছায়া দেখলে ভয়ে চেঁচাতে থাকে। অথচ তাদেরকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি শিকারি চিলের ছায়া কেমন।

টীকা-১

অতি উন্নত মস্তিষ্ক হলো মানব মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কের কি সহজাত বা মুদ্রিত স্মৃতি আছে? আমার ধারণা–নেই। মানুষের সব স্মৃতিই অর্জিত স্মৃতি। নিম্নশ্রেণীর প্রাণের জন্য প্রকৃতি সহজাত এবং মুদ্রিত স্মৃতির প্রয়োজন বোধ করেছে। উচ্চশ্রেণীর প্রাণের জন্য নয়।

টীকা-২

Johanes Schmidt

এই বিজ্ঞানী ইল মাছের সহজাত স্মৃতি প্রথম আবিষ্কার করেন। ইল মাছ, মিঠাপানির মাছ। নদীতে থাকে। ডিম পাড়ার সময় গভীর সমুদ্রে চলে যায়। বারমুদা দ্বীপের কাছে শৈবাল সাগরে (Sargasso Sea) সেখানেই ডিম পড়ে। ডিম পাড়ার পর পরই তারা মারা যায়। ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বের হয় তখন তারা সমুদ্রে ভেসে উঠে এগিয়ে যেতে থাকে উত্তর দিকে। কিছু দূর যাবার পর ওরা দুদলে ভাগ হয়ে যায়। একদল যেতে থাকে উত্তর আমেরিকা থেকে কারণ তাদের মায়েরা এসেছিল উত্তর আমেরিকা থেকে। আরেক দল যেতে থাকে ইউরোপের দিকে। কারণ তাদের মায়েরা এসেছিল ইউরোপ থেকে। তারা নদী-নালায় বড় হতে থাকে। ডিম পাড়ার সময় হলে আবারও হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে শৈবাল সাগরের দিকে যাত্রা।ডায়েরি লেখকের মূল লেখক স্মৃতি বিষয়ে। RNA স্মৃতির কেরিয়ার কি-না সে বিষয়ে নানান কথা। এবং বেশ জটিল কথা।

কয়েক জায়গায় দেখলাম ভবিষ্যদ্বক্তা নস্ট্রাডেমাসের নাম। ইনি পাঁচশ বছর আগে ফ্রান্সে জন্মেছিলেন। হাজার বছরের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ লিখে গেছেন। তাঁর সব ভবিষ্যদ্বাণী ছিল চারপদের কবিতায়। এদের বলা হয় কোয়াট্রেন। কোয়াট্রেনের ভাষী বেশ জটিল এবং রূপকাশ্রয়ী।নস্ট্রাডেমাসের বেশিরভাগ ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গিয়েছে। যেমন তিনি আমেরিকা নামক দেশ আবিষ্কার হবে বলেছেন। এটম বোমার ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলেছেন। ফরাসি বিপ্লবের কথা বলেছেন।ডায়েরিতে নস্ট্রাডেমাসের একটি কোয়াট্রেন দেয়া আছে। তার পাশে বাংলায় লেখা এর অর্থ কি আমি যা ভাবছি তা?

কোয়াট্রেনটা এই–

মানুষ একজন অসংখ্য সে

যেমন এক বৃক্ষ অসংখ্য পত্র

কিছু আলো, কিছু অন্ধকার

প্রাসাদ একটি তার অসংখ্য দোয়ার

আমি ডায়েরির খানিকটা পড়ে নিশ্চিত হলাম এর লেখক আমাদের নলিনী বাবু B.Sc. হতেই পারেন না। এত ব্যাপক পড়াশোনা তার থাকার কোনো কারণ নেই। যিনি সব লেখকের একটি মাত্র বই পড়েন তাঁর পাঠাভ্যাস নেই। গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষকের হাতের কাছে বইপত্রও থাকে না।ডায়েরি নলিনী বাবুর লেখা না অন্য কোনো মানুষের লেখা এই তথ্য যে অতি সহজেই প্রমাণ করা যায় তা আমার মাথায় অনেক দিন আসেনি। আমাদের মস্তিষ্ক রহস্য সমাধানে সহজ পথে যেতে চায় না। মস্তিষ্ক নিজে জটিল বলে খুঁজে জটিল পথ।

আমার কাছে নলিনী বাবুর হাতে লেখা সংস্কৃত শ্লোকের খাতা আছে। খাতার লেখা এবং ডায়েরির বাংলা লেখা মিলিয়ে দেখলেই রহস্যের সমাধান হয়। খাতার লেখা এবং ডায়েরির লেখা মিলিয়ে দেখলাম। হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ না হয়েও যে কেউ বলবে একই হাতের লেখা। স্কুল শিক্ষক নলিনী বাবুই জটিল সব তথ্য লিখেছেন এবং ডায়েরিতে সংস্কৃতি শ্লোকও আছে। একটাই শ্লোক। জটিল প্রসঙ্গের শেষে শ্লোকটা লেখা–

ন হি সর্ববিদঃ সর্বে

আমি সংস্কৃত জানি না বলে এর অর্থ উদ্ধার করতে পারলাম না। মিসির আলি সাহেব নামে বাস্তবে কেউ থাকলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃত জানে এমন কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। আমি একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। অভিনেতা এবং আবৃত্তিকার। অনেক সংস্কৃত শ্লোক উনার মুখস্থ। তিনি হয়তো এই শ্লোকের অর্থ জানবেন। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বললেন, জীবনে প্রথম শুনলাম। অর্থ কি জানি না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *