নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

নলিনী বাবু B.Sc. পর্ব – ৬

ডায়েরি নিয়ে গবেষণার ইতি টানতে হলো। ডায়েরির পেছনে সময় নষ্ট করা কোনো কাজের কথা না। নানান কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মাঝে মাঝে নিজের মনেই উচ্চস্বরে বলি ন হি সর্ববিদঃ সর্বে। আশেপাশে কেউ থাকলে চমকে উঠে বলে, কি বললেন? আমি উত্তরে বলি, কি বলেছি নিজেই জানি না।সব মানুষের জীবনেই ছোটখাটো বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। তারা সাময়িকভাবে বিস্মিত হয় কিন্তু অতি দ্রুত ভুলে যায়। আমার জীবনে ছোট একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। আমি নুহাশ পল্লীতে। আষাঢ় মাস। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আমি আছি বৃষ্টি বিলাসে। বৃষ্টি বিলাস ঘরের চাল টিনের। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শোনার জন্য আমি বৃষ্টি বিলাসে এসেছি। প্রশস্ত বারান্দায় বসে আছি। সামনে চায়ের কাপ। কাপে চুমুক দিচ্ছি না কারণ সিগারেট নেই। সিগারেট ধরিয়ে চায়ে চুমুক দেয়া হবে। একজন সিগারেট আনতে গেছে। আমি অভ্যাস মতো হঠাৎ বললাম,

ন হি সৰ্ববিদঃ সর্বে

বিস্ময়কর ঘটনাটি তখন ঘটল। আমার হঠাৎ মনে হলো এই শ্লোকের অর্থ, সকলেই সকল বিষয় জানে না।আশ্চর্য ব্যাপার। এই অর্থ আমার মাথায় কেন এসেছে? এইটিই কি আসল অর্থ? সিগারেট চলে এসেছে। সিগারেট ধরিয়ে চায়ে চুমুক দিয়েছি তখন মোবাইল ফোন সেটে জয়ন্ত টেলিফোন করলেন। আমি ফোন ধরলাম।জয়ন্ত বললেন, আপনি একটা সংস্কৃত শ্লোকের অর্থ জানতে চেয়েছেন। অর্থটা পেয়েছি। বলব?

আমি বললাম, আমিও অর্থ পেয়েছি। আমারটা আগে শুনে দেখুন অর্থ ঠিক আছে কি না। সকলেই সকল বিষয় জানে না।জয়ন্ত বললেন, এইটাই অর্থ। ন হি হচ্ছে না।আমি কি এই শ্লোকের অর্থ টেলিপ্যাপের মাধ্যমে পেয়েছি? জয়ন্ত শ্লোকের অর্থ জেনেছেন। আমাকে জানাতে চেয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি জেনে গেছি। Entanglement থিওরি। তার মানে কি এই আমরা সবাই একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত? কিন্তু আমরা তা জানি না। যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই আধুনিক প্রযুক্তি মোবাইল ফোন সেট এসেছে।আমরা সবাই যে একে-অপরের সঙ্গে যুক্ত তার একটা গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পটা বলেই আমি নলিনী বাবু B.Sc.র মূল গল্পে চলে যাব।

আমি তখন সবে মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রির লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছি। রসায়ন বিভাগ আমাকে পাঠিয়েছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাত দিনের একটা কর্মশালা। বিষয় নিজস্ব প্রযুক্তিতে কমদামে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরি।কর্মশালা শেষ করেছি দেশে ফিরব। এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছি। আমার বিমানের টিকিট। সামান্য যে টাকা সঙ্গে আছে তা দিয়ে এয়ারপোর্টের বুক স্টল থেকে বই কিনলাম। বাচ্চাদের জন্যে এক প্যাকেট চকলেট কিনলাম।রাত তিনটায় বিমান এলো। আমার কনফার্ম করা টিকিট। আমাকে বলা হলো, বিমান ইউরোপ থেকে যাত্রী বোঝাই হয়ে এসেছে। আপনাকে নেয়া যাবে না।

আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, আমি দেশে ফিরব কি ভাবে?

পরের ফ্লাইটে ফিরবেন।

পরের ফ্লাইট কখন?

এক সপ্তাহ পর।

আমি হতাশ গলায় বললাম, ভাই আমার কাছে একটা পয়সা নাই। আমি সপ্তাহ আমি কোথায় থাকব? কি খাব?

বিমানের ম্যানেজার কঠিন মুখ করে বললেন, সেটা তো আমরা জানি।বিমান আমাকে ফেলে রেখে চলে গেল। কি ভয়ঙ্কর বিপদে যে পড়লাম তার বিবরণ দিতে চাচ্ছি না। পাঠক নিশ্চয় কল্পনা করতে পারছেন।আমি যে মহাবিপদে পড়েছি সেই খবর আমার মায়ের জানার কোনোই কারণ নেই। তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন। অন্যদের ডেকে তুলে বললেন, আমার ছেলে মহাবিপদে পড়েছে। কি বিপদ আমি জানি না। কিন্তু সে বিরাট বিপদে আছে এটা জানি। আমি খুবই পেরেশান।আমার মা, ছেলের বিপদের কথা কিভাবে জানলেন? আমরা একেঅপরের সঙ্গে যুক্ত বলেই জানলেন।

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থাকুক গল্পে ফিরে যাই। শ্লোকের অর্থ জানার পর আষাঢ় মাসের সেই রাতে নলিনী বাবুর কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নলিনী বাবুকে খুঁজে বের করব। খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া খুব জটিল হবার কথা না। মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করা হয় এমন কোনো একটা ক্লিনিকে তিনি আছেন। ক্লিনিকটা হয় ঢাকায় আর ঢাকায় না হলে চিটাগাংয়ে। এই জাতীয় ক্লিনিকের সংখ্যা খুব বেশি হবার কথা না। বুদ্ধিমান কাউকে দায়িত্ব দিলে সে বের করে ফেলবে। দায়িত্ব দিলাম নুহাশ পল্লীর ম্যানেজারকে। তাকে বললাম, সাত দিনের মধ্যে নলিনী বাবুকে খুঁজে বের করতে হবে।

বুলবুল বলল, স্যার এটা কোনো ব্যাপার না। আমি কাল ভোরেই ঢাকা চলে যাব।দ্বিতীয় দিনে মাথায় বুলবুল জানাল নলিনী বাবুর খোজ পাওয়া গেছে। নলিনী বাবুর অবস্থা ভালো না। তিনি কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কাউকে চেনেন না। আপনার কথা বলেছি। আপনাকে চিনতে পারেন নাই। স্যার! আপনি কি আসবেন?আমি বললাম, কয়েকটা দিন পার হোক। ভদ্রলোক যখন কিছুটা স্বভাবিক হবেন তখন আসব। তাঁকে স্বাভাবিক করার দায়িত্ব তোমার।

নলিনী বাবু যে ক্লিনিকে আছেন সেটা ঢাকা শহরে। সঙ্গত কারণেই ক্লিনিকের নাম বলছি না।সকাল দশটার দিকে ম্যানেজার বুলবুলকে নিয়ে আমি ক্লিনিকে ঢুকলাম। মনে হলো মিনি জেলখানায় ঢুকেছি। কয়েকটা কলাপসিবল গেট। ভেতরে-বাইরে জেলখানার প্রহরীর মতো দারোয়ান। একজন দারোয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে সে বডি বিল্ডার। মিস্টার বাংলাদেশ হবার চেষ্টায় আছে।এই দারোয়ানের গায়ে লাল রঙের গেঞ্জি। তার হাতে লাঠি।

ক্লিনিকের প্রধান (ধরা যাক তার নাম আলিফ, ডা. আলিফ) অতি কৃশকায় মানুষ। মুখের তুলনায় বেমানান গোফ রেখেছেন। কলপ দেয়া মাথার চুল চকচক করছে। গোঁফে কলপ দেয়া হয়নি তবে মেহেদি দেয়া হয়েছে। গোঁফ লাল-সাদা। তার চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। তার প্রধান কাজ চশমাটা খানিকটা নাকের সামনে এগিয়ে আনা এবং পেছানো। ভদ্রলোককে আমার মানসিক রোগী বলে মনে হলো। আমি নলিনী বাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই শুনে তিনি বললেন, কেন দেখা করতে চান? আমার দিকে তাকিয়ে বললেন না, জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন।আমি বললাম, নলিনী বাবু আমার পরিচিত। রোগীর সঙ্গে দেখা করার নিয়ম নিশ্চয়ই আছে।নিয়ম নাই।নিয়ম নাই মানে? কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না? না।কারণটা ব্যাখ্যা করবেন?

মানসিক রোগীদের আলাদা রাখা হয়। আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত জনদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের সমস্যা হয়। তাদের যে আলাদা করা হচ্ছে এটাও চিকিৎসার একটা অংশ।আমি বললাম, ভাই আমি পাঁচ মিনিট থেকে চলে যাব।ডা. আলিফ চশমা আগ-পিছ করতে করতে বললেন, সম্ভব না। সম্ভব না। সম্ভব না।নলিনী বাবুর যে আত্মীয় চিকিৎসার খরচ দিচ্ছেন তার ঠিকানাটা কি পেতে পারি? না।

না কেন? মানসিক রোগী এবং তার আত্মীয়স্বজনদের সব ইনফরমেশন ক্লাসিফায়েড।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, ম্যানেজার বুলবুল আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, স্যার আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খান আমি ব্যবস্থা করছি।ম্যানেজার কিভাবে কি করল আমি জানি না। নলিনী বাবুর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল। বডি বিল্ডার দারোয়ানকে সঙ্গে নিয়ে আমি নলিনী বাবুর ঘরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

রট আয়রনের খাটে নলিনী বাবু বসা। তার দুই হাত খাটের সঙ্গে বাঁধা। তিনি হাঁ করে আছেন। তাঁর মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। তার চোখ রক্তবর্ণ। নলিনী বাবুর সামনে মেলামাইনের একটা থালায় দুটা রুটি। একটা বাটিতে খানিকটা ডাল। একটা সিদ্ধ ডিম। ডালের বাটিতে ভনভন করে মাছি উড়ছে।আমি বডি বিল্ডারকে বললাম, মনে হচ্ছে উনাকে সকালের নাশতা দেয়া হয়েছে। হাত বাঁধা অবস্থায় উনি খাবেন কি করে? বডি বিল্ডার বলল, খাওয়া মুখে তুলে দেওয়ার লোক আছে।ইনার হাত বাঁধা কেন? রোগী ভায়োলেন্ট। মারতে আসে। এই জন্যই বাঁধা।রাতে যখন ঘুমান তখনো কি হাত বাঁধা থাকে? রাতে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ায় দেই। হাত বান্ধার প্রয়োজন পড়ে না। এক ঘুমে রাইত পার।কি ইনজেকশন দেন? সেটা ডাক্তার সাব জানে। আমি কি জানি? আপনার হাতে লাঠি দেখতে পাচ্ছি। আপনি কি লাঠি দিয়ে মারধোর করেন?

প্রয়োজনে করতে হয়। ধরেন একজন রোগী আপনার উপর ঝাপ দিয়া পড়ল। আপনি কি করবেন? মাইর খাবেন না মাইর দিবেন? বুঝেন না কেন এরা সাধারণ রোগী না, এরা মেন্টাল কেইস। আপনার কথা যা বলার তাড়াতাড়ি বলেন। মেন্টাল রোগীর সামনে বেশিক্ষণ থাকার নিয়ম নাই।আমি নলিনী বাবুর সামনে দাঁড়ালাম। তিনি চোখ তুলে তাকালেন।নলিনী বাবু আপনি কি আমাকে চিনেছেন? নলিনী বাবু জবাব দিলেন না। বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলেন।আমি যদি আপনাকে এখান থেকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করি আপনি কি যাবেন? এইবার নলিনী বাবু হ্যাসূচক মাথা নাড়লেন। আমি ঘর থেকে বের হয়ে ডা. আলিফের কাছে গেলাম। তাঁকে বিনীতভাবে বললাম, আমি যদি নলিনী বাবুকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাই আমাকে কি করতে হবে?

ডা. আলিফ বললেন, আপনার করার কিছু নাই। রোগীর বিষয়ে তাঁর আত্মীয় সিদ্ধান্ত নিবে।সেই আত্মীয়ের ঠিকানা দিন। আমি যোগাযোগ করি আপনাকে আগে একবার বলেছি, তারপরে বলি–হে ব ফার আত্মীয়স্বজনের সব ইনফরমেশন ক্লাসিফায়েড।আমি রাগ সামলাতে না পেরে বললাম, আপনার এখানে কি নিউক্লিয়ার এনার্জি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে যে সনফরমেশন ক্লাসিফায়েড?

ম্যানেজার কানে কানে বলল, স্যার চলে আসেন। জায়গা ভালো না। আগে বের হই।পাশের একটা ঘর থেকে গোঁ গোঁ শব্দ হওয়া শুরু করল। গোঁ গো শব্দের সঙ্গে হুটোপুটি; ঝনঝন শব্দে কিছু একটা ভাঙল। লাল গেঞ্জি দ্রুত সেখানে গেল। আমি চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। মেয়ে গলায় চিৎকার–মারবেন না। খবরদার গায়ে হাত তুলবেন না।এত কিছুতেও আমার সামনে বসা ডাক্তার আলিফের কোনো ভাবান্তর হচ্ছে না। তিনি একটা ইংরেজি খবরের কাগজ চোখের সামনে ধরে আছেন।পাশের কামরার মেয়েটি বিকট আর্তচিৎকার করল। সেই শব্দে ডা. আলিফ মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজ নামিয়ে আমাকে বললেন, আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

আমি আর থাকা সমীচীন মনে করলাম না।বাংলাদেশ খুবই ছোট একটা জায়গা। ছোট জায়গার বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে সবাই সবাইকে চেনে। মুদির দোকানদারও কোনো না কোনো সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরিচিত। যে আইসক্রিমের গাড়ি নিয়ে বের হয় তারও আত্মীয়ের আত্মীয় পুলিশের ডিআইজি বা আইজি।আমিও অনেককে চিনি তবে তারা গুরুত্বপূর্ণ কেউ না। ট্রাকের পেছনে লেখা থাকে একশ এক হাত দূরে থাকুন। আমি গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের ট্রাকের মতো মনে করি। তাদের কাছ থেকে একশ এক হাত দূরে থাকি। এতে তারাও ভালো থাকেন, আমিও ভালো থাকি।

সমস্যা হয় যখন গুরুত্বপূর্ণ কাউকে প্রয়োজন পড়ে। এখন যেমন পড়েছে। নলিনী বাবুকে জেলখানা থেকে উদ্ধার করতে হবে। আমার পক্ষে তা সম্ভব না। গুরুত্বপূর্ণ কাউকে দরকার। পরামর্শের জন্য আমি ধানমণ্ডি থানার ওসি কামরুল সাহেবকে খবর পাঠালাম।তিনি একজন শখের অভিনেতা। আমার কিছু নাটকে অভিনয় করেছেন। একই সঙ্গে শখের সম্পাদক। হাতে কিছু টাকা-পয়সা জমলে পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকার নাম–সোনা রঙ। এই ভদ্রলোক কিছু দিন পর পর আমার কাছে আসেন এবং বিনীত ভঙ্গিতে বলেন, স্যার একটু দোয়া নিতে এসেছি। দোয়া করে দেন।

ওসি কামরুল খবর পেয়েই উপস্থিত হলেন। এবং বললেন, স্যার কি আদেশ।আমি বললাম, আদেশ না, অনুরোধ। আমার একটা ইনফরমেশন দরকার। ইনফরমেশনটা হচ্ছে–পুলিশের কোনো কর্তাব্যক্তি কি আছেন যিনি হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েন। যার কাছে এই লেখকের কিছু গুরুত্ব আছে। যাকে লেখক কোনো অনুরোধ করলে তিনি রাখবেন।কি অনুরোধ করতে চান স্যার? আমি নলিনী বাবুর ঘটনাটা বললাম। তাঁকে ক্লিনিক থেকে বের করা দরকার এটা জানালাম।ওসি কামরুল বললেন, নলিনী বাবুকে বের করার জন্য আইজি, ডিআইজি লাগবে কেন? অধম কামরুলকে আপনার যথেষ্ট মনে হয় না? তাঁকে কি আপনার এই উত্তরার বাসায় নিয়ে আসব?

না তাকে নুহাশ পল্লীতে নিয়ে আসতে হবে। এখানে অসুস্থ মানুষটার দেখাশোনার কেউ নাই। নুহাশ পল্লীতে অনেকেই আছে। তাকে দেখে-শুনে আসবে।ওসি সাহেব চলে যাওয়ার তিন ঘণ্টার মাথায় নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার জানাল, কিছুক্ষণ আগে নলিনী বাবুকে ওসি সাহেব নুহাশ পল্লীতে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। নলিনী বাবু ভালো আছেন।আমি বললাম, ভালো আছেন বলতে কি বুঝাচ্ছ? উনি কথা বলেছেন।কি কথা? আমাকে বলেছেন, স্নান করব। আমি ব্যবস্থা করেছি। গরম পানি দিয়ে আমি নিজে গোসল দিব।ডাক্তার এজাজকে খবর দাও। একজন ডাক্তারের পাশে থাকা দরকার।স্যার আপনি বলার আগেই আমি ডাক্তার সাহেবকে খবর দিয়েছি। উনি আধাঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন। আপনি কি আসবেন?এখন আসব না। উনার শরীর একটু সারুক। কথা বলা শুরু হলে আসব।

নুহাশ পল্লীর দিঘীতে দুটা ঘাট আছে। একটা পুরানো ঘাট, নাম জাপানি ঘাট কারণ জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রী এই ঘাট বানানোয় সাহায্য করেছিল।আরেকটা ঘাটের নাম চন্দ্র ঘাট। এই ঘাট পুরোটাই শ্বেতপাথরের। চাঁদের আলো শ্বেতপাথরে পড়লে শ্বেতপাথর থেকে জোছনার মতো আলো বের হয় বলেই চন্দ্র ঘাট।নলিনী বাবু চন্দ্র ঘাটে বসে আছেন। আকাশে চাঁদ। চাদের আলোয় এবং ঘাট থেকে প্রতিফলিত আলোয় তিনি ঝলমল করছেন। আমি তার সামনে বসলাম। ক্লিনিক থেকে ছাড়া পাবার পর আমি প্রথম তাকে দেখছি। ম্যানেজার বুলবুল বলেছে তিনি এখন মোটামুটি স্বাভাবিক।নলিনী বাবু আমাকে চিনতে পারছেন?

তিনি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন। আমি বললাম পরিষ্কার করে বলুন আমি কে। মাথা নাড়ানাড়ি বন্ধ।নলিনী বাবু বললেন, আপনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, কিন্তু আপনি আমার পরম আত্মীয়।এই তো আপনার মাথায় কথা ফুটেছে। ক্লিনিকে আপনার অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।তারা ঘুমের অষুধ দিয়ে মানুষকে জন্তু বানায়ে রাখতে।কত দিন পর জোছনা দেখছেন?

অনেক দিন পর। আপনি আমাকে পরম শান্তি দিয়েছেন। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।ঈশ্বর বিশ্বাস করেন? মাঝে মাঝে করি। বেশিরভাগ সময় করি না।এই মুহূর্তে করছেন? না।রাতের খাবার খেয়ে সকাল সকাল শুয়ে পড়ুন। কাল সকালে আপনার সঙ্গে কথা হবে।আপনি যদি কিছু মনে না করেন রাতটা কি আমি ঘাটে শুয়ে কাটাতে পারি?

অবশ্যই পারেন। আমি একজনকে বলে দিচ্ছি সে আপনার সঙ্গে থাকবে।একা থাকতে চাচ্ছি।একা আপনাকে থাকতে দেব না। নুহাশ পল্লীর একজন স্টাফ দূর থেকে আপনার উপর লক্ষ রাখবে আপনি তার অস্তিত্বই টের পাবেন না।নলিনী বাবুকে রেখে আমি চলে এলাম। রাতে তার ডায়েরি পড়ে শেষ করব। যদি ব্যক্তিগত কিছু পাওয়া যায়।ডায়েরিতে কিছুই পাওয়া গেল না। সবই থিওরির কচকচানি। এক জায়গায় পাওয়া গেল–সীতার অনেক জ্বর। শরীর ভয়ঙ্কর খারাপ করেছে। সারা গায়ে গুটি গুটি বের হয়েছে। মনে হচ্ছে হাম। হাম জীবাণুঘটিত ব্যাধি। পাঁচশ বছর আগে নস্ট্রডেমাস জীবাণুর কথা বলেছেন। তিনি জীবাণুর আবিষ্কার যে লুই পাস্তুর করবেন তাও বলে গেছেন।লাল কালি দিয়ে আন্ডার লাইন করা কিছু অংশ পাওয়া গেল। সেখানে লেখা–

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই।

সে সম্পূর্ণই নিয়ন্ত্রিত Robot.

তার নিচেই জীববিজ্ঞানী Dewitt-এর কিছু লাইন। যে বইটি থেকে লাইনগুলি নেয়া হয়েছে সৌভাগ্যক্রমে বইটা আমার পড়া বইয়ের নাম The Selfish Gene

লাইনটা হচ্ছে,

What on Earth do you

think you are? If not a robot, albeit

a very complicated one?

যার বাংলাটাও ডায়েরি লেখক করেছেন–

নিজেকে তুমি কি ভাব হে? তুমি রোবট ছাড়া

কিছু না তবে জটিল ধরনের রোবট।

ভোরবেলা চায়ের কাপ নিয়ে বের হয়েছি, নলিনী বাবুর সঙ্গে দেখা। নলিনী বাবু হেসে বললেন, সুপ্রভাত।আমি বললাম, রাত কি শেষ পর্যন্ত ঘাটেই কাটিয়েছেন? আজ্ঞে না। মশা কামড়াচ্ছিল বলে ঘরে এসে শুয়েছি।ঘুম হয়েছে? অতি সুনিদ্রা হয়েছে। ঘুমের অষুধ ছাড়াই সুনিদ্রা।চা খেয়েছেন? না।

আসুন চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প করি।আপনার সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে গল্প করব। কিন্তু চা পান করব না।আমরা দুজন লিচু বাগানের দিকে রওনা হলাম। নুহাশ পল্লীর সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হলো বাঁধানো লিচুতলা। বাঁধানো তলায় বসে গল্প করতে আমার নিজের ভালো লাগে।নলিনী বাবু! নস্ট্রডেমাসের নাম শুনেছেন? না। ইনি কে?

পাঁচশ বছর আগের ফ্রান্সের একজন চিকিৎসক। ভবিষ্যৎ বলতে পারতেন। তাঁর নাম শুনেননি? না। জীববিজ্ঞানী Dewit-এর নামও বোধ হয় শুনেননি।আজ্ঞে না। প্রথম শুনলাম।আপনার কি ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে? না। ডায়েরি লিখবেন মহামানবরা। তারা যা লিখবেন তাতেই অন্যদের জন্য চিন্তার খোরাক থাকবে। আমার মতো অভাজনরা কেন শুধু শুধু ডায়েরি লিখব? ঠিক বলেছি না?

অবশ্যই ঠিক বলেছেন।সীতাকে চেনেন? রাম লক্ষ্মণের সীতা না। আপনার পরিচিত কেউ আছে নাম সীতা।হ্যাঁ চিনি।তার কি কখনো শরীর ভয়ঙ্কর খারাপ করেছিল? গায়ে গুটি বের হয়েছিল? হাম হয়েছিল। খুব কষ্ট পেয়েছিল। আপনি কিভাবে জানেন? আমি জবাব দিলাম না। জবাব দেবার সময় আসেনি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *