নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ পর্ব – ৪

স্লোয়ান কেটারিংয়ের ডাক্তার আমার সিগারেট খাওয়া নিয়ে কিছুই বললেন না। আমি খানিকটা কনফিউজড হয়ে গেলাম। তবে কেমোথেরাপি শুরুর আগের দিন আমাকে হাসপাতালে ডাকা হলো। তারা বলল, আমার চামড়া কেটে তার ভেতর একটি নিকোটিন রিলিজিং যন্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। শরীর যখন নিকোটিনের জন্য কাতর হবে, তখন যন্ত্র নিকোটিন রিলিজ করবে। খুব ধীরে ধীরে নিকোটিনের পরিমাণ যন্ত্র কমাবে।

আমি বললাম, শরীরের ভেতর আমি যন্ত্র ঢোকাব না। সিগারেট ছেড়ে দিলাম।তারা বলল, যে দিনে ত্রিশটা সিগারেট খায়, সে সিগারেট ছাড়তে পারবে না।আমি বললাম, পারব।আশ্চর্যের ব্যাপার, পেরেছি।আমাদের বাড়ির সামনে একটি ডেইলি গ্রোসারি শপ আছে। সেখানে চা-কফি পাওয়া যায়। যখন কাউকে দেখি কফির মগ নিয়ে বাইরে এসে সিগারেট ধরিয়ে টানছে, তখন এত ভালো লাগে! মনে হয়, তারা কী সুখেই না আছে!

যারা সিগারেট ছেড়ে দেয়, তারা অতি দ্রুত সিগারেটবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। যেমন আমার বন্ধু প্রতীক প্রকাশনার মালিক, একসময়ের গল্পকার আলমগীর রহমান। সে একসময় দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট খেত। সিগারেট ছাড়ার পর আমাদের দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন আমরা সিগারেট না, কাগজে মুড়ে গুয়ের পুরিয়া খাচ্ছি।

আমার ক্ষেত্রে কখনো এ রকম হবে না। পরিচিত কাউকে সিগারেট খেতে দেখলে আমি তার পিঠে হাত রেখে বলব, আরাম করে খাও! আমি দেখি।সিগারেট প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা গল্প বলি। একবার নিউইয়র্কে তাঁর সঙ্গে এক হোটেলে উঠেছি (প্যান অ্যাম হোটেল)। দেখি, তিনি সিগারেট খাচ্ছেন না, চুরুট টানছেন। আমি বললাম, সিগারেট বাদ দিয়ে চুরুট কেন?

উনি বিরক্ত গলায় কী একটা মহিলা কলেজের নাম করে বললেন, ছাত্রীরা এই সমস্যা করেছে। সভার মাঝখানে দল বেঁধে মঞ্চে এসে বলেছে, ‘আপনাকে সিগারেট ছাড়তে হবে। মঞ্চেই কথা দিতে হবে।’ আমি বাধ্য হয়ে সিগারেট ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে চুরুট ধরেছি।আরও কিছুদিন অতিরিক্ত বেঁচে থাকার জন্য মানুষ অনেক কিছু ত্যাগ করে। মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ কী? গলিত স্থবির ব্যাঙও নাকি দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে। অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

আমি কখনো অতিরিক্ত কিছুদিন বাঁচার জন্য সিগারেটের আনন্দ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ভেবে রেখেছিলাম ডাক্তারকে বলব, আমি একজন লেখক। নিকোটিনের বিষে আমার শরীরের প্রতিটি কোষ অভ্যস্ত। তোমরা আমার চিকিৎসা করো, কিন্তু আমি সিগারেট ছাড়ব না।তাহলে কেন ছাড়লাম?

পুত্র নিনিত হামাগুড়ি থেকে হাঁটা শিখেছে। বিষয়টা পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি। দু-এক পা হেঁটেই ধুম করে পড়ে যায়। ব্যথা পেয়ে কাঁদে।একদিন বসে আছি। টিভিতে খবর দেখছি। হঠাৎ চোখ গেল নিনিতের দিকে। সে হামাগুড়ি পজিশন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।

তার ছোট্ট শরীর টলমল করছে। যেকোনো সময় পড়ে যাবে এমন অবস্থা। আমি ডান হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিতেই সে হাঁটা বাদ দিয়ে দৌড়ে হাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশ্বজয়ের ভঙ্গিতে হাসল। তখনই মনে হলো, এই ছেলেটির সঙ্গে আরও কিছুদিন আমার থাকা উচিত। সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত সেই মুহূর্তেই নিয়ে নিলাম।

পাদটীকা

আমেরিকার মহান লেখক মার্ক টোয়েন বলেছেন, অনেকেই বলে সিগারেট ছাড়া কঠিন ব্যাপার। আমি তাদের কথা শুনেই অবাক হই। সিগারেট ছাড়া কঠিন কিছুই না। আমি ১৫৭ বার সিগারেট ছেড়েছি।

নিউইয়র্ক

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ১৩, ২০১১

বালিশ

আমার জন্ম-জেলা নেত্রকোনায় ‘বালিশ’ নামের একধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়। আকৃতি বালিশের মতোই। এক বালিশ সাত-আটজনে মিলে খেতে হয়।নেত্রকোনা শহরের এক মিষ্টির দোকানে বসে আছি। ময়রা থালায় করে বালিশ এনে আমার সামনে রাখল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, একটু মুখে দেন, স্যার।আমি বললাম, যে মিষ্টির নাম বালিশ, সেই মিষ্টি আমি খাই না। আমি লেখক মানুষ।

আমার মধ্যে রুচিবোধ আছে।ময়রা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, স্যার, আপনি একটা নাম দিয়ে দেন। আমার দোকানে এর পর থেকে আমি বালিশ মিষ্টি এই নামে ডাকব।পুত্র-কন্যার নাম রাখার জন্য, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম রাখার জন্য কেউ কেউ আমার কাছে আসে। এই প্রথম মিষ্টির নাম। আমি মাথা ঘামাচ্ছি সুন্দর কোনো নাম যদি পাওয়া যায়।

ভারতবর্ষের ভাইসরয়ের স্ত্রী লেডি কেনিংয়ের সম্মানে একটি মিষ্টি বানানো হয়েছিল, নাম ‘লেডিকেনি’। লেডি কেনিং চলে গেছেন, কিন্তু লেডিকেনি ময়রাদের দোকানে রয়ে গেছে।আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে বললাম, মিষ্টির নাম রাখুন ‘বালক-পছন্দ’। বালকেরা মিষ্টির সাইজ দেখে খুশি হয় বলেই এই নাম।ময়রা বলল, স্যার, নাম রাখলাম। এরপর কেউ আমার দোকানে বালিশ পাবে না। পাবে বালক-পছন্দ।

নেত্রকোনায় অনেক দিন যাই না, আসলেই এই নাম রাখা হয়েছে কি না, তা জানি না। মনে হয় না। রাজনৈতিক নাম বদলানো সহজ, স্থায়ী নাম বদলানো কঠিন ব্যাপার। কোনো মিষ্টির নাম যদি থাকত ‘বঙ্গবন্ধু-পছন্দ’, তাহলে ক্ষমতা বদলের পরপর তার নাম হতো ‘জিয়া-পছন্দ’। এটা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না। কারণ, এটাই স্বাভাবিক।হঠাৎ বালিশ নিয়ে এত কথা বলছি কেন?

কারণ আছে। গত তিন দিনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। ঘুম ভাঙার পরপরই আমার মাথার নিচ থেকে শাওন বালিশ টেনে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাচ্ছে। রহস্যময় কর্মকাণ্ড। তবে মিসির আলির পক্ষে রহস্য ভেদ করা কঠিন কিছু না। আমি রহস্য ভেদ করলাম।কেমোথেরাপির কারণে আমার মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। বালিশভর্তি চুল। শাওন আমাকে এই দৃশ্য দেখাতে চাচ্ছে না। শুনেছিলাম, আধুনিক কেমোর উন্নতি হয়েছে। এখন আর চুল পড়ে না।

ঘটনা তা না। যা-ই হোক, মাথার চুল নিয়ে আমি চিন্তিত না। আমি চিন্তিত নতুন এক রিয়েলিটিতে ঢুকছি। আমার পিঠে সিল পড়েছে—‘তুমি ক্যানসার নামের ব্যাধির চিকিৎসা নিচ্ছ’। কারও যক্ষ্মার চিকিৎসা শুরু হলে কেউ বুঝে না তার কী রোগ হয়েছে বা কী চিকিৎসা চলছে। ব্যতিক্রম ক্যানসারের কেমো। সে শরীরের ভেতরে এবং বাইরে দুই জায়গাতেই নিজেকে জানান দেবে।

চুল পড়ার ঘটনা কেন ঘটে, একটু বলে নিই। শরীরে যখন কেমোথেরাপিতে ভয়ংকর বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, সেই বিষ খুঁজে বেড়ায় সেই সব কোষকে, যা দ্রুত বিভাজনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ক্যানসার সেল দ্রুত বিভাজন সেল। কাজেই কেমো তাদের আক্রমণ করে। একই সঙ্গে চুলের গোড়ার কোষ এবং মুখের ভেতরের কোষও দ্রুত বিভাজমান কোষ। কোনো অন্যায় না করেও এরা মারা পড়ে। চুল পড়ে যায়, মুখের ভেতর ঘায়ের মতো হয়।

আমার মুখগহ্বর এখনো ঠিক আছে, তবে চুল পড়ছে। শাওন বাজারে গেলেই এখন টুপি কিনে আনে। নানান ধরনের টুপি পরে আয়নার সামনে দাঁড়াই। নিজেকে অন্য রকম লাগে। অন্য কোনো বাস্তবতায় চলে যাই।ইতালির মোনজা শহরে আইন করা হয়েছে, যেন কেউ গোলাকার কাচপাত্রে গোল্ডফিশ রাখতে না পারে। আইন প্রণেতারা ভাবছেন, গোলাকার কাচপাত্রে বাস করার কারণে গোল্ডফিশগুলোর দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছে। পৃথিবী সম্পর্কে তারা ভুল ধারণা পাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, আমরা মানুষও প্রবল বিভ্রমে বাস করি। আমাদের সবার বাস্তবতাই আলাদা। মানুষ হিসেবে আমরা আলাদা। আমাদের রিয়েলিটিও আলাদা।এখন নিউইয়র্কে রাত আটটা। আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসে আছি। বাংলাদেশে দিনে লিখতাম, এখন লিখছি রাতে। ভিন্ন বাস্তবতা না?

যা-ই হোক, এই মুহূর্তে আমার মন ভালো, জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির একগাদা বই টরন্টো থেকে সুমন রহমান মেইল করে পাঠিয়েছে। কিছুদিন হলো এই লেখকের বই আগ্রহ নিয়ে পড়ছি। কেন পড়ছি, তা পরে একসময় বিতং করে জানাব।

খোদ জাপানি ভাষায় আমার একটি বই প্রকাশিত হচ্ছে। বই নিয়ে জাপান থেকে ড. নাসির জমাদার (তিনি বইটির অনুবাদক) নিউইয়র্কে আসছেন। এই খবরটিতেও আনন্দ পাচ্ছি। বইটির বাংলা নাম বনের রাজা। বাচ্চাদের একটি বই। শুভ্রকে নিয়ে লেখা কোনো বই জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হলে হারুকি মুরাকামিকে পাঠিয়ে দিয়ে লিখতাম…। না থাক, কী লিখতাম, তা সবাইকে না জানালেও চলবে।টরন্টোর সুমন বইগুলোর সঙ্গে এক লাইনের একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে লেখা—‘দ্রুত সুস্থ হয়ে পাঠকদের উৎকণ্ঠা দূর করুন’।

ভাই, সুমন। কোনো কিছুই আমার হাতে নেই। নিয়ন্ত্রণ অন্য কারোর কাছে।

পাদটীকা

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দুটি ছেলে নিতান্ত অল্প বয়সে হোয়াইট হাউসে মারা যায়। আব্রাহাম লিংকন তারপর হতাশ হয়ে লিখলেন, গডের সৃষ্টি কোনো জিনিসকে বেশি ভালোবাসতে নেই। কারণ, তিনি কখন তাঁর সৃষ্টি মুছে ফেলবেন, তা তিনি জানেন। আমরা জানি না।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ১৭, ২০১১

ব্ল্যাক ফ্রাইডে

শুক্রবার মুসলমানদের জন্য পবিত্র একটি দিন। খ্রিষ্টানদের রোববার, ইহুদিদের শনিবার। সপ্তাহের তিন দিন, তিন ধর্মাবলম্বীরা নিয়ে বসে আছে।

শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিকানরা ‘কালো শুক্রবার’ আবিষ্কার করল? থ্যাংকস গিভিংয়ের রাত থেকেই শুরু এই কালো শুক্রবার। একটি দিনের জন্য কম দামে জিনিসপত্র বিক্রির মহোৎসব। ৪০ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন, যার দাম এক হাজার ডলার, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কালো শুক্রবারে তা বিক্রি হয় ২০০ ডলারে। আমেরিকানরা বড় বড় দোকানের সামনে প্রচণ্ড শীত অগ্রাহ্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। কখন রাত ১০টা বাজবে, কখন শুরু হবে কালো শুক্রবার?

গত বছরের কালো শুক্রবারে দোকানে ঢোকার ধাক্কাধাক্কিতেই নাকি মারা গেছে পাঁচজন। ‘সেল’ শুনলেই আমেরিকানদের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। জীবন বাজি রেখে হলেও ‘সেলে’ জিনিস কিনতে হবে। সেই জিনিস কাজে লাগুক বা না লাগুক। আমেরিকা পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে অকারণ শপিং করে দেউলিয়া হওয়া যায়। ব্যাংক বাড়িঘর নিয়ে নেয়। এমনও হয়, গৃহত্যাগীরা পথে হাঁটাহাঁটি শুরু করে। টিভির খবরে দেখলাম, এই ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে সারা আমেরিকায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের জিনিসপত্র বিক্রি হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে এ বছরের বাংলাদেশের বাজেটের দ্বিগুণ এক ব্ল্যাক ফ্রাইডের বিক্রি।

এ বছরের কালো শুক্রবারটা আমার দেখার শখ ছিল। শরীরে কুলোয়নি বলে যাওয়া হয়নি। একটি লাভ অবশ্যি হয়েছে, টেলিফোনে আমার এক প্রিয় কবির সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর প্রথম কথা, ‘হুমায়ূন! তোমার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি কেন?’

কবির কণ্ঠস্বর তেজি। গলা শুনে বোঝার উপায় নেই, উনি শারীরিকভাবে অচল হয়ে গেছেন। খুব মন খারাপ হলো যখন উনি বললেন, হুমায়ূন! আমার জীবন হুইলচেয়ারে আটকে গেছে।আমি এক মিনিটের বেশি হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারি না। আমার কিডনি নষ্ট। ছয় বছর বেঁচে আছি ডায়ালাইসিসের ওপর। ডায়ালাইসিস নিয়ে পাঁচ বছরের বেশি কেউ বাঁচে না। আমি এক বছর বেশি বেঁচে আছি। সেটাই বা খারাপ কী? হুমায়ূন! বয়সে আমি বড় বলে তোমাকে তুমি করে বলছি। সমস্যা আছে?

আমি বললাম, আপনার ক্ষেত্রে নেই।

কবির নাম শহীদ কাদরী।

‘রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে স্বাধীনতা দিবসের

সাঁজোয়া বাহিনী,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে রেসকোর্সের কাঁটাতার,

কারফিউ, ১৪৪ ধারা,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে ধাবমান খাকি

জিপের পেছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি,

কাঠগড়া গরাদের সারি সারি খোপ

কাতারে কাতারে রাজবন্দী’

(রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট; শহীদ কাদরী)

আমি কবিকে বললাম, আপনার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি, কিন্তু আপনার অনেক গল্প আমি জানি।কবি বললেন, কী গল্প জানো?

আমি বললাম, আপনি একদিন দুর্বল এক কবির বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছেন। দুর্বল কবির বিশাল বাড়ি দেখে বিস্মিত হয়ে হিন্দিতে বললেন, ‘এতনা ছোটা কবি কা এতনা বড় মোকাম!’

কবি হো হো করে হেসে ফেলে বললেন, হুমায়ূন, একদিনের কথা বলি। আমি শামসুর রাহমানকে নিয়ে বের হয়েছি। কারও পকেটেই টাকা-পয়সা নেই। রাস্তার পাশের দোকান থেকে দুই কাপ চা কিনে চুমুক দিচ্ছি, হঠাৎ দেখি, কালো মরিস মাইনর গাড়িতে করে বিখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী যাচ্ছেন। শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘দেখো, আমরা দুই প্রধান কবি রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছি, রিকশায় ওঠার সামর্থ্যও নেই, আর একজন ফোক সিঙ্গার গাড়িতে চড়ে ঘুরছে। কোনো মানে হয়?’

আসাদুজ্জামান নূর এই কবির সঙ্গে চাকরি করতেন। মনে হয় সোভিয়েত দূতাবাসের তথ্যকেন্দ্রে চাকরি। শহীদ কাদরী ছিলেন নূরের বস। নূরের কাছে শুনেছি, একদিন কবি অফিসে এসে ফাইলপত্র ছুড়ে ফেলে বললেন, হিন্দি চুলের চাকরি শহীদ কাদরী করে না। বলেই যে বের হলেন, আর কোনো দিন অফিসে ফিরলেন না।

এই মুহূর্তে দেশের একজন প্রধান কবি পড়ে আছেন নিউইয়র্কের জ্যামাইকায়। কোনো মানে হয়? তিনি কি তাঁর দেশের অপূর্ব জোছনা দেখবেন না? তাঁর গায়ে কি বর্ষার প্রথম জলধারা পড়বে না? তিনি কি আর কোনো দিনও হাতে নেবেন না বাংলাদেশের বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল?

‘ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করব যাতে সেনাবাহিনী

গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে

মার্চপাস্ট করে চলে যাবে

এবং স্যালুট করবে তোমাকে প্রিয়তমা!

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করব

কত বাঙ্কার ডিঙিয়ে

কাঁটাতার, ব্যারিকেড পার হয়ে অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে

আর্মিদের কারগুলি এসে দাঁড়াবে

ভায়োলিন বোঝাই করে

কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা’

(তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা; শহীদ কাদরী।)

কবি! আপনাকে অভিবাদন!

পাদটীকা

হুমায়ূন! আমি নাস্তিক মানুষ। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রার্থনায় বিশ্বাস করা শুরু করেছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমেরিকার সব হাসপাতালে রোগীদের জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা আছে। স্ট্যাটিসটিকসে দেখা গেছে, যাদের জন্য প্রার্থনা করা হয়, তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।আমি আমার স্ত্রীকে আপনার জন্য প্রার্থনা করতে বলেছি।

শহীদ কাদরী

ব্ল্যাক ফ্রাইডে ২০১১

জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক

পুনশ্চ

দুর্বল কবি এবং ফোক সিঙ্গারের নাম আমার লেখায় ছিল। শহীদ কাদরীর অনুরোধে দুটি নাম বাদ রাখলাম। পাঠকদের কাছে ধাঁধা—নাম দুটি কী? সঠিক উত্তরদাতার কাছে প্রথম আলোর এক কপি ডাকযোগে পৌঁছে যাবে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৬, ২০১১

 মাঠরঙ্গ

গুপ্তধন পাওয়ার মতো ব্যাপার ঘটেছে। আমার হাতে বিশ্বকাপের দুটো টিকিট। বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ডের খেলা মাঠে বসে দেখতে পারব। টিকিট দুটি এমপি হিসেবে শাওনের মা পেয়েছেন। তাঁর হাত থেকে ছিনতাই করে নিয়ে নিয়েছে তাঁর ছোট দুই মেয়ে। শাওন দুই বোনের হাত থেকে গোপনে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। চোরের ওপর বাটপারি একেই বলে।

 

Read more

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.