নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ শেষ – পর্ব

আড়াইটার সময় খেলা শুরু হবে, আমরা সাড়ে ১২টার সময় ঘর থেকে বের হলাম। স্টেডিয়ামে ঢুকতে হলে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে, নিরাপত্তা চেকিং, আগেভাগে যাওয়াই ভালো।স্টেডিয়ামে ঢোকার পথের রাস্তায় কোনো যানবাহন চলছে না। শত শত মানুষ হাঁটাহাঁটি করছে। এদের হাতে টিকিট নেই। যেখানে খেলা হবে, তার আশপাশেই থাকতে পারার আনন্দেই তারা অভিভূত।

রাস্তায় প্রচুর তরুণ-তরুণীকে দেখা গেল রংতুলি নিয়ে ঘুরছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের মুখে বাংলাদেশ পতাকা আঁকছে। অতি উৎসাহীরা তাদের সারা মুখে হলুদ-কালো আঁকিবুঁকিতে বাঘ সাজছে। শাওন তার গালে বাংলাদেশের পতাকা আঁকাল। আমি তাকে বললাম, আমার বাঘ সাজার শখ! তোমার কি আপত্তি আছে?

শাওন বলল, আপত্তি থাকবে কেন? তোমার যা সাজার ইচ্ছা সাজ।শেষ মুহূর্তে বাঘ সাজার পরিকল্পনা বাদ দিলাম। বৃদ্ধ বাঘ সেজে মাঠে ঢোকার মানে হয় না। মাঠে ঢুকবে তরুণ বাঘ এবং বাঘিনীরা।প্রথম পর্যায়ের নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে আমি ধরা খেলাম। পকেটের সিগারেটের প্যাকেট-ম্যাচ ফেলে দিতে হলো। দ্বিতীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা চেকিংয়ে শাওন ধরা খেল। তার হ্যান্ডব্যাগে পাওয়া গেল ফেস পাউডারের কৌটা, মেকআপের কিছু জিনিসপত্র ও চিরুনি।

সব ফেলে দিতে হবে। শাওন করুণমুখে দেনদরবার করছে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে আছি। দেনদরবারে লাভ হলো না। সব ফেলে দিতে হলো।স্টেডিয়ামে ঢুকে ধাক্কার মতো খেলাম। সব ছবির মতো সুন্দর। আমি বিদেশি কোনো স্টেডিয়াম দেখিনি, কাজেই তুলনা করতে পারছি না। তুলনা ছাড়াই বলছি, আমাদের এই স্টেডিয়াম দৃষ্টিনন্দন। বড় কোনো হোটেলের ঘরে ঢুকলে প্রথমেই বাথরুম দেখতে ইচ্ছা করে। আমি স্টেডিয়ামের বাথরুমে উঁকি দিলাম, সব ঝকঝক তকতক করছে।

টিকিটে নম্বর দেওয়া ছিল। নম্বর মিলিয়ে বসেছি। আমাদের সামনে (মাঠের ওপাশে) বিশাল টিভি স্ক্রিন। আমি অস্বস্তি নিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছি। অস্বস্তির কারণ পুরো মাঠ একসঙ্গে দেখতে পাচ্ছি। আমার অভ্যাস টিভি স্ক্রিনে খেলা দেখা। সেখানে সবকিছুই খণ্ড খণ্ড করে দেখানো হয়। যখন বোলার বল হাতে ছুটে আসেন, তখন শুধু বোলারকে ধরা হয়। বল দেখানো হয় স্লোমোশনে। এখন সব খেলোয়াড়কে একসঙ্গে দেখব, ব্রেইন ব্যাপারটা গুছিয়ে নিতে পারছে না।

টস হয়ে গেছে। বাংলাদেশ টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছে। সারা মাঠে আনন্দের ঢেউ (আক্ষরিক অর্থেই ঢেউ), এক প্রান্ত থেকে ঢেউ শুরু হয়ে অন্য প্রান্তে গিয়ে থামে। এর নাম মেক্সিকান ওয়েভ।দুই দলের খেলোয়াড়েরা সার বেঁধে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। সবার সামনে বাংলাদেশের একটি করে বালক বা বালিকা। সুন্দর দৃশ্য। শুরু হলো আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সংগীত দিয়ে। অনেক দর্শক দেখলাম উঠে দাঁড়ালেন। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আয়ারল্যান্ড আজ আমাদের শত্রু। শত্রুদের জাতীয় সংগীতে কি উঠে দাঁড়ানো উচিত?

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সময় অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো। দর্শকেরা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছেন। গানের সঙ্গে গলা মিলাচ্ছেন। আমি লক্ষ করলাম, আমার চোখে পানি এসে গেছে।খেলা শুরু হয়েছে। তামিমের দুর্দান্ত ঝোড়ো ব্যাটিং। আমাদের পেছনে বসা কিছু তরুণের মন্তব্য শুনে মজা পাচ্ছি। ‘তামিম তক্তা বানায়ে দাও।’ ‘মুখ বরাবর বল মারো। বদগুলোর মুখ ভোঁতা করে দাও। কত বড় সাহস! বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে আসে।’

‘তামিমের আজ যে অবস্থা সাড়ে তিন শ থেকে চার শ রান উঠবে। আয়ারল্যান্ড আজ মাঠেই হাগামুতা করবে।’ আমি এদের উত্তেজনায় যুক্ত হতে পারছি না, কারণ বল চোখে দেখছি না। বল কোন দিকে যাচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে, টিভি পর্দায় খেলা দেখা উচিত ছিল। মাঠে এসে ভুল করেছি।

আমার সামনের সারিতে এক তরুণ ও তরুণীও আমাকে খেলায় মন দিতে দিচ্ছে না। তারা হয় নতুন বিয়ে করেছে কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা। তারা সারাক্ষণই একে অন্যের ছবি তুলছে। একজন অন্যজনের গায়ে পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পায়ের খেলাও খেলছে। পায়ে পায়ে ঠোকাঠুকি। ভুভুজেলা নামক বাদ্যযন্ত্রটি এই স্টেডিয়ামে নিষিদ্ধ, কিন্তু এই যুগল ভুভুজেলার একটি মিনি সংস্করণ জোগাড় করেছে। বস্তুটি বাঁশির মতো না, চারকোনা, ফুঁ দিলেই ভুভুজেলার চেয়েও বিকট শব্দ হয়। এরা ক্ষণে ক্ষণে ভুভুজেলা বাজিয়ে আমাকে চমকাচ্ছে।

আমার পাশে এক ভদ্রলোক বসেছেন। তিনি সারাক্ষণই উচ্চস্বরে মোবাইল ফোনে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। খেলা কী হচ্ছে বা না হচ্ছে এদিকে তার ভ্রুক্ষেপও নেই।কে সামছু! আমি তো মাঠে খেলা দেখছি। ফজলু কই? তারে টেলিফোনে পাচ্ছি না। ফজলুকে বল, আমারে যেন কল দেয়। রংমিস্ত্রি পেয়েছ? আচ্ছা আমি পাত্তা লাগাচ্ছি।

খেলা এগোচ্ছে মোবাইলওয়ালা রংমিস্ত্রির অনুসন্ধানে ব্যস্ত আছেন।খাদক প্রজাতির একজনকে দেখলাম, খেলা শুরু থেকেই তিনি খাবার স্টল থেকে একের পর এক খাবার নিয়ে আসছেন। শেষ হচ্ছে, আবার আনছেন। খাদ্য গ্রহণ চলছেই। আবহসংগীতের মতো মুরগির হাড় চিবানোর শব্দ আসছে।

পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যকে দেখে খুব মায়া লাগল। তাদের ডিউটি পড়েছে বক্সের দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকার। চমৎকার খেলা হচ্ছে, বেচারারা উপস্থিত থেকেও খেলা দেখতে পারছে না, তাদের তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে উল্লসিত দর্শকদের মুখের দিকে। উল্লাসের কারণ জানার অধিকার তাদের নেই।উল্লাসে বাধা পড়ল, ইমরুল কায়েস আউট। বাংলাদেশের টিমে ডমিনো এফেক্ট প্রবল। একা কেউ আউট হয় না, দলবল নিয়ে হয়। দেখতে দেখতে চার ব্যাটসম্যান শেষ। সাবিকের আউটে মাঠে নেমে এল কবরের নিস্তব্ধতা।

শেষ ভরসা আশরাফুল। সাত নম্বরে নেমে সে সবাইকে চমকাবে—এই আমাদের বিশ্বাস। মাঠে আশরাফুল ঢোকামাত্র, আমরা হাততালি দিলাম। আমাদের মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে এল। হায় খোদা! এ তো দেখি পুরোনো আশরাফুল। এক রান করে আউট। ব্যাট নিয়ে প্র্যাকটিস করতে করতে হাসিমুখে মাঠ থেকে বিদায়।

আমার পেছনে বসা তরুণের দল বলল, আশরাফুলকে এমন শাস্তি দেওয়া দরকার, যেন তার সারা জীবন মনে থাকে। একটা লম্বা বাঁশ এনে…। বাক্যটি লিখলাম না। পাঠকদের কল্পনায় ছেড়ে দিলাম।আশরাফুল আউট হওয়ার পরপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। শাওনকে বললাম, বাংলাদেশের পরাজয় আমি এত মানুষের সঙ্গে দেখব না। আমি চললাম।

শাওনও উঠে দাঁড়াল। দুঃখিত গলায় বলল, মাঠে বসে বাংলাদেশের বিজয় দেখবে বলে তোমাকে মাঠে নিয়ে এসেছি। এমন অবস্থা হবে কে জানত! সরি।বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের খবর রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। তাদের হতাশায় ম্রিয়মাণ মুখ দেখে দেখে ফিরছি। আমার হূদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। শাওন বলল, প্লিজ, এত মন খারাপ করবে না। পরের ম্যাচে আমরা অবশ্যই জিতব। এত মানুষের ভালোবাসা কখনো বৃথা যেতে পারে না।

পাদটীকা

একি কাণ্ড! এই খেলায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতেছে। অভিমান করে মাঠ ছেড়ে চলে আসায় আসল খেলাটা দেখা হলো না। আফসোস, আফসোস এবং আফসোস!

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ০৪, ২০১১

সংসার

একজন মানুষ এক জীবনে কতবার ‘সংসার’ করে? বেশির ভাগ মানুষের জন্য একবার। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশি মানুষের জন্য দুবার। প্রথম সংসার জ্বলেপুড়ে যাওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার। আমি, মনে হয়, কথা গুছিয়ে বলতে পারছি না। এখানে ‘সংসার’ মানে বিয়ে করে ঘর বাঁধা বোঝাচ্ছি না। হাঁড়িকুড়ি, বিছানা-বালিশ নিয়ে দিনযাপন বোঝাচ্ছি।

আমার মা অতি অল্প বয়সে বাবার সঙ্গে সংসার করতে এসেছিলেন। বাবার মৃত্যুতে মায়ের সংসার লন্ডভন্ড হয়ে গেল। তিনি তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে ঢাকায় এলেন। নিউমার্কেট থেকে হাঁড়িকুড়ি কিনে নতুন সংসার শুরু করলেন। আমি বাবাশূন্য মায়ের নতুন সংসারে যুক্ত হলাম।

পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় গেলাম। গুলতেকিনকে নিয়ে শুরু হলো তৃতীয় সংসার। হাঁড়িপাতিল কেনা, বিছানা-বালিশ কেনা।ঢাকায় ফিরে এসেই সেই সংসারও ভাঙল। উত্তরার এক বাসায় শুরু হলো আমার একার চতুর্থ সংসার।বছর তিনেক পর শাওন আমার সঙ্গে যুক্ত হলো। ‘দখিন হাওয়া’য় আমার পঞ্চম সংসার।

ক্যানসার বাধিয়ে আমেরিকায় এসে শুরু হলো ষষ্ঠ সংসার।সম্ভবত, সপ্তম সংসার হবে আমার শেষ সংসার। সেখানে কি আমি একা থাকব, নাকি সুখ-দুঃখের সব সাথিই থাকবে? দার্শনিক কথাবার্তা থাক, ষষ্ঠ সংসার নিয়ে বলি।বাড়ি ভাড়া করা হলো, হাঁড়ি-পাতিল কেনা হলো; টিভি কেনা, বিছানা-বালিশ—সে এক হইচই।

তিন রুমের একটি আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। বাড়িটা নিশ্চয় সুন্দর। কারণ, কথাবার্তার একপর্যায়ে বাড়িতে রোগী দেখতে আসা প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বাড়িটা কার?’ আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, ‘যেহেতু ভাড়া নিয়েছি, আপাতত আমার।’ বাড়িটায় তিনটা শোবার ঘর। জানালার পাশে প্রকাণ্ড মেপলগাছ। মেপলগাছের পাতায় ফল-এর (Fall) রং ধরতে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে তাকালে চোখ ঘরে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমেরিকান ইনডিপেনডেন্ট বাড়িতে ‘এটিক’ নামের একটা ছাদঘর থাকে। এই ঘরটা হয় সবচেয়ে সুন্দর। অনেকখানি সময় আমি এটিতে একা কাটাই। লেখালেখি করি না। ছবি আঁকি। জলরং ছবি। ছবি মোটেই ভালো হচ্ছে না। রঙে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। শুধু অন্যদিন-এর মাজহার বলছে, ‘অসাধারণ! আপনার আঁকা ছবি বিক্রি করে আমরা চিকিৎসার খরচ তুলে ফেলতে পারব, ইনশাল্লাহ।’

চিকিৎসার খরচ নিয়ে আমি এই মুহূর্তে ভাবছি না। নিজেকে ব্যস্ত কীভাবে রাখা যায়, ভাবছি তা নিয়ে।প্রচুর বই জোগাড় করেছি (অর্থাৎ, কিনেছি)। বাড়ির পাশেই একটা পাবলিক লাইব্রেরি, তার মেম্বার হয়েছি। মেম্বার হতে গিয়ে গোপন আনন্দও পেলাম। বিদেশি লেখকদের বইয়ের তাকে দেখি আমার অনেক বই। বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম, ‘বাংলা ভাষার এই বই তোমরা কীভাবে পেয়েছ?’ লাইব্রেরিয়ান বলল, ‘আমাদের বই দেয় লাইব্রেরি অব কংগ্রেস।’

আমি বললাম, ‘বাংলা ভাষার এই লেখক আমার প্রিয় লেখকদের একজন।’ লাইব্রেরিয়ান বলল, ‘হাউ নাইস! তুমি তার একটা বই ইস্যু করে নিয়ে যাও। সাত দিন রাখতে পারবে।’ আমি হিমুর একটা বই ইস্যু করে নিয়ে এলাম।দেশে যখন ছিলাম, নিয়মিত সাপ্তাহিক টাইম পড়তাম। এখন পয়সা দিয়ে চারটি পত্রিকার গ্রাহক হয়েছি—

Time

Science

Scientific American

National Geographic

অন্য সময় হলে শাওন মাসে মাসে এতগুলো টাকা খরচ করতে দিত না। তার এখন হিসাবের টাকা। গুনে গুনে খরচ করতে হচ্ছে। সে ঠিক করেছে, আমার কোনো কিছুতেই বাধা দেবে না। বিশাল বাড়িতে আমাদের সঙ্গে মাজহার ছাড়া কেউ নেই। কাজেই জলি ও তার স্বামীকে নাইওর নিয়ে এসেছি। রান্নার দায়িত্ব জলি নিয়ে নিয়েছে। সে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ‘হুমায়ূন ভাই, আজ কী খাবেন?’ আমি চেষ্টা করি এমন কোনো খাবারের নাম করতে, যা জোগাড় করা অসম্ভব। কিন্তু অবাক কাণ্ড, খাবারের টেবিলে তা পাচ্ছি। উদাহরণ—

কচুর লতি দিয়ে কাঁঠালবিচি

গরুর ভুঁড়ি

মাছ দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল

ডাঁটা দিয়ে ট্যাংরা মাছ।

মাজহার দায়িত্ব নিয়েছে আমাকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর। অদ্ভুত, উদ্ভট ও অখাদ্য সব ফল ও ফলের রস আমাকে নিয়মিত খেতে হচ্ছে। অসংখ্য বিভিন্ন ধরনের ফল খেয়ে আমি এখন বুঝেছি—জগতে ফলের রাজা আম। ফলের রানি আম। ফলের রাজপুত্র-রাজকন্যা আম।দেশে আমি ‘গর্তজীবী’ ছিলাম। আমেরিকায় এসে গর্ত থেকে বের হয়েছি। যতটা পারি, পৃথিবী দেখে যাই। কিছুই তো বলা যাচ্ছে না।গর্ত থেকে বের হয়ে আমি কিছুটা সময় আমার বাড়ির পেছনের ব্যাক ইয়ার্ডে (Back Yard) কাটাই।

আমেরিকানরা এই জায়গাটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে। উইকএন্ডে বারবিকিউ করে, আড্ডা দেয়, বিয়ার খেয়ে উল্লাস করে। বাকি দিনগুলোতে জায়গাটা পড়ে থাকে অনাথের মতো। আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন সন্ধ্যার কিছুটা সময় এখানে কাটাতে।এক সন্ধ্যায় পুত্র নিষাদকে নিয়ে বসেছি। হঠাৎ পুত্র আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘বাবা, দেখো, বাংলাদেশের চাঁদটা এখানে চলে এসেছে। আকাশে কত বড় চাঁদ!’ তাকিয়ে দেখি, মেপলগাছের ফাঁকে নিউইয়র্ক নগরে সম্পূর্ণ বেমানান এক চাঁদ নির্লজ্জের মতো উঠে বসে আছে। তার তো থাকার কথা বাঁশবাগানে মাথায়।

আমি পুত্রকে বললাম, ‘বাংলাদেশের চাঁদ এখানে কীভাবে চলে এসেছে?’ সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমরা যখন প্লেনে করে এসেছি, তখন প্লেনের পেছনে পেছনে চলে এসেছে। চাঁদটা তোমাকে খুব ভালোবাসে তো, এই জন্য এসেছে।’ শিশুরা না বুঝে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে আমার মনে হলো, আমার পুত্রের কথা সত্যি। বাংলাদেশের দুঃখী চাঁদ শুধু আমাকে ভালোবেসেই কংক্রিটের নিউইয়র্ক নগরে চলে এসেছে।

আমি আমার লেখকজীবনে একটিমাত্র উপন্যাসই আমেরিকায় বসে লিখেছিলাম—সবাই গেছে বনে। নামটা ধার করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান থেকে—‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’।আচ্ছা, পাঠক কি জানেন, এই গানটি কোনো আনন্দগীতি, না দুঃখগীতি? রবীন্দ্রনাথের অতি আদরের পুত্র শমির মৃত্যুর পরদিন রাতে আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছিল। রবীন্দ্রনাথ একা টানাবারান্দায় বসে প্রবল জোছনার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লিখলেন—

‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

বসন্তের এই মাতাল সমীরণে\

যাব না গো যাব না যে

রইনু পড়ে ঘরের মাঝে—

এই নিরালায় রব আপন কোণে।…

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে

ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।

আমারে যে জাগতে হবে

কী জানি সে আসবে কবে

যদি আমায় পড়ে তাহার মনে…’

হুমায়ূন আহমেদ, নিউইয়র্ক

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

তারিখ: ৩০-১০-২০১১

 সুপার হিরো

হিরো একটি পশ্চিমা কনসেপ্ট। এদের কমিক বইয়ে হিরো আছে (ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান), বাস্তবেও আছে।আমাদের তেমন কিছু নেই। মাঝেমধ্যে এক-আধজনকে পাওয়া যায়— ভাঙা রেললাইনের সামনে গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেন থামায়। অনেকের জীবন রক্ষা করে। আমরা কিছুদিন তাকে নিয়ে হইচই করে ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন। উল্টো ব্যাপারও আছে, পুরো ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়া।

পশ্চিমা একজন হিরোর গল্প দিয়ে আজকের লেখা শুরু করছি। তার নাম টেরি ফক্স। কানাডার এক যুবক। মাত্র বাইশ বছর বয়সে ভয়াবহ ক্যানসার (osteosarcoma) তাকে আক্রমণ করল। তার একটি পা কেটে ফেলে দিতে হলো। টেরি ফক্স হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাবলেন, ক্যানসার গবেষণার জন্যে আরও অর্থ প্রয়োজন। তিনি ঘোষণা করলেন, এক পা নিয়েই তিনি কানাডার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দৌড়ে ক্যানসারের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবেন।

আটলান্টিক সমুদ্রে পা ডুবিয়ে তিনি দৌড় শুরু করলেন। তত দিনে একটা নকল পা লাগানো হয়েছে। এক শ তেতাল্লিশ দিন পর্যন্ত তিনি নকল পায়ে দৌড়ালেন। ৩,৩৩১ মাইল অতিক্রম করে তাকে থামতে হলো। কারণ ক্যানসার তখন ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তিনি ক্যানসার রিসার্চের জন্যে রেখে গেলেন সংগ্রহ করা এক শ মিলিয়ন ডলার। এখন সংগ্রহ পাঁচ শ মিলিয়ন ছেড়ে গেছে।

ক্যানসার রিসার্চের অর্থ সংগ্রহের জন্যে বিশ্বজুড়েই টেরি ফক্স ম্যারাথন হয়। পঁচিশতম ম্যারাথনে পৃথিবীর তিন মিলিয়ন মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, বাংলাদেশেও এই ম্যারাথন হয়েছে।ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণাকেন্দ্রের জন্যে আমরা অর্থ সংগ্রহে নামতে যাচ্ছি। আমাদের গুরু অবশ্যই টেরি ফক্স।

আমি টেকনাফে বঙ্গোপসাগরে পা ডুবিয়ে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত যাব। আমার পক্ষে দৌড়ানো সম্ভব না। কারণ শিশুপুত্র আমার দুই পা চেপে ধরে থাকবে। এরা পা চেপে ধরায় ওস্তাদ। আমি পরিবার ছাড়া এক দিনও একা থাকতে পারি না। আমার সঙ্গে আমার দুই শিশুপুত্র এবং তাদের মা থাকবে। আমরা প্রতীকী অর্থে মাঝে মাঝে দৌড়াব। বাকিটা গাড়িতে। এই আনন্দযাত্রায় সবাইকে আমন্ত্রণ।

ক্যানসার ইনস্টিটিউটের জন্যে আমি যে সাড়া পেয়েছি তাতে আমার মনে হয়েছে আমার মানবজীবন ধন্য। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।অভিনেতা রহমত (নয় নম্বর বিপদ সংকেত) আমাকে জানিয়েছেন রাজশাহীতে তাঁর পাঁচ বিঘা জমি দিতে চান। যদি ক্যানসার ইনস্টিটিউট ঢাকায় হয় তাহলে তিনি তাঁর সঞ্চিত পাঁচ লাখ টাকা দিতে চান। এর বেশি তাঁর আর নেই। থাকলে তাও দিতেন।

নিউইয়র্কের বাঙালি ডাক্তার নাহরিন মামুন জানিয়েছেন ঢাকায় তাঁর জমি আছে। পুরোটাই তিনি ক্যানসার ইনস্টিটিউটকে দিয়ে দিতে চান। আমি যখন বলব তখন।জেনেভা থেকে আনজু ফেরদৌসী জানিয়েছেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় ১০ হাজার ডলার শুরুতে দিতে চান। এক্ষুনি দিতে চান। পরে যদি কিছু খরচ হয়ে যায়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আমেরিকার প্রধান প্রধান হাসপাতালে বাংলাদেশের ডাক্তার সন্তানরা প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করে যাচ্ছেন।পৃথিবীর সেরা অনকোলজিস্টের অনেকেই বাংলাদেশি। একজন অনকোলজিস্ট রথীন্দ্রনাথ বসু ওভারিয়ান ক্যানসারে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন।এঁরা সবাই বাংলাদেশের ক্যানসার ইনস্টিটিউটের জন্যে যা করণীয় তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অনলাইনে দেখলাম, ২৫০ জন নিজেদের ভিক্ষুক ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা অর্থ সংগ্রহের জন্যে ভিক্ষার থালা নিয়ে পথে বের হবেন।আর হিমুর দল তো হলুদ পাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়েই আছে। তারা নাচুনি বুড়ি। ঢোলের বাদ্যের অপেক্ষা।কনফুসিয়াসের বিখ্যাত বাণী সবাইকে মনে করিয়ে দেই। ‘আ জার্নি অব আ থাউজ্যান্ড মাইলস বিগিনস উইথ আ সিংগল স্টেপ’। আমরা কিন্তু প্রথম ‘স্টেপ’ নিয়ে নিয়েছি।

আল্লাহপাক বলেছেন, তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করবে হিংসামুক্ত অবস্থায়।আমাদের ক্যানসার হাসপাতালে একই অবস্থা। তবে হিংসা না, সবাইকে প্রবেশ করতে হবে রাজনীতিমুক্ত অবস্থায়। ডাক্তাররা আওয়ামী লীগ, বিএনপি করবেন, ইলেকশন হবে, মারামারি হবে—তা কখনো না।

পৃথিবীর কোথাও আমি ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক দল করতে দেখিনি। এই অর্থহীন মূর্খামি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার। এই মূর্খদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ড. আহমদ শরীফ এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অতি শ্রদ্ধেয় দুজন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাদা দলে ইলেকশন করেছি। এখন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। মূর্খ মনে হয়। আমাদের ক্যানসার ইনস্টিটিউটে মূর্খদের প্রবেশাধিকার নেই।

বিশ্বমানের গবেষণা শুরুতেই আমাদের ইনস্টিটিউটের পক্ষে সম্ভব হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। তবে সারা বিশ্বের ক্যানসারের ওপর গবেষণার ফলাফল তারা ব্যবহার করতে পারবেন।বিদেশি ডাক্তারদের প্রতি আমাদের এক ধরনের মোহ আছে। মোহভঙ্গের সময় এসেছে। বাংলাদেশের সেরা অনকোলজিস্টরা ইনস্টিটিউট চালাবেন।

একটি আমেরিকান হাসপাতালে সর্বাধুনিক যেসব যন্ত্রপাতি থাকবে তার সবই থাকবে আমাদের ইনস্টিটিউটে। যন্ত্রপাতি দেখাশোনা এবং পরিচালনার জন্যে দক্ষ শক্তিশালী টিম থাকবে। বর্তমান চিকিৎসা অতিমাত্রায় যন্ত্রনির্ভর।দামি যন্ত্রপাতি কেনার বাংলাদেশি স্টাইলে আমরা যাব না। কোনো টেন্ডার না। ইনস্টিটিউট ঠিক করবে তার কী যন্ত্র দরকার। তারা সরাসরি কিনবে।

বাংলাদেশি স্টাইল হলো—প্রথমে টেন্ডার ডাকা হবে। ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের পোষা ছাত্র দল ঝাঁপিয়ে পড়বে। টেন্ডার হয়ে যাবে। এখন বিদেশ ভ্রমণ পালা। নানান টিম আলাদা আলাদাভাবে যন্ত্র কেনা এবং তার প্রয়োগ জানতে বিদেশ ভ্রমণ করবে। সবশেষে যাবেন মন্ত্রী মহোদয় (স্ত্রী এবং শ্যালিকাসহ)।

যন্ত্র কেনার পর সবার আগ্রহ শেষ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে যন্ত্র পড়ে থাকবে দিনের পর দিন। কেউ ছুটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে না। ছুটানোর দায়িত্ব কার এই নিয়ে জটিলতা। যন্ত্র ছোটানোতে আর মালকড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা নাই।এক সময় যন্ত্র ছাড় করা হবে। যন্ত্র বসাতে লাগবে প্রায় এক বছর। তত দিনে যন্ত্র বেঁকে বসেছে। এটা একটা সুসংবাদ, কারণ যন্ত্র কেন কাজ করছে না এটা জানার জন্যে বেশ কিছু দল আবার বিদেশ সফর করবে। স্ত্রী-শ্যালিকাসহ মন্ত্রী মহোদয় আবারও যাবেন।

পাদটীকা

বাংলাদেশের একজন রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্যে আমেরিকায় এসেছেন। নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি সেরা ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করাবেন। তাঁর রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিভাগীয় প্রধান রোগী দেখতে এসে বললেন, আপনার কী কী সমস্যা আমাকে বলবেন? রোগী চোখ কপালে তুলে বললেন, আপনি বাংলাদেশি নাকি?

হ্যাঁ। আমার বাড়ি চিটাগাং।রোগী থমথমে গলায় বললেন, এত টাকা-পয়সা খরচ করে আমেরিকায় এসে আমি বাংলাদেশি ডাক্তারের চিকিৎসা নিব না। আমেরিকান ডাক্তার লাগবে। বাংলাদেশি দিয়ে চলবে না।একটা ব্যাপার আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছি, তখন পশ্চিমারা বাঁদরের চেয়ে সামান্য ওপরে অবস্থান করছিল।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের শুরুটা আমরা করেছি। চৈনিক ও আরবদের অবস্থান আমাদের নিচে। পাঁচ হাজার বছর আগে আমাদের সার্জনরা প্লাস্টিক সার্জারি করতেন।কর্কট রোগ (ক্যানসার) সম্পর্কে পাঁচ হাজার বছর আগের ভারতীয় চিকিৎসকেরা নিদান দিয়ে গেছেন। শূন্য এবং অসীম—এই দুই সংখ্যা আমাদের আবিষ্কার।আমাদের সবার উচিত শৈশবের একটি কবিতা নতুন করে পড়া—

‘আমরা যদি না জাগি মা

কেমনে সকাল হবে?’

হুমায়ূন আহমেদ, নিউইয়র্ক থেকে

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারী ২৯, ২০১২

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.