নিশীথিনী পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

নিশীথিনী পর্ব:০১

মিসির আলির ধারণা ছিল, তিনি সহজে বিরক্ত হন না। এই ধারণাটা আজ ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তিনি অসম্ভব বিরক্ত। যে-রিকশায় তিনি উঠেছেন, তার সীটটা ঢালু। বসে থাকা কষ্টের ব্যাপার। তার চেয়েও বড় কথা, দু মিনিট পরপর রিকশার চেইন পড়ে যাচ্ছে।এখন বাজছে দশটা তেইশ। সাড়ে দশটায় থার্ড ইয়ার অনার্সের সঙ্গে তাঁর একটা টিউটোরিয়াল আছে। এটা কোনোক্রমেই ধরা যাবে না। যে-হারে রিকশা এগুচ্ছে, তাতে ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে তাঁর আরো পনের মিনিট লাগবে। এ-কালের ছাত্ররা এতক্ষণ তাদের টীচারদের জন্যে অপেক্ষা করে না।

মিসির আলি তাঁর বিরক্তি ঢাকবার জন্যে একটা সিগারেট ধরালেন। ঠিক তখন পঞ্চম বারের মতো রিকশার চেইন পড়ে গেল। রিকশাওয়ালার ভাব-ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে চেইন পড়ার ব্যাপারটায় সে আনন্দিত। গদাইলশকরী চালে সে নামল এবং সামনের চাকাটা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করতে লাগল।চেইন পড়ে গেলে কেউ চাকা তুলে ঝাঁকাঝাঁকি করে বলে তাঁর জানা ছিল না। রুক্ষ গলায় বললেন, এ রকম করছি কেন?

জবাব দিল না। গরম চোখে তাকাল এবং মিসির আলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটা বিড়ি ধরাল। মিসির আলি রাগ সামলাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কুড়ি থেকে এক পর্যন্ত উল্টো দিকে গুনলেন। জীবনানন্দ দাশের মনে হয় একদিন কবিতার প্রথম চার লাইন মৃদু স্বরে আওড়ালেন। মিসির আলির ধারণা, কিছু-কিছু কবিতা মানুষের অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। মনে হয় একদিন এমন একটি কবিতা।কিন্তু আজ তাঁর রাগ কমছে না। রিকশাওয়ালা কঠিন মুখ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। মিসির আলির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

মিসির আলি নিজেকে সামলাবার জন্যেই ভাবতে লাগলেন–তিনি নিজে যদি সিগারেট ধরাতে পারেন, তাহলে এই লোকটি পারবে না কেন? জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে বেচারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। এক জন ক্লান্ত ও বিরক্ত মানুষের নিশ্চয়ই বিশ্রাম করার অধিকার আছে। তিনি হালকা গলায় বললেন, নাম কি তোমার?

সামসু।

বাড়ি কোথায় তোমার সামসু?

বাড়ি-ঘর নাই।

দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার সামসু, রিকশা চালাও। ক্লাস মিস হবে।

সামসু কোনো পাত্তাই দিল না। রাস্তার পাশে প্রোসাব করতে বসে গেল। তার বসার ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে সে সহজে উঠবে না, বসেই থাকবে। এই লোকটি কি কোনো-একটি অজ্ঞাত কারণে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে? মিসির আলি রিকশা থেকে নেমে পড়লেন। পাঁচ টাকা ভাড়া ঠিক করা ছিল, তিনি ছটাকা দিলেন। সহজ স্বরে বললেন, নাও, ভাড়া নাও! আমি হেঁটে চলে যাব।

সাধারণত রিকশাওয়ালদের সবচেয়ে ময়লা ন্যাতন্যাতে নোটগুলো দেয়া হয়। মিসির আলি তাকে দিয়েছেন কচকচে নতুন নোট। এটা তিনি করলেন এই আশায়, যাতে সামসু নামের এই উদ্ধত যুবকটি তাঁর আচরণের জন্যে লজ্জিত বোধ করে।এ-রকম কাণ্ডকারখানা মিসির আলি সাহেব করে থাকেন। একবার বাসে তার পাশে সুখী-সুখী চেহারার এক বুড়ো বসল। দু জনের সীট। কিন্তু বুড়ো অকারণে পা ফীক করে তাঁকে চাপ দিতে লাগল। বিশ্ৰী কাণ্ড! মিসির আলি খানিকক্ষণ চাপ সহ্য করলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, আপনার বোধহয় অল্প জায়গায় বসার অভ্যোস নেই, আপনি বরং একাই এখানে আরাম করে বসুন!

মিসির আলি ভেবেছিলেন, লোকটি এতে লজ্জিত ও বিব্রত হবে। সে-রকম কিছু হল না। লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে দু জনের জায়গা দখল করে পা দোলাতে লাগল। এরা অসুখী মানুষ। নিজেদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এরা–অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে অসুখী মানুষের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন ভাবতে ভাবতে মিসির আলি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মাথার ওপর জুন মাসের গানগনে আকাশ। রাস্তাঘাট তেতে উঠেছে। বাতাসের লেশমাত্ৰও নেই। এ-বছর অসম্ভব গরম পড়েছে। এই অসহ্য গরমে রিকশাওয়ালারা মানুষ টানে কীভাবে কে জানে। মিসির আলি সামসু নামের উদ্ধত যুবকটির জন্যে এক ধরনের মায়া অনুভব করলেন।

ক্লাস ফাঁকা। আসমানী রঙের জামদানি শাড়ি পরা একটি মেয়ে শুধু সেকেন্ড বেঞ্চে বসে আছে। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা! এটা একটা নতুন ব্যাপার। ইউনিভার্সিটির মেয়েরা মাথায় ঘোমটা দেয় শুধু আজানের সময়।মিসির আলি ঢুকতেই মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তিনি অপ্ৰস্তুত স্বরে বললেন, দেরি করে ফেললাম। সবাই চলে গেছে নাকি? জ্বি স্যার! তুমি বসে আছ কেন? তুমি কেন ওদের সঙ্গে গেলে না?

মেয়েটি মৃদু স্বরে বলল, স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?

ধরতে পারছি। তোমার নাম নীলু।

জ্বি।

তুমি তো এই ক্লাসের নও।

জ্বি-না।

তাহলে?

আমি স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বসে আছি। আমি রুটিনে দেখেছি, আজ। আপনার এখানে ক্লাস।মিসির আলি ভুরু কুঁচকে বললেন, তোমার কি বিয়ে হয়েছে? মাথায় ঘোমটা, তাই বললাম। নতুন বিয়ে-হওয়া মেয়েরা প্রথম দিকে ঘোমটা পরে।আমার বিয়ে হয় নি।ও, আচ্ছা!আপনার সঙ্গে আমার খুব একটা জরুরি কথা আছে স্যার।বল।আমি স্যার অনেকটা সময় নিয়ে কথাটা আপনাকে বলতে চাই। আমি কি স্যার আপনার বাসায় যেতে পারি?

বাসায় আমার কিছু ঝামেলা আছে।তাহলে স্যার, আপনি কি আমাদের বাসায় একটু আসবেন? আমার খুব দরকার।ঠিক আছে, যাব।আমাদের বাসার ঠিকানা কি আপনার মনে আছে? এক বার গিয়েছিলেন আমাদের বাসায়! আমাদের বাসার দোতলায় আপনার এক জন পরিচিত মহিলা থাকতেন। রানু!আমার মনে আছে।স্যার, আপনি কি আজই আসবেন? আমার খুব দরকার।মিসির আলি তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে। এই মেয়ের নাম নীলু, কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে তাকে অবিকল রানুর মতো দেখাচ্ছে।

স্যার, আপনি কি আজই যাবেন?

ঠিক আছে রানু।

আমার নাম কিন্তু স্যার নীলু।

মিসির আলি লক্ষ করলেন, মেয়েটা হাসছে। যেন তাকে রানু বলায় সে খুশি। এটাই যেন আশা করছিল।

আমাদের বাসার ঠিকানা কি লিখে দেব?

লিখে দিতে হবে না। আমার মনে আছে।

আসবেন কিন্তু স্যার।

আসব। আমি আসব।

যাই স্যার, আসসালামুয়ালাইকুম ।

নীলু উঠে দাঁড়াল। এত সুন্দর মেয়েটা শ্যামলা গায়ের রঙ। চোখে-মুখে তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু তবু এমন মায়া জাগিয়ে তুলছে কেন? মিসির আলি লজ্জিত বোধ করলেন। তাঁর বয়স একচল্লিশ। এই বয়সের এক জন মানুষের মনে এজাতীয় তরল ভাব থাকা উচিত নয়। তা ছাড়া এই মেয়েটি তাঁর ছাত্রী।মিসির আলি শূন্য ক্লাসে দীর্ঘ সময় বসে রইলেন। একসঙ্গে বেশ কয়েকটা জিনিস নিয়ে তিনি ভাবছেন। মেয়েটির মাথায় ঘোমটা কেন? এই মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাসে আসছে না কেন? মেয়েটি চলে যাবার সময়ও একটা অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। সোজাসুজি হেঁটে গেছে, এক বারও পেছনে ফিরে তাকায় নি। মেয়েরা সাধারণত পেছন ফিরে তাকায়।

সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মৃত মেয়ের ছাপ আছে নীলুর মধ্যে। যেভাবেই হোক আছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।তিনি সিগারেট ধরালেন।প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।–কথাটা কি সত্যি? তাঁর মনে হল, সত্যি নয়। কাজই হচ্ছে নানান রকম রহস্য সৃষ্টি করা-মানুষের কাজ হচ্ছে সেই রহস্যের কুয়াশা সরিয়ে দেয়। এমন একদিন কি আসবে, যখন কেউ বলবে না।– দেয়ার আর মেনি থিংকস ইন হেভেন অ্যাণ্ড আর্থ …।

আরে, মিসির আলি সাহেব না? এখানে কী করছেন? এক-একা ক্লাসে বসে আছেন কেন? তিনি দাড়িওয়ালা এই লোকটাকে চিনতে পারলেন না; হাতে রেজিষ্টি খাতা, কাজেই অধ্যাপক হবেন। মুখখানা হাসি-হাসি। পান খেয়ে দাঁত লাল করে ফেলেছেন। পান-খাওয়া লোকজন কি কিছুটা নিম্ন স্বভাবের হয়? মিসির আলির মনে হল, পান এবং স্বভাবের ভেতর কোনো- একটা সম্পর্ক আছে। তিনি যে কজন পানবিলাসী লোককে চেনেন, তাদের সবাই সদালাপী।কি, কথা বলছেন না কেন? কিছু ভাবছেন নাকি?

মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত ও নরম স্বরে বললেন, জ্বি-না, কিছু ভাবছি না।আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না? জ্বি-না।দাড়িওয়ালা অধ্যাপক অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। মিসির আলি বিব্রত বোধ করলেন। কাউকে চিনতে পারছি না বলা।–তাকে প্রায় অপমান করার শামিল। বিশেষ করে অধ্যাপক শ্রেণীর মানুষরা এ ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর।সত্যি চিনতে পারছেন না?

জ্বি না। আমার একটা প্রবলেম আছে, কিছুই মনে থাকে না।মাসখানেক আগে আমি আপনার কাছে এক জন রোগী নিয়ে গিয়েছিলাম–ফিরোজ নাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি ফিরোজের দুলাভাই।হ্যাঁ দুলাভাই।এবং আপনার নাম হচ্ছে নাজিমুদ্দিন। হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট।এই তো চিনতে পারছেন।চিনতে পারছি এসোসিয়েশন থেকে একটা মনে পড়লে, অন্যগুলো মনে পড়তে থাকে। এসোসিয়েশন অব আইডিয়াস।

ফিরোজ তো অনেকখানি ইমপ্রুভ করেছে। এত অল্প সময়ে যে আপনি এতটা করবেন, আমরা কেউ কল্পনাও করি নি। দারুণ ব্যাপার! মিসির আলি কিছু বললেন না। ফিরোজ আজ বিকেলে তাঁর কাছে আসবে। প্রতি সোমবার ফিরোজের সঙ্গে তাঁর একটি সেশন হয়। অথচ নীলুকে বলে রেখেছেন, আজ যাবেন তাদের বাসায়। তাঁর কাজকর্ম ইদানীং এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? বয়স বাড়ছে।মিসির আলি সাহেব! জ্বি।চলুন, লাউঞ্জে বসে চা খাওয়া যাক।চলুন।আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? কী ভাবছেন এত?

কিছু ভাবছি না। তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। দীর্ঘনিঃশ্বাসটি কেন ফেললেন, এই নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন। অকারণে তো কেউ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে না। সবকিছুর পেছনেই কারণ থাকে। এই জগতে কার্যকারণ ছাড়া কিছুই হয় না, সবই লজিক। জটিল লজিক জটিল কিন্তু অভ্রান্ত। লজিকের বাইরে এক চুলও কারোর যাবার ক্ষমতা নেই।

গত দু মাস ধরে ফিরোজ প্রতি সোমবারে মিসির আলির কাছে আসে। পাঁচটার সময় আসে, থাকে সাতটা পর্যন্ত। আজ কী মনে করে তিনটার সময় চলে এসেছে। মিসির আলি তখনো ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরেন নি। তাঁর কাজের মেয়ে হানিফা দরজা খুলে দিল। সে দরজা খুলল ভয়ে-ভয়ে। ফিরোজের দিকে তাকালেই তার বুক টিপটপ করে। বড় ভয় লাগে।স্যার কি আছেন, হানিফা? জ্বি-না।আজ একটু সকাল—সকাল এসে পড়েছি। আমি বসি, কেমন? জ্বি আইচ্ছা।

তুমি আমাকে এক গ্লাস লেবুর শরবত খাওয়াতে পারো? প্রচণ্ড গরম।হানিফার বয়স দশ। কিন্তু সে খুবই চটপটে। মিসির আলি সাহেব তাকে অল্পদিনের মধ্যেই বর্ণপরিচয় করিয়েছেন। পড়াশোনার ব্যাপারে তার অসম্ভব আগ্ৰহ। মেয়েটি এমনিতেও চটপটে। সে বড় এক গ্লাস শরবত বানাল। তিন টুকরা বরফ ছেড়ে দিল। ট্রেতে করে শরবতের গ্লাস এবং আরেক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে গেল। সে দেখেছে শরবত খাবার পরপরই সবাই পানি খেতে চায়।ফিরোজ অবশ্য উল্টোটা করল। পানি খেল প্ৰথমে। তারপর বেশ সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, তুমি আমাকে ভয় পাও কেন হানিফা? ভয় পাই না তো? পাও, খুবই ভয় পাও। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি এখন সেরে গেছি। পুরোপুরি না-সারলেও অসুখটা আর নেই। চোঁচামেচি হৈচৈ কিছুই করি না। ঠিক না?

জ্বি, ঠিক।এখন দেখা না–সবাই একা-একা ছেড়ে দেয়। আগে ছাড়ত না।হানিফা কিছু বলল না।ফ্যানটা ছেড়ে দাও।হানিফ ফ্যান ছেড়ে দিল। ফিরোজ ভারী গলায় বলল, এই গরমে সুস্থ মানুষই পাগল হয়ে যায়, আর আমি তো এমনিতেই পাগল।হানিফার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। বলে কী এই লোক! বাড়িতে আর কেউ নেই। শুনশান নীরবতা। হানিফার ইচ্ছা করতে লাগল, বাড়ির বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।হানিফা।জ্বি? আমাকে ভয় লাগছে?

জ্বি।ভয়ের কিছু নেই। আমি সেরে গেছি। ঠিক আছে।–তুমি যাও। আমি বসে থাকব চুপচাপ।হানিফা রান্নাঘরে চলে গেল। কি মনে করে সে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দিল! কেন জানি দারুণ ভয় করতে লাগল তার।ফিরোজ বসে আছে চুপচাপ। তার চোখ ঈষৎ লাল। খুব সূক্ষ্মভাবে হলেও তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যায়। ছেলেটির বয়স বাইশ, অত্যন্ত সুপুরুষ। চিবুক মেয়ে বানাতে গিয়ে মনে করে শেষ মুহূর্তে তাকে পুরুষ বানিয়েছে, এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কিছু কাঠিন্য ঢেলে দিয়েছে।

ফিরোজের সমস্যাটা শুরু হয় এইভাবে—সে দু বছর আগে জানুয়ারি মাসে তার এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিল। যাবার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—গ্রামে। ফিরোজ কখনো গ্রাম দেখেনি।বন্ধুর বাড়ি ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জে। চমৎকার একটা জায়গা। ভোরবেলায় আকাশের গায়ে নীলাভ গারো পাহাড় দেখা যায়। চারদিকে ধু-ধু প্ৰান্তর, বর্ষা আসা মাত্র যা পানিতে ডুবে যায়। সেই পানি সমুদ্রের মতো গর্জন করতে থাকে। অল্প বাতাসেই সমুদ্রের মতো বিশাল ঢেউ ওঠে।

এখন অবশ্য শুকনো খটখট করছে চারদিকে। তবু ফিরোজ মুগ্ধ হয়ে গেল। সবচেয়ে মুগ্ধ হল বন্ধুর বাড়ি দেখে-বিশাল এক দালান। সিনেমাতে পুরনো আমলের জমিদার বাড়ির মতো বাড়ি। একেকটি ঘর এত উচু এবং এত বিশাল যে, কথা বললেই প্ৰতিধ্বনি হয়।ফিরোজের বন্ধুর নাম আজমল চৌধুরী। সে তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি দেখাল। অতিথিদের থাকবার জায়গা। নায়ারীদের থাকবার জায়গা। কুয়োতলা। বাড়ির পেছনের সারদেয়াল, যেখানে পূর্বপুরুষদের কবর আছে। ফিরোজের বিস্ময়ের সীমা রইল না। কী কাণ্ড। সে মুগ্ধ কষ্ঠে বলল, এ তো হুলস্থূল ব্যাপার রে আজমল! তোরা রাজা-মহারাজা ছিলি–তা তো কোনোদিন বলিস নি?

এখন কিছুই নেই। দালানটাই আছে, আর কিছুই নেই। সেই দালানই ভেঙে ভেঙে পড়ছে। আরেকটা ভূমিকম্প হলে গোটা দালানই ভেঙে পড়ে যাবে। তা ছাড়া খুব সাপের উপদ্রব।বলিস কী? এখন ভয় নেই কোনো সাপ হাইবারনেশনে চলে গেছে; গরমের সময় ভয়াবহ কাণ্ড হয়!কোনো ব্যবস্থা করতে পারিস না? আজমল কঠিন স্বরে বলল, এর একটামাত্র ব্যবস্থাই আছে, সব ছেড়েছুড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া।এত চমৎকার ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি, বলিস কী! চলে যাব। এখানে থাকলে মারা পড়তে হবে। তিনিটা মাত্র মানুষ আমরা। আমি, মা আর আমার ছোটবোন। এত বড় বাড়ি দিয়ে আমি করব কী? জঙ্গল হয়ে গেছে চারদিকে, দেখছিস না?

দু দিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে ফিরোজ গিয়েছিল, কিন্তু পঞ্চম দিনেও সে ফেরার কথা কিছু বলল না।বড় আনন্দে সময় কাটতে লাগল। গ্রাম যে এত ইন্টারেষ্টিং হবে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। শুধু একটি খটকা লেগে থাকল। তার মনে। আজমলের বোনের সঙ্গে তার দেখা হল না, যদিও মেয়েটি এই বাড়িতেই থাকে। মেয়েটির নাম-নাজ। আজমলের মা প্রায়ই তাঁর মেয়েকে চিকন গলায় ডাকেন, ও নাজ, ও নাজ। তার উত্তরে মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে সাড়া দেয়। মেয়েটির সাড়াশব্দ এইটুকুই। ফিরোজ এক বার ভেবেছিল, আজমলকে তার বোনের কথা জিজ্ঞেস করে। শেষ পর্যন্ত তা করা হয় নি। প্রাচীনপন্থী একটি পরিবার, হয়তো কিছু মনে করে বসবে। এদের হয়তো কঠিন পর্দার ব্যাপার আছে।

ষষ্ঠ দিন সন্ধ্যায় মেয়েটির সঙ্গে ফিরোজের দেখা হয়ে গেল। ফিরোজ অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যাবেলা। চারদিক অন্ধকার। ঘরে আলো দিয়ে যায় নি। ফিরোজ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেই হকচাকিয়ে গেল! সতের-আঠার বছরের একটি মেয়ে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার এক হাতে একটি হারিকেন। হারিকেনের আলো পড়েছে মেয়েটির মুখে। এই মুখ কি কোনো মানবীর মুখ? অসম্ভব। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য, সমস্ত রূপ কি এই মুখে আঁকা নয়? ফিরোজ চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল পারল না। সে তাকিয়েই রইল।মেয়েটি বলল, আমি নাজনীন।কিছু-একটা বলতে হয়। ফিরোজ বলতে পারল না। কোনো কথা তার মনে এল না। এই অসম্ভব রূপবতী মেয়েটিকে সে কী বলবে?

ভাইয়া বাজারে গেছে, এসে পড়বে। আপনি বড় ঘরে বসুন–চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।ফিরোজ বড় ঘরের দিকে রওনা হল। আচ্ছানের মতো, এবং সে মনে করতে পারল না মেয়েটির গায়ে শাড়ি ছিল, না সালোয়ার-কামিজ ছিল। মেয়েটির চুল কি বেণী-বাঁধা ছিল, না খোলা ছিল। তার মুখটি কি গোলাকার, না লম্বাটে। কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে একটি তুলি দিয়ে আঁকা মুখ সে দেখে এসেছে। যে-শিল্পী ছবিটি একৈছেন তাঁর বাস এ পৃথিবীতে নয়।–অন্য কোনো ভুবনে।

রাতে খাবার সময় আজমল সহজ স্বরে বলল, নাজের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে, তাই না? নাজ বলছিল।ফিরোজ কিছু বলল না। আজমল বলল, ও কিছুতেই তোর সামনে আসতে চাচ্ছিল না। দেখাটা সে-জন্যেই এমন হঠাৎ হয়েছে।আসতে চাচ্ছিল না কেন? লজ্জায় ওর পোলিওতে একটা পা নষ্ট। এই লজ্জায় সে কারো সামনে পড়তে চায় না।আজমলের মুখ কঠিন হয়ে গেল। সে রুক্ষ স্বরে বলল, পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা তার মধ্যে। শুধু তোর সামনে কেন, কারো সামনেই সে যায় না।সমস্ত রাত ফিরোজ এক ফোঁটা ঘুমতে পারল না। এত কষ্টের রাত তার জীবনে আসে নি এবং ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটল পরদিন দুপুরে।

সে এক-একা শিয়ালজানি খালের পাড় ধরে হাঁটতে গেল এবং তার এক ঘন্টার মধ্যেই চার-পাঁচ জন লোক তাকে ধরাধরি করে নিয়ে এল। তার চোখ লাল টকটক করছে। দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত। মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে! কথাবার্তা অসংলগ্ন। মাঝে-মাঝে বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠছে এবং দৌড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছে।আজমল এবং তার মা হতভম্ব। নাজনীন সমস্ত ব্যাপার দেখে অনবরত কাঁদছে। বাড়ি ভর্তি হয়ে গেছে মানুষে। নানান জল্পনা-কল্পনা। খারাপ বাতাস লেগেছে। জিনে ধরেছে। কালীর আছর হয়েছে।ফিরোজকে নিয়ে আসা হল ঢাকায়। সারিয়ে তুললেন মিসির আলি সাহেব। সেই সারানোর ব্যাপারটা সাময়িক। কিছুদিন সুস্থ থাকে, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। লোকজনদের গলা টিপে ধরতে চায়। জিনিসপত্র ভেঙে একাকার করে।

তবে এখন অবস্থা অনেক ভালো। অসুস্থতার সময় আগের মতো ভায়োলেন্ট হয় না। চুপ করে থাকে। কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে না। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে বসে থাকে। ঘর থেকে শুধু বিড়বিড় শব্দ শোনা যায়। যেন সে কারো সঙ্গে কথা বলছে।যখন সে সুস্থ থাকে, তখন তার অসুস্থ অবস্থার কথা বিশেষ মনে থাকে না। মিসির আলি সাহেব খুটিয়ে খুঁটিয়ে যা বের করেছেন, তা খাতায় লিখে রেখেছেন। লেখা হয়েছে ফরোজের জবানিতে।

অসুস্থতার বিবরণ

সারা রাত নানান কারণে আমার ঘুম হয় নি। শেষ্যরাতের দিকে একটু ঘুম এল। তাও অল্প কিছুক্ষণের জন্যে। ছাঁটার সময় বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে দেখি, আজমল একটা চাদর গায়ে দিয়ে আমবাগানে রোদের জন্যে অপেক্ষা করছে। চট করে রোদ উঠবে মনে হল না। কারণ খুব কুয়াশা। আমি লক্ষ করেছি, আটটা-নটার আগে এ অঞ্চলে সূর্যের দেখা পাওয়া যায় না।আজমল আমাকে দেখে বলল, আজ এত সকাল-সকল উঠলি যে? চোখ লাল কেন? রাতে ঘুম হয় নি? হয়েছে।চা খাবি এক কাপ? নাশতা হতে দেরি হবে। চাল কোটা হচ্ছে, পিঠা হবে; সময় লাগবে।চা এক কাপ খাওয়া যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *