নিষাদ পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

নিষাদ পর্ব – ৩

ঘটনাটা যদি বিদেশে ঘটত, তাহলে একটা মোটিভ খুঁজে পাওয়া যেত। পাবলিসিটি পত্রিকায় ছাপা হত। টিভি প্রোগ্রাম হত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে, তদন্তকারী টীম বসত। এক দল বলত পুরোটাই ভাঁওতা, অন্য দল বলত, না, চাঁওতা নয়।–ব্যাপারটার মধ্যে কিছু-একটা আছে।আমেরিকায় কানসাস সিটির এক মহিলাকে নিয়ে এ-রকম হল। ভদ্রমহিলা সেইন্ট পল স্কুলের গেম টীচার। একবার এক সপ্তাহ স্কুলে এলেন না।

এক সপ্তাহ পার করে যখন এলেন তখন তাঁর চোখ-মুখ শুকিয়ে আমসি। দৃষ্টি উদভ্ৰান্ত। ডাকলে সাড়া দেনমা। দু বার-তিন বার ডাকতে হয়। ভদ্রমহিলা এক অদ্ভুত গল্প বললেন। তার মৃতা মা দুপুরবেলা হঠাৎ তাঁর বাসায় উপস্থিত। স্বাভাবিক মানুষের মতো গল্প শুরু করলেন। লাঞ্চে কি আছে জিজ্ঞেস করে শাওয়ার নিতে গেলেন। তিনি দু দিন থাকলেন।

স্বাভাবিক মানুষের মতো খাওয়াদাওয়া করলেন। ঘুমুলেন। প্রচুর গল্প করলেন। তবে বাড়ি থেকে বেরুলেন না এবং নিজের মেয়েকেও বেরুতে দিলেন না। বেশির ভাগ গল্পই পরকালসংক্রান্ত। কিছু-কিছু উপদেশও দিলেন। বিশেষ কোনো উপদেশ নয়। ধর্মগ্রন্থে যে-ধরনের উপদেশ থাকে, সে-ধরনের উপদেশ। তারপর এক দিন ভরদুপুরে ফেভাবে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই চলে গেলেন।

স্কুল শিক্ষিকার এই ঘটনা নিয়ে সারা আমেরিকায় হৈচৈ পড়ে গেল। ভদ্রমহিলা লাই ডিটেকটির টেস্ট দিলেন। দেখা গেল। তিনি সত্যি কথাই বলছেন। এক দল বলা শুরু করল-লাই ডিটেকটির টেষ্ট মানসিক ব্যাধিগ্রস্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভদ্রমহিলা মানসিক ব্যাধিগ্ৰস্ত। ভদ্রমহিলা মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত নাকি ব্যাধিগ্রস্ত নন। তা বের করার জন্যে আবার বিশেষজ্ঞদের টীম বসল, হুলস্থূল ব্যাপার!

মুনিরের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তবে ব্যক্তিগত বিদ্রোহের কারণেও সে এটা করতে পারে। হয়ত সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসগুলো তার পছন্দ নয়। তার অপছন্দের ব্যাপারগুলো সে অন্যদের জানাতে চায়। মিসির আলিকে দিয়ে তার শুরু। পরে অন্যদের কাছে যাবে।

মিসির আলি ঠিক করলেন, যে করেই হোক, ডাক্তার এ মল্লিককে খুঁজে বের করবেন। তাঁকে এই চিঠিটি দেখাবেন। এতে রহস্যের অনেকটা সমাধান হবার কথা। ডাক্তার এ মল্লিককে খুঁজে বের করতে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। যেহেতু সরকারি ডাক্তার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলতে পারবে উনি কোথায় আছেন, কোন পোষ্টে আছেন। নিশ্চয়ই তাদের ডাইরেক্টরেট আছে।

বাংলাদেশে কোনো কাজই সহজে হয় না! ডাক্তার এ মল্লিকের খোঁজ বের করতে তাঁকে বিস্তর ঝামেলা করতে হল। এ বলে ওর কাছে যান, ও বলে আজ না, সোমবারে আসুন। সোমবারে গিয়ে দেখেন, যিনি খবর দেবেন। তিনি শালার বিয়েতে চিটাগাং চলে গেছেন। শেষ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া গেল। ডাক্তার এ মল্লিক কর্তমানে খুলনার সিভিল সার্জন। তাঁর চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ। কিছুদিনের মধ্যেই এলপিআরে চলে যাবেন।

খুলনা যাবার ব্যবস্থাও মিসির আলি চট করে করতে পারলেন না। দুটো কোর্স ঝুলছে মাথার উপর। সেসন জট সামলাবার জন্যে স্পেশাল ক্লাস হচ্ছে। মিডটার্ম পরীক্ষা। প্রচুর খাতা জমা হয়ে আছে। খাতা দেখতে হবে। খুলনা জায়গাটাও এমন নয় যে দিনে দিনে গিয়ে চলে আসা যায়।

তিনি মনে-মনে একটা পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, মুনিরকে সঙ্গে নিয়েই খুলনা যাবেন। সেই পরিকল্পনাও কার্যকর করা যাচ্ছে না। মুনিরের দেখা নেই। সেই যে ডুব দিয়েছে, ডুবাই দিয়েছে। আর উদয় হচ্ছে না। তার ঠিকানা জানা নেই বলে যোগাযোগ করা হচ্ছে না। সে কোথায় থাকে তা একবার মনে হয় বলেছিল– এখন মনে পড়ছে না। মানুষের মস্তিষ্কের একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সে খুব যত্ন করে মনে করে রাখে, প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো মুছে ফেলে।

যেটেলিফোন নাম্বারটি মনে করা দরকার সেটি মনে পড়ে না, অথচ প্রয়োজন নেই এমন টেলিফোন নাম্বারগুলো একের পর এক মনে পড়তে থাকে।ডাক্তার এ মল্লিক। মানুষটি ছোটখাট। চেহারায় বয়সের তেমন ছাপ নেই, তবে মাথার সমস্ত চুল পাকা। যেন শরতের সাদা মেঘের একটা টুকরো মাথায় নিয়ে হাসিখুশি ধরনের এক জন মানুষ বসে আছেন।

ডাক্তার এ মল্লিক বললেন, আমি কি আপনাকে চিনি?……..জ্বি-না। আমার নাম মিসির আলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।ও, আচ্ছা আচ্ছা, আগে বলবেন তো।আগে বললে কি হত? না, মানে আরো খাতির করে বসতাম।মিসির আলি হেসে ফেললেন। হাসি থামিয়ে বললেন, আপনি যথেষ্ট খাতির করেছেন। ছুটির দিন, কোথায় যেন বেরুচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বাতিল করলেন।

বাতিল করি নি। বাতিল করলে উপায় আছে? মহিলারা সেজোগুঁজে বসে আছে। তারা আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে! হা হা হা। কি ব্যাপার বলুন।আমি না-হয় বিকেলে আসি? পাগল হয়েছেন? বিকেলে দুটো প্রোগ্রাম। একটা জন্মদিন, একটা বিয়ে। যা বলবার এক্ষুণি বলুন। আমার নিজের কোথাও বেরুতে ইচ্ছা করছে না।

আপনি আসায় একটা অজুহাত তৈরি হল। বাড়ির মেয়েদের বলতে পারব কাজে আটকা পড়েছি। হা হা হা। আসুন, আমার একটা ব্যক্তিগত ঘর আছে, সেখানে যাই।ডাক্তার সাহেবের ব্যক্তিগত ঘর দেখার মতো। মেঝেতে কাৰ্পেট বসার জন্যে চমৎকার কিছু রকিং চেয়ার। দেয়ালে অরিজিনাল পেইন্টিং। ঘরটিতে এয়ারকুলারও বসান।এটা হচ্ছে আমার নিজস্ব ড্রয়িং রুম।

খুব নির্বাচিত কিছু অতিথির জন্যে।আমি কি খুব নির্বাচিত কেউ?….কি জন্যে আপনি এসেছেন তা জানার পর বোঝা যাবে। তবে একটা অনুমান অবশ্যি করছি। ঢাকা থেকে শুধু আমার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছেন, সেই থেকেই অনুমানটা করছি। হা হা হা। একটু বসুন। ঠাণ্ডা কিছুদিতে বলি।মিসির আলি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। উনিশ কুড়ি বছরের একটি মেয়ে খুব বিনীত ভঙ্গিতে মিষ্টির প্লেট নামিয়ে লাজুক হাসি হাসল।

মিসির আলির অস্বস্তি আরো বাড়ল। তাঁর মন বলছে, এই মেয়েটির বিয়ের কোনো কথাবার্তা হচ্ছে। এবং তারা ধরেই নিয়েছে তিনি ঢাকা থেকে এই ব্যাপারেই এসেছেন।মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, যাচ্ছে না। তার উপর এই বোধহয় নির্দেশ।কি নাম তোমার খুকি? আমার নাম মীরা।বাহ্, খুব সুন্দর নাম। কী পড়? বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে পড়ি।বাহ্‌, ডাক্তারের মেয়ে ডাক্তারা এখন কি কলেজ ছুটি? জ্বি-না। বাবা হঠাৎ আসতে লিখলেন …।

মেয়েটি কথা শেষ করল না। হঠাৎ অস্বাভাবিক লজ্জা পেয়ে গেল। মিসির আলি মনে-মনে ভাবলেন, চমৎকার একটি মেয়ে! এই মেয়ের বিয়ের সঙ্গে কোনো-না- কোনোভাবে যুক্ত থাকা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।মীরা, তুমি এখন যাও। তোমার বাবাকে পাঠিয়ে দাও।

ডাক্তার সাহেব ঘরে ঢুকলেন হাসিমুখে, কেমন দেখলেন আমার মেয়েকে?…….খুব ভালো মেয়ে! চমৎকার মেয়ে! আমি কিন্তু আপনার মেয়ের বিয়ের কোনো ব্যাপারে আসি নি। অন্য ব্যাপারে এসেছি। তবে মীরার বিয়ের ব্যাপারে কোনো সাহায্য করতে পারলে অত্যন্ত খুশি হব।ডাক্তার সাহেব নিভে গেলেন। মিসির আলির বেশ খারাপ লাগল।

ঢাকা থেকে কি কারোর আসার কথা ছিল?……..জ্বি, ছিল! গত পরশু আসার কথা। সেই জন্যেই মেয়েটাকে বরিশাল থেকে আনালাম। আমার বড় মেয়ে থাকে রাজশাহী, সেও এসেছে। মোটামুটি একটা বেইজ্জতি অবস্থা! নিশ্চয়ই কোনো- একটা ঝামেলা হয়েছে, যে জন্যে আসতে পারছে না।তা তো হতেই পারে।

কিন্তু খবর তো দেবে?…আপনি যদি চান তাহলে তৃতীয় পক্ষ হয়ে ঢাকায় ফিরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাতে পারি।ডাক্তার সাহেব হা-না কিছুই বললেন না। তাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে প্রস্তাবটি তাঁর পছন্দ হয়েছে, তবে সরাসরি হ্যাঁ বলতে তাঁর বাধছে। সম্ভবত স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম আলাপ করবেন। তারপর বলবেন।মিসির আলি বললেন, আমি কি জন্যে এসেছি সেটা কি আপনাকে বলব? হ্যাঁ, বলুন।

আপনি কি অনেকদিন নেত্রকোণায় ছিলেন?…..হ্যাঁ, ছিলাম। পাঁচ বছর ছিলাম নেত্রকোণা সদর হাসপাতালে। সে তো অনেক দিন আগের কথা।কামরুদিন সাহেব নামে কাউকে চিনতেন? উকিল? বেশ নামকরা উকিল।খুব ভালো করে চিনতাম। অত্যন্ত মেজাজি লোক ছিলেন। অসম্ভব দিল-দরিয়া। টাকা রোজগার করতো দুই হাতে, খরচ করতো চার হাতে। কী-একটা অনুষ্ঠান একবার করলেন-ছেলের আকিকা কিংবা মেয়ের জন্মদিনে।

সে এক দেখার মতো দৃশ্য! ভদ্রলোক মারা গেলেন কীভাবে?…..অ্যাপেনডিসাইটিস। মফস্বল শহরের অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। অপারেশনের সে রকম সুবিধা নেই। আমিও ছিলাম না। থাকলে একটা কিছু অবশ্যই করতাম। ঐ দিনই রাত দশটার ট্রেনে ময়মনসিং চলে আসি। আপনি এইসব জিজ্ঞেস করছেন কেন? একটা কারণ আছে। কারণটা এই মুহূর্তে বলতে চাই না। পরে বলব। আপনি কি ওদের কোনো আত্মীয়? জ্বি-না। কামরুদিন সাহেবের স্ত্রী সম্পর্কে কি আপনি কিছু জানেন? কোন বিষয়ে বলুন তো?

উনি কেমন ছিলেন, কীভাবে মারা গেলেন, এইসব।খুব রূপবতী মহিলা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো মানসিক পরিবর্তন ওঁর হয়েছিল কি না জানি না, তবে নানান রকম গুজব শহরে ছড়িয়ে পড়ে।কি রকম গুজব? অভিভাবকহীন রূপবতী মেয়েদের নিয়ে যেসব গুজব সাধারণত ছড়ায়, সেইসব মুক্তি, সহজলভ্য মেয়ে—এই সব কথাবার্তা।

পুরুষদের খুব আনাগোনাও নাকি ছিল।মারা যান কীভাবে?……সেই সম্পর্কেও নানান গল্প আছে। কুৎসিত গল্প। পেটে বাচ্চা এসে গিয়েছিল, গ্ৰাম্য উপায়ে খালাস করতে গিয়ে কি সব হয়েছে। … আমি এর বেশি কিছু জানি না। গুজবের ব্যাপারে আমার উৎসাহ কিছু কম। তবে এইসব গুজবের পেছনে কিছু সত্যি সাধারণত থাকে।

মিসির আলি পকেট থেকে প্যাডের কাগজটি বের করে বললেন, ভালো করে। দেখুন তো এই কাগজের লেখাটি আপনার? আমার তো বটেই।আপনার নিজের হাতে লেখা! নিশ্চয়ই।লেখাটা দয়া করে পড়ে দেখুন।মল্লিক সাহেব লেখা পড়ে দীর্ঘ সময় চুপ করে বসে রইলেন। একটি কথাও বললেন না।আপনি লিখেছেন এ লেখা? না।

হয়তো অন্য কোনো কামরুদিন সম্পর্কে লিখেছেন।এই নামে নেত্রকোণায় অন্য কোনো উকিল ছিল না, এবং আমি অপারেশনের ব্যাপারে সাহায্য চেয়েও চিঠি লিখি নি।হয়তো আপনার মনে নেই।দেখুন প্রফেসর সাহেব, আমার স্মৃতিশক্তি ভালো। আপনার ব্যাপারটা আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

আপনি কি কোনোভাবে আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন?…ছি ডাক্তার সাহেব, ভুলেও এ-রকম কিছু ভাববেন না। আমি একটা জটিল রহস্যের জট ছাড়াবার চেষ্টা করছি। এর বেশি কিছু না। আমি আজ উঠি? আমার লেখা এই চিঠি আপনাকে কে দিল? অন্য এক দিন। আপনাকে বলব।অন্য কোনোদিন আপনাকে আমি পাব কোথায়? আমি আমার ঠিকানা দিয়ে যাচ্ছি।মিসির আলি ঠিকানা লিখলেন।

মন্ত্রিক সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনি জিগাতলায় থাকেন?……জ্বি।রহমান সাহেবের বাসা চেনেন? ২২/১৩, তিনতলা বাড়ি। আই স্পেশালিস্ট টি রহমান।জ্বি-না। তবে আপনি যদি তাঁদের কাছে কোনো খবর পাঠাতে চান, আমি ঠিকানা বের করে খবর পৌঁছে দেব।কোনো খবর দিতে হবে না।ও-বাড়ি থেকেই কি করে আসার কথা ছিল।

আপনি কী করে বুঝলেন?….অনুমান করছিলাম।ডাক্তার এ মল্লিক অপ্ৰসন্ন চোখে তাকিয়ে আছেন। তিনি চিন্তিত ও বিরক্ত। তাঁর আজকের ছুটির দিনটি নষ্ট হয়েছে।যাই ডাক্তার সাহেব? তিনি জবাব দিলেন না।মতিঝিল পাড়ার অফিস। নাম আলফা ট্রান্সপোর্ট। নাম থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তবে কাজকর্ম পাঁচমিশালি–অটোমোবাইল ইন্সুরেন্স, ট্রাভেল এজেন্সি এবং ইণ্ডেনটিং।

বৃহস্পতিবার অর্ধেক দিন অফিস। মুনিরের হাতে তেমন কোজ নেই। সে বসেছে এ্যাসিসটেন্ট ক্যাশিয়ার নিজামুদ্দিন সাহেবের পাশে। নিজামুদ্দিন সাহেবের ব্যালেন্স শীটে সতের টাকার গণ্ডগোল। হিসাব মিলছে না। তিনি মুনিরকে ডেকে নিয়ে গেছেন, যাতে সে ঠাণ্ডা মাথায় ফিগারগুলি চেক করতে পারে।

নিজামুদ্দিন সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এল ডি ক্লার্ক হয়ে ঢুকেছিলেন। দুটো প্রমোশন পেয়ে এ্যাসিষ্ট্যান্ট ক্যাশিয়ার হয়েছেন। গত বছর একটা গুজব উঠেছিল, তিনি অফিসার্স গ্রেড পাচ্ছেন। তা পান নি। তাঁর পাঁচ বছরের জুনিয়র শমসের সাহেব পেয়েছেন। এই নিয়ে নিজামুদ্দিন সাহেবের মনে কোনো ক্ষোভ নেই। দিনের শেষে ক্যাশের হিসাব পুরোপুরি মিটে গেলেই তিনি মহাসুখী। এই হিসাব তাঁর প্রায়ই মেলে না।

তখন তাঁকে দেখে মনে হয়, তাঁর মাথা-খারাপ হতে বেশি বাকি নেই!……এই মানুষটিকে মুনিরের খুব পছন্দ। ভদ্রলোক সব কিছুই অত্যন্ত দ্রুত করেন। দ্রুত কথা বলেন। দ্রুত লেখেন এবং দ্রুত রেগে যান। অতি দ্রুত রাগ চলেও যায়। তখন ধরা গলায় বলেন, মিসটেক হয়েছে। মনের মধ্যে কিছু রাখবেন না, তাহলে কষ্ট পাব। এক্সকিউজ করে দেন।জুনিয়র কর্মচারীদের কেউ তাঁকে স্যার বললে তিনি শীতল গলায় বলেন, আমাকে স্যার ডাকবেন না। স্যার ডাকলে নিজেকে মাস্টার-মাস্টার মনে হয়। বরং ভাই ডাকবেন। ব্রাদারের উপর কোনো ডাক হয় না।

মুনির নিজেও সতের টাকার কোনো সমাধান করতে পারল না। দেখা যাচ্ছে ক্যাশে সতের টাকা আসলেই কম। নিজামুদ্দিন সাহেবের মুখ অন্ধকার। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘন-ঘন।মুনির বলল, নিজাম ভাই, আপনি আজ চলে যান। শনিবার না হয় আরেক বার দেখব।শনিবার দেখলে তো হবে না। দিনের হিসাব মেটাতে হয় দিনে। তিনি নিজের পকেট থেকে সতেরো টাকা রাখলেন আয়রন সোফে। কাগজপত্র সই করলেন। মুনিরের খুব মন-খারাপ হল।

বেচারার সতের টাকা চলে গেল, এই জন্যে নয়, যে-হিসাবের জন্য ভদ্রলোকের এত মমতা সেই হিসাব মিলছে না দেখে। মুনিরের মনে হচ্ছে এই সরল-সহজ মানুষটা হয়তো কেঁদে ফেলবে।নিজাম ভাই।কি? আসুন, আরেক বার আমরা দুজন মিলে বসি। চেক এবং কাউন্টার চেক। তাউচারগুলিও দেখেন। কোনোটা হয়তো ইংরেজিতে লেখা, তুলেছেন বাংলায়।

নিজামুদ্দিন সাহেবের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি অত্যন্ত উৎসাহে কাগজপত্র বের করলেন। মুনির কাগজপত্র নিয়ে বসতে পারল না। এজিএম কাদের সাহেব ডেকে পাঠালেন। নরম গলায় বললেন, আমাকে কয়েকটা জিনিস টাইপ করে দিতে পারবে?……প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায় অফিসের কোনো কাজ নয়। অফিসের কাজ হলে বলতেন, খুব জরুরি। টাইপরাইটার নিয়ে বসে যাও। মিসটেক যেন না-হয়। স্পেসিং ঠিক রাখবে।এখন তা বলছেন না। নরম স্বরে কথা বলছেন। এজিএম ধরনের কেউ নরম স্বরে কথা বলে–এটাও এক অভিজ্ঞতা।

একটু এক্সটা টাইম কাজ করতে হবে, পারবে?….পারব স্যার।গুড।কাদের সাহেব মানিব্যাগ খুলে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে একটা দশ টাকার নোট বের করলেন।।নাও দুপুরে কিছু খেয়ে নিও।কিছু লাগবে না স্যার! আরো নাও নাও।মুনির হাত বাড়িয়ে টাকা নিল। নিজেকে তার ভিখিরির মতো মনে হচ্ছে। অথচ না নিয়েও উপায় নেই।

কাদের সাহেব টাকা না নেয়ার অন্য অর্থ করে বসতে পারেন! কতক্ষণ লাগবে?…ঘন্টাখানিক! গুড। আমি একটু বেরুচ্ছি। একঘন্টা পরে এসে নিয়ে যাব। ঠিক আছে? জ্বি আচ্ছা স্যার।একটার মধ্যেই কাজ শেষ–এজিএম সাহেবের দেখা নেই। অফিস খালি হয়ে গেল দেড়টার মধ্যে। দারোয়ান তালাচাবি লাগিয়ে দিল।

নিজাম সাহেব বললেন, তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? এ ছাড়া আর কি করব? একা একা কতক্ষণ দাঁড়াবে? আমিও অপেক্ষা করি?…….আপনি চলে যান নিজাম ভাই। স্যার এসে পড়বেন। জরুরি কাজ।জরুরি কাজ না হাতি। জরুরি কাজ হলে চলে যেত না। পাশে বসে থাকত।আপনি চলে যান নিজাম ভাই।একা তোমাকে রেখে চলে যেতে খারাপ লাগছে।আমি বেশিক্ষণ থাকব না।

এই ঘন্টাখানিক।ঘন্টাখানিক নয়, মুনির সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। কাগজগুলো হয়তো জরুরি। আগামীকাল ছুটি। কাদের সাহেব এই ছুটির মধ্যে তাকে খুঁজে পাবেন না। সেও কদের সাহেবের বাসার ঠিকানা জানে না।

মুনিরের রীতিমতো কান্না পেতে লাগল। বারান্দায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা খুবই কষ্টের সময় কাটতেই চায় না। দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। অফিসের পাশেই চায়ের দোকান আছে একটা। টোষ্ট, কলা এইসব পাওয়া যায়। কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না। বরং নিজেকে কোনো-না-কোনোভাবে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে। মুনির ঠিক করল, রাতেও সে কিছু খাবে না। দুগ্নিাস পানি খেয়ে শুয়ে থাকবে। মাঝে-মাঝে সে এ-রকম করে।

সন্ধ্যা মেলাবার আগেই আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামল।শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি একবার শুরু হলে থামবে না। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগছে। তা লাগুক। কাগজগুলো না-তিজলেই হয়। মুনির সদর দরজা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। পা টাটাচ্ছে। বসে পড়তে ইচ্ছে করছে। বৃষ্টির জন্যেই বেশ কয়েকজন ভিখিরিণী আশ্রয় নিয়েছে। খুব অল্প সময়েই এরা কেমন গুছিয়ে নিয়েছে।

পা ছড়িয়ে গল্পগুজব করছে। এক জন আবার রাস্তা আড়াল করে বসে বিড়ি ধরিয়েছে। মুনিরকে দেখে একটু লজ্জালজ্জা পাচ্ছে। অন্য এক জনের কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা। সে বাচ্চাটির সঙ্গে নিচুগলায় কী সব গল্প করছে। এ-রকম ছোট তিন-চার বছরের শিশুর কোনো গল্প বোঝার কথা নয়। কিন্তু শিশুটি মনে হয় বুঝতে পারছে।

বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। রাস্তায় একহাঁটু পানি। এই পানি ভেঙে এজিএম সাহেবের গাড়ি আসূবে না। তিনি নতুন গাড়ি কিনেছেন। গাড়ির গায়ে এক ফোঁটা পানি পড়লে আঁৎকে ওঠেন।বৃষ্টির বেগ ক্রমেই বাড়ছে। শ্রাবণ মাসে ঝড় হবার কথা শোনা যায় না, বাতাসের গতিক দেখে মনে হচ্ছে ঝড় হবে। পাশের চায়ের দোকান ঝাঁপ বন্ধ করছে।মুনির, এই মুনির।

মুনির চমকে উঠল। নিজামুদিন সাহেব। পায়জামা হাঁটু পর্যন্ত তোলা। মাথায় ছাতা থাকা সত্ত্বেও ভিজে জীবজব করছেন। পাঞ্জাবি লেপ্টে গায়ের সঙ্গে মিশে আছে।আমার তাই সন্দেহ হচ্ছিল। এই জন্যই এলাম, তুমি আছ এখনো? বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি।বৃষ্টি তো শুরু হল সুন্ধ্যাবেলায়।

কোন আক্কেলে তুমি সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলে! তুমি কি বায়েজিদ বোস্তামী? আবার হাসছ? এর মধ্যে হাসির কী হল!……..আপনি আমার খোঁজে আবার এলেন? আসব না তো কী করব? বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল ভূমি এখনো আছ। এর নাম হচ্ছে ইনটুশন। এখন চল আমার সঙ্গে। নাকি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকবে? কোথায় যাব? আমার বাসায়! আমার সঙ্গে আজ খাবে। তুমি মহা মুর্থ। মহা-মহা মুর্থ।

নিজাম সাহেবের বাসা ভূতের গলিতে। দু-কামরার টিনের ঘর। কাঁচা রাস্তা পার হয়ে যেতে হয়। জায়গায়-জায়গায় খানাখন্দ। স্ট্রীট লাইট নেই। ইলেকট্রিসিটি না থাকায় সমস্ত অঞ্চলটাই অন্ধকারে ডুবে আছে। নিজাম সাহেব হাত ধরে- ধরে মুনিরকে নিয়ে যাচ্ছেন। কাদায় পানিতে দু জনই মাখামাখি। নিজাম সাহেব সারা পথ গালাগালি করতে-করতে আসছেন। কিছুক্ষণ পর-পর বলছেন, তুমি মহা মুর্থ।

মুনিরের বড় ভালো লাগছে। অনেক দিন পর সে কোনো মানুষের মধ্যে এমন গাঢ় মৃত্যুর পরিচয় গেল। এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে ভদ্রলোক এক-একা গিয়েছেন খোঁজ নিতে।বাড়ি পৌঁছামাত্র গরম পানির ব্যবস্থা হল। নিজাম সাহেব ঠেলে তাকে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলেন। বাথরুম অন্ধকার। সারা বাড়িতে একটামাত্ৰ হারিকেন।মুনির।জ্বি।তাকে সাবান আছে।কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না।দরজা বন্ধ করার দরকার কী? খোলা রাখা।

মুনির দরজা অল্প একটু ফাঁক করল। ভেতরবাড়ির সবটা দেখা যাচ্ছে। ফ্ৰক-পরা একটি কিশোরী মেয়ে বারান্দায় কেরোসিন কুকারে রান্না চড়িয়েছে। মেয়েটির পাশে ভেজা-কাপড়ে নিজাম সাহেব। কি যেন বলছেন মেয়েকে, আর মেয়ে বারবার হোসে উঠছে। অন্ধকারে এই হাসির শব্দ এত মধুর লাগছে! বাড়িতে আর কোনো লোকজন নেই।

নিজাম সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন। অল্প কিছুদিন আগে। দেশের বাড়িতে গিয়ে জ্বরে পড়েছিলেন। জ্বরের সঙ্গে ধীরে-ধীরে আরো সব উপসর্গ যুক্ত হল। খবর পেয়ে নিজাম সাহেব গেলেন দেশে। তিনদিনের আর্নড লীত নিয়ে গিয়েছিলেন। দু দিনের দিন ফিরে এসে যথারীতি হিসাবের খাতা নিয়ে বসলেন। বিকেলে অফিসের ছুটির পরও বসে রইলেন।

মুনির এসে বলল, নিজাম ভাই বাসায় যাবেন না? নাকি আজও হিসাবের গণ্ডগোল আছে?…..নিজাম সাহেব শান্ত গলায় বললেন, অন্যের হিসাব মিলিয়ে দিয়েছি। নিজেরটা মেলে না। আমার স্ত্রী মারা গেছে। বাড়ি গিয়ে দেখি দশ মিনিট আগে ডেডবডি কবর দিয়ে ফেলেছে। অনেকেই বলেছিল। কবর থেকে আবার তোলা হোক। শেষ দেখা। আমি নিষেধ করলাম।নিজাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার চেহারায় বা আচার-আচরণে শোকের কোনো ছাপ নেই। অফিসের হিসাব না-মিললে এই মানুষটি অনেক বেশি বিচলিত হয়।

 

নিষাদ পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

 

Leave a comment

Your email address will not be published.