থার্মোমিটার পাওয়া গেল। দেখা গেল জ্বর সত্যি সত্যি একশ দুই। শওকত সাহেব বললেন, ভবেশ বাবু আপনি ভাল চিকিৎসক।
‘এই কথাটা স্যার আপনি কাগজে লিখে দিয়ে নাম সই করে যাবেন। সার্টিফিকেটের মত সাথে রাখব।
পুষ্প বলল, আরাে পানি ঢালবেন চাচা?
ভবেশ বাবু বললেন, অবশ্যই — পানি জ্বর ধুইয়া নিয়ে যাইতেছে। সেই সঙ্গে রােগের যে বিষ ছিল – সেই বিষ।
‘ভবেশ বাবু। ‘আজ্ঞে স্যার। ‘আপনাদের এখানে যে নদী আছে তার নাম কি?
নদীর নাম সােহাগী। ‘আমিতাে জানতাম – ছােটগাঙ। ‘আগে তাই ছিল – বজলুর রহমান বলে এক পাগল কিসিমের লােক নাম
বদলায়ে দিল।
‘কি ভাবে বদলালাে?”
‘মজার ইতিহাস। সভা মিছিল করে একটা হুলুস্থুল করেছেন। রােজ সকালে উঠে নদীর ধার দিয়ে দৌড়াতেন আর চিৎকার করতেন – সােহাগী, সােহাগী, সােহাগী। স্কুলে ছাত্রদের গিয়ে বলেছেন – তােমরা এই নাম চারদিকে ছড়ায়ে দিবে। তারপর আপনের গান বাঁধলেন সােহাগী নাম দিয়ে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
‘গানের লাইন মনে আছে? ‘আজ্ঞে প্রথম কয়েকটা চরণ আছে। ‘বলুনতাে দেখি। ‘ও নদী তাের কানে আমি চুপে বলিলাম।
সােহাগী তাের নামরে নদী, সােহাগী তাের নাম। ‘এখন সবাই কি নদীটাকে এই নামেই ডাকে?” ‘জি ডাকে। সবাই ডাকে।।
শওকত সাহেব ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন – আসলে সবাই বােধ হয় মনে মনে চাচ্ছিল – এই নদীর সুন্দর একটা নাম হােক। যেই মুহূর্তে নাম পাওয়া গেল – সবাই সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করল।
| ভবেশ বাবু বললেন, আর জল ঢালতে হবে না বলে মনে হয়। জ্বর আরাে কমেছে। এখন জ্বর হচ্ছে একশ এক। পুষ্প মা, থার্মোমিটারটা দিয়ে দেখতাে ঠিক বললাম কি–না।
শওকত সাহেব বললেন, দেখতে হবে না। আপনার কথা বিশ্বাস করলাম। “আজ্ঞে না। পরীক্ষা হয়ে যাক। ‘পরীক্ষা করা হল। জ্বর ঠিকই একশ এক।
‘রুগীকে এখন ঘুমাইতে হবে। পুষ্প মা, রুগীকে একা কইরা দাও। কেউ থাকলেই রুগী কথা বলবাে। ঘুম হবে না।
তারা বের হয়ে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শওকত সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙ্গল রাত এগারােটার দিকে। চোখ মেলেই দেখলেন – বিছনার পাশে পুষ্প বসে আছে। একটু দূরে চেয়ারে পা তুলে মােফাজ্জল করিম সাহেব বসে আছেন। তার মুখ ভয়ে পাংশু বর্ণ।
মােফাজ্জল করিম সাহেব বললেন, স্যার আপনার শরীর এখন কেমন?
‘ভাল। শরীর ভাল। আমি আপনাদের দারুণ উদ্বেগে রেখেছি দয়া করে ক্ষমা করবেন।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
‘কিছু খাবেন স্যার? খাওয়ার রুচি হয়েছে?”
না। তবে একেবারে খালি পেটে থাকা বােধ হয় ঠিক হবে না। এক গ্লাস দুধ। খেতে পারি।
এশার নামাজ শেষ করে করিম সাহেব খেতে বসলেন।
পুষ্পও বসল তার সঙ্গে। করিম সাহেব বললেন, তাের উপর দিয়ে আজ খুব ঝামেলা গেছে। পুষ্প কিছু বলল না।
‘ভবেশ বাবুকে বুদ্ধি করে খবর দিয়ে খুব ভাল কাজ করেছিস মা। ভবেশ বাবু চিকিৎসা কিছু জানেন না। কিন্তু এরা প্রাচীন মানুষ অনেক টোটকা ফোটকা জানেন। সময়মত পানি না ঢাললে অবস্থা হয়ত আরাে খারাপ হত। তুইতাে কিছু খাচ্ছিস না মা।
‘আমার খেতে ভাল লাগছে না। ‘তাের আবার জ্বর আসেনিতাে? দেখি বাঁ হাতটা আমার কপালে ছোঁয়াতে। ‘জ্বর নেই বাবা। ‘না থাকুক ছোঁয়াতে বলেছি ছোঁয়া।
পুষ্প বাবার কপালে হাত রাখল। করিম সাহেব বললেন, হাততাে সােহাগী নদীর পানির মত ঠাণ্ডা।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
বলেছিলাম তাে, জ্বর নাই।
‘। তাই দেখছি। এদিকে আরেক কাণ্ড হয়েছে উনার আসার খবর দিকে দিকে রটে গিয়েছে। কলমাকান্দার সার্কেল অফিসার চিঠি দিয়ে লােক পাঠালেন – – উনাকে নিয়ে তাঁর বাসায় যেন এক কাপ চা খেতে যাই। আমি বলেছি ঠিক আছে।”
‘নিজ থেকে ঠিক আছে বললে কি জন্যে – উনিতাে যাবেন না তুমি জানােই।
‘যেতেও পারে। এরা ঘন ঘন মত বদলায় – কাল সকালেই হয়ত বলবেন, করিম সাহেব এক জায়গায় বসে থাকতেতে আর ভাল লাগছে না। চলুন একটু ঘুরা ফেরা করি।
‘কোনদিনও এই কথা বলবেন না। মাঝখানে তুমি অপমান হবে।
‘আমাদের স্কুলের সেক্রেটারীর বাসায়ও গিয়েছিলাম – বললাম উনার কথা। মহামূর্খ নামও শুনে নাই। যাইহােক বললাম তরফদার সাহেব একটি সম্বর্ধনা স্কুলের তরফ থেকেতাে দেয়া লাগে। উনি বলেন সম্বর্ধনা দিয়ে কি
হবে? মন্ত্রী টস্ত্রী হলে সাহায্য পাওয়ার ব্যাপার ছিল। মূখের কথাবার্তা আর কি। যাই হােক শেষকালে রাজি হয়েছেন। তিনশ টাকা সংস্থান করেছেন। একটা হাতে লেখা মানপত্র দেয়া হবে। স্কুলের সব টিচাররা মিলে উনাকে নিয়ে চা–টা খাবে। এক কাপ চা, সিঙ্গারা, মিষ্টি আর ধর একটা করে কলা।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
“তােমাদের স্কুলের অর্ধেকটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঝড়ে আর তােমরা উনার সম্বর্ধনায় পয়সা খরচ করবে?
‘স্কুল উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আবার হবে – উনাকে পাব কোথায় ?
খাওয়া শেষ করে করিম সাহেব কুয়াতলায় হাত ধুতে গেলেন। পেছনে পেছনে পুষ্পও এলাে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলােয় আবছা করে সব দেখা যাচ্ছে। পুষ্প থালাবাসন ধুচ্ছে করিম সাহেব একটু দূরে বসে সিগারেট টানতে টানতে মেয়েকে দেখছেন। তাঁর বড় মায়া লাগছে। মেয়েটা কষ্টে পড়ে গেছে। একা কত কি দেখতে হচ্ছে। মতির মা’কে কাল যে ভাবেই হােক জোগাড় করতে হবে।
‘পুষ্প। ‘জি বাবা।
‘কয়েকজন গ্রাম্য গাতককে খবর দেয়া দরকার। সন্ধ্যাবেলা একদিন এইখানে একদিন আসর করলে, উনি খুব পছন্দ করবেন।
‘উনাকে না জিজ্ঞেস করে কিছুই করাে না বাবা।
‘জিজ্ঞেস করেই করব। আমাদের কত বড় সৌভাগ্য চিন্তা করে দেখতাে মা – উনার মত মানুষ এই বাড়িতে আছেন।
Read more
