নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

খাবার সময়ও খুব যন্ত্রণা হল। করিম সাহেব প্লেটে ভাত তুলে দিচ্ছেন, তরকারী তুলে দিচ্ছেন। শওকত সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, প্লীজ কিছু তুলে দেবেন না। যা দরকার আমি নিজে নেব।

নীল অপরাজিতাকেউ খাবার তুলে দিলে আমার খুব অস্বস্তি লাগে। ‘আপনিতাে স্যার কিছুই নিচ্ছেন না, মুরগীর বুকের গোশত একটু দিয়ে দেই। 

তিনি শুধু যে মুরগীর বুকের গােশত দিলেন তাই না। এক টুকরা লেবু নিজেই শওকত সাহেবের প্লেটে চিপে দিলেন। 

‘কাগজি লেবুটা স্বাস্থের জন্যে ভাল। আমার গাছের কাগজি স্যার। ‘ভাল। ‘ছ‘টা কাগজি লেবুর গাছ আছে – এর মধ্যে দু‘টা গাছ বাঁজা। ফুল ফোটে – – ফল হয় না। 

‘গাছগুলাে কাটায়ে ফেলব ভেবেছিলাম – আমার মেয়ে দেয় না। ও কি বলে জানেন স্যার? ও বলে বাজা গাছ বলেই কেটে ফেলবে? কত বাজা মেয়েমানুষ। আছে। আমরা কি তাদের কেটে ফেলি? আমি ভেবেছিলাম কথা খুবই সত্য। আমার নিজের এক ফুপু ছিলেন, বাজা। কলমাকান্দায় বিয়ে হয়েছিল। খুব বড় ফ্যামেলি।

তারা অনেক চেষ্টাচরিত করেছে। ডাক্তার কবিরাজ কিছুই বাদ দেয়। নাই। তারপর নিয়ে গেল আজমীর শরীফ। সেখান থেকে লাল সূতা বেঁধে নিয়ে আসল। খােদার কি কুদরত – আজমীর শরীফ থেকে ফেরার পর একটা সন্তান হল। আমি চিন্তা করে দেখলাম – আমার লেবু গাছের বেলায়ওতাে এটা হতে পারে। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

শওকত সাহেব হাত ধুতে ধুতে বললেন, নিশ্চয়ই হতে পারে। আপনি একটা টবে গাছ দুটাকে আজমীর শরীফে নিয়ে যান। লাল সূতা বেঁধে আনুন। 

করিম সাহেব কিছু বললেন না, তাকিয়ে রইলেন। সম্ভবত রসিকতাটা তিনি ধরতে পারেন নি। ‘করিম সাহেব। “জ্বি স্যার।” ‘আপনাদের ওখানে পােস্ট অফিস আছে তাে? 

‘জি আছে। আমাদের গ্রামে নাই। শিবপুরে আছে। আমরা পােস্টপিসের জন্যে কয়েকবার দরখাস্ত দিয়েছি। পােস্ট মাস্টার জেনারেলের এক শালার বিবাহ হয়েছে আমাদের গ্রামে, মুনশি বাড়িতে। উনার মারফতে গত বৎসর একটা দরখাস্ত দিয়েছি। উনি আশা দিয়েছেন – হয়ে যাবে। 

‘শিবপুর আপনাদের গ্রাম থেকে কতদূর?” ‘বেশী না, চার থেকে সাড়ে চার মাইল। ‘আমি আমার স্ত্রীর কাছে একটা চিঠি পাঠাতে চাই – পৌছানাের সংবাদ। ‘কোন চিন্তা নাই স্যার। চিঠি এবং টেলিগ্রাম দূটারই ব্যবস্থা করে দেব। শওকত সাহেব স্যুটকেস খুলে চিঠি লেখার কাগজ বের করলেন। বৃষ্টি আবার জোরে সােরে এসেছে।

এক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না এমন বৃষ্টি। এর মধ্যেই নৌকা ছাড়া হয়েছে। নৌকার মােট তিনজন মাঝি। একজন হাল ধরে বসে আছে। দুজন দাড় টানছে।

বৃষ্টির পানিতে ভেজার জন্যে তাদের মধ্যে কোন বিকার নেই। যে দুজন দাড় টানছে তাদের দেখে মনে হচ্ছে – পঁড় টানার কাজে খুব আরাম পাচ্ছে। করিম সাহেব ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরে বসে আছেন। শওকত সাহেবের অসুবিধা হবে এই কারণে তিনি দুই এর ভেতর যেতে রাজি হন নি। শওকত সাহেব স্যুটকেসের উপর কাগজ রেখে পেন্সিলে দ্রুত লিখে যাচ্ছেন। তার লেখা কাচা তবে গােটা গােটা – দেখতে ভাল লাগে।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

কল্যাণীয়া, হাতের লেখা কি চিনতে পারছ? নৌকায় বসে লেখা কাজেই অক্ষরগুলি এমন চ্যাপ্টা দেখাচ্ছে। ঠাকরােকোনা স্টেশনে ঠিকমতই পৌছেছি। মােফাজ্জল করিম সাহেব উপস্থিত ছিলেন। নাম শুনে মনে হয়েছিল ভদ্রলােকের দাড়ি থাকবে। মাথায় টুপী থাকবে এবং মাপে লম্বা, ন্যাপথলিনের গন্ধ মাখা কেটি থাকবে গায়ে। কোটের অংশ শুধু মিলেছে। ভদ্রলােক সারাক্ষণ কথা বলেন। অনায়াসে তাঁকে কথা–সাগর উপাধি দেয়া যায়। কথলা লােকজন কাজকর্মে কঁচা হয়। ভদ্রলােক তা না। তাকে সর্বকর্মে অতি উৎসাহী মনে হল। তার অতিরিক্ত রকমের উৎসাহে ঘাবড়ে যাচ্ছি।

ভাত খাওয়ার সময় ভদ্রলােক নিজে লেবু চিপে আমার পাতে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। অবস্থাটা ভাবে। আসার সময় তোমার মুখ কালাে বলে মনে হল। তাড়াহুড়ায় জিজ্ঞেস করা হয়নি। তাছাড়া ভাবলাম বিদায়–মুহূর্তে কোন কারণে আমার উপর রাগ করে থাকলেও তা প্রকাশ করবে না। ইদানীং কথা চেপে রাখার এক ধরনের প্রবণতা তােমার মধ্যে লক্ষ্য করছি।

একবার অবশ্যি আমাকে বলেছিলে “তােমাকে কিছু বলা আর গাছকে কিছু বলা প্রায় একরকম। গাছকে কিছু বললে গাছ শুনতে না। পেলেও গাছের ডালে বসে থাকা পাখিরা শুনতে পায়। তােমাকে বললে কেউ শুনতে পায় না।” এই কথাগুলি তুমি ঠাট্টা করে বলেছ না মনের বিশ্বাস থেকে বলেছ আমি জানি না। মন থেকে বললেও আমার প্রতিবাদ করার কিছু নেই।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি নিজেও বুঝতে পারছি আজকাল তােমার কথা মন দিয়ে শুনছি না। আমাকে বলার মত কথাও কি তোমার খুব বেশী আছে? সংসার, ছেলেমেয়ে নিয়ে তুমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। রাত দশটা পর্যন্ত বাচ্চাদের পড়িয়ে, খাইয়ে দাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে তুমি যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তখন আমি বসছি লেখা নিয়ে। সময় কোথায় ? খুব সূক্ষ্ম হলেও সংসার নামক সমুদ্রে দু‘টি দ্বীপ তৈরী হয়েছে।

একটিতে আমি, অন্যটিতে ছেলেমেয়ে নিয়ে তুমি। তাই নয় কি? স্বেচ্ছা নির্বাসনে কিছুদিন কটাতে এসেছি। পরিকল্পনা মত লেখালেখি করব, তার ফাকে অবসরের সময়টা আমাদের জীবন নিয়ে চিন্তা ভাবনাও করব। জীবনের একঘেঁয়েমীতে আমি খানিকটা ক্লান্ত।

নতুন পরিবেশ সেই ক্লান্তি দূর করবে না আরাে বাড়িয়ে দেবে কে জানে! ভাল লাগবে বলে মনে হচ্ছে না। সারাজীবন শহরে থেকেছি। শহরের সুবিধা ও অসুবিধায় এত অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানাে কষ্টকর হবে বলে মনে হয়। কষ্ট করার একটা বয়স আছে। সেই বয়স পার হয়ে এসেছি।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-

তাছাড়া এখনি হােমসিক বােধ করছি। আসার সময় স্বাতীর জ্বর দেখে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম ঘর থেকে বেরুবার আগে তার কপালে চুমু খেয়ে আসব। ড্রাইভার নীচে এত ঘন ঘন হর্ণ বাজাতে লাগল যে সব ভুলে নীচে নেমে এলাম। বেচারীর জুরতপ্ত কপালে চুমু খাওয়া হল না।

আমার হয়ে ওকে আদর করে দিও । আমার থাকার জায়গা কি করা হয়েছে এখনাে জানি না। মােফাজ্জল করিম সাহেবকেও কিছু জিজ্ঞেস করি নি। জিজ্ঞেস করলেই তিনি লং প্লেইং রেকর্ড চালু করবেন। তা শুনতে ইচ্ছা করছে না। আস্তানায় পৌছেই আস্তানা সম্পর্কে তােমাকে জানাব। জায়গাটা পছন্দ হলে তােমাকে লিখব। সবাইকে নিয়ে চলে আসবে। তবে জায়গা পছন্দ হবে বলে মনে হচ্ছে না। অনেক অনেক দিন পর তােমাকে দীর্ঘ চিঠি লিখলাম। ভাল থাক এবং সুখে থাক। 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *