‘স্যার কত দিন থাকবেন এখানে? “ঠিক করিনি। পনেরাে বিশ দিন থাকব।
শুনলাম, নির্জনে একটা লেখা শেষ করার জন্য এসেছেন?”
শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। নির্জনতার যে নমুনা শুরু হয়েছে খুব বেশী ভরসা করতে পারছেন না।
স্যার পান খেলেন না ? ‘পন আমি খাই না। থ্যাংক ইউ। আমি বাইরে একটু দাড়াই।
বাইরে দাঁড়ায়ে কি দেখবেন স্যার, কিছুই দেখার নাই। শীতকালে তাও একটু হাঁটাহাঁটি করা যায় – বর্ষাকালে অসম্ভব। কাঁচা রাস্তা, হাঁটু পর্যন্ত কাদা। দিনরাত বৃষ্টি। খাওয়া–খাদ্য কিছু নাই। ইলিশ মাছ এক জিনিস দুই বছরে চোখে দেখি নাই। তরকারীর মধ্যে আছে উঁটা, পুই শাক আর ঝিঙ্গা। এই তিন জিনিস কত খাওয়া যায় বলেন? পটল এক জিনিস কেউ চোখেও দেখে নাই। অথচ শহর বন্দরে এই জিনিস খাওয়ার লােক নাই।
শওকত সাহেব স্টেশন ঘর থেকে বের হয়ে এলেন আর তখনি কেঁপে বৃষ্টি
এল। শিরীষ গাছের ঘন পাতায় বৃষ্টি আটকে যাচ্ছে। কতক্ষণ এ রকম থাকবে কে জানে। শওকত সাহেব মুগ্ধ হয়ে গাছ, বৃষ্টি এবং দূরের মাঠ দেখতে লাগলেন। সামনের অনেকখানি ফাঁকা। দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া যায়। শহরের সঙ্গে গ্রামের এই বােধ হয় তফাৎ। শহরে দৃষ্টি আটকে যায়। গ্রামে আটকায় না।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
ছাতা মাথায় মােফাজ্জল করিমকে হন হন করে আসতে দেখা যাচ্ছে। পায়ের জুতা জোড়া খুলে তিনি হাতে নিয়ে নিয়েছেন। প্যান্ট ভাজ করে হাঁটু পর্যন্ত তুলে দিয়েছেন। শওকত সাহেব আঁৎকে উঠলেন, তাকেও কি এইভাবে যেতে হবে? বৃষ্টির জোর খুব বেড়েছে। শিরীষ গাছের একটি মাত্র ডালে ছ‘সাতটা কাক বসে বসে ভিজছে। অন্য ডালগুলি কঁকা। কাকরা কি একটি বিশেষ ডাল বৃষ্টির সময় আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে ? এই ডালটার নিশ্চয়ই কোন সুবিধা
আছে।
স্টেশন মাস্টার সাহেবও ছাতা হাতে বের হয়েছেন। তিনি নিজেই ছাতা মেলে শওকত সাহেবের মাথার উপর ধরলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, এই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে খুব কম করে হলেও সাতদিন থাকবে।
শওকত সাহেব বললেন, একটা মজার জিনিস দেখুনতাে। এতগুলি ভাল থাকতে কাকরা সবাই একটা ডালে বসে আছে কেন?
‘পশু পাখির কি স্যার কোন বুদ্ধিশুদ্ধি আছে? একজন একটা ডালে বসছে। গুণ্ঠিশুদ্ধা সেই ডালে গিয়ে বসছে। স্যার ভিতরে চলেন। বৃষ্টিতে ভিজতেছেন।
‘আপনি ছাতাটা আমার হাতে দিয়ে চলে যান। বৃষ্টি দেখতে আমার ভালই লাগছে।
‘একদিন দুদিন লাগবে স্যার। তারপর দেখবেন যন্ত্রণা। গ্রামদেশে সবচে খারাপ সময় হইল বর্ষাকাল।
মােফাজ্জল করিম সাহেব একটা চায়ের দোকানে দাড়িয়ে কি যেন কিনলেন, তারপর আবার যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকে রওনা হলেন। শিরীষ গাছের ঐ ডালটায় আরাে কিছু কাক এসে বসেছে। অন্য ডালগুলি এখনাে ফঁাকা। যখন ঝড়–বৃষ্টি থাকে না তখন এরা কি করে ? অন্য ডালগুলিতে বসে? না–কি কখনাে বসে না? প্রচণ্ড শব্দে কাছে কোথাও বজ্রপাত হল। ধক করে বুকে ধাক্কা লাগল । এত বড় শব্দ অথচ কাকদের মধ্যে কোন রকম চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল না। সম্ভবত তারা শব্দটা কি, কখন হবে, কোথায় হবে জানে বলেই চুপচাপ আছে। আরাে দুটা কাক এসে সেই ডালটাতেই বসল। আশ্চর্যতাে !
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
নৌকা বেশ বড়।
ভেতরে তোষকের বিছানায় রঙিন চাদর। দু‘টা বালিশ, একটা কোলবালিশ। মােফাজ্জল করিম বললেন, বিছানা বালিশ সব বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি। আরাম করতে করতে যাবেন।
শওকত সাহেব বললেন, কোলবালিশ এনেছেন কেন? ‘ঘরে ছিল। নিয়ে এসেছি।
তিনি যে শুধু কোলবালিশ এনেছেন তা না, টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার দাবার নিয়ে এসেছেন। নৌকার চুলায় সেই সব খাবার গরম করা হচ্ছে। দুপুরের খাওয়া শেষ করে নৌকা ছাড়া হবে।
বৃষ্টির তেজ অনেক কমেছে। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। তবে বাতাস আছে।
করিম সাহেব বললেন, এই বৎসর মারাত্মক বন্যা হবে। কি বলেন স্যার?
শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। কথা বললেই কথার পিঠে কথা বলতে হবে। ইচ্ছা করছে না। এক ধরনের ক্লান্তিও বােধ করছেন। বিছানায় শুয়ে পড়লে হয়। কোলবালিশ দেখার পর থেকে কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।
‘স্যার, তরকারীতে কেমন ঝাল খান তাতাে জানি না। আমি বলেছি ঝাল কম দিতে। খুব বেশী কম হলে কাঁচা মরিচ আছে। আমার নিজের গাছের কাঁচা মরিচ
অসম্ভব ঝাল। সাবধানে কামড় দিবেন।
শওকত সাহেব কিছুই বললেন না। এক জায়গায় বসে একদিকেই তাকিয়ে আছেন। চোখের সামনের দৃশ্য এখন খানিকটা একঘেঁয়ে হয়ে গেছে। নৌকার চুলা থেকে ভেজা কাঠের কারণে প্রচুর ধোয়া আসছে। চোখ জ্বালা করছে। ধোয়া
অন্যদিকে সরানাের জন্যে করিম সাহেব তালপাতার একটা পাখা দিয়ে ক্রমাগত হাওয়া করে যাচ্ছেন। এতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং ধোয়া আরাে বেশী হচ্ছে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ
করিম সাহেব। ‘জ্বি স্যার। ‘আমি, আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছি। যদি কিছু মনে না করেন। ‘অবশ্যই বলবেন স্যার। অবশ্যই।
‘আমি মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে তেমন আগ্রহ বােধ করি না। ভাল লাগে না। চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি।
‘সেটা আপনাকে বলতে হবে না। আপনাকে দেখেই বুঝেছি। স্টেশন মাস্টার
সাহেবকে এই কথাই বলছিলাম।
‘করিম সাহেব, আমি আমার কথাটা শেষ করতে পারি নি – আপনাদের ওখানে আমি যাচ্ছি খুব নিরিবিলিতে কিছু কাজ করতে। শহরের পরিবেশে মন হাঁপিয়ে গেছে। নতুন পরিবেশের কোন ছাপ লেখায় পড়ে কি–না সেটা দেখতে চাচ্ছি। কাজেই আমি যা চাই তা হচ্ছে – নিরিবিলি।
‘স্যার আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে না। গ্রামের লােকজন যদি আসেও সন্ধ্যার পর আসবে। এরা আপনার কাছ থেকে দু‘একটা মূল্যবান কথা শুনতে চায়।
‘আমি কোন মূল্যবান কথা জানি না। ‘এটাতাে স্যার, আপনি বিনয় করে বলছেন। ‘না বিনয় করে বলছি না। বিনয় ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই।
Read more