নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

স্যার কত দিন থাকবেন এখানে? ঠিক করিনিপনেরাে বিশ দিন থাকব। 

শুনলাম, নির্জনে একটা লেখা শেষ করার জন্য এসেছেন?” 

শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেননির্জনতার যে নমুনা শুরু হয়েছে খুব বেশী ভরসা করতে পারছেন না। 

নীল অপরাজিতাস্যার পান খেলেন না ? পন আমি খাই নাথ্যাংক ইউআমি বাইরে একটু দাড়াই। 

বাইরে দাঁড়ায়ে কি দেখবেন স্যার, কিছুই দেখার নাইশীতকালে তাও একটু হাঁটাহাঁটি করা যায় বর্ষাকালে অসম্ভবকাঁচা রাস্তা, হাঁটু পর্যন্ত কাদাদিনরাত বৃষ্টিখাওয়াখাদ্য কিছু নাইইলিশ মাছ এক জিনিস দুই বছরে চোখে দেখি নাই। তরকারীর মধ্যে আছে উঁটা, পুই শাক আর ঝিঙ্গাএই তিন জিনিস কত খাওয়া যায় বলেন? পটল এক জিনিস কেউ চোখেও দেখে নাইঅথচ শহর বন্দরে এই জিনিস খাওয়ার লােক নাই। 

শওকত সাহেব স্টেশন ঘর থেকে বের হয়ে এলেন আর তখনি কেঁপে বৃষ্টি 

এলশিরীষ গাছের ঘন পাতায় বৃষ্টি আটকে যাচ্ছেকতক্ষণ রকম থাকবে কে জানেশওকত সাহেব মুগ্ধ হয়ে গাছ, বৃষ্টি এবং দূরের মাঠ দেখতে লাগলেনসামনের অনেকখানি ফাঁকাদৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া যায়শহরের সঙ্গে গ্রামের এই বােধ হয় তফাৎশহরে দৃষ্টি আটকে যায়গ্রামে আটকায় না। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

ছাতা মাথায় মােফাজ্জল করিমকে হন হন করে আসতে দেখা যাচ্ছেপায়ের জুতা জোড়া খুলে তিনি হাতে নিয়ে নিয়েছেনপ্যান্ট ভাজ করে হাঁটু পর্যন্ত তুলে দিয়েছেনশওকত সাহেব আঁৎকে উঠলেন, তাকেও কি এইভাবে যেতে হবে? বৃষ্টির জোর খুব বেড়েছেশিরীষ গাছের একটি মাত্র ডালে সাতটা কাক বসে বসে ভিজছেঅন্য ডালগুলি কঁকা। কাকরা কি একটি বিশেষ ডাল বৃষ্টির সময় আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে ? এই ডালটার নিশ্চয়ই কোন সুবিধা 

আছে। 

স্টেশন মাস্টার সাহেবও ছাতা হাতে বের হয়েছেনতিনি নিজেই ছাতা মেলে শওকত সাহেবের মাথার উপর ধরলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, এই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে খুব কম করে হলেও সাতদিন থাকবে। 

শওকত সাহেব বললেন, একটা মজার জিনিস দেখুনতােএতগুলি ভাল থাকতে কাকরা সবাই একটা ডালে বসে আছে কেন

পশু পাখির কি স্যার কোন বুদ্ধিশুদ্ধি আছে? একজন একটা ডালে বসছেগুণ্ঠিশুদ্ধা সেই ডালে গিয়ে বসছেস্যার ভিতরে চলেনবৃষ্টিতে ভিজতেছেন। 

আপনি ছাতাটা আমার হাতে দিয়ে চলে যানবৃষ্টি দেখতে আমার ভালই লাগছে। 

একদিন দুদিন লাগবে স্যারতারপর দেখবেন যন্ত্রণাগ্রামদেশে সবচে খারাপ সময় হইল বর্ষাকাল। 

মােফাজ্জল করিম সাহেব একটা চায়ের দোকানে দাড়িয়ে কি যেন কিনলেন, তারপর আবার যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকে রওনা হলেন। শিরীষ গাছের ডালটায় আরাে কিছু কাক এসে বসেছেঅন্য ডালগুলি এখনাে ফঁাকাযখন ঝড়বৃষ্টি থাকে না তখন এরা কি করে ? অন্য ডালগুলিতে বসে? নাকি কখনাে বসে না? প্রচণ্ড শব্দে কাছে কোথাও বজ্রপাত হলধক করে বুকে ধাক্কা লাগল এত বড় শব্দ অথচ কাকদের মধ্যে কোন রকম চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল নাসম্ভবত তারা শব্দটা কি, কখন হবে, কোথায় হবে জানে বলেই চুপচাপ আছেআরাে দুটা কাক এসে সেই ডালটাতেই বসলআশ্চর্যতাে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

নৌকা বেশ বড়। 

ভেতরে তোষকের বিছানায় রঙিন চাদরদুটা বালিশ, একটা কোলবালিশমােফাজ্জল করিম বললেন, বিছানা বালিশ সব বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিআরাম করতে করতে যাবেন। 

শওকত সাহেব বললেন, কোলবালিশ এনেছেন কেন? ঘরে ছিলনিয়ে এসেছি। 

তিনি যে শুধু কোলবালিশ এনেছেন তা না, টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার দাবার নিয়ে এসেছেননৌকার চুলায় সেই সব খাবার গরম করা হচ্ছেদুপুরের খাওয়া শেষ করে নৌকা ছাড়া হবে। 

বৃষ্টির তেজ অনেক কমেছেঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছেতবে বাতাস আছে। 

করিম সাহেব বললেন, এই বৎসর মারাত্মক বন্যা হবেকি বলেন স্যার

শওকত সাহেব জবাব দিলেন নাকথা বললেই কথার পিঠে কথা বলতে হবেইচ্ছা করছে না। এক ধরনের ক্লান্তিও বােধ করছেনবিছানায় শুয়ে পড়লে হয়কোলবালিশ দেখার পর থেকে কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। 

স্যার, তরকারীতে কেমন ঝাল খান তাতাে জানি নাআমি বলেছি ঝাল কম দিতেখুব বেশী কম হলে কাঁচা মরিচ আছেআমার নিজের গাছের কাঁচা মরিচ 

অসম্ভব ঝালসাবধানে কামড় দিবেন। 

শওকত সাহেব কিছুই বললেন নাএক জায়গায় বসে একদিকেই তাকিয়ে আছেনচোখের সামনের দৃশ্য এখন খানিকটা একঘেঁয়ে হয়ে গেছেনৌকাচুলা থেকে ভেজা কাঠের কারণে প্রচুর ধোয়া আসছেচোখ জ্বালা করছেধোয়া 

অন্যদিকে সরানাের জন্যে করিম সাহেব তালপাতার একটা পাখা দিয়ে ক্রমাগত হাওয়া করে যাচ্ছেনএতে কোন লাভ হচ্ছে নাবরং ধোয়া আরাে বেশী হচ্ছে। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

করিম সাহেবজ্বি স্যারআমি, আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিযদি কিছু মনে না করেনঅবশ্যই বলবেন স্যারঅবশ্যই। 

আমি মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে তেমন আগ্রহ বােধ করি নাভাল লাগে নাচুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। 

সেটা আপনাকে বলতে হবে নাআপনাকে দেখেই বুঝেছিস্টেশন মাস্টার 

সাহেবকে এই কথাই বলছিলাম। 

করিম সাহেব, আমি আমার কথাটা শেষ করতে পারি নি আপনাদের ওখানে আমি যাচ্ছি খুব নিরিবিলিতে কিছু কাজ করতেশহরের পরিবেশে মন হাঁপিয়ে গেছেনতুন পরিবেশের কোন ছাপ লেখায় পড়ে কিনা সেটা দেখতে চাচ্ছিকাজেই আমি যা চাই তা হচ্ছে নিরিবিলি। 

স্যার আপনাকে কেউ বিরক্ত করবে নাগ্রামের লােকজন যদি আসেও সন্ধ্যার পর আসবেএরা আপনার কাছ থেকে দুএকটা মূল্যবান কথা শুনতে চায়। 

আমি কোন মূল্যবান কথা জানি নাএটাতাে স্যার, আপনি বিনয় করে বলছেন। ‘না বিনয় করে বলছি নাবিনয় ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই। 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *