হুঁ।অফিসে গিয়ে তাকে বলেছিস যে সে পুণ্যবান লোক? জি খালা। আমি একটা লিস্ট করেছি। লিস্টে তাঁর নাম আছে।তোর কথা শুনে ঐ গাধা পুণ্যবান সাজার চেষ্টা করছে। আমাদের এই বাড়ি সে এতিমখানা বানানোর জন্যে দিয়ে দিতে চায়। বলো কী!এত কষ্টের পয়সায় বাড়ি, এটা নাকি হবে এতিমখানা! এতিমখানা তার পাছা দিয়ে ঢুকিয়ে দেব।
খালা, প্লিজ, আরেকটু ভদ্র ভাষা ব্যবহার করো।হারামজাদা, ভদ্র ভাষা আবার কী রে? গাধা পুণ্যবান সাজে। উকিল-মোক্তার নিয়ে বাসায় উপস্থিত। আমি ভাবলাম কী না কী, পরে শুনি এই ব্যাপার। আমাকে ডেকে বলে—সুরমা, তুমি কিন্তু সাক্ষী। সাক্ষী আমি বুঝায়ে দিয়েছি।মারধর করেছ?
ইয়ারকি করিস না হিমু। ইয়ারকি ভালো লাগছে না।খালুজানকে দাও। কথা বলি।ওকে দেব কোথেকে? ও কি বাসায় আছে? জুতিয়ে বের করে দিয়েছি না?স্যান্ডেল-পেটা করেছি।স্পঞ্জ স্যান্ডেল, না চামড়া? হারামজাদা, রসিকতা করিস না। তোকেও জুতা-পেটা করব।খালুজানকে কখন বের করলে? আজ?
হ্যাঁ,সন্ধ্যাবেলা।উকিল-মোক্তার সব নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘর থেকে বের হয়েছে।মোক্তার ব্যাটা ফাইল নিয়ে হুড়মুড় করে রাস্তায় গড়িয়ে পড়েছে।তুমি কি সত্যি সত্যি স্যান্ডেল-পেটা করেছ? অবশ্যই।রাখি খালা? শোন হিমু, গাধাটার সঙ্গে তোর যদি দেখা হয় তাহলে গাধাকে বলবি সে যেন আর ত্রিসীমানায় না আসে…
জি আচ্ছা, আমি বলব। তবে বলার দরকার হবে বলে মনে হয় না।কত বড় সাহস! আমার জমি, আমার বাড়ি সে দান করে দিচ্ছে, আর আমাকে বলছে সাক্ষী হতে। মদ খেয়ে খেয়ে মাথার বারোটা বেজে গেছে সেই খেয়াল নেই।খুব খাচ্ছেন বুঝি? অফিসে গিয়েছিলি, কিছু টের পাস নি? রাত-দিন তো ওর উপরই আছে। গাধার চাকরিও চলে গেছে।বলো কী! অনেক আগেই যাওয়া উচিত ছিল।
আমাকে টেলিফোন ছাড়তে হলো না। আপনা আপনি লাইন কেটে গেল। আমি ফ্যাকাসে ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলাম। ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেছে। আমার ধারণা, মেসে ফিরে দেখব বড় খালু বসে আছেন। আমার ইনট্যুশন তাই বলছে। কিছুদিন পালিয়ে থাকার জন্যে আমার আস্তানা সর্বোত্তম। গ্রীন ফার্মেসির ছেলেটাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে দু’প্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনলাম। বড় খালুর এই হচ্ছে ব্র্যান্ড। আমার ধারণা, মেসে পা দেয়ামাত্র বড় খালু বলবেন, হিমু, সিগারেট এনে দে।মেসে ফিরলাম।
আমার ঘরের দরজা খোলা। ঘর অন্ধকার। খাটের উপর কেউ একজন শুয়ে আছে। আমি ঘরে ঢুকলাম। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে বললাম, বড় খালু, আপনার সিগারেট। ডানহিল।বড় খালু জড়ানো গলায় বললেন, থ্যাংকস। তোর এখানে দু-একদিন থাকব। অসুবিধা আছে?
আমার কোনো অসুবিধা নেই। আপনি থাকতে পারবেন কিনা কে জানে।নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য যে কোনো জায়গায় আমি থাকতে পারি। নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য যে কোনো জায়গায়ই আমার স্বর্গ—দি হেভেন।কিছু খেয়েছেন? না।চলুন আমার সঙ্গে। হোটেলের খাবার খেতে অসুবিধা নেই তো? না।
বড় খালুর উঠে দাঁড়িয়েছেন,তবে দাঁড়ানোর ভঙ্গি শিথিল। বোঝাই যাচ্ছে প্রচুর মদ্যপান করেছেন। মুখে থেকে ভকভক করে কুৎসিত গন্ধ আসছে। কথাবার্তা পুরো এলোমেলো।হিমু! জি।তোর এই মেসের ম্যানেজার এসেছিল। তোর নাকি আজই মেস ছেড়ে দেবার কথা?
হুঁ।আমি রিকোয়েস্ট করে আর এক সপ্তাহ টাইম এক্সটেনশান করেছি।ভালো করেছেন।এক সপ্তাহ পর যদি বের করে দেয়, দুজন একসঙ্গেই বের হয়ে যাব। কী বলিস?সেটা মন্দ হবে না।সেটা মন্দ হয় না।শীতকাল হওয়ায় মুশকিল হয়েছে। গরমকাল হলে পার্কের বেঞ্চিতে আরাম করে ঘুমানো যেত।হুঁ।তুই শুধু হুঁ হুঁ করছিস কেন?কথা বল। বি হ্যাপি।
বুঝলি হিমু, তোর মেসের লোকজন খুবই মাইডিয়ার। এক ভদ্রলোক তোর ঘরের তালা অনেক যন্ত্রণা করে খুলে দিয়েছে। একজন এসে তাসখেলার জন্য ইনভাইট করলেন।ভালো তো।তোদের এখানে কাজের মেয়েটা যে আছে, কি যেন নাম? ময়নার মা? আরে ধুৎ!ময়না তো তার মেয়ের নাম। ওর নিজের নাম কি? নাম জানি না খালু।মনে পড়েছে, ওর নাম হলো কইতরী। সুন্দর না নাম টা?
হ্যাঁ সুন্দর।কইতরী আমাকে চা এনে দিল। অনেকক্ষণ গল্প করলাম কইতরীর সঙ্গে। অসাধারণ মহিলা। গরিব ঘরে জন্মেছে বলে সে হয়েছে ঝি। বড়লোক ঘরে জন্মালে ইউনিভার্সিটির অংকের টিচার হতো…….। বড়খালুর হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। তিনি দেখি এক একবার হুমড়ি খেয়ে গায়ে পড়ে যাচ্ছে। বেতাল অবস্থা।বড় খালু,বমি টমি হবে নাকি?
তুই কি পাগল টাগল হয়ে গেলি?আমি কি এ্যামেচার?আমি হলাম প্রফেশনাল পানকারী। আমার কিছুই হবে না।না হলেই ভালো।বুঝলি হিমু, ওই কইতরী মেয়েটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। I like him. him না বড় খালু, her. ঠিকই বলেছিস,her, I like her. exceptional Lady. তাই নাকি?
তোর খালাকে একটা শিক্ষা দেওয়ার জন্য কইতরীকে বিয়ে করে ফেললে কেমন হয়? তাহলে তোর খালা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। উচিত শিক্ষা হবে। সবাই বলবে- ছিঃ ছিঃ ! ঝি বিয়ে করে ফেলেছে। হো হো হো। হি হি হি।আপনার অবস্থা তো কাহিল বলে মনে হচ্ছে।তোর খালার অবস্থা আরো কাহিল করে ফেলব। একেবারে কাহিলেস্ট করে দেব। কাহিল-কাহিলার- কাহিলেস্ট, তখন সে বুঝবে, হাউ মেনি রাইস, হাউ মেনি পেডি। হি হি হি।
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম।ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেল।হিমু ! জি।একটা কি যে জরুরি কথা তোকে বলা দরকার, মনে পড়েছে না। ফরগটেন।মনে পড়লে বলবেন।খুবই জরুরি ব্যাপার। এখানে দাঁড়া। দাঁড়ালে মনে পড়বে।মাতাল মানুষের কাছে সবই জরুরি। তারা অতি তুচ্ছ ব্যাপারকেও আকাশে তোলে। আমি বড় খালুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তার কিছুই মনে পড়েছে না।
দাঁড়িয়ে থাকলে মনে পড়বে না। বরং আমরা হাঁটি হাঁটলে ব্রেইন ঝাকুনি খাবে,তাতে যদি মনে আসে।এটা মন্দ না।তাকে নিয়ে হোটেলে ঢোকার আগে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। তিনি হাঁটার সময় ইচ্ছা করে বেশি বেশি মাথা ঝাকালেন- তাতেও লাভ হলো না।হোটেলে খেতে বসে তার মনে পড়ে গেল। আনন্দিত গলায় বললেন, মনে পড়েছে। আলেয়া এসেছিল তোর কাছে। চিনেছিস তো? সম্পর্কে তোর খালা হয়। তার বোনের মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিল – খুকি নাম। পরীর মতো মেয়ে।কি জন্যে এসেছিলেন?
খুকির বড় মেয়েটাকে তারা খুঁজে পাচ্ছে না। দুদিন হলো বাসা থেকে উধাও। তোর কাছে এসেছিল, তুই যদি কিছু বলতে পারিস? আমি কি করে বলব? আমিও সেই কথাই ওদের বললাম। আমি বললাম – হিমু বলবে কি করে? ও কি ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের লোক? আলেয়া কিছুতেই মানবে না। আলেয়ার ধারনা, তুই চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধ্যান করলেই বলতে পারবি মেয়েটা কোথায় আছে। হা হা হা।মেয়েটার নাম কি পলিন? হুঁ। তুই চিনিস নাকি?
চিনি।ধ্যান করে বলতে পারবি মেয়েটা কোথায়? না। ধ্যান কি করে করতে হয় জানি না।খুব ইজি। আমি তোকে শিখিয়ে দেব। প্রথমে ঘরটা অন্ধকার করবি। তারপর পদ্মাসন হয়ে বসবি। খালি গা। সবচে’ ভালো হয় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসলে……চোখ পুরোপুরি বন্ধও না, খোলাও না……… বড় খালু খুব আগ্রহ নিয়ে ধ্যানের কৌশল বলছেন। আমি শুনছি।ধ্যান করলে সব পাওয়া যায় রে হিমু, সব পাওয়া যায়। ধ্যান কর। ধ্যান।
ধ্যান করব। রেস্টুরেন্টে ধ্যান সম্ভব না। বাসায় ফিরেই করব।রেস্টুরেন্টেও সম্ভব। এই দেখ আমি করছি। আমাকে দেখে শিখে নে।তিনি উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যান করতে লাগলেন। এবং ত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় কাটা তালগাছের মতো মেঝেতে পড়ে গেলেন। উঠলেন না। উঠের অবস্থা নেই।তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আকাশ মেঘলা হয়েছিল। শীতকালে আকাশে মেঘ মানায় না। শীতের আকাশে থাকবে ঝকঝকে রোদ। আমি হাইকোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছি বলেই একজনের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমি লজ্জিত হয়ে কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, মাফ করে দিয়েছি।
আকাশের দিকে তাকিয়ে যে মন খারাপ ভাবটা হয়েছিল – ভদ্রলোকের এক কথায় সেই মন খারাপ ভাব দূর হয়ে গেল। ইচ্ছে করছে হাত ধরে ভদ্রলোককে কোনো চায়ের দোকানে নিয়ে যাই। খানিকক্ষণ তার সাথে গল্প করি। ভদ্রলোক আমাকে সেই সুযোগ দিলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, আমি অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন। সব ঠিকঠাক তো?
জি, সব ঠিকঠাক।আমার বাবা রিটায়ার করার পর ঠিক আপনার মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটার অভ্যাস করলেন। ফুঁটপাতে হাঁটলেও একটা কথা ছিল -উনি রাস্তা ও পার হতেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। গত বৎসর রাস্তা পার হবার সময় অ্যাক্সিডেন্ট করেন। একটা ট্রাক এসে তাকে চ্যাপ্টা করে রেখে চলে যায়। অনেক দিন পর আবার আপনাকে দেখলাম আকাশে দিকে তাকিয়ে হাঁটতে।এই অভ্যাস দূর করুন।
জি আচ্ছা,করব।পথ চলবেন চোখ খোলা রেখে।চোখ খোলা রাখলে মনের চোখ বন্ধ হয়ে যায়।মনের চোখ বন্ধ থাকাই ভালো। আপনাকে কে যেন ডাকছে। ওই দেখুন গাড়ি।ওই দেখুন গাড়ি? আমি এগুলাম গাড়ির দিকে । গাড়িতে যিনি বসে আছে তাকে চিনি না। বিদেশি টিদেশী হতে পারে – তুরস্ক টুরস্ক হবে। অস্বাভাবিক লম্বা টানা টানা চোখ। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং। লালচে চুল। বোরখা পরা।
তবে বোরখার ভেতর থেকে মুখ বের হয়ে আছে। কালো বোরখার কারণেই বোধ হয় তরুণীকে এমন অস্বাভাবিক রুপবতী লাগছে। ভদ্রমহিলার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলব? ইংরেজি? সর্বনাশ হয়েছে -মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে কথা বলা- শাস্তির মতো।হিমু সাহেব।জি ম্যডাম।কি করছেন? কিছু করছি না।উঠে আসুন।
আমি ড্রইভারের কাছে বসতে গেলাম, ভদ্রমহিলা ইশারা করলেন তার সঙ্গে বসতে। আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মিতু।আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল।এই মেয়ে যে শুধু নিজের চেহারা পাল্টে ফেলেছে তাই না- গলার স্বরও পাল্টেছে।ভারী স্বর। ইংরেজিতে একেই বোধহয় বলে, ‘হাসকি ভয়েজ’।হিমু সাহেব।জি।আমি যে আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রেখেছি সেটা কি জানেন? জি না। জানি না।স্পাই আছে।
স্পাইয়ের কাজ হচ্ছে – আপনার ক্রিয়াকর্ম লক্ষ রাখা এবং আমাকে রিপোর্ট করা।সে কি ঠিকমত রিপোর্ট করছে।হুঁ করছে।মিতু মুখের উপর বোরকা ফেলে দিল। গাড়ি মিরপুরের রাস্তা দিয়ে উড়ে চলছে। ব্যস্ত রাস্তা। এমন ব্যস্ত রাস্তায় ঝড়ের গতিতে গাড়ি চলতে সাহস লাগে। ড্রইভারের মনে হয় সেই সাহসের কিঞ্চিৎ অভাব আছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঘনঘন কাশছে। আমি বললাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
মিতু বলল, কোথাও যাচ্ছি না। ঘুরছি। অকারণে ঘুরার অভ্যাস শুধু আপনার থাকবে, অন্য কারো থাকবে না এটা মনে করা ঠিক না। আপনার চেয়েও অনেক বিচিত্র মানুষ থাকতে পারে।অবশ্যই পারে।আমার স্পাই আপনার সম্বন্ধে কি বলল জানতে চান? জি না। আমার কৌতূহল কম।আমার কৌতূহল কম না। আমার কৌতূহল অনেক বেশি-আমি এখন আপনার নাড়ি নক্ষত্র জানি। হাসবেন না।আমি কি একটা সিগারেট ধরাতে পারি?
পারেন।আমি সিগারেট ধরালাম।মিতু বলল,আপনার এই বিচিত্র জীবনযাপনের উদ্দেশ্য কি? কোনো উদ্দেশ্য নেই। অল্প কদিনের জন্য পৃথিবীতে এসেছি, নিজের মতো করে বাস করতে চাই।আপনি বিয়ে করেন নি? জি না।করবেন না? বুঝতে পারছিনা।কাকে বিয়ে করবেন?রুপাকে? আমি আবার ও হাসলাম।মিতু কঠিন গলায় বলল, হাসবেন না। প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি, জবাব দিন।জানা থাকলে জবাব দিতাম। জবাব জানা নেই।আপনি দেশের বাইরে কখনো গিয়েছেন? জি না।যেতে চান?
আমি চুপ করে রইলাম। মিতু বলল, চুপ করে থাকবেন না। এই প্রশ্নের জবাব আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে- যদি যেতে চান আমাকে বলুন, আমি আপনাকে সারা পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাব। মরুভূমি দেখবেন, তন্দ্রা অঞ্চল দেখবেন।শর্ত কি? কিসের শর্ত? অকারণে নিশ্চয়ই আপনি আমাকে এই সুযোগ দিচ্ছেন না। শর্ত নিশ্চয়ই আছে। সেই শর্তটা কি?
আমারও খুঘুরতে ইচ্ছা করে। একা একা ঘুরতে ভালো লাগে না। একটা সঙ্গী দরকার।পাহারাদার? পাহারাদার না, সঙ্গী। বন্ধু। আপনাকে পছন্দ হয়েছে। আমার কোনো বন্ধু নেই। বাবার মৃত্যুর পর আমি একা হয়ে যাব।আপনার বাবা মারা যাবেন না -আমি পবিত্র মানুষ খুঁজে পেয়েছি।সেই পবিত্র মানুষটি কে?
আছে একজন।সে কি রুপা? হ্যাঁ, রুপা।কি করে ধরলেন? ইনট্যুশন ক্ষমতা শুধু যে আপনারই প্রবল তাই না। আমার ও প্রবল।তাই তো দেখছি।আপনি একবার বলেছিলেন আপনার এক পরিচিত লোক আছে যে হারানো মানুষ সন্ধান দিতে পারে।হ্যাঁ বলেছিলাম। চানখাঁরপুলে থাকে – আব্দুল করিম।তার কাছে আমাকে নিয়ে চলুন তো।এখন যাবেন?
হ্যাঁ এখন যাব। তার ক্ষমতা কি দেখব। যদি সে সত্যি কিছু পারে তাহলে…….. তাহলে কী? আমার একজন হারানো মানুষ আছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না দেখব।চলুন যাই।আব্দুল করিম তার ছাপড়ার ঘর থেকে বের হয়ে আনন্দে দাঁত বের করে ফেলল। আরে, হিমু ভাইজান আফনে? কেমন আছিস? ভালো আছি। আফনের দোয়ায়।ব্যবসাপাতি কেমন হচ্ছে?
ব্যবসা নাই বললেই হয়। কনটেকে একটা কাম করলাম-পুলা হারাইয়া গেছিল। পাঁচ হাজার টেকা কনটেক। বাইর কইরা দিলাম। এর পরে আর টেকা দেই নাই। চোইদ্দবার গেছি। কোনোবার দেই পঞ্চাশ, কোনোবারে কুড়ি……শেষে এমন গাইল দিছি -বলেছি -হারামির বাচ্চা, তোর মারে আমি……..
চুপ চুপ।ছরি ভাইজান ছরি। মিসটেক হইছে- আপনার সাথে মেয়েছেলে আছে খেয়াল নাই। বোরকা পরা খালাম্মা -মাফ কইরা দিবেন। ছোটলোকের জাত- মুখের ভাষার নাই ঠিক…….।আমি মিতুর দিকে তাকালাম। বোরকার ফাকা দিয়ে একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে আব্দুল করিমের দিকে। কিছুই বলছে না।আমি বললাম, একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে। পলিন নাম। তার পেন্সিল বক্স আমার কাছে আছে। মেয়েটা কোথায় আছে বল।
বক্সটা দেন দেহি আমার হাতে।আমি পেনিস বক্স তার হাতে দিলাম। বক্স হাতে নিয়েই আব্দুল করিম ফিরিয়ে দিয়ে বিরস গলায় বলল, হারাইছে কই! এই মেয়ে তার মার সাথেই আছে। মেয়ে ইসকুলে পড়ে। তার গালে পোড়া দাগ আছে। ভাইজান ঠিক বলছি না? হ্যাঁ,ঠিক বলেছ।মিতু বলল, পেন্সিল বক্স হাতে নিয়েই বুঝে ফেললেন? জে।কিভাবে? কিভাবে এইটা তো খালাম্মা জানি না। আল্লাহ পাক এক ক্ষমতা দিছে। এই ক্ষমতা বেইচে খাই।আমার একটা লোক খুঁজে দিতে পারবেন?
জে সারব। অবশ্যই পারব। তই খালাম্মা কনটেকে কাজ করব। টেকা পুরোটাই দেবেন এডভান্স। কাম করতে না পারলে গলায় ইটার মালা দিয়া কানে ধইরে শহর চক্কর দিওয়াইবেন। করিমের কথা এক।যার খোঁজ চান তার নাম দিবেন। ব্যবহারী জিনিস দিবেন। ছবি থাকলে ছবি দিবেন। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।
আচ্ছা আমি আসব।গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম, লোকটাকে কি আপনার বিশ্বাস হয়েছে?মিতু বলল, আপনার হয়? হ্যাঁ হয়। এই ক্ষমতা তার আছে। কিভাবে এই ক্ষমতা তার হয়েছে আমি জানি না।সে আপনার হারানো মানুষ খুঁজে দেবে তবে……। তবে কি?
যে হারিয়ে গেছে তাকে হারিয়ে যেতে দেওয়াই ভালো। হারানো মানুষ খুঁজে বের করতে নেই।মিতু বোধহয় কাঁদছে। বোরকায় মুখ ঢাকা বলে বুঝা যাচ্ছে না।তবে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।মিতু আমাকে আমার মেসবাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। মুখের উপর থেকে বোরকার পর্দা উঠিয়ে দিয়ে বলল, আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি থাকেন তাহলে আর হারানো মানুষ খুঁজব না। আপনি কি রাজি? না।না, কেন?
আপনার আকর্ষণ ক্ষমতা প্রবল। রুপার চেয়ে প্রবল। আমাকে এর বাইরে থাকতে হয়।কেন? আমার উপর এই হলো আদেশ।কার আদেশ?আমার বাবার।তিনি আমার নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিতু যাই। মিতু কোনো জবাব দিল না।আপনার নাম কি মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার? জি।ভালো আছেন?
