প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৮)

কোক পাওয়া গেল না, সেভেন আপ নিয়ে এসেছে। আপনি দোকানে যাবেন না নাজির ভাই ? যাব। গাড়ি আসবে, এগারােটায়। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে মতিঝিল গেছে। আমি চমকে উঠে বললাম, গাড়ি কিনেছেন কবে ? গত মাসে। নতুন গাড়ি ? 

নতুন গাড়ি কেনবার পয়সা কোথায় ? পুরনাে। ড্রাইভারের বেতন দিতে গিয়ে অবস্থা কাহিল ।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

কত দেন বেতন ? 

আট শ’ । তােমার খবর বলাে। কী খবর চান ? করছ কী? তেমন কিছু করছি না। 

নাজির ভাই বিরক্ত স্বরে বললেন, কখনাে তাে কিছু করতে শুনি না। চলে কীভাবে ? 

 চলে কোথায়! চলে না। থেমে থাকে। | চার-পাঁচটা প্রাইভেট টিউশনি করতে, এখনাে কর ? 

একটা অ্যাড ফার্মে কাজ করি। দুটো টিউশনি করি। 

এটাও খারাপ বিজনেস না। এক ঘণ্টা পড়াতে একজন চার শ’ পাঁচ শ’ টাকা চায়, দেখ অবস্থা। 

আমি কিছু বললাম না । নাজির ভাইকে মনে হলাে ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন, কেন কে জানে। 

এত বড় অপারেশন করাচ্ছ, হাতে টাকাপয়সা আছে ? আছে কিছু। 

কত আছে? তিন হাজার টাকার মতাে আছে । বলাে কী! প্রাইভেট টিউশনি করে এত টাকা জমিয়েছ ? 

আমি উত্তর দিলাম না। নাজির ভাই শুকনাে গলায় বললেন, দরকার লাগলে চাইবে আমার কাছে। লজ্জা করবে না। 

 দরকার হবে না। হবে না বুঝলে কীভাবে? তিন হাজার টাকা আজকাল কিছুই না। তা ঠিক। 

শােনাে ফরিদ, তােমার যে ভাই সুইডেনে আছে তার নামটা কী যেন? বাবুল না? বাবুলই তাে নাম ? 

জি। 

প্রথম প্রহর

তাকে টাকাপয়সার জন্য লেখ না কেন? ভাইয়ের কাছে চাইতে আবার লজ্জা কী ? সৎভাইও না। নিজের মায়ের পেটের ভাই। তােমাদের দাবি আছে। 

দেখি, লিখব এবার। তার নিজেরই বােধহয় চলে না। না চললেও লিখবে। বুড়াে বাপ আছে, তার দায়িত্ব আছে ? জি, তা তাে ঠিকই। তার উপর তােমার এত বড় অপারেশন। 

আমি লিখব। এর মধ্যে লজ্জার কিছু নেই (র্যে দেখে না তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। এটাই নিয়ম। 

এগারােটার আগেই গাড়ি এসে পড়ল । সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি মনেই হয় না। নতুন কাঁচা টাকার মতাে চকচক করছে। 

ফরিদ, আমি গেলাম। দুপুরে খেতে আসব । তুমিও দুপুরে খেয়ে তারপর যাবে। হুট করে চলে যেও না। 

দেখি । 

দেখাদেখি না। আমি এলে তারপর যাবে। ড্রাইভার পৌছে দিয়ে আসবে। অসুবিধা হবে না। 

বাবা এলেন বারােটায়। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এই শরীরে কোথায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন কে জানে! আমাকে দেখে প্রথম যে-কথাটি বললেন, সেটি হচ্ছে— কী, আমাকে নিতে এসেছিস ? 

কোথায় যাবেন ? 

অনুর বাসায়। আর কোথায় যাব ? যাওয়ার জায়গা আছে ? অপদার্থ ছেলেপুলে তৈরি করে শেষ বয়সে এই কষ্ট। ছিছি। 

আমি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বললাম, আমার অপারেশনের কথা শুনেছেন ? ‘। অপারেশন কবে ? 

এখনাে ডেট হয় নি। সােমবার হাসপাতালে ভর্তি হবাে। একুশ নম্বর কেবিন। 

বাবাকে খুব চিন্তামগ্ন মনে হলাে। মাথা নিচু করে বসেছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ তুলে তাকালেন। পরাজিত মানুষের মুখ। সারা জীবন অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন। এখনাে করছেন। একটিতেও জয়লাভ করেন নি। কিছু কিছু মানুষ কি শুধু পরাজিত হবার জন্যেই জন্মায়? একসময় থেমে বললেন, নাজিরের বাসায় আর থাকতে পারব না। হারামজাদা ছােটলােক! 

অতি সামান্য আহতই হলাম। বাবা আমার কথা মােটেই ভাবছেন না। আমার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া না-হাওয়ায় তার কিছুই যায় আসে না। তিনি ভাবছেন তার নিজের কথা । 

ফরিদ! বলেন। 

ওরা খায় দায় ভালাে। খাওয়াটাই তাে সব না। ইজ্জত নিয়ে থাকতে হয়। এইখানে পদে পদে বেইজ্জত। 

অনুর বাসাতেও তাে তাই। তবু সেটা মেয়ের বাসা। নিজের লােকের কাছে বেইজ্জতি হওয়া অন্য কথা। 

বাবা আবার চিন্তায় ডুবে গেলেন। আমি মৃদু স্বরে বললাম, বাবা, আমার কিছু টাকা দরকার। হাজারদুই। 

টাকা, আমি টাকা পাব কোথায় ? তাের কি মাথা-টাথা খারাপ ? 

প্রথম প্রহর

বাবা দারুণ চমকে উঠলেন। এতটা চমকানাের প্রয়ােজন ছিল না। কারণ তাঁর কাছে টাকা আছে। চার-পাঁচ হাজার থাকার কথা। বেশিও হতে পারে। 

মা’র মৃত্যুর পর বাবা ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে বড় ছেলের বাড়িতে থাকতে গেলেন। আলনা, চেয়ার, টেবিল থেকে শুরু করে শিল-পাটা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে গেল। এ ছাড়াও মায়ের দুভরি ওজনের একটা গলার হার ছিল যা বাবা বহু চেষ্টা করেও মা’র জীবদ্দশায় বিক্রি করতে পারেন নি। সেটিও নিশ্চয় এতদিনে বিক্রি হয়েছে। এবং তার মতাে কৃপণ লােক একটি টাকাও খরচ করবেন বিশ্বাস হয় না। সবই জমা আছে। 

বাবা, অপারেশনে অনেক খরচপত্র আছে। সরকারি হাসপাতালে অপারেশন-এর আবার খরচ কিসের ? কেবিন নিয়েছি। কেবিনের চার্জ আছে।। 

কেবিন নিলি কেন ? কেবিনে কি আলাদা চিকিৎসা হয় ? সব একপদের চিকিৎসা। চেষ্টা-চরিত্র করে জেনারেল ওয়ার্ডে চলে যা। 

বাবা, কিছু টাকা দেন। আপনার কাছে তাে আছে। 

যা আছে সেটা বিড়ি সিগ্রেট খাওয়ার খরচ। একটা পয়সা কেউ দেয় ? বাবুল দিয়েছে কিছু? 

আমি তাে দিতাম। মাসে পঞ্চাশ করে দিতাম। পঞ্চাশে কী হয় ? হােটেলে এক বেলা খেতে লাগে কুড়ি টাকা । যা পেরেছি দিয়েছি। আপনি এখন কিছু দেন। 

আমার কাছে টাকা নেই। বাবুলের কাছে চিঠি লিখলাম, টাকাপয়সার কথা লিখলাম। তার কোনাে উত্তর নাই। সে তার মেমসাহেবের ছবি পাঠিয়েছে। হারামজাদা! 

দেখি ছবিটা ? 

বাবা ছবি আনতে গেলেন। বাড়ির একটি কাজের মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, আমি গােসল করব কি-না। আমি বললাম, আমি এখানে ভাত খাব না। চলে যাব। মেয়েটি মনে হলাে বেশ অবাক হয়েছে। আমাকে বােধহয় সেই শ্রেণীর গরিব আত্মীয়দের মতাে দেখাচ্ছে যারা অত না খেয়ে কখনাে যায় না।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *