প্রিয়তমেষু পর্ব:০৬ হুমায়ূন আহমেদ

প্রিয়তমেষু পর্ব:০৬

রান্না শেষ করে নিশাত দ্বিতীয় বার স্নান করল। তবু নিজেকে ঠিক ফ্রেশ মনে হচ্ছে না। মনের কোথাও যেন খানিকটা কাদা লেগে আছে। এই কাদা কিছুতেই দূর হবে না। তার প্রচণ্ড খিদে লেগেছিল। এক বার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে খেতে বসে গেল। রাত দশটার মতো বাজে। আর অপেক্ষা করার অর্থ হয় না। জহির নিশ্চয়ই খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফিরবে।পুষ্প কিছু খেয়েছে কি না কে জানে। হয়ত খায় নি। খোঁজ নেওয়া উচিত। কিন্তু প্রচণ্ড আলসেমিতে শরীর কেমন করছে। মনে হচ্ছে কোনোমতে বিছানায় গড়িয়ে পড়তে পারলে বেঁচে যাবে। তা ছাড়া এরা স্বামী-স্ত্রী এখন কিছু সময় একা থাকুক। এর প্রয়োজন আছে।

ভাত শেষ না-করেই নিশাত উঠে পড়ল। খিদে আছে, কিন্তু খেতে ইচ্ছা করছে না। অদ্ভুত শারীরিক অবস্থা! জহির এল রাত এগারটায়। মুখে অনুতপ্ত মানুষের লাজুক হাসি। টাই খুলতে। খুলতে বলল, মহিউদ্দিনের পাল্লায় পড়েছিলাম। জোর করে ঢাকা ক্লাবে নিয়ে গেল। ইচ্ছা ছিল না। দু পেগ হুইস্কি খেতে হল। যত বলি লিকার আমার পছন্দ না, তত জোর করে। সব মাতালরা অন্যদের মাতাল বানানোর চেষ্টা করে। মনে করে এটা তাদের ডিউটি। ভাত খেয়েছ? হ্যাঁ। তুমি নিশ্চয়ই খেয়ে এসেছ?

হুঁ। কেমন বমি-বমি লাগছে। হুইস্কি আমার একেবারেই সহ্য হয় না।তুমি এমনভাবে কথা বলছ যেন কৈফিয়ত দিচ্ছ আমার কাছে। কৈফিয়ত দেবার কিছু নেই। খেতে ইচ্ছা করলে তুমি খাবে। মাতাল হতে চাইলে হবে। তোমার জীবন হচ্ছে তোমার, আমারটা আমার।জহির বিস্মিত হয়ে বলল, তার মানে? মানে কিছু নেই।মনে হচ্ছে তুমি খুব রেগে গেছ।না, আমি মোটও রাগি নি। এর আগেও তুমি অনেক বার লিকার খেয়ে বাড়ি ফিরেছ। কখনো আমি কিছু বলি নি। বলেছি? তা বল নি, কিন্তু মুখ অন্ধকার করেছ। মুখ অন্ধকার করার চেয়ে বলে ফেলা ভালো।আজও কি আমার মুখ অন্ধকার মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ।দুঃখিত। মুখ অন্ধকার করতে চাই নি। হাতমুখ ধুয়ে শুয়ে পড়। তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছ না। বিশ্রাম নাও।জিনিসটা আমার সহ্য হয় না, মাতালের পাল্লায় পড়ে……কড়া করে এক কাপ কফি করতে পারবে? হ্যাঁ, পারব।নিশাত রান্নাঘরে ঢুকল। কফি বানাল। টেবিলের উপর থেকে খাবারদাবার ফ্রীজে ঢুকিয়ে রাখল। জহির এসে উকি দিল রান্নাঘরে।নিশাত, তোমার টেলিফোন। মোহাম্মদপুর থানা থেকে ইন্সপেক্টর নুরুদ্দিন তোমাকে চাচ্ছেন। ব্যাপারটা কি? ব্যাপার কিছু না।ব্যাপার কিছু না মানে? দুপুর-রাতে থানা থেকে তোমাকে টেলিফোন করবে। কেন? হয়েছেটা কি?

বললাম তো কিছু হয় নি।নিশাত টেলিফোন ধরল। ইন্সপেক্টর নুরুদ্দিন বললেন, সরি, অনেক রাতে টেলিফোন করলাম।অসুবিধা নেই। আমি জেগেই ছিলাম।আমরা মিজানকে এই কিছুক্ষণ আগে গ্রেফতার করেছি, এই খবরটা আপনাকে দিলাম। আপনি যদি এঁকে খবরটা দেন, উনি হয়তো খুশি হবেন।আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।আরেকটা কথা আপনি বারবার জানতে চাচ্ছিলেন যে, মেডিকেল রিপোর্টে কিছু পাওয়া গেছে কি না। কিছু পাওয়া যায় নি।সে-কী।এইসব ব্যাপারে সাধারণত ধস্তাধস্তি হয়। জখম থাকে ভিক্টিমের গায়ে। কামড়ের দাগ থাকে। সে-সব কিছুই নেই।ও অজ্ঞান ছিল?

হ্যাঁ, তাই। আমি বুঝতে পারছি। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হচ্ছে। কোর্টকে বোঝাতে হবে। মুশকিল কি হচ্ছে জানেন, কোনোসিমেনও পাওয়া যায় নি।তাই নাকি? হ্যাঁ। তার কারণ বুঝতে পারছি। মেয়েটি নিশ্চয়ই বেশ কয়েক বার গোসল করেছে। এইসব ক্ষেত্রে মেয়েরা তাই করে। বিপদে পড়ি আমরা। চিহ্ন থাকে না।কেইস দাঁড় করাতে পারবেন না? আমার নাম নুরুদ্দিন-আমি খুব খারাপ লোক। আমি কেইস দাঁড় করিয়ে দেব। আপনারা খুব ভালো এক জন লইয়ার দেবেন। আচ্ছা রাখি।নিশাত টেলিফোন রেখে দিল। জহির তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে থমথমে গলায় বলল, কি হয়েছে? পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটি রেপ্‌ড্‌ হয়েছে।তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি? তোমাকে টেলিফোন করেছে কেন?

আমি মেয়েটিকে পুলিশের কাছে নিয়ে গিয়েছি।তুমি নিয়ে গেছ। কেন? তুমি কেন? তোমার কিসের মাথাব্যথা? নিশাত চুপ করে আছে। জবাব দিচ্ছে না। এক বার ছোট্ট একটা হাই তুলল। জহির বলল, কথা বলছ না কেন? তুমি সুস্থ না। কাজেই কথা বলছি না।আমি সুস্থ না? না। তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছ না। যা মনে আসছে বলছ। এখন আমি তোমার কোনো কথার জবাব দেব না।নিশাত শোবার আয়োজন করছে। ঝাড়ন দিয়ে বিছানা ঝাড়ছে। মশারি জলে। কড়া বাতি নিভিয়ে নীল বাতি জ্বালাল, যেন কিছুই হয় নি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার যেন কোন অস্তিত্ব নেই। নিশাত মশারির ভেতর থেকে বলল, এস, শুয়ে পড়। রাত কম হয় নি।জহির হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ঘুমুতে এল। কোমল গলায় বলল, ঘুমিয়ে পড়েছ?

না, চেষ্টা করছি।কিছু মনে করো না নিশাত। হঠাৎ মাথা এলোমেললা হয়ে গেল। আই অ্যাম সরি।আমি কিছু মনে করি নি।জহির একটা হাত নিশাতের গায়ে তুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এল। নিশাত খুব সাবধানে হাতটা সরিয়ে দিল। স্পর্শ সবসময় সুখকর হয় না। নিশাতের ঘুম আসছে না। অদ্ভুত একটা কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে খুব একা লাগছে।সে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশে খুব তারা। ঝলমল করছে। আকাশ। কত নক্ষত্ৰ কত ছায়াপথ। সীমাহীন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একজন মানুষের নিঃসঙ্গতাও কি সীমাহীন হয়?

রকিব জেগে আছে। সে উবু হয়ে খাটের উপর বসে আছে। তার পাশেই পল্টু। মেঝেতে সারা গায়ে চাদর জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে পুষ্প শুয়ে আছে। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার। পুষ্প ঘুমিয়ে আছে কি না বুঝতে পারছে না। ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু মাঝে মাঝে নড়াচড়া করছে। যেভাবে সারা গায়ে চাদর জড়িয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে জ্বর এসেছে।পুষ্প। এই পুষ্প।পুষ্প একটু নড়ল, কোনো রকম শব্দ করলো না। রাতে তাদের কারোরই খাওয়া হয় নি। রকিবের প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কিন্তু এই মুহুর্তে খাওয়ার কথা কী করে পুষ্পকে বলবে বুঝতে পারছে না। রাতে রান্না হয় নি। খাবারদাবার কিছু বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। রাত জাগলেই খিদে পায়।পুষ্প। এই পুষ্প।কি? থানায় কী হল?

পুষ্প জবাব দিল না। চাদরে মুখ ঢেকে দিল। অত্যন্ত অবাক হয়ে রকিব লক্ষ করল, এই মুহূর্তে তার শুধু খিদের কথাটাই বারবার মনে হচ্ছে। অন্য কিছু মনে আসছে না। সে মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। পুষ্পের মাথার কাছে চেয়ারটায় খানিকক্ষণ বসে রইল। ভোর হতে কত দেরি কে জানে। ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করছে না। তবে মনে হচ্ছে খুব দেরি নেই। ভোর হলে সে কী করবে? তার কী করা উচিত? এই বাড়িতে থাকা যাবে না। তার কেন জানি মনে হচ্ছে আশপাশের সবাই ব্যাপারটা জেনে গেছে। পুলিশ যাওয়া-আসা করেছে। জানাই তো উচিত। বাড়িওয়ালার ভাগ্নে এসে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? সে শুকনো গলায় বলল, কিছু না।পুলিশ কী জন্যে?

এই মামুলি ব্যাপার। কিছু জিনিসপত্র চুরি গেছে।ছেলেটা এই কথা বিশ্বাস করল না। কীরকম অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল। সবই হচ্ছে কপালের খেলা। এত মেয়ে থাকতে সে কি না বিয়ে করল পরীর মতো একটা মেয়েকে কালো, নাক বোঁচা, বেঁটে একটা মেয়েকে বিয়ে করলে কি আর এই সমস্যা হত? সুখে থাকত সে। মহা সুখে থাকত। কথায় আছে না, পয়লা নম্বরী সুন্দরীর সঙ্গে করতে হয় ফষ্টিনষ্টি, দু নম্বরী সুন্দরীর সঙ্গে করতে হয় প্রেম। বিয়ে করতে হয় তিন নম্বর সুন্দরীকে।সে করেছে বিরাট আহাম্মুকি। সুন্দরী বিয়ে করেছে। সুন্দর ধুয়ে এখন কি সে পানি খাবে? দেখতে সুন্দর হলেই হল না, বুদ্ধিও থাকতে হয়। বুদ্ধি থাকলে কখনো এই কাণ্ড ঘটে?

একটা চিৎকার দিলে পঞ্চাশটা মানুষ আসে। সাহায্যের জন্যে আসে না, মজা দেখার জন্যে আসে। তাতে তো অসুবিধার কিছু নেই। লোক তো জড়ো হয়।এই কেলেঙ্কারির কথা নিশ্চয়ই পত্রিকায় উঠবে। পত্রিকাওয়ালারা এইসব জিনিসই খোঁজ। বক্স করে ছাপায়। এই খবরগুলি লোজন পড়েও আগে। কালকের খবরের কাগজ খুললেই হয়তো দেখা যাবে, গৃহবধূ পুষ্প ধৰ্ষিতা। আত্মীয়স্বজনেরা ব্যাপারটা কীভাবে নেবে কে জানে। জনে-জনে চিঠি লিখতে হবে, বাদ সমাচার এই যে খবরের কাগজে যে সংবাদ ছাপা হইয়াছে ইহার সহিত আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। নাম ও জায়গা এক হওয়ায় কিছুটা বিভ্ৰাট সৃষ্টি হইয়াছে। আমি পড়িয়াছি যন্ত্রণায়। জনে-জনে পত্রপাঠ উত্তর দিবেন। শ্রেণীমতে সালাম ও দোয়া দিবেন। আরজ ইতি।

কিছুতেই ব্যাপারটা জানাজানি করতে দেওয়া যাবে না। কেইসের তো প্রশ্নই আসে না। পুষ্পকে বুঝিয়ে বলতে হবে। মাথা খারাপ করলে তো চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।রকিব শেষ সিগারেটটা ধরাল। পল্টু জেগে উঠেছে। রাতে এক বার উঠে দুধ খায়। এটা কি সেই ওঠা কি না কে জানে! পল্টু কাঁদতে শুরু করেছে। পুষ্প নড়ছে না। যেন। পল্টুর কান্নার শব্দ তার কানে যাচ্ছে না। রকিব বলল, এই পুষ্প, ওকে দেখ না! একটু দুধটুধ খাবে বোধহয়। পুষ্প উঠল, কিন্তু তার বাবুর কাছে গেল না। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে হাউমাউ শব্দে কাঁদতে শুরু করল। শব্দ যাতে বাইরে না আসে তার জন্যে দরজা বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু শব্দ আসছে।

রকিব স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। এই প্রথম বারের মতো মনে হল, পুষ্পকে কিছু সান্ত্বনার কথা বলার দরকার ছিল। সে বলে নি।রকিব বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, এই পুষ্প, কী করছ? দরজা খোল। পুষ্প দরজা খুলে বেরিয়ে এল। সহজ ভঙ্গিতে বাবুকে কোলে নিয়ে দুধ খেতে দিল। ছেলেটা এত বড় হয়েছে, এখনন মার দুধ খায়! রকিব নিচু গলায় বলল, কান্নাকাটি করে এখন আর কী হবে। মানে…… সে তার কথা শেষ করল না। কারণ, কী বলবে বুঝতে পারল না।পুষ্প থেমে-থেমে বলল, তুমি কি এখন আমাকে ঘেন্না করছ?

ঘেন্না করব কেন? শরীরটা নোংরা হয়ে আছে এই জন্যে।কী যে বল! তুমি আমাকে ঘেন্না করছ। আমি তোমার চোখ দেখেই বুঝেছি। এইসব বোঝা যায়।বাথরুমের আলোর খানিকটা এসে পড়েছে পুষ্পের গায়ে। কী অদ্ভুত সুন্দরই না তাকে লাগছে। রকিব এগিয়ে এসে পুষ্পের পিঠে হাত রাখল। পুষ্প শান্ত স্বরে বলল, আমাদের বাসার পাশে একজন মোক্তার সাহেব থাকতেন। কতগুলি গুণ্ডা ছেলে তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে এক রাত একটা দোকানে আটকে রেখেছিল। তাঁর স্ত্রী পরদিন ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু মোক্তার সাহেব তাঁর স্ত্রীকে ঘরে নেন নি। পরের বছর তিনি আরেকটা বিয়ে করেছিলেন।রকিব বলল, আজেবাজে কথা বলার কোনো দরকার নেই। এস কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। ভোরবেলায় আমরা এইখানে তালা দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাব। কল্যাণপুরে তোমার ভাইয়ের বাসায় কিংবা অন্য কোথাও।কেন? কল্যাণপুরে যাব কেন?

এইখানে জানাজানি হয়ে গেছে। নানান জনে নানান কথা বলবে।বলুক। আর জানাজানি তো হবেই। কোর্টে কেইস উঠবে না? তুমি কী ভাবছিলে? আমি মুখ বন্ধ করে বসে থাকব? রকিব অবাক হয়ে লক্ষ করল, এই পুস্প দিনের বেলা ভেঙে পড়া পুষ্প নয়। অন্য পুষ্প, তাকে সে ঠিক চেনে না।নিশাত খুব ভোরবেলায় তার মার বাড়িতে চলে এল। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাবাকে ধরা।ফরহাদ সাহেব সকাল আটটার আগেই বাড়ি থেকে বের হন। রিটায়ার করার পর বিদেশি এক কোম্পানিতে কনসালটেন্সি করেন। ওদের অফিস শুরু হয় আটটায়।গেট খুলে নিশাত অবাক হয়ে গেল। বারান্দায় তার বোন মীরু। ছবছর পর দেখা। এরা থাকে নিউজার্সিতে। দেশে যে বেড়াতে আসবে এরকম কোনো আভাস চিঠিপত্রে ছিল না।নিশাত ছুটে এসে মীরুকে জড়িয়ে ধরল। মীরু বলল, দম বন্ধ করে মারবি নাকি? ছাড় তো! না, ছাড়ব না।

নিশাত আনন্দে কেঁদে ফেলল। মীর হাসতে-হাসতে উচু গলায় বলল, এই, তোমারা সবাই এসে দেখে যাও নিশাত কেমন ভ্যাভ্যা করে কাঁদছে। এই মেয়েটা দেখি বড় হল না! মীরুর নিজের চোখ ভিজে গেল। কত দিন পর দেখছে নিশাতকে। খুব সখ ছিল ওদের বিয়ের সময় থাকবে। আসা হয় নি।মীরুর স্বামী ইয়াকুব বেরিয়ে এসেছে। সে হাসিমুখে বলল, নিশাত, এবার তোমার দুলাভাইকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ কাঁদ। তাকেও তো তুমি অনেক দিন পর দেখছ।আপনারা কখন এসেছেন দুলাভাই?

ঢাকা এয়ারপোর্টে এসে পৌছলাম রাত দটায়। বেরুতে-বেরুতে সাড়ে তিন। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যে কাউকে কোনো খবর দেওয়া হয় নি। কাজেই এয়ারপোর্ট থেকে শহরে আসার কোনো ট্রান্সপোর্ট নেই। মহা যন্ত্রণা! তোমরা দুবোন পরস্পরের দুঃখের আলাপ কিছু করে নাও। তারপর আমি কথা বলব। এক কাজ কর, একটা ঘরে ঢুকে যাওবাইরে থেকে আমি দরজা বন্ধ করে দি।নিশাত বলল, বাচ্চারা কোথায়? ওদের আনি নি। স্কুল খোলা। বাংলাদেশের স্কুল তো না, যে অ্যাবসেন্ট করা যাবে।ক দিন থাকবে? গুনে গুনে দশ দিন। আজকের দিন চলে গেলে থাকবে ন দিন। কাজেই তুই তোর বরকে নিয়ে চলে আয়। এই দশ দিন একসঙ্গে থাকব। তোর বরটা কেমন?

ভালো।শুকনো মুখে ভালো বলছিস কেন, জোর করে বল। মা বলছিলেন, একটু নাকি গম্ভীর টাইপের, অমিশুক। শ্বশুরবাড়িতে বিশেষ আসেটাসে না।নিশাত জবাব দিল না। তার একটু মন-খারাপ হল। মা জহিরকে তেমন পছন্দ করেন না। করতেই যে হবে তেমন কথা নেই, কিন্তু যার সঙ্গে দেখা হয় তার সঙ্গেই প্রথমে নিজের অপছন্দের কথাটা বলেন। মীরু আপাকে আসতে-না-আসতেই বলেছেন। দু-একটা দিন অপেক্ষা করতে পারলেন না।নিশাত, তোর বরকে ইয়াকুবের সঙ্গে জুড়ে দেব, দেখবি সাত দিন তাকে সামাজিক বানিয়ে ছেড়ে দেবে।সব জামাই কি আর এক রকম হয় আপাং মার বড় দুলাভাইকে মনে ধরেছে, আর কাউকে তাঁর পছন্দ হবে না।তোর নিজের কি হোর বরকে পছন্দ হয়েছে?

হ্যাঁ, হয়েছে।গুড। আর কারো পছন্দ হোক না-থোক তাতে কিছু যায়-আসে না। দাঁড়া তোর দুলাভাইকে পাঠিয়ে দিই, জহিরকে নিয়ে আসবে।কাউকে পাঠাতে হবে না, খবর দিলে নিজেই চলে আসবে।না, ও গিয়ে নিয়ে আসবে। তোর জন্যে চমৎকার গিফট এনেছি। তোর দুলাভাই পছন্দ করে কিনেছে। বিয়ে উপলক্ষে গিফট। আন্দাজ কর তো কী? আন্দাজ করতে পারছি না।দাঁড়া, এখানে আমি নিয়ে আসছি। তার আগে আমার গালে একটা চুমু খা তো।নিশাত মীরুর গালে চুমু খেল। আবার তার চোখে পানি এসে গেল। মীরু বলল, তোর পাশের ফ্ল্যাটের একটা মেয়ে নাকি রেড় হয়েছে? তুই খুব ছোটাছুটি করছিস? কে বলেছে?

না, মার কাছে শুনলাম। তুই সাবধানে থাকবি। কেমন ফ্ল্যাট তোদর? ভালো প্রিকশন নেই। ঐ ফ্ল্যাট তুই ছেড়ে দে। অসম্ভব, ওখানে তোক যেতেই দেব না।নিশাত মুগ্ধ হয়ে মীরুকে দেখছে। কেমন হড়বড় করে কথা বলছে। কী সুন্দর লাগছে আপাকে। গিফট দেখাবার কথা বলেছে, এখন আর তা তার মনে নেই।নিশাত রান্নাঘরে উঁকি দিল। মা খুব ব্যস্ত। রাজ্যের রান্না মনে হচ্ছে এক দিনে বেঁধে ফেলবেন। তাঁর মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। তিনি এক বার শুধু নিশাতের দিকে তাকিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।এত আয়োজন কি শুধু সকালের নাশতার মা? হ্যাঁ, তুই জহিরকে আনবার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দে।গাড়ি পাঠাতে হবে না, আমি টেলিফোন করছি, চলে আসবে।নিশাত তার বাবার খোঁজে গেল। তাঁকে পাওয়া গেল না। তিনি কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। নিশাত জহিরকে টেলিফোন করল।

হ্যালো, তুমি এখানে চলে এস।কেন বল তো! আপা আর দুলাভাই এসেছেন আমেরিকা থেকে।তাই নাকি? হ্যাঁ, সারপ্রাইজড ভিজিট। তুমি চলে এস। অফিসে যেতে হলে এখান থেকে যাবে।আসছি। নিশাত শোন, ঐ মেয়েটি, মানে পুষ্প, বেশ কয়েক বার এসে তোমার খোঁজ করে গেছে।কিছু বলেছে? না, বলে নি।তুমি কি আসবার সময় জিজ্ঞেস করে আসবে কী ব্যাপার? জহির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে। না। তুমি ইনভলব্‌ড্‌ হয়েছ এই যথেষ্ট। পুরো পরিবারসুদ্ধ ইনভলব্‌ড্‌ হবার কোন কারণ দেখি না।ইনভলব্‌ড্‌ হবার তো কথা হচ্ছে না। তুমি শুধু জিজ্ঞেস করবে কী ব্যাপার? এর মধ্যে যদি এখানে আসে তা হলে জিজ্ঞেস করব। আমি নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারব না।আচ্ছা, তাই করো।

 

Read more

প্রিয়তমেষু পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.