বলপয়েন্ট পর্ব-০৪ হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট

তবে নিজেদের সম্পর্কে কিছুই বলে না।তাদের যান্ত্রিক কোনো কিছু নেই। কারণ, তাদের যন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই। মহাকাশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে তারা ছোটাছুটি করতে পারে।ধারণা করা হচ্ছে অঁহকরা অতি শান্তিপ্রিয়। সিরাস নক্ষত্রের গ্রহ ‘ভি থ্রি’র অতি উন্নত প্রাণী মায়রাদের একটি দল একবার অঁহকদের লক্ষ করে আণবিক ব্লাস্টার, লেজার-নিও ব্লাস্টার এবং পজিট্রন ব্লাস্টার নিক্ষেপ করে। সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার মতো অবস্থা তৈরি হয়।

এর উত্তরে অঁহকরা তাদের যাত্রাপথ থেকে সরে যায় এবং তাদের কাছে একটি বার্তা পাঠায়। বার্তায় বলা হয়— ধ্বংসে আনন্দ নেই। আনন্দ সৃষ্টিতে।অঁহকদের মোট সংখ্যা, তাদের জীবনকাল কিংবা বাসস্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নি। খুব সম্ভব তাদের নির্দিষ্ট কোনো বাসস্থান নেই।

তাদের শরীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া এবং জৈব রসায়ন বিষয়ক কোনো কিছুই জানাযায় নি। স্পেকট্রোগ্রাফিতে প্রাপ্ত সামান্য তথ্যেঅনুমান করা হয় তারা মেঘসদৃশ্য প্রাণী। তাদের বলয়থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে গামা রশ্মি এবং এক্স রশির বিকিরণ হয়। এই বিকিরণ অনিয়মিত বলেই তাদের উপস্থিতি আগে থেকে বোঝা যায় না।

গ্যালাকটোপিডিয়াতে অঁহকদের সম্পর্কে খারাপ কিছু নেই। মহাবিশ্বের অন্যসব বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গেই তাদের যুক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের স্থান হয়েছে রেড বুকে। রেড বুকে নাম ওঠার অর্থ এদের কাছে যাওয়া অতিবিপদজনক।স্পেসশিপ ‘লি-২০১’ একটি সাধারণ ফেরিশিপ। এর কাজ সৌরমন্ডলের ভেতরে গ্রহ এবং উপগ্রহ থেকে খনিজ দ্রব্য মঙ্গল গ্রহে নিয়ে যাওয়া। খনিজ দ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির সব বড় বড় কলকারখানাই মঙ্গল গ্রহে করা হয়েছে।

স্পেসশিপ লি-২০১-এর মাল বহনের ক্ষমতা অসাধারণ। এর ইঞ্জিন ইলেকট্রন এমিশন ইঞ্জিন। পুরনো ধরনের ইঞ্জিন হলেও ভারি ইঞ্জিন এবং কার্যকর ইঞ্জিন। সাধারণত ০.2C [C আলোর গতিবেগ] গতিতে চলে। প্রয়োজনে এই গতিবেগ বাড়িয়ে ০.6C পর্যন্ত যাওয়া যায়। লি সিরিজের স্পেসশিপ পরিচালনার জন্যে কোনো মহাকাশ নাবিকের। প্রয়োজন হয় না। সাধারণ এনারবিক রোবট কম্পিউটারের সাহায্যে এই কাজ সুন্দরভাবে করতে পারে।

তবে লি সিরিজের দু’শর ওপরের নাম্বার শিপে অবশ্যই একজন মহাকাশ নাবিক লাগে। কারণ, এই সিরিজ তৈরি করা হয়েছিল মিল্কিওয়ে গ্যালিয়াম ভেতরের মাইনিং- এর জন্যে। ইলেকট্রন এমিশন টেকনোলজি ছাড়াও এই জাতীয় মহাকাশযানে হাইপার স্পেস জাম্পের ব্যবস্থা আছে। দু’শ’ সিরিজের এটি দ্বিতীয়। মহাশূন্যযান। প্রথমটি লি-২০০ মহাশূন্যে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বিধ্বস্ত হবার কোনো কারণ জানা যায় নি। ধারণা করা হয় কোনো বিচিত্র কারণে মহাশূন্যযানটি হাইপার স্পেস জাম্প দেয়। সেট কো-অর্ডিনেট না থাকায় সেটা চিরদিনের জন্যে হারিয়ে যায়।

এক হাজার টন গ্যালিয়াম ধাতু নিয়ে মহাকাশযান লি-২০১ বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ থেকে মঙ্গলের দিকে রওনা হয়েছে। কনট্রোল প্যানেলে যে বসে আছে তার নাম নিম। বয়স মাত্র ২৭। মেয়েটি তিন মাস আগে মহাকাশযান পরিচালনার সার্টিফিকেট পেয়েছে। তবে ট্রেনিং পিরিয়ড এখনো শেষ হয় নি। তাকে এক হাজার ঘন্টার ফ্লাইং টাইম সংগ্রহ করতে হবে। নিম এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে দু’শ একুশ ঘণ্টা। আজকের ফ্লাইট শেষ হলে আরো এগারো ঘণ্টা যুক্ত হবে।

নিমের চোখ কনট্রোল প্যানেলের দিকে। তাকিয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। অটো পাইলট-এ দেয়া আছে।আর মাত্র আটত্রিশ মিনিট এগারো সেকেন্ডে সে পৌঁছে যাবে মঙ্গলের উপগ্রহ ডিমোসের পাশে। ফিক্সড় অরবিট নিয়ে অপেক্ষা করবে মঙ্গলে অবতরণ অনুমতির জন্যে।সেখানেও কিছু করতে হবে না। সবই অটো পদ্ধতিতে হবে।এই কাজের জন্যে মহাকাশ নাবিকের প্রয়োজন নেই।

সাধারণ মানের একজন এনারবিক রোবটই যথেষ্ট। নিমের পাশের আসনে যে রোবটটি বসে আছে সে সাধারণ মানের নয়। যে-কোনো মহাকাশযান সে চালাতে পারে। অতি আধুনিক হাইপার ভাইভার চালনার দক্ষতাও তার আছে।এই এনারোবিক রোবটের নাম দৃস। এরা S2 টাইপ রোবট বলেই তাদেরকে মানুষের মতো আলাদা নাম দিয়ে সম্মান দেখানো হয়।

দৃস নিমের দিকে তাকিয়ে বিনীত গলায় বলল, মিস ক্যাপ্টেন, আমি কি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি? নিম বলল, নিশ্চয়ই পার।দৃস বলল, আপনি কি কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ করছেন? অস্বাভাবিকতাটা কী ধরনের? আমাদের এই মহাকাশযানের গতি 0.2C থাকার কথা।প্রোগ্রাম সেরকমই করা হয়েছে। আপনার কি মনে হয় না গতি বাড়ছে? নিম বিরক্ত গলায় বলল, সেরকম মনে হয় না। পর্দার দিকে তাকিয়ে দেখ গতি দেখানো আছে।

দৃস বলল, আপনি কি দয়া করে ভিউ ফাইন্ডারের দিকে তাকাবেন। যে কোনো দুটি উজ্জ্বল তারার দিকে তাকালেই লক্ষ করবেন আমাদের মহাকাশযানের গতি 0.4C-র কাছাকাছি।এটা হতেই পারে না।আপনি ঠিকই বলেছেন, এটা হতে পারে না। কিন্তু ফুয়েল কনজামশান। রেটের দিকে তাকাল আপনি দেখবেন আমি যা বলছি তা ঠিক।

নিম অতিদ্রুত কয়েকটি রিডিং নিল রিডিং থেকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। ফুয়েল কনজামশান রিডিং ০.4c গতিবেগের কথাই বলে। কিন্তু এই গতিবেগে কনট্রোল প্যানেলে লালবাতি জ্বলবে। হাইপার ভাইভ প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।দৃস বলল, ম্যাডাম, আপনি ভীত হবেন না। নিম বলল, আমি ভীত তোমাকে কে বলল?

দৃস বলল, মহাকাশযানের গতি এখন 0.5C। ভীত হবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেই আমি আপনাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে ভীত না হবার জন্য বলছি।নিম মঙ্গলের স্পেসশিপ মনিটারিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল। যোগাযোগ করা গেল না। দৃস বলল, ম্যাডাম, কোনো মহাকাশযানের গতিবেগ যদি 0.5C- র চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা

বন্ধ হয়ে যায়।এই তথ্য আমি জানি।আপনি যদি জানেন তাহলে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন কেন? তুমি আমাকে কী করতে বলছ? আমি আপনাকে ভীত না হবার জন্যে বলছি।একটু আগেই তুমি বলেছ ভীত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।দৃস বলল, আমার ধারণা যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সে সমস্যা আপনার ট্রেনিং এর অংশ।নিম বলল, তার মানে কী?

ট্রেইনী নাবিকদের জন্যে মাঝে মাঝে পরিকল্পিতভাবে সমস্যা তৈরি করা হয়। দেখার জন্যে এরা সমস্যার সমাধান কীভাবে করে।তোমার এরকম মনে হচ্ছে? আমি সম্ভাবনার কথা বলছি। নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই সমস্যাটি ট্রেনিং এর অংশ, তার সম্ভাবনা কত?

0.30 বলো কী! এত কম সম্ভাবনা? ত্রিশ পারসেন্ট সম্ভাবনা কম না, মিস ক্যাপ্টেন।৭০ পারসেন্ট সম্ভাবনা যে এটা বাস্তব সমস্যা? আপনি যথার্থ বলেছেন। মহাকাশযানের গতিবেগ বেড়েই চলেছে। ট্রেনিং এর সময়েও গতিবেগ এত বাড়ানো হয় না। তাছাড়া এটা মাল বোঝাই ফেরিশিপ। এখন করণীয় কী?

আপনি খুব ভালো করেই জানেন এখন করণীয়।তারপরেও তুমি আমাকে সাহায্য কর।আপনি যদি কুলকিনারী না পান তাহলে ইমার্জেন্সি ব্লু বাটন টিপবেন। ইমার্জেন্সি বাটন টেপার পর আপনার কিছুই করার থাকবে না। কম্পিউটার সিডিসি আপনার হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। ছোট্ট সমস্যা কিন্তু থেকেই যাবে মিস ক্যাপ্টেন।সমস্যা কী?

যেসব ট্রেইনী নাবিক ব্লু বাটন টেপে তাদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। তারা আর কখনো আকাশে উড়তে পারবে না।আমার কী করা উচিত? আপনার ইমার্জেন্সি বাটন টেপা উচিত।নিম ইমার্জেন্সি বাটনে চাপ দিল। প্যানেলে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। কম্পিউটার সিডিসির ধাতব গলা

শোনা গেল। কম্পিউটার সিডিসি বলছি। আমি মহাকাশযানের কম্পিউটারের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। আমরা ক্রমবর্ধমান গতিতে এগুচ্ছি। অতি দ্রুত ত্বরণ বন্ধ করা প্রয়োজন। সেটা করা যাচ্ছে না। আয়ন ইঞ্জিনের যে ক্রটি ধরতে পেরেছি সেই ত্রুটি সারানো এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।নিম বলল, ক্রটি কেন দেখা গেল?

এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না। হাতে সময় নেই।তুমি এখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ? কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। খুব অল্পসময়েই এই মহাকাশযান বিধ্বস্ত হবে। কারণ, এটি একটি মাল বোঝাই কার্গো। ০.6c-র গতিবেগ এ নিতে পারবে না।আমাদের হাতে কত সময় আছে?

তিন মিনিটেরও কম।আমার কি কিছু করণীয় আছে? না। আপনি পেন্টাথেল থ্রি ইনজেকশন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। মৃত্যু হবে ঘুমের মধ্যে। নিম ঠান্ডা গলায় বলল, অতি সুন্দর প্রস্তাবের জন্যে ধন্যবাদ।নিমের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ হলো। ভয়াবহ বিস্ফোরণ।অঁহকদের ছোট্ট একটা দল দ্রুত কাজ করছে। তাদের কাজ যিনি তদারক করছেন তাকে তারা মহান শিক্ষক নামে ডাকছে।

কাজের প্রতিটি পর্যায়ে তারা মহান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলছে। এমনও হচ্ছে একসঙ্গে সবাই কথা বলছে।মহান শিক্ষক একই সঙ্গে সবার কথার জবাব দিচ্ছেন।মহান শিক্ষক বললেন, তোমরা কি আনন্দ পাচ্ছ?

একসঙ্গে সবাই বলল, আমরা খুবই আনন্দ পাচ্ছি।আমরা কেন বেঁচে আছি? আনন্দের জন্যে বেঁচে আছি।আমরা কেন বেঁচে থাকব? আনন্দের জন্যে বেঁচে থাকব।মৃত্যু কী? আনন্দের সমাপ্তি। তোমরা যে মেয়েটির শরীরবৃত্তিয় ক্ষতি ঠিকঠাক করছ সে কোন সম্প্রদায়ের, তা কি জানো?

জানি মহান শিক্ষক। সে মানব সম্প্রদায়ের।মানব সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য কী? বৈশিষ্ট্যহীন একটি সম্প্রদায়। যাদের শরীরবৃত্তিয় কর্মকাণ্ড অতি দুর্বল।দুর্বল বলছ কেন? এরা অক্সিজেননির্ভর একটি প্রাণী। অক্সিজেন একটি ভারি গ্যাস। ভারি গ্যাস নির্ভর প্রাণী দুর্বল হয়।হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম-নির্ভর প্রাণীরা সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিমান। যেমন আমরা হাইড্রোজেন-নির্ভর।এর বাইরে কী আছে?

এরা অতি নিম্নশ্রেণীর বুদ্ধিহীন প্রাণীদের মতোই খাদ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। কাজেই তারা চিন্তা বা শিক্ষার সময় পায় না। তারা তাদের সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করে খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য পরিপাক এবং খাদ্য বর্জনে।ভালো বলেছ। এদের আর কী ত্রুটি আছে?

এদের সভ্যতা যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা। এরা আমাদের মতো যন্ত্রমুক্ত না। মহান শিক্ষক, আপনি বলেছেন যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা নিম্নমানের সভ্যতা।যে-কোনো বস্তুর ওপর নির্ভর সভ্যতাই নিম্নমানের সভ্যতা। এই সত্যটি সব সময় মনে রাখবে।মহান শিক্ষক, আমরা মনে রাখব।তোমাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বলো।

মেয়েটি যে যন্ত্রযানে করে এসেছে সেটি সম্পূর্ণ ঠিক করা হয়েছে। যন্ত্রযানের মূল ডিজাইনে একটি ত্রুটি ছিল। আমরা সেই ক্রটিও ঠিক করে দিয়েছি।কাজটা করে কি আনন্দ পেয়েছ? মহান শিক্ষক, খুবই আনন্দ পেয়েছি।মেয়েটির অবস্থা কী?

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। মেয়েটির শরীরের যে অংশ অক্সিজেনবাহী তরল পরিশুদ্ধ করে সেই অংশই বিশেষভাবে ক্ষত্যিস্ত হয়েছে বলে সামান্য বেশি সময় আমরা নিয়েছি। তার জন্যে আমরা দুঃখিত মহান শিক্ষক।কাজটা করে কি তোমরা আনন্দ পেয়েছ?

আমরা অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছি। এখন আমরা আপনার নির্দেশের অপেক্ষা করছি।কী নির্দেশ? মেয়েটি জ্ঞান ফিরে পাবার পর যেন অত্যন্ত আনন্দ পায় তার জন্যে কিছু কি করব? তার শরীরের কিছু পরিবর্তন? তার জন্যে মঙ্গলময় হয় এমন কিছু পরিবর্তন?

অবশ্যই করবে। আমরা উপকারী সম্প্রদায়। আমাদের কাজ দুর্বল সম্প্রদায়ের উপকার করা। তাদের ত্রুটি দূর করা।অতি দুর্বল বুদ্ধিমত্তার প্রাণীরা নিজেদের ত্রুটি ধরতে পারে না। মেয়েটির কোন কোন ক্রটি সারাবার কথা ভাবছ?

সে মহাকাশযান চালক। মাত্র দুটি হাতে এই জটিল মহাকাশযানের সমস্ত বোতাম এবং চক্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমরা তাকে আরো বাড়তি দুটি হাত দিতে চাচ্ছি।অতি উত্তম প্রস্তাব। দাও।হাতের আঙুলের সংখ্যা পাঁচটির জায়গায় দশটি করে করতে চাচ্ছি।

এটিও ভালো প্রস্তাব করে দাও।মানব সম্প্রদায়ের পেছনে কোনো চোখ নেই। পেছনে চোখ না থাকার কারণে সে পেছনে দেখতে পারে না।পেছনে দেখার জন্যে তাকে সমস্ত শরীর ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে হয়। আমরা ভাবছি তার পেছনে একটি চোখ দিয়ে দেব।জায়গাটা ঠিক করেছ?

ঘাড়ে দিতে চাচ্ছি।দাও, ঘাড়েই দাও। তবে ঘাড়ে একটি চোখ না দিয়ে দুটি চোখ দাও। মানব সম্প্রদায় সবসময় দুটি চোখ ব্যবহার করে এসেছে। সেখানে হঠাৎ করে পেছনে একটা চোখ তার পছন্দ নাও হতে পারে।ঠিক আছে মহান শিক্ষক, আমরা পেছনেও দুটি চোখ দিয়ে দেব।আর কিছু কি ভাবছ? আপনার অনুমতি পেলে আরেকটি ছোট্ট পরিবর্তন করা যায়।বলো কী পরিবর্তন? মানব সম্প্রদায়ের গায়ের চামড়া সবচেয়ে দুর্বল। আমরা কি একটি ধাতব আবরণ দিয়ে দেব?

না। তার প্রয়োজন দেখি না। চামড়া দুর্বল হলেও সে স্পেস স্যুট পরে। এটি যথেষ্ট মজবুত। গায়ের চামড়া ছাড়া বাকি পরিবর্তনগুলি করে দাও।মহান শিক্ষক। বলো।মেয়েটি যখন তার শরীরের পরিবর্তনগুলি দেখবে তখন সে খুবই আনন্দ পাবে।অবশ্যই আনন্দ পাবে।মেয়েটির আনন্দের কথা ভেবেই আমাদের আনন্দ হচ্ছে।আনন্দ মানেই বেঁচে থাকা। আমরা বেঁচে আছি।তোমাদের সবার কাজে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।ধন্যবাদ মহান শিক্ষক।

নিমের মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। সে হতভম্ব হয়ে তার চারটি হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে দৃস।নিম চোখ তুলে ছায়ার দিকে তাকাল।দৃস বলল, মিস ক্যাপ্টেন, আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ভয়ঙ্কর অঁহকদের হাতে পড়েছিলাম।নিমের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সে এখনো জানে না তার ঘাড়েও দুটি চোখ আছে। সেই চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। দৃস বলল, মিস ক্যাপ্টেন, কাঁদবেন না। আপনার জন্যে একটি ভালো সংবাদ আছে। নিম ফোপাতে ফোপাতে বলল, ভালো সংবাদটি কী? দৃস বলল, আপনার ঘাড়ে যে দুটি চোখ আছে, সেই চোখ দুটি আসল চোখের চেয়েও অনেক অনেক সুন্দর।

০৮.

যে-কোনোদিন M.Sc, থিসিস গ্রুপের রেজাল্ট বের হবে।টেনশন নিয়ে অপেক্ষা করছি। ফার্স্টক্লাস যে পাব এই বিষয়ে সন্দেহ নেই। পজিশন কী হবে এই নিয়ে সন্দেহ।পজিশনে যদি নিচে নেমে যাই, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারির সুযোগ নাও পেতে পারি। ভাইভা খুব সুবিধার হয় নি। প্রফেসর আলি নওয়াব Zeta potential বিষয়ে একটা জটিল প্রশ্ন করে আমাকে আটকে দিয়েছিলেন। গভীর গর্তে ঠেলে ফেলে দেওয়ার মতো। একশ’ নাম্বারের ভাইভা। এখানে নাম্বার কমে গেলে দ্রুত পজিশন নামবে।

রেজাল্টের খোঁজে রোজ কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ঘোরাঘুরি করি। পয়সাওলা বন্ধুবান্ধব খুঁজি যে আমাকে চা-শিঙ্গাড়া খাওয়াবে। অর্থনৈতিকভাবে আমি তখন পরও নিচে। বাবা মরে যাবার কারণে মা ১৮৫ টাকার মাসিক পেনশন পান, এটাই ভরসা। তিনি এবং তার ছোটভাই রুহুল আমিন শেখ (পরবর্তীকালে চেয়ারম্যান, মংলাপোর্ট সফল একজন ভালো মানুষ। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গা থেকে টাকাপয়সা ধার করে আনেন।

তাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সংসার চলে। আমি সারাক্ষণ চোখে অন্ধকার দেখি। একটা চাকরি আমার ভীষণ দরকার। আগে তো রেজাল্ট হবে, তারপর চকিরি।কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে গেছি, বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছি। চেয়ারম্যান স্যারের পিয়ন এসে বলল, স্যার আপনারে ডাকে। আমার কলজে শুকিয়ে গেল। খোন্দকার মোকাররম হোসেন কোনো ছাত্রকে ডাকবেন আর তার কলিজা শুকিয়ে শুঁটকি হয়ে যাবে না, তা হয় না। স্যার ভুল করেন নি তো? আমাকে কি তিনি নামে চেনেন? চেনার কথা না।

ভয়ে ভয়ে স্যারের ঘরে ঢুকলাম। স্যার কী যেন লিখছেন।আমি নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে আছি। নিঃশ্বাসের শব্দে স্যারের লেখায় যেন বিঘ্ন না ঘটে। স্যারের লেখা শেষ হলো। তিনি লেখাটা খামে ঢুকালেন। খামের মুখ বন্ধ করলেন। এবং খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি খাম হাতে নিলাম। স্যার বললেন, তুমি ময়মনসিংহ এগ্রিকালচারালইউনিভার্সিটিতে চলে যাও। চেয়ারম্যান কেমিস্ট্রি

ডিপার্টমেন্টকে এই চিঠি দেবে। তুমি লেকচারারের একটা চাকরি পেয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পোস্ট খালি নেই। পোস্ট খালি থাকলে এখানেই তোমাকে নিতাম। এখন সামনে থেকে যাও, আমাকে কাজ করতে দাও।আমি দ্রুত স্যারের ঘর থেকে বের হলাম। তখন মনে হলো, সর্বনাশ! স্যারকে তো ধন্যবাদ দেওয়া হয় নি। আমি আবার ঢুকলাম। স্যার বিরক্ত গলায় বললেন, আবার কী?

আমি বললাম, স্যার, আপনাকে সালাম করব।স্যার রিভলভিং চেয়ারে বসে ছিলেন। তিনি চেয়ার ঘুরালেন। পা থেকে জুতা খুললেন। মোজা খুললেন।সালাম নেবার জন্য অনেক আয়োজন করলেন। আমি পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতেই তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন, May God be always with you. আজ আমার বয়স ষাট। অনেকেই নানান কারণে আমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে আসে। আমি আয়োজন করেই

সালাম গ্রহণ করি এবং মোকাররম স্যারের মতো বলি, May God be always with you. কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান মোকাররম স্যারের চিঠি পড়ে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন।আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার M.Sc. রেজাল্ট তো হয় নাই।আমি বললাম, জি-না স্যার।মোকাররম স্যারের চিঠি আছে। এই চিঠিই যথেষ্ট। সমস্যা একটাই, আপনাকে চাকরি দেব। দুদিন পরে আপনি চলে যাবেন। আবার আমাদের নতুন টিচার খুঁজতে হবে।চলে যাব ভাবছেন কেন?

চলে যাবেন ভাবছি কারণ আপনার রেজাল্ট ভালো।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই আপনি চলে যাবেন। এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি হচ্ছে আপনার মতো মানুষদের transit point. আমি হতাশ গলায় বললাম, আমার চাকরি কি স্যার হচ্ছে না? চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, মোকাররম স্যার চিঠি দিয়েছেন। আপনাকে চাকরি না দিয়ে উপায় আছে? আমি সুপারিশ করছি যেন আপনাকে অনেক বেশি বেতন দেওয়া হয়। যাতে বেতনের লোভে হলেও আপনি এখানে থেকে যান।

সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারারের বেসিক পে ছিল ৪৫০ টাকা। অনার্স এবং এমএসসিতে ফার্স্ট ক্লাস থাকলে দু’টা ৫০ টাকার ইনক্রিমেন্ট পেয়ে হতো ৫৫০ টাকা। আমাকে চারটা ইনক্রিমেন্ট দেয়া হলো।বেতন হলো ৬৫০ টাকা। সেই সময়ের জন্যে অনেক টাকা।আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু হলো। এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, বিশাল ব্যাপার। কিন্তু সেখানের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট হলো দিঘিতে শিশির বিন্দু।

সেখানে কেমিস্ট্রি পড়ানো হয় সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে। ল্যাবরেটরির অবস্থা তথৈবচ। কেমিস্ট্রির শিক্ষকরা ক্লাসে যান নিতান্তই অনাগ্রহে। ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র শিক্ষকরা (কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কথা বলছি। যে যার বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন কিংবা তাস খেলেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করি। সকাল দশটায় রসায়ন বিভাগের একজন শিক্ষকের মেটালার্জি (ধাতুবিদ্যা বিষয়ে ক্লাস। ক্লাস শুরু হবার পাঁচ মিনিট আগে ওই শিক্ষক আমাকে বললেন, হুমায়ুন সাহেব, আমার ক্লাসটা নিয়ে আসুন তো। আমার আজ ক্লাস নিতে ইচ্ছা করছে না।

আমি বললাম, ভাই, মেটালার্জি আমার বিষয় না। আমি ভৌত রসায়নের। ওই ক্লাস আমি কীভাবে নেব? আমার তো কোনোরকম প্রিপারেশন নেই।প্রিপারেশন লাগবে না। ক্লাসে ঢুকে যান। কিছুক্ষণ বকবক করে চলে আসবেন। আপনি পড়াচ্ছেন কী? স্টিল। স্টিল কীভাবে তৈরি হয়, এইসব হাবিজাবি। আমি ক্লাসে ঢুকলাম। মন খারাপ করেই ঢুকলাম। হচ্ছেটা কী?

এখন বলি কীভাবে থাকতাম। কয়েকজন শিক্ষক মিলে ইউনিভার্সিটির কাছেই একটা পাকাবাড়ি ভাড়া করেছিলেন। আমি তাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। আমাকে আলাদা একটা রুম দেওয়া হলো। সকালবেলা একটা কাজের মেয়ে আসে। মেয়েটা অল্পবয়স্ক। বেশির ভাগ শিক্ষকই মেয়েটার সঙ্গে রসিকতা করা দায়িত্ব মনে করেন।

এই মেয়ে ঘর ঝাট দেয়। বাজার করে আনে। রান্না করে। দুপুরে সবাইকে খাইয়ে থালাবাসন পরিষ্কার করে চলে যায়। খাবার যা বাচে রাতে তাই খাওয়া হয়। নতুন করে রান্না হয় না। খাবারের আয়োজন থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ের। শিক্ষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন টাকা বাঁচানোর।বিনোদনের ব্যবস্থার কথা বলি। দুই প্যাকেট তাস আছে।তাস দিয়ে ব্রিজ খেলা হয়। মাঝে মাঝে লুডু খেলা হয়।সব খেলাই সিরিয়াসলি খেলা হয় না। লুডু খেলায় গুটি খাওয়া নিয়ে কয়েকবার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে।আমি কিছুতেই তাদের সঙ্গে মিশ খাওয়াতে পারি না।

শিক্ষকদের মধ্যে একজনকে আমার পুরোপুরি মানসিক রোগী বলে মনে হলো। তিনি রোজ রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আমার কাছে এসে বিনীত গলায় বলেন, আমাকে একটা লাথি দেবেন? কষে আমার পাছায় একটা লাথি।প্রথম রাতে এই কথা শুনে আমি চমকে উঠে বললাম, লাথি দেব কেন?

ভদ্রলোক আগের চেয়েও বিনয়ী গলায় বললেন, আপনিপবিত্র একজন মানুষ। আপনি লাথি দিলে আমার কিছু পাপ কাটা যাবে। আমি ভয়ঙ্কর পাপী একজন মানুষ। কী কী পাপ করেছি শুনবেন?না।না বলার পরেও তিনি পাপের কথা বলতে থাকেন। আমারবমি আসার মতো হয়। কাজের মেয়েটির রান্না গলাদিয়ে নামতে চায় না।

গ্লানিময় পরিবেশ থেকে বাঁচার জন্য মাঝে মাঝে আমিময়মনসিংহ শহরে যাই। শহরের ছোটবাজার নামক জায়গায়আমার মেজোখালা থাকেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহকরেন। কিন্তু তাঁর বাড়িটিও বিচিত্র। তার ছোটছেলেমেয়েগুলি কোনো কারণ ছাড়াই সারাদিনতারস্বরে কাঁদে। এই কান্না বিরামহীন। খালা এসেমাঝে মাঝে কান্না থামাবার জন্য এদের পিঠে ধুম ধুমকিল দেন। এতে তাদের ব্যাটারি রিচার্জ হয়। তারানবোদ্যমে কান্না শুরু করে।

বায়োলজিক্যাল ইভোলিউশনের নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চাদের কান্না এমন হয়, যা বড়দের মধ্যে চূড়ান্ত বিরক্তি তৈরি করবে। যাতে বড়রা ছুটে এসে কান্নার কারণ অনুসন্ধান করে।বাচ্চাদের কান্না যদি বিরক্তি উৎপাদন না করে, তাহলে কেউ কান্নার কারণ অনুসন্ধানে এগিয়ে আসবে না। শিশু থাকবে একা। ইভোলিউশন বাধাগ্রস্ত হবে।খালার বাসায় যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণ ইভোলিউশনের যন্ত্রণা মর্মে মর্মে অনুভব করি। বেশির ভাগ সময় আমি চলে যাই দোতলার একটা ঘরে। দরজা জানালা বন্ধ করে রাখি, যাতে আওয়াজটা কম আসে। ছুটির দিনের এক দুপুরের কথা। দোতলার ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়েছি।

একটা জানালা শুধু খোলা। বৃষ্টি দেখার জন্য সেই জানালাটা খোলা রেখেছি। ভালো বৃষ্টি হচ্ছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে, ঠান্ডা হাওয়া আসছে। আরামে চোখে ঘুম এসে যাচ্ছে। খালার বাচ্চাগুলোর কান্নাটাও আবহসঙ্গীতের। মতো লাগছে।ঘুম ঘুম অবস্থায় (কিংবা ঘুমের মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল।আমি স্পষ্ট দেখলাম জানালার শিক গলে অদ্ভুত এক প্রাণী ঢুকল। পাঁচ ফুটের মতো লম্বা। লোমশ শরীর।

মুখমণ্ডল মানুষের মতো। প্রাণীটা ইশারায় কাদের যেন ডাকল। তারা ঘরে ঢুকল। এরা সাইজে খুবই ছোট। মনে হয় বড়টার সন্তান। বড়টা এসে আমার বুকে বসল। দুহাত দিয়ে গলা চেপে ধরল। মেরে ফেলার চেষ্টা। আমি হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারছি না। চিৎকার করার চেষ্টা করছি।পারছি না। নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করেছি।পরে শুনলাম এটা একটা অসুখ। অসুখের নাম বোবায় ধরা।

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *