আমার মেয়েদের যদি কখনো জিজ্ঞেস করা হয়–বাবার বিষয়ে তোমাদের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি কী? তারা অবশ্যই সাঁতার শেখা এবং সাইকেল চালানো শেখার কথা বলবে।আমি মেয়েদের পেছনে কোনো সময়ই দিতে পারি নি।ইউনিভার্সিটির চাপ, হলের চাপ, লেখালেখিতেই সময় চলে যেত। তখন আমার দু’জন থিসিসের ছাত্র ছিল। তাদের রিসার্চের কাজ দেখাশোনাতেও প্রচুর সময় যেত। ইউনিভার্সিটির ছুটির দিনে সন্ধ্যার পর কিছু অবসর পেতাম।
তখন চলে যেতাম ইউনিভার্সিটি ক্লাবে দাবা খেলতে। দাবা খেলতাম রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে (হ্যারল্ড লাস্কির প্রিয় ছাত্র অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।কিংবদন্তি শিক্ষক)। দাবা খেলার সময়টা আমি আমার পরিবারকে দিতে পারতাম। তাও দেই নি। কারো বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, জন্মদিন, বিয়ে—এইসবে আমি নেই। সম্পূর্ণই নিজের ভেতরে বাস করা।
সবকিছু দেখেশুনেই হয়তো আমার মেয়েরা আবদারশূন্য মানসিকতায় বড় হতে লাগল। তারা কেউ কখনো আমার কাছে কিছু চেয়েছে বলে আমি মনে করতে পারি না।মেয়েদের কাছে আমি ছিলাম ভিনগ্রহের মানুষ। তারা আমার। চোখের সামনে বড় হচ্ছে, এই পর্যন্তই। তাদের জন্যে আদর নেই, বকাও নেই। তারপরেও কী কারণে যেন বড় মেয়ে নোভার ওপর রাগ করে তার গালে একটা চড় দিয়ে বসলাম। মেয়ে হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাসও করাতে পারছে না আমি এমন একটা কাজ করতে পারি।
আমি বললাম, মা, আমি খুবই ভুল একটা কাজ করেছি।বুঝতে পারছি তুমি মনে কষ্ট পেয়েছ! বলো কী করলে তোমার মনের কষ্ট দূর হবে। আমি তাই করব।নোভা বলল, বাথরুমে একটা বাথটাব বসিয়ে দাও।বাথটাবে গোসল করলে মনের কষ্ট কমবে।আমি বাথটাবের ব্যবস্থা করলাম।কয়েকদিন আগে কবি নির্মলেন্দু গুণের মেয়ে মৃত্তিকার সঙ্গে দেখা। সে বলল, আঙ্কেল, আপনার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় আমি কী করতাম আপনার মনে আছে? কী করতে? বাবার সঙ্গে প্রায়ই বেড়াতে যেতাম। যে কাপড় পরে যেতাম সেই কাপড়েই লাফ দিয়ে আপনাদের বাথটাবে নেমে পড়তাম।
শহীদুল্লাহ হলে থাকার সময়ই অনিন্দ্য প্রকাশনীর মালিক আমাকে আমার বইয়ের রয়েলটির টাকা না দিয়ে সেই টাকায় একটা গাড়ি কিনে দিলেন। গাড়ির সঙ্গে একজন ড্রাইভার দিয়ে দিলেন। নতুন গাড়ি দেখে আমার মেয়েদের সে-কী লাফালাফি ! সে-কী চিৎকার! মেজো মেয়ে শীলা তার বান্ধবীকে টেলিফোন করে বলল, বাবা না আমাদের জন্যে একটা গাড়ি কিনেছে। গাড়ির সঙ্গে একজন ড্রাইভার কিনে এনেছে।
একটা গাড়িই আমার জন্যে যথেষ্ট। আমি রয়েলটির টাকা পেয়ে আরেকটা মাইক্রোবাস কিনে ফেললাম। ব্যাংকে কোনো জমা টাকা নেই, অথচ শহীদুল্লাহ হলের বাসার সামনে দু’টা গাড়ি। মেয়েরা বান্ধবীদের নিয়ে মাইক্রোবাসে বসে রান্নাবাটি খেলা খেলে।দ্বিতীয় গাড়ি কেনার মানসিকতাটা ব্যাখ্যা করি।
রয়েলটির টাকা হাতে নিতে বা জমা করে রাখতে আমার লজ্জা লাগত। আমার মনে হতো এটা ঠিক না। কেন বই লিখে এত টাকা পাব! এই কারণেই যা পেতাম সঙ্গে সঙ্গে খরচ করে ফেলতাম। শহীদুল্লাহ হল নিয়ে আমার অসংখ্য সুখস্মৃতি আছে। একটা সুখস্মৃতি বলি। আমি একটা বিষয়ে (টাকা চুরি) কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে হলের একটি ছাত্রকে হল থেকে বের করে দেবার সুপারিশ করেছি। সে একটি ছাত্র সংগঠনের কর্তাব্যক্তি।
সংগঠন তার পেছনে দাঁড়িয়ে গেল এবং মিছিল বের করল।মিছিলের স্লোগান ‘হুমায়ূন আহমেদের চামড়া তুলে নেব আমরা’। আমি মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ শুনি আমার তিন মেয়ে এবং তাদের এক বান্ধবী (ফ্ল্যাটের হাউস টিউটর সাহেবের মেয়ে পাল্টা স্লোগান দিচ্ছে—
হুমায়ূন আহমেদের চামড়া
লাগিয়ে দেব আমরা।
আনন্দে সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে পানি এসে গেল।এবার দুঃখস্মৃতির কথা বলি। রাত আটটা। হঠাৎ গেটের সব বাতি নিভে গেল। আমি ভয়াবহ আর্তচিৎকার শুনলাম, স্যার, আমাকে মেরে ফেলছে। আমাকে বাঁচান।আমি বারান্দায় এসে দেখি তিনজন মিলে একটা ছেলেকে গেটের সামনে চেপে ধরেছে। অন্য একজন তার শরীরে ছুরি বসাচ্ছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে।আমার খালি গা। পরনে লুঙ্গি। এই অবস্থায় দৌড়ে নিচে নামলাম। দ্বিতীয় কেউ এগিয়ে এল না। অথচ হলভর্তি ছাত্র। অনেক দারোয়ান।
অনেক হাউস টিউটর।যারা ছুরি মারছিল তারা আমাকে দেখে থমকে গেল।আমার একবারও মনে হলো না এরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। আমি পাগলের মতো এদের ধরার জন্যে ছুটছি। তারা পুকুরের দিকে যাচ্ছে। আমি ছুটছি তাদের পেছনে। এমন সময় আমার পাশের হাউস টিউটর চেঁচিয়ে বললেন, হুমায়ূন সাহেব, কী করছেন? ফিরে আসেন।আমার সংবিত ফিরল। আমি আহত ছেলেটির কাছে এলাম। গেটের অন্য পাশের হাউস টিউটর সাহেবকে নিয়ে ছেলেটিকে ধরাধরি করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।রক্তে আমার সারা শরীর ভিজে গেল। এই প্রথম রক্তস্নান করলাম।
যাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, সে নিজেও ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসী। তার দল খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে নিয়ে গেল। সে বেঁচে ছিল না মারা গিয়েছিল কিছুই জানি না। শহীদুল্লাহ হলে আমি অনেক লেখা লিখেছি। কয়েকটার নাম দিলাম আমার আছে জল। জনম জনম। সাজঘর। পুতুল। চারটা নাম দিলাম, কারণ এই চারটাই বিভিন্ন পরিচালক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
১৫.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক সম্ভবত সবচেয়ে রহস্যময় মানুষ ছিলেন।বিয়ে করেন নি, চিরকুমার মানুষ। সবসময় পায়জামা এবং গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি পরতেন। খুব কম কথা বলতেন, তবে অতি ঘনিষ্ঠদের কাছে মজলিশি মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার চেহারার সঙ্গে হো চি মিনের চেহারার সাদৃশ্য ছিল। তিনি নিয়ম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যেতেন। নির্দিষ্ট একটা জায়গায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবা খেলতেন। অস্থিরতা নামক বিষয়টি তার মধ্যে কখনো দেখি নি, তবে দাবা খেলার শেষের দিকে (যখন জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে) কিছু অস্থিরতা দেখা যেত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাধর মানুষদের উনি ছিলেন একজন।তার ক্ষমতার উৎস আমি জানতাম না। শুনেছি তিনি হ্যারল্ড লাস্কি নামক জগৎবিখ্যাত অধ্যাপকের সঙ্গে Ph.D করছিলেন। থিসিস লেখার শেষ পর্যায়ে হ্যারল্ড লাস্কি মারা যান। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক থিসিস জমা না দিয়েই দেশে ফিরে আসেন। কারণ তাঁর ধারণী হয়েছিল, যারল্ড লাস্কি ছাড়া এই থিসিসের মর্ম কেউ বুঝবে না।আমি হ্যারল্ড লাস্কিকে চিনি না। কেন তিনি জগৎবিখ্যাত তাও জানি না। আমি তার ছাত্রের প্রতি সবার সমীহ দেখে অবাক হই। এমন না যে অধ্যাপক রাজ্জাক অনেক বইপত্র লিখে নিজেকে বিকশিত করেছেন।
আমার মনে হয় তিনি তাঁর প্রতিভার পুরোটাই দাবা খেলায় ব্যয় করেছেন। সেখানেও তেমন কিছু করতে পারেন নি। বেশির ভাগ সময়ই অন্যদের কাছে হেরেছেন।আমি অতি নিম্নমানের দাবা খেলোয়াড়। তিনি আমার কাছেও মাঝে মধ্যে হারতেন। চাল ফেরত নেয়া দাবা খেলায় নিষিদ্ধ। এই নিষিদ্ধ কাজটি সবসময়ই করতেন।অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে মাতামাতি শুধু যে দেশেই তা-না, বিদেশেও। দেশের বাইরের অনেকেই তার পরামর্শে তার অধীনে Ph.D করেছেন। অনেক গবেষণাপত্র উৎসর্গ করা হয়েছে তার নামে। এক বাঙালি অর্থনীতিবিদ ঢাকায় এলেই রাজ্জাক স্যারের বাসায় যেতেন।
তিনি কয়েকবার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবেও নিয়ে এসেছেন। পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন—“এই ছেলে Economics ভালো জানে।” Economics জানা মানুষটির নাম অমর্ত্য সেন। যিনি পরে ইকনমিক্সে নোবল পুরস্কার পান। প্রস্তাবনাপর্ব শেষ, এখন মূল গল্পে আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর তখন পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক। তিনি আমাকে অফিসে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, একটা কাজ করে দিতে হবে।আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের একটি ইংরেজি বক্তৃতা বাংলায় অনুবাদ করে দিতে হবে। উনি বিশেষ করে আপনার কথা বলেছেন।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আমার নাম জানেন, এতেই আমি যথেষ্ট আত্মশ্লাঘা অনুভব করলাম। কারণ তখনো তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় নি। তাঁর সঙ্গে দাবা খেলারও শুরু হয় নি।আমি বললাম, স্যার, আমি অবশ্যই অনুবাদ করে দেব।ভাইস চ্যান্সেলর স্যার বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মূল বক্তৃতাটা রাজ্জাক সাহেবের। আশা করি গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। হুবহু অনুবাদ করবেন। একচুলও যেন এদিক-ওদিক না হয়।স্যার, আপনি নিশ্চিত থাকুন। হুবহু অনুবাদ করব।শহীদুল্লাহ হলে রাজ্জাক সাহেবের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফিরেই অনুবাদে হাত দিয়েছি।
একটা জায়গায় এসে থমকে গেলাম। এইসব কী লিখেছেন? স্যার লিখছেন—শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিখ্যাত সব শিক্ষকের মিলনক্ষেত্র। অতি বিখ্যাত সব শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু গুণী কোনো ছাত্র বের করতে পারে নি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৌলুশ কমে গেল। মোটামুটি মানের শিক্ষকরা শিক্ষকতা শুরু করলেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন অসাধারণ মেধার মানুষ বের করতে শুরু করল। যেমন, কবি শামসুর রাহমান, ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ।
আমি ভেবেই পাচ্ছি না, যে হুমায়ূন আহমেদের কথা লেখা হচ্ছে সে কি আমি? আরো কোনো হুমায়ূন আহমেদ কি আছে? যদি আমি সেই হুমায়ুন আহমেদ হয়ে থাকি,তাহলে তো আমার এই লেখা অনুবাদ করা ঠিক হবে না।পাণ্ডুলিপি নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর স্যারের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি পাণ্ডুলিপি পড়ে বললেন—আপনার নামই তো মনে হচ্ছে। আপনি এক কাজ করুন—রাজ্জাক সাহেবের কাছে যান, তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন।উনি ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারে থাকেন। একা মানুষ।এখনি চলে যান।আমি স্যারের বাসায় গেলাম। তার বসার ঘরটা প্রকাণ্ড।সেখানে কোনো সোফা নেই। ঘরের মাঝখানে প্রকাণ্ড একটা মশারি খাটানো।
স্যার মশারির ভেতর চেয়ার- টেবিল পেতে পড়াশোনা করছেন। মশার হাত থেকে মুক্ত থেকে পড়াশোনা করার চমৎকার ব্যবস্থা। স্যার আমাকে দেখে মশারির ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। আমি আমার সমস্যার কথা বললাম।স্যার বললেন, আমি আপনার কথাই লিখেছি এবং কোনো ভুল করি নি। যেভাবে লিখেছি সেভাবেই যেন অনুবাদ করা হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে খুব আগ্রহ করে বক্তৃতা শুনতে গিয়েছি। প্যান্ডেল সাজিয়ে বিশাল আয়োজন। স্যার বক্তৃতা শেষ করলেন। তুমুল করতালি। আমি ভ্যাবদা মেরে বসে আছি, কারণ বক্তৃতায় হুমায়ুন আহমেদের অংশটা নেই।
স্যার যে পড়তে ভুলে গেছেন তাও না। মূল বক্তৃতা বুকলেট আকারে সবাইকে দেয়া হয়েছে। সেখানেও এই অংশ নেই।খুবই তুচ্ছ বিষয়। মাঝে মাঝে তুচ্ছ বিষয় চোরাকাটার মতো মনে লেগে থাকে। ব্যথা দেয় না, অস্বস্তি দেয়।কয়েকদিন পর রাজ্জাক স্যার পিয়ন পাঠিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। রাতে তাঁর বাসায় খাবার নিমন্ত্রণ। নিমন্ত্রণ খেতে গেলাম। বিশাল আয়োজন।অনেক অতিথি। সবাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধু নামগোত্রহীন। ‘হংস মধ্যে কাক’ যথা, বকও না। স্যার এক ফাঁকে বললেন, আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?
আমি বললাম, জি-না স্যার।স্যার বললেন, বক্তৃতার অনুবাদ ভালো হয়েছে। বক্তৃতা বিষয়ে কিছু বলবেন? আমি বললাম, জি-না।সবাই খেতে বসেছি। স্যার আমাকে বসিয়েছেন তার পাশে। প্রচুর খাবার দাবার। এর মধ্যে একটি আইটেম স্যারের রান্না করা। উনি খেতে পছন্দ করতেন। রান্নার ব্যাপারেও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। খাবার টেবিলে আরেকটি ব্যাপার আমাকে বিস্মিত করল। সবাইকে ফ্রান্সের তৈরি চিনামাটির বাসনে খেতে দেয়া
হয়েছে, আর স্যার খাচ্ছেন মাটির সানকিতে। উনি না-কি মাটির সানকি ছাড়া খেতে পারেন না।স্যারের দাওয়াতে আমি নিয়মিত হয়ে গেলাম, কিছুদিন পরপরই আমার ডাক পড়ে। আমি সামাজিক মানুষ না। অচেনা সব লোকজনের ভিড়ে অস্বস্তি বোধ করি। আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে কেউ এগিয়েও আসে না। নিজেকে মনে হয় গৃহকর্তার দরিদ্র আত্মীয়, যাকে আসর থেকে বাদ দেয়া যায় না, আবার আসরে রাখাও যায় না।
উপগ্রহ আমার খুব অপছন্দের জিনিস। স্যারের কাছে আমার অবস্থান ছিল উপগ্রহের মতো।তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খবর পেয়ে আমি দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক জনাব সালেহ চৌধুরীকে নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলাম।বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি বই পড়ছেন। বইটির নাম অমানুষ। লেখক হুমায়ূন আহমেদ।সালেহ চৌধুরী বললেন, স্যার, কেমন আছেন? তিনি বই থেকে মুখ না তুলেই বললেন, পরে আসুন। এখন ব্যস্ত আছি। বই পড়ছি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের ঘটনায় খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। সেদিনের ঘটনায় সব দুঃখ ধুয়ে-মুছে গিয়েছিল।
১৯৭১ নামের উপন্যাসটি আমি উৎসর্গ করেছিলাম স্যারের নামে। বইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে তাঁর হাতে দিলাম। তিনি পাতা উল্টে বললেন—যে বইয়ের নাম ১৯৭১, তার পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র সর? আমি জবাব দিলাম না। তার ঠিক এক সপ্তাহ পর তিনি আমাকে তার বাসায় ডেকে পাঠালেন। সরাসরি ঢুকে গেলাম তার পড়ার টেবিলের ওপর ঝুলানো মশারির ভেতর। স্যার বললেন, নিজের হাতে খাঁটি ঘি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছি। খাবেন? আমি বললাম, জি-না স্যার।আপনাকে ছোট্ট একটা উপদেশ দেবার জন্যে ডেকেছি।আপনাকে লেখালেখি নিয়ে অনেকেই অনেক উপদেশ দিতে চেষ্টা করবে।
আপনি কোনো উপদেশই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন না। আপনার যা মনে আসে লিখবেন। ঠিক আছে? আমি বললাম, জি স্যার। রাজ্জাক স্যারের মতো একই উপদেশ একটু ভিন্ন ভাষায় আরেকজন আমাকে দিয়েছিলেন। তার নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই গল্প আরেকদিন বলা যাবে।পাদটিকা:শামসুর রাহমান এবং হুমায়ুন আহমেদের নাম কেন বাদ দেয়া হয়েছিল তা কখনো জানা হয় নি।একটু পেছনে ফিরি।১৯৬৫ সন। আমি পড়ি ঢাকা কলেজে। এখনকার ছেলেপুলেরা বলে ‘ইন্টার’। সেই ইন্টারের ছাত্র। থাকি হোস্টেলে। প্রচুর স্বাধীনতা।
সেই স্বাধীনতা ভোগ করার উপায় নেই। কারণ আমার মামাও হোস্টেলে একই রুমে আমার সঙ্গে থাকেন। তিনি সিরিয়াস ধরনের ছাত্র।কোনো ক্লাস মিস করেন না। সন্ধ্যার পর পরই বই নিয়ে বসেন।আমার ক্লাস করতে ভালো লাগে না। পাঠ্যবই পড়তে ভালো লাগে না। হোস্টেলের খাবার ভালো লাগে না।ঢাকায় থাকতে ভালো লাগে না। ক্লাস করা প্রায় ছেড়েই দিলাম। আমার মামা তা টের পেলেন না। কারণ তিনি অন্য সেকশানের ছাত্র। ক্লাসে যাওয়া ছেড়ে দেয়ার শুরুটা বেশ মজার। বাংলার একজন শিক্ষক, নাম আজিজুর রহমান।
তিনি ক্লাস নিতে এসে বললেন, অনেক ছেলেই ক্লাসে আসে শুধুমাত্র পার্সেন্টেজের জন্যে। তাদেরকে জানাচ্ছি, তারা ক্লাসে না এলেও চলবে। আমি সবাইকে পার্সেন্টেজ দেই।আমি উঠে দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, কিছু বলবে? আমি বললাম, জি-না স্যার। আমি চলে যাব।স্যার বিস্ময়ের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।আমি গটগট করে বের হয়ে এলাম। পরে জানলাম আজিজুর রহমানই বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান। তাঁর সঙ্গে বেয়াদবি করেছি ভেবে মন খারাপ হলো এবং ঠিক করলাম অন্যক্লাস না করলেও আমি তার ক্লাসগুলি করব।
শওকত ওসমান স্যারের ক্লাস করতে গিয়ে হতাশই হয়েছি।মূল বিষয় নিয়ে তিনি অল্পই কথা বলতেন যেমন, একদিন পুরো ক্লাসে বললেন তিনি একটা পেইন্টিং কিনেছেন সে-গল্প। একজন শিক্ষকের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্যারের কথা জড়িয়ে যেত। এবং আমার সবসময় মনে হতো তিনি সময়। কাটানোর জন্যেই কথা বলছেন। আমাদের আরেকজন বাংলার শিক্ষক ছিলেন। মোটা, বেঁটে। তাঁর নাম মনে পড়ছে না। তিনি ক্লাসে ঢুকেই নানান ধরনের জোকারি করতেন। অঙ্গভঙ্গি করতেন।বিচিত্র শব্দ করতেন। ছাত্ররা খুবই মজা পেত। ক্লাস শেষ হবার পর বলতেন, একটা ঘন্টা আনন্দ করে পার করেছ এটাই লাভ।
জগতে আনন্দই সত্য।স্যারের গোপাল ভাঁড়ের মতো আচরণ আমার অসহ্য লাগত।একজন শিক্ষক ক্লাসে ছাত্র পড়াবেন। তাদের হাসানোর দায়িত্ব নেবেন না।একদিন স্যার বললেন, কারো কোনো প্রশ্ন আছে? আমি উঠে দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, কী জানতে চাও হে খোকা? খোকা ডাকায় ক্লাসে হো হো হাসি শুরু হলো। হাসির শব্দ থামার পর আমি বললাম, স্যার, ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘোরে। নিউক্লিয়াস কি স্থির হয়ে থাকে? না-কি সেও ঘোরে? স্যার কিছুক্ষণ হতভম্ব অবস্থায় কাটালেন। তারপর বললেন, বাংলা ক্লাসে তুমি সায়েন্স নিয়ে এসেছ কেন?
বাংলা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে কর। আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, স্যার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাশুড়ির নাম জানতে চাচ্ছিলাম।স্যার একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমিও তাকিয়ে আছি। ছাত্ররা হো হো হাসতে শুরু করেছে।আমি মোটেই বেয়াদব ছাত্র না। বরং একটু বেশিরকমই বিনয়ী। কিন্তু শিক্ষকদের ফাঁকিবাজিটা কখনোই নিতে পারতাম না।ঢাকা কলেজে ভালো শিক্ষক কি ছিলেন না? অনেক ছিলেন। সিরাজুল হক নামের একজন অংকের শিক্ষক ছিলেন, তিনি পড়াতেন কোঅর্ডিনেট জিওমেট্রি! ওরকম শিক্ষক পাওয়া ভাগের ব্যাপার।
প্রফেসর নোমান পড়াতেন ইংরেজি কবিতা। কী সুন্দর কণ্ঠ! কী চমৎকার পড়ানোর ভঙ্গি! শিক্ষকদের কথা থাকুক, তাঁদের ছাত্রের কথা বলি। ছাত্র ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কী করত? হন্টন করত।হ্যাঁ, আমার প্রধান কাজ ছিল ঢাকা শহর চষে বেড়ানো।মাঝে মাঝে বলাকা সিনেমাহলে ম্যাটিনি শোতে ইংরেজি ছবি দেখা। দেশের প্রধান তখন ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান। ছাত্রদের প্রতি তার অনেক মমতা (!), ছাত্ররা যেন অর্ধেক টাকায় ছবি দেখতে পারে সেই ব্যবস্থা তিনি করেছেন। ছাত্রদের জন্যে সিনেমাহলে টিকিটের দাম অর্ধেক।
ছাত্রদের সস্তায় সিনেমা দেখানোর জন্যে এই রাষ্ট্রপ্রধানের এত আগ্রহের কারণ কী কে জানে! ঢাকার পথেঘাটে হাঁটতে হাঁটতে একবার এক ম্যাজিশিয়ানের দেখা পেলাম। বেশির ভাগ সময়ই ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখাবার পর ওষুধ বিক্রি করে। এই ম্যাজিশিয়ান সেরকম না। তিনি ম্যাজিকের কৌশল টাকার বিনিময়ে শিখিয়ে দেন। কেউ যদি সেই আইটেম কিনতে চায় তাও তিনি বিক্রি করেন। আমি তার ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ। চারটা তাশ নিয়েছেন। চার বিবি। ফুঁ দেয়া মাত্র বিবিদের ছবি মুছে গেল। হয়ে গেল চারটা টেক্কা।
এই ম্যাজিকটার দাম পাঁচ টাকা। আমি পাঁচ টাকা দিয়ে ম্যাজিকটা কিনলাম। ম্যাজিশিয়ান আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কৌশল ব্যাখ্যা করলেন এবং চারটা তাশ আমাকে দিয়ে দিলেন।ম্যাজিকের কৌশল শেখার পর সবারই ধাক্কার মতো লাগে। মন খারাপ হয়ে যায়। কৌশল এত সহজ! আমি মুগ্ধ হলাম। মানুষকে এত সহজে বিভ্রান্ত করা যায়।এরপর থেকে আমার কাজ হয়ে দাঁড়াল ম্যাজিশিয়ান ভদ্রলোককে খুঁজে বের করা।
ঘণ্টার পর ঘন্টা তার ম্যাজিক দেখা এবং অতি সস্তায় কিছু ম্যাজিক তার কাছ থেকে কেনা। কারণ টাকা নেই। নাশতা খাবার জন্য যে টাকা বাবা পাঠান, তার একটা বড় অংশই এখন চলে যাচ্ছে ম্যাজিকের কৌশল কেনায়। সারাক্ষণ মনে হয় যদি প্রচুর টাকা থাকত, তাহলে এই লোকটার সব ম্যাজিক আমি কিনে নিতাম।ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে আমার কিছুটা খাতিরও হলো।ভদ্রলোকের নাম মনে নেই, তবে তার ওস্তাদের নাম মনে আছে। ওস্তাদের নাম যদু বাবু। ম্যাজিশিয়ান কথায় কথায় যদু বাবুর প্রসঙ্গ আনতেন।
যেমন— আমার ওস্তাদ যদু বাবু বলতেন যারা ম্যাজিকের জিনিসপত্র দিয়ে ম্যাজিক দেখায়, তারা ম্যাজিশিয়ান সমাজের কলঙ্ক। হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে যারা খেলা দেখায় তারাই খেলোয়াড়।আমি ম্যাজিশিয়ানকে একদিন বললাম, পামিং শিখতে চাই। কতদিন লাগবে? তিনি বিড়ি ধরাতে ধরতে বললেন, কমের পক্ষে কুড়ি বছর।প্রথম দশ বছর পয়সা হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে।হাতে নিয়ে ঘুরলেই হবে, আর কিছু না? না। দশ বছরে পয়সা হাতরে চিনবে, হাত পয়সারে চিনবে।দুইজনের ভিতর মহব্বত হবে।
আমি কয়েন হাতে নিয়ে ঘুরতে শুরু করলাম। সবসময় হাতে কয়েন। কখনো একটা। কখনো দুটা।ম্যাজিশিয়ান ভদ্রলোক থাকেন চানখাঁর পুলে। মাঝে মধ্যে তার ছাপড়ায় বেড়াতে যাই। তিনি আমাকে দেখে খুশিও হন না, বিরক্তও হন না। মন ভালো থাকলে এক- আধটা ম্যাজিক দেখান। একদিনের কথা। উনার মেজাজ খুব ভালো। আমাকে দেখেই বললেন, এখান থেকে যে- কোনো একটা তাশ নাও।আমি নিলাম হার্টসের দুই।ম্যাজিশিয়ান হাই তুলতে তুলতে বললেন, পানির গ্লাসের ভিতর তাকিয়ে দেখ কিছু দেখা যায় কি-না।আমি অবাক হয়ে দেখি, পানির গ্লাসে হার্টসের দুই-এর ছায়া। আমি মন্ত্রমুগ্ধ। ম্যাজিশিয়ান বললেন, আমি শিষ্য নেই না।
শিষ্য নিলে তোমারে নিতাম। তবে যদি পার আমাকে তিনশ’ টাকা দিও। এমন একটা ম্যাজিক তোমাকে শিখায়ে দিব বাকি জীবন করে খেতে পারবে। তিনশ’ টাকা তখন অনেক টাকা। হোস্টেলের ফুড চার্জ মাসে চল্লিশ টাকা। ষাট টাকায় আমার মাস চলে। সেখানে কোথায় পাব তিনশ’ টাকা? একসময় ছয় মাসের স্কলারশিপের টাকা একসঙ্গে পেলাম।প্রায় একহাজার টাকা। সেখান থেকে তিনশ’ টাকা নিয়ে গেলাম ম্যাজিশিয়ানের কাছে। তিনি তিনশ’ টাকা রেখে পরের মাসের প্রথম সপ্তাহে যেতে বললেন। আমি গেলাম এবং শুনলাম ম্যাজিশিয়ান ছাপড়া ছেড়ে চলে গেছেন।
কোথায় গেছেন কেউ জানে না।পাঠকের ধারণা হতে পারে এই ঘটনার পর আমি ম্যাজিকচর্চা ছেড়ে দিয়েছি। তা কিন্তু হয় নি। পামিং শেখা চালিয়ে গেছি। ম্যাজিকের বইপত্র জোগাড় করেছি। যে যা জানে তার কাছেই শেখার চেষ্টা করেছি।যে মানুষটি এই ব্যাপারে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, তার নাম জুয়েল আইচ। তাঁর কল্যাণেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যাদু সংস্থা—-International Brotherhood of Magicians-এর আমি সদস্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি ম্যাজিক দেখাই? উত্তর হলো, না। আমি ম্যাজিকটা করি সম্পূর্ণই আমার নিজের জন্যে।হঠাৎ হঠাৎ শাওনকে একটা কৌশল দেখাই। সে মুগ্ধ হবার অভিনয় করে। এতেই আমি খুশি।
বলপয়েন্টে ম্যাজিকের অংশটা বিস্তারিত লেখার কারণটা বলি? আমার লেখালেখিতে Magician-এর চরিত্র অনেকবার উঠে এসেছে। পাঠকদের কি মনে আছে এইসব দিনরাত্রি-র আনিসের কথা? যে চিলেকোঠায় থাকতো।ম্যাজিক দেখাতে।আমি বাস করি ম্যাজিকের জগতে। ছোট্ট নিষাদ যখন হাসে, সেই হাসিতে ম্যাজিক। তার মা যখন গান করে, তাতেও ম্যাজিক। আমি যখন একটি চরিত্র সৃষ্টি করি, সেখানেও ম্যাজিক।আমার সেই মহান ম্যাজিশিয়ানের স্বরূপ জানতে ইচ্ছা করে, যিনি আমাদের সবাইকেই অন্তহীন ম্যাজিকে ডুবিয়ে রেখেছেন।
১৭.
স্যার, আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন? না।তাহলে এত ভূতের গল্প কেন লিখেছেন? তোমাদের ভয় দেখানোর জন্যে। মানুষ নিরাপদ জায়গায় বসে ভয় পেতে ভালোবাসে।স্যার, ভূত কখনো দেখেছেন? তুমি দেখেছ? জি। ঘটনা বলব? বলো।আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।সামারের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। বর্ষাকাল। বৃষ্টি পড়ছে না, তবে আকাশে ঘন মেঘ। যে-কোনো সময় বর্ষণ শুরু হবে।
সন্ধ্যার পর পর আমি নৌকায় কাওরাইদ পৌঁছলাম। কিছুটা রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। গোরস্থানের পাশ দিয়ে রাস্তা। লোক চলাচল নেই বললেই হয়… শুরু হয়ে গেল ভূতের গল্প। আমি এখন পর্যন্ত এমন কাউকে পাই নি যার ঝুলিতে কোনো ভৌতিক অভিজ্ঞতা নেই।নাস্তিকরা এই বিষয়ে অনেক এগিয়ে। তারা ভূত বিশ্বাস করে না, কিন্তু তাদের ভৌতিক অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। এমন একজন হলেন অভিনেতা এবং আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।
