বহুব্রীহি পর্ব (১০)- হুমায়ূন আহমেদ

 কি নিয়ে ভাবছ?দেশে মাছের যে ভয়াবহ সমস্যা ঐটা নিয়ে ভাবছিকি করা যায় তাই । 

বহুব্রীহি

সব ভাববার লােক আছেতােমাকে মাথা ঘামাতে হবে নাএইতাে একটা ভুল কথা বললে মিনুদেশের সমস্যা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবেসবাই যদি ভাবে তাহলেই সমস্যার কোন একটা সমাধান বের করা যাবে। 

বেশতাে সকাল বেলা সমাধান বের করবেবারটা বাজে, এখন শুয়ে পড়নাও পানিটা খাও। 

সােবাহান সাহেব চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসলেনহাসতে হাসতেই বললেন, ঘড়িতে বারটা বাজে না, বাজে এগারােটাতােমরা এই ঘরের ঘড়ি এক ঘন্টা আগিয়ে দাওযেদিন প্রথম করলে সেদিনই টের পেয়েছিতােমাদের বুঝতে দেই নিতােমরা যা করছ, আমার প্রতি মমতা বশতই করছ তবু কাজটা ঠিক নাতােমরা ধোঁকা দেবার চেষ্টা করছধোঁকা দেয়া অন্যায়যাও শুয়ে পড়। 

মিনু কথা বাড়ালেন না, শুয়ে পড়লেনস্বামীকে তিনি খুব ভাল করে চেনেনএই মুহূর্তে তাকে ঘাঁটানাে ঠিক হবে না। 

মিনুবলআচ্ছা বলতাে তােমরা কি আমাকে খুব অল্প বুদ্ধির মানুষ বলে মনে কর? তা মনে করব কেন? 

এই যে ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা আগিয়ে দিলে, মনটাই একটু খারাপ হলতােমরা আমাকে নিয়ে এমন একটা ছেলেমানুষী ব্যাপার করছ। 

মিলি করেছেএই সব মিলির বুদ্ধিদাও এক্ষুণী ঠিক করে দিচ্ছি| দরকার নেইআমার ঘরের ঘড়ি এক ঘন্টা এগিয়েই থাকুকআমি মানুষটা অবশ্যি অনেকখানি পিছিয়ে আছিএই দিক দিয়ে ঠিকই আছেতুমি ঘুমাও মিনুবয়সতাে শুধু আমার একার বাড়ছে না, তােমারও বাড়ছেআমার যেমন বিশ্রাম দরকার, তােমারও দরকারসমাজটাই এমন যে পুরুষের প্রয়ােজনটাই বড় করে দেখা হয়মেয়েদেরটা দেখা হয় নাএই সমস্যা নিয়েও ভাবতে হবে। 

বহুব্রীহি পর্ব (১০)- হুমায়ূন আহমেদ

সােবাহান সাহেব নিজেই উঠে ঘরের বাতি নিভিয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে দিয়ে চেয়ারে বসলেনতাঁর সামনে একটা বিশাল খাতাখাতায় লেখামৎস্য সমস্যা। 

খাতার প্রথম পাতায় এদেশের সব রকম মাছের নাম লেখা আছেদেশে কত ধরনের মাছ পাওয়া যায়, কোন অঞ্চলে কোন মাছের কি নাম সব আগে লেখা দরকারসব জাতের মাছের ব্রিডিং টাইম কি একনা একেক মাছের একেক সময় তাও জানা দরকারমাছের খাবার কি? সােবাহান সাহেবের মন খারাপ লাগছে, তিনি মাছের দেশের মানুষ অথচ মাছের ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানেন নাশুধু জানেন বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে যখন আকাশ গুড় গুড় করে উঠে তখন কৈ মাছের ঝাক পানি ছেড়ে শুকােয় উঠে আসেরহস্যময় ব্যাপারএই পৃথিবী যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কত অদ্ভুত রহস্য চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেনতাঁকে চিনতে হবে এইসব রহস্যের মাঝে। 

বারান্দায় মিলি হাঁটছে| হাঁটতে হাঁটতে শুনগুন করে গাইছেমেয়েটার গানের গলা চমৎকার অথচ ভাল করে গান শিখল নাতাঁর ইচ্ছা করল মেয়েকে ডেকে পাশে বসিয়ে গান শুনেনতা সম্ভব হবে নাগাইতে বললে মিলি গাইতে পারে নাসে না কি গান করে নিজের জন্যে, অন্য কারাে জন্যে 

মিলি গাইছে বলি গাে সজনী যেয়াে না, যেয়াে না তার কাছে আর যেয়াে নাসুখে সে রয়েছে, সুখে সে থাকুক, মাের কথা তারে বলাে না বােলােনা। 

সন্দর গানতােসােবাহান সাহেবের মন আনন্দে পূর্ণ হলতিনি খাতা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেনমিলি রেলিংহেলান দিয়ে আছেআকাশ ভরা জোছনাকি অপরূপ ছবিএমন সুন্দর পৃথিবী ফেলে রেখে তাঁকে চলে যেতে হবে ভাবতেই কষ্ট হয়স্বৰ্গ কি এই পৃথিবীর চেয়েও সুন্দর হবে? তাও কি সম্ভব

মিলি গান বন্ধ করে বাবার দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, আমার মন অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে বাবা। 

বহুব্রীহি পর্ব (১০)- হুমায়ূন আহমেদ

কাল আমার টিউটোরিয়েল, কিছু পড়া হয় নিপড়তে ভাল লাগে না, কিযে করি। 

সোবাহান সাহেব সস্নেহে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেনমিলি বলল, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা আমরা পড়া লেখা করে নষ্ট করিকোন মানে হয় না। 

নিরিবিলি বাড়ির সবচে সরব মহিলারহিমার মার মুখে আজ সারাদিন কোন কথা নেইমিনুব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে রহিমার মা

রহিমার মা থমথমে গলায় বলল, কিছু হয় নাইগরীবের আবার হওয়া হওয়িগরীবের কিছুই হয় না। 

মিনু আর তাকে ঘটালেন নাচুপচাপ আছে ভাল আছে, কথা বলা শুরু করলে মুশকিল। 

সন্ধ্যায় চা বানাতে বানাতে রহিমার মা নিজের মনেই বলল, গরীবের দুঃখু কেউ বুঝে নামাইনষেতে বুঝেই না আল্লায়ও বুঝে না। 

খুবই ফিলসফিক কথাজাতীয় কথাবার্তা বলা শুরু করলে বুঝতে হবে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে| যা ঘটেছে তাকে ভয়াবহ বলা ঠিক হবে নাঘটনা ঘটেছে গত রাতেকাদের এবং রহিমার মা এক ঘরে ঘুমােয়কাজকর্ম শেষ করে রাত এগারােটার দিকে রহিমার মা ঘুমুতে এসে দেখে কাদের জেগে বসে আছেকাদেরের চোখে নতুন চশমাকাদেরকে কেমন ভদ্রলােক ভদ্রলােক লাগছেকাদের বলল, কেমন দেহায় খালাজী

রহিমার মা তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারল নাবিস্ময় সামলাতে সময় লাগলচশমা কই পাইছস?কিনলামএকশ দশ টেকা দামটেকা পয়সার দিকে চাইলেতাে হয় না খালাজীটেকা পয়সা হইল বটপাতাআইজ আছে কাইল নাইজেবন তাে বটপাতা নাজেবনের সাধ আহ্লাদ আছেকি কন খালালী

রহিমার মা জবাব দিল নাকাদের চোখ থেকে চশমা খুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে বলল, জিনিসটার প্রয়ােজনও আছে খালাজীচেহাৱা সুশরের কথা বাদ দিলেও জিনিসটার বড়ই দরকারচউক্ষে ধূলাবালি পড়ে নারইদ কম লাগেচউক্ষের আরাম হয়। 

বহুব্রীহি পর্ব (১০)- হুমায়ূন আহমেদ

দাম কত কইলি

একশ দশপাওয়ার দিলে আরাে বেশী পড়তবিনা পাওয়ারে নিলামবুড়াকালে পাওয়ার কিনমু। 

রহিমার মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আটকে রাখতে পারল নাএই কাদের ছােকরা বড়ই শৌখিনবেতনের টাকা পেলেই এটা ওটা কিনে ফেলেগত মাসে কিনেছে কলমকলম কিনে এনে গম্ভীর গলায় বলেছে, কলম কিনলাম একটা খালাজী, চাইনীজ

রহিমার মা অবাক হয়ে বলেছে, কলম দিয়া তুই করবি কি? লেহা পড়া জানছ

কাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে লেহাপড়া কপালে নাই করমু কি কন? লেহাপড়া না জানলেও কলম একটা থাকা দরকারপকেটে কলম থাকলে বাইরের একটা লােক ফট কইরা তুমি বইল্যা ডাক দিব নাবলব, ভাইসাব। 

রহিমার মারও খুব শখ ছিল একটা কলম কেনারতবে কাদের যেমন কলম পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে সে তা পারবে না জেনে কেনে নিএখন আবার চশমা কিনে ফেলেছেঈষায় রহিমার মাচোখ জ্বালা করতে লাগল। 

কাদের বলল, দেহায় কেমন খালাজী? রহিমার মা বিরক্ত মুখে বলল, যেমুন চেহারা তেমুন দেহায়ভ্যান ভ্যান করিস না। 

আয়নায় অনেকক্ষণ কাদের নিজেকে দেখলতারপর বারান্দায় একটু হেঁটে আসলচশমা পরার পর তার হাঁটার ভঙ্গিও বদলে গেছে| সেই রাতে মনের কষ্টে রহিমার মার ঘুম হল নাতার মেজাজ খারাপের এই হচ্ছে পূর্ব ইতিহাসমিনু পূর্ব ইতিহাস জানেন নাকাজেই রহিমার মা যখন এসে তাঁকে বলল, আমার চউক্ষে যেন কি হইছে আম্মা,তখন তিনি সঙ্গত কারণেই চিন্তিত হয়ে বললেন, কি হয়েছে

চউখ খালি কড় কড় করে। তাই নাকি? আবার চিলিক দিয়া বেদনা হয়ডাক্তার দেখাওডাক্তার লাগতাে না আম্মাচশমা দিলে ঠিক হইব। চশমার দাম বেশী নাএকশ দশকাদের কিনছে। 

বহুব্রীহি পর্ব (১০)- হুমায়ূন আহমেদ

কাদের চশমা কিনেছে

জ্বি আম্মাজেবনের একটা সাধ আহলাদ আছে না? | মিনু বিরক্ত হয়ে বললেন, কাদের যা করে তােমাকে তাই করতে হবে? তুমি বড় যন্ত্রণা কর রহিমার মা। 

কয় দিন আর বীচমু আম্মা কন?আচ্ছা ঠিক আছে যাও চশমা দেয়া হবে। 

Leave a comment

Your email address will not be published.