বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

রাত এগারোটা বাজে। ফতে বসে আছে তাদের বাসার পেছনে মিউনিসিপ্যালিটির ফ্ৰক জায়গাটিার ভেতরে কংক্রিটের এক চেয়ারে। জায়গাটির নাম–শিশু বিনোদন পার্ক। এই নামে ক্ৰীড়া প্রতিমন্ত্রী জায়গার উদ্বোধন করেছেন। শ্বেতপাথরের একটি ফলকে এই বিশেষ ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্বোধনের দুদিন আগে তড়িঘড়ি করে কয়েকটা লম্বা চেয়ার বসানো হয়েছে। একটা স্নাইড এবং দুটা সি-সো।

একটা দোলনা আনা হয়েছে, বসানো হয় নি। যেহেতু উদ্বোধন হয়ে গেছে এখন আর বসানোর তাড়া নেই। জিনিসগুলি রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। দোলনাটা অবিশ্যি কিছু কাজে লাগছে। দোলনার খুঁটিতে দড়ি লাগিয়ে পলিথিন ঝুলিয়ে গ্রাম থেকে আসা একটা পরিবার সুন্দর সংসার পেতে ফেলেছে।

ফতে এই পরিবারটিকে শুরু থেকেই লক্ষ করছে। বাবা-মা, তেরো-চৌদ্দ বছরের একটা বড় বড় চোখের রোগা মেয়ে। এরা দিশাহারা ভঙ্গিতে একদিন পার্কে ঢুকল, ফতে তখন বেঞ্চিতে বসে বাদাম খাচ্ছে। লক্ষ্য রাখছে পরিবারটি কী করে। স্বামী-স্ত্রী নিচুগলায় কিছুক্ষণ কথা বলল। লোকটি এগিয়ে এল ফতের দিকে। ভিক্ষা চাইতে আসছে না এটা বোঝা যাচ্ছে। গ্রাম থেকে যারা আসে তারা এসেই ভিক্ষা করা শুরু করতে পারে না। সময় লাগে।ভাইসাব এইটা কি সরকারি জায়গা?

লোকটা খুবই বিনীত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করছে। তার স্ত্রী ও কন্যা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। ফতে বলল, হ্যাঁ, এটা মিউনিসিপালটির জায়গা।সরকারি জাগোত আমরা যদি থাকি কোনো অসুবিধা আছে? কোনো অসুবিধা নাই–থাকেন।আমরা এই পরথম ঢাকা শহরে আসছি। কাজের ধান্দায় আসছি।ভালো করেছেন।এই জায়গাটা কি নিরাপদ? আপনার এবং আপনার স্ত্রীর জন্যে নিরাপদ। আপনাদের মেয়ের জন্যে নিরাপদ না। একদিন দেখবেন মেয়ে নাই।লোকটা ভীত মুখে তাকিয়ে রইল। ফতে বলল, মেয়ের নাম কী?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

মেয়ের নাম দিলজান।দিলজানকে বাকির খাতায় ধরে সংসার পাতেন কোনো সমস্যা নাই। আপনার দেখাদেখি আরো অনেকে উঠে আসবে। সুন্দর একটা বস্তি তৈরি হয়ে যাবে। আপনাদের সাহায্যের জন্যে এনজিওরা আসবে। সুন্দর সুন্দর স্মার্ট মেয়েরা ভিটামিন এ ট্যাবলেট দিয়ে যাবে। বয়স্করা স্কুলে ভর্তি হবে। নানান রকম পরীক্ষা হবে।

কী বলতেছেন কিছু বুঝতেছি না জনাব।বোঝবার কিছু নাই। সংসার পাততে চান-পাতেন। নেন সিগারেট নেন।লোকটা একবার সিগারেটের দিকে তাকাচ্ছে একবার তার কন্যার দিকে তাকাচ্ছে। অপরিচিত মানুষের থেকে সিগারেট নেওয়া ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না। আবার আস্ত সিগারেটের লোভও ছাড়তে পারছে না। শেষ পর্যন্ত লোভ জয়ী হল-সে সিগারেট নিয়ে চলে গেল।

ফতে ফজলু মিয়ার পরিবারের পরবর্তী কর্মকাণ্ডে প্রায় মুগ্ধ হয়ে গেল। তারা অতিদ্রুত সংসার সাজিয়ে ফেলল। প্রথম দিনেই লোকটির স্ত্রী চুলা বানিয়ে ফেলল-চুলার আশপাশের কিছু অংশ লেপে ফেলল। সেখানে একটা মোড়া এবং কাঠের খুঁড়ি চলে এল। এক রাতে দেখা গেল চুলার উপরে কাপড় শুকানোর মতো করে লম্বা করে তার টানানো হয়েছে।

সেই তারে মাছ শুকানো হচ্ছে। লোকটিও চালাক-ঠেলা চালানোর কাজ যোগাড় করে ফেলল। দিনের বেলা ঠেলা চালায়, রাতে এক চায়ের দোকানের এসিসটেন্ট। মেয়েটিকে নিয়ে এখনো তাদের কোনো সমস্যা হয় নি। তবে তারা এখন এক না, আরো চার-পাঁচটি পরিবার চলে এসেছে। এখন নিশ্চয়ই তাদের খানিকটা জোর হয়েছে।

ফজলু রান্না চড়িয়েছে। তার কাছেই দিলাজান। বাবার সঙ্গে নিচুগলায় গল্প করছে, মাঝে মাঝে চুলার খড়ি নেড়েচেড়ে দিচ্ছে। রান্না আজ অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে ফজলুর স্ত্রী অসুস্থ। ফতে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফজলুর দিকে এগিয়ে গেল, আগুনের পাশে বসে সিগারেটটা শেষ করলে ভালো লাগবে।ফজলু কেমন আছ?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

ফতে নিঃশব্দে এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে। ফজলু বুঝতে পারে নি বলে ভয়ঙ্কর চমকে গেল। ফতেকে দেখে সে নিশ্চিন্ত হতে পারুল না। চোখে-মুখে ভয়ের ভাবটা থেকে গেল। শুকনো গলায় বলল, জে ভালো আছি। আপনের সাইল ভালো। এই বলেই সে ফতে যাতে দেখতে না পায় এমন ভঙ্গিতে মেয়েকে চােখের ইশারা করল—যার অর্থ তুই এখানে থাকিস না। ঘরে ঢুকে যা। মেয়ে বাবার আদেশ পালন করল। ফতে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখল। তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হল না। দিলজান যে মোড়ায় বসে ছিল ফতে সেই মোড়াতে বসতে বসতে বলল-কী রান্না হচ্ছে?

ফজলু বিনীত গলায় বলল, গরিবের খাওয়া খাদ্য।গরিবের খাওয়া খাদ্যটা কী? আমার তো মনে হচ্ছে মাংস রান্না হচ্ছে। ভালো ঘ্রাণ বের হচ্ছে! দিলজান মাংস খাইতে চায়। কয়েক দিন ধইরা বলতেছে। দুই দিন পরে বিবাহ কইরা শ্বশুরবাড়িতে যাইব। আমার কাছে যে কয়দিন আছে। শখ মিটিয়ে দেই।বিয়ে ঠিক হয়েছে নাকি?

জে না, তবে এইটা নিয়া চিন্তা করি না। জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ আল্লাপাকের ঠিক করা। উনি যেখানে ঠিক করেছেন সেইখানেই হবে।খারাপ না। আল্লা মেহেরবান-রোজই কাজ পাই। গতির খাটনি কাম–তয় গাছপালার কাম পাইলে ভালো হইত।গাছপালার কামটা কী?

ফজলু উৎসাহ নিয়ে ঘুরে বসল। আগ্রহের সঙ্গে বলল–ঢাকা শহরে দেখছি রাস্তায় রাস্তায় গাছপালা বেচে। ফুলের গাছ, ফলের গাছ। গাছ বেচতে পারলে ভালো হইত। গাছপালা আমার হাতে খুব হয়।ফতের সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। সে সিগারেটের টুকরাটা দূরে ফেলে আরেকটা ধরাতে ধরাতে বলল-নার্সারির কাজ খারাপ না, কোনো ফুটপাত দখল করে বসে পড়লেই হয়। তবে ব্যবসাটা কীভাবে হয় জানতে হবে।

গাছপালা যোগাড় করতে হবে। আমি এক নার্সারির মালিককে চিনি তার সাথে আলাপ করে দেখতে পারি।ফজলুর চোখ চকচক করছে। মনে হচ্ছে সে চোখের সামনে দেখছে অসংখ্য গাছপালা সাজিয়ে সে বসে আছে। শহরের লোকজন বড় বড় গাড়ি নিয়ে আসছে। চকচকে নোট বের করে গাছ নিয়ে চলে যাচ্ছে। ফতে বলল-সিগারেট খাবে? ফজলু আনন্দের সঙ্গে বলল, দেন একটা টান দেই।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

ফতে সিগারেট দিল। ফজলু চুলা থেকে জ্বলন্ত লাকড়ি বের করে সেই আগুনে সিগারেট ধরিয়ে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বলল—গাছের ব্যবসার খোঁজখবর নিয়েন। আমি কলমের কামও খুব ভালো জানি।তাই নাকি?

জি। আমরার গেরামের যত তিতকুট বরই গাছ আছে-কলম দিয়া সব বরই মিষ্টি বানায়ে দিছি। আমরার গোরামে আমারে কী ডাকত জানেন ভাইজোন? আমারে ডাকত গাছ ডাকাতর।তোমার গ্রামের নাম কী?

শুভপুর। বড়ই সৌন্দর্য জায়গা। কপালে নাই বইল্যা থাকতে পারলাম না।ফতে উঠে পড়ল। রাত বারোটার আগে তাকে বাড়িতে পৌঁছতে হবে। রাত বারোটার সময় মূল গেট বন্ধ হয়ে যায়। দারোয়ান গেটে তালা লাগিয়ে গেটের পাশে বেঞ্চিতে বসে ঘুমাবার আয়োজন করে।

তার ওপর নির্দেশ আছে বারোটার সময় গেট বন্ধ হয়ে যাবে। তখন গেট খুলতে হলে মালিকের অনুমতি লাগবে। গেট খোলার সময় তিনি উপস্থিত থাকবেন।ফতের বেলায় হয়তো এটা হবে না। দারোয়ানের সঙ্গে ভালোই খাতির আছে, তারপরেও বিস্ক নেবার দরকার কী? মামা যদি জেগে থাকে গেট খোলার শব্দে অবশ্যই বারান্দায় এসে দাঁড়াবে। চিলের মতো গলায় বলবে-কে আসল?

ও আচ্ছা, বাংলার ছোট লাট সাহেব।ফতে থাকে তার মামার বাড়ির গ্যারেজে।মামা গাড়ি কেনেন নি বলে তার গ্যারেজ খালি। তিনি কখনো গাড়ি কিনবেন। এরকম মনে হয় না। দরিদ্র লোকজন যখন টাকা পয়সা করে তখন জমি কেনে, বাড়ি বানায়। কেউ কেউ এক পর্যায়ে গাড়ি কেনার মতো সাহস সঞ্চয় করে ফেলে। আর কেউ কোনোদিনই তা পারে না। বদরুল সাহেব দ্বিতীয় দলের। গাড়ি না।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

কিনলেও তিনি একটা বেবিট্যাক্সি কিনেছেন। প্রাইভেট সাইনবোর্ড লাগানো বেবিট্যাক্সিতে করে তিনি ঘুরে বেড়ান, তার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখেন।গ্যারেজে দুটো চৌকি আছে। একটায় ফতে ঘুমায় পাশেরটায় বেবিট্যাক্সির ড্রাইভার বাদল। তবে বেশিরভাগ সময় বাদল তার বাড়িতে চলে যায়। হঠাৎ হঠাৎ বেবিট্যাক্সি চালানোর প্রয়োজন পড়লে ফতে চালায়। তার লাইসেন্স নেই।

কিন্তু বেবিট্যাক্সি সে ভালোই চালাতে পারে। যদিও বদরুল সাহেব তার ভাগ্লের বেবিট্যাক্সি চালানোর কোনো ভরসা পান না। সারাক্ষিণ টেনশনে থাকেন। সারাক্ষণ উপদেশ দিতে থাকেন–এই গাধা আস্তে চালা। এই গাধা তোর ওভারটেক করার দরকার কী? তোর কি হাগা ধরেছে? হর্ন দেস না কেন? হর্ন না দিলে রিকশাওয়ালা বুঝবে কী করে তার পিছনে বেবিট্যাক্সি? রিকশাওয়ালার মাথার পিছনে কি চক্ষু আছে?

বাসায় পৌঁছেই ফতে দেখে উঠানে জটিল। তার মামা ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছেন। ফতেকে দেখেই তিনি ধমক দিয়ে উঠলেন-রাত বারোটা বাজে তুই ছিলি কোথায়? মদ ধরেছিস নাকি? মদের আখড়ায় ছিলি? গা দিয়ে তো মদের গন্ধ বের হচ্ছে। মাল টেনে এসেছিস?

ফতে জবাব দিল না। উত্তপ্ত মুহূর্তে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরে নীরব থাকতে হয়। মামা অতি উত্তপ্ত।বেবিট্যাক্সি বের কর। তোর মামিকে হাসপাতালে নিতে হবে। হঠাৎ তার পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। ব্যথায় হাত-পা নীল হয়ে যাচ্ছে! বুঝলাম না। কী ব্যাপার।ফতে বলল, কোন হাসপাতালে যাবেন মামা?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

আরো গাধা গাড়ি বের কর আগে। বেহুদা কথা বলে সময় নষ্ট।ফতে বলল, ব্যথা থাকবে না মামা। কমে যাবে।বদরুল ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, তুই কি গণক এসেছিস? গান গুনে বলে দিলি ব্যথা কমে যাবে। কথা বলে সময় নষ্ট। গাড়ি স্টার্ট দে।ফতে গাড়ি স্টার্ট দিল। বদরুল তার স্ত্রীকে হাত ধরে নিচে নিয়ে এলেন। তারা গাড়িতে ওঠার পরপরই ফতের মামি বলল, ব্যথা কমে গেছে।

বদরুল বললেন-কতটুকু কমেছে?

অনেক কম। বলতে গেলে ব্যথা নাই।

একটু আগে কাটা মুরগির মতো ছটফট করছিলে এখন বলছ ব্যথা নাই।

হাসপাতালে যাব না।

আবার যদি শুরু হয়?

শুরু হলে তখন যাব।

বদরুল স্ত্রীকে হাত ধরে নামালেন। ফতের দিকে তাকিয়ে বললেন-তুই ঘুমাবি না। তোর মরণ ঘুম। একবার ঘুমালে কার সাধ্য তোকে ডেকে তোলে। তুই জেগে বসে থাকিবি। তোর মামির ব্যথা আবার উঠবে বলে আমার ধারণা।ফতে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ুল। এবং ফজরের আজান না পড়া পর্যন্ত জেগে বসে রইল। অনেকের রাত জগতে কষ্ট হয়। ফতের কখনো হয় না। বরং রাত জাগতে তার ভালো লাগে। রাতে নানান চিন্তা করতে তার ভালো লাগে।

এই চিন্তা দিনে কখনো করতে ভালো লাগে না। দিনে অবিশ্যি চিন্তাগুলি মাথায় আসেও না। চিন্তাগুলি রাতের। রাত যত গভীর হয় চিন্তাগুলিও গভীর হয়।ফতের আশপাশের সব মানুষকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করে। কাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যায়-এই চিন্তা। যেমন মামা বদরুল আলম। তাকে নানানভাবে শাস্তি দেওয়া যায়-নরম শাস্তি, নরমের চেয়ে একটু বেশি-কঠিন শাস্তি।

তবে মামার মানসিক অবস্থা এইরকম যে-যে কোনো শাস্তিই তার জন্যে কঠিন শাস্তি। ফতে একেক সময় একেক ধরনের শাস্তির কথা ভাবে। গতরাতে ভেবেছে সে তার মামিকে নিয়ে কিছু আজেবাজে কথা লিখে বেনামে মামার কাছে একটা চিঠি লিখবে। এই শাস্তিটা হবে খুবই কঠিন। কারণ তার মামার অসংখ্য দোষ থাকলেও তিনি তাঁর স্ত্রীকে পাগলের মতো ভালবাসেন। ভালবাসেন বলেই সন্দেহের চোখে দেখেন। স্ত্রীকে একা কোথাও যেতে দেবেন না।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

সব সময় নিজে সঙ্গে যাবেন। তার স্ত্রীকে কেউ টেলিফেন করলে তিনি তৎক্ষণাৎ একতলায় চলে যাকেন। অতি সাবধানে একতলার টেলিফোন রিসিভার কানে নিয়ে শুনবেন কে টেলিফোন করেছে। একতলার টেলিফোন এবং দোতলার টেলিফোন প্যারালাল কানেকশন আছে। তার স্ত্রীর নামে যেসব চিঠি আসে তার প্রত্যেকটা তিনি আগে পড়ে তারপর স্ত্রীর হাতে দেন। এই যখন অবস্থা তখন যদি তার কাছে একটা চিঠি আসে যার বিষয়বস্তু ভয়াবহ তখন কী হবে? চিঠিটা এরকম হতে পারে–

জনাব বদরুল আলম সাহেব, সালাম, পর সমাচার, আমি আপনাকে কিছু গোপন বিষয় জানাইবার জন্য এই পুত্ৰ লিখিতেছি। বিষয়টি অত্যধিক গোপন বুলিয়া আমি আমার নিজের পরিচয়ও গোপন রাখলাম। এই ক্ৰটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিবেন-ইহাই আমার কামনা। যাহা হউক এখন মূল বিষয়ে আসি–আপনার স্ত্রী তসলিমা খানম বিষয়ে কিছু কথা। তসলিমা খানম যখন বিদ্যাসুন্দরী স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী তখন জনৈক তরুণের সঙ্গে তাহার অতীব ঘনিষ্ঠত হয়।

যে ঘনিষ্ঠতার কথা ভাষায় বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নহে। উক্ত তরুণ দুষ্ট প্ৰকৃতির ছিল, সে তসলিমা খানমের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠতার কিছু ছবি গোপনে তাহার আরেক দুষ্ট বন্ধুর সহায়তায় তোলে। ছবির সর্বমোট সংখ্যা একুশ। এই একুশটি ছবির মধ্যে পাঁচটি ছবি এতই কুরুটিপূর্ণ যে, যে কোনো মানুষ শিহরিত হইবে।

জনাব আপনাকে উত্তেজিত এবং ছবির কারণে ভীত হইতে নিষেধ করিতেছে। কারণ আমি সমুদয় ছবির নেগেটিভসহ সঞ্চগ্ৰহ কারয়া নষ্ট কবিয়া দিয়াছি। কাজেই উক্ত ছবি দেখাইয়া কেহই অৰ্থ সংগ্রহের জন্যে আপনাকে চাপ দিতে পারিবে না। আপনাকে এই তথ্য জানাইয়া রাখিলাম। এখন কেহ যদি ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ছবির কথা বলিয়া আপনার নিকট হইতে অর্থ গ্ৰহণের চেষ্টা করে আপনি ইহাকে মোটেই আমল দিবেন না।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৪

হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগিতেছে আমি এই কাজটি কেন করলাম? আমি কাজটি করলাম। কারণ আমার কাছে মনে হইয়াছে ইহা একটি সৎকর্ম। ইহকালে আমি সৎকর্মের কোনো প্রতিদান আশা করি না। কিন্তু পরকালে আমি এই সৎকর্মের প্রতিদান অবশ্যই পাইব।

এখন জনাব আপনার নিকট আমার একটি আবদার—আমি আপনার মঙ্গলের জন্যে একটি কঠিন কর্ম করিয়াছি। আমি আশা করি তাহার প্রতিদানে আপনি আমার একটি আবদার রক্ষা করিবেন। আবদারটি হইল—এই বিষয়ে আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো আলোচনা করিবেন না। উঠতি বয়সে তিনি একটি ভুল করিয়াছিলেন-সেই ভুল ক্ষমা করবেন। আল্লাহপাক ক্ষমা পছন্দ করেন।

আরজ ইতি

আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী জনৈক মাদান।

এই এক চিঠিতেই চৌদ্দটা বেজে যাবার কথা। শাস্তির শুরু। তারপর আস্তে আস্তে শাস্তির ডোজ বাড়াতে হবে।

 

Read more

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.