বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯ হুমায়ূন আহমেদ

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

এই বলেই সে আর দাঁড়াল না। হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাবার পর পেছন ফিরে দেখে লোকটা তার পেছনে পেছনে আসছে। ফতের বুক আবার ধড়ফড় করতে শুরু করল। সে দৌড়াতে শুরু করল। তখন ঐ লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল, তবে তাকিয়ে রইল। ফতের দিকে। দৃশ্যটা মনে পড়লেই ফতের বুক কাঁপে।

মিসির আলির ব্যাপারটা ফতে ঠিক ধরতে পারছে না। ফতেরা যে ক্ষমতা এই মানুষটার কি সেই ক্ষমতা আছে? মাঝে মাঝে মনে হয় আছে–আবার মাঝে মাঝে মনে হয় নেই। মিসির আলির মাথায় বেশিরভাগ সময়ই ফাতে ঢুকতে পারে না। সন্দেহটা সেই কারণেই হয়। যতবার ফতে মিসির আলির মাথার ভিতর ঢুকেছে ততবারই সে ধাক্কার মতো খেয়েছে। লোকটা একসঙ্গে অনেক কিছু চিন্তা করছে। তিনটা-চারটা চিন্তা কোনো মানুষ একসঙ্গে করছে—এমন কারোর সঙ্গেই ফতের এর আগে দেখা হয় নি। ফতে মিসির আলির ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে চায়। পুরোপুরি জানতে চায় এই মানুষটারও কি তার মতো ক্ষমতা আছে?

ফতের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে তার ক্ষমতার ব্যাপারটা মিসির আলিকে খোলাখুলি বলে। কিন্তু তার মন সায় দেয় না। লোকটাকে এটা বলে তার লাভ কী। এমন তো না যে এটা কোনো অসুখ সে অসুখ থেকে মুক্তি চায়। আগবাড়িয়ে বললে–একজন তার গোপন ব্যাপারটা জেনে ফেলবে। একজন জানা মানেই অনেকের জানা। কী দরকার।

মিসির আলির গোসল শেষ হয়েছে। তিনি এসে ফাতের সামনের চেয়ারে বসেছেন। ফাতে খুবই হতাশা বোধ করছে। মিসির আলির মাথার ভেতর সে ঢুকতে পারছে না। ইয়াসিন এসে পরোটা এবং বাটিতে করে মুরগির লটপট দিয়ে গেল। ফতে বলল, স্যার খান এর নাম মুরগির লটপটি।মিসির আলি কোনো কথা না বলে খেতে শুরু করলেন। ফতে বলল, খেতে কেমন স্যার?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

মিসির আলি বললেন, ভালো।

আপনার কি শরীর খারাপ? –

না শরীর খারাপ না। মেজাজ। সামান্য খারাপ। কোনো কারণ ছাড়াই খারাপ।আমি বেশিক্ষণ থাকব না স্যার। নাশতা খেয়ে আপনার ফতুয়ার মাপটা নিয়ে কাপড় কিনতে যাব। কী রঙের কাপড় আপনার পছন্দ? মিসির আলি বললেন, কাপড়ের রঙ নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। শুধু কটকট না করলেই হল।হালকা নীল রঙ কিনব স্যার?

কিনতে পার।কাপড়ের দামটা স্যার আমি দিব। আপনি যদি কিছু মনে না করেন। শুধু দরজির খরচটা। আপনি দিবেন। প্রথম ব্যবসা-বিনা টাকায় করা ঠিক না।মিসির আলি বললেন, আমি দরজির খরচ দেব। কোনো অসুবিধা নেই।আজ সন্ধ্যার মধ্যে ফতুয়া দোকানে গিয়ে ডেলিভারি নেবেন। কষ্টটা আপনাকে করতে হবে।আচ্ছা করব। ঠিকানা রেখে যাও, আমি সন্ধ্যার পরপর যাব।

মিসির আলির নাশতা খাওয়া শেষ হয়েছে। তিনি চা খাচ্ছেন। ফতে কয়েকবার চেষ্টা করেও মিসির আলির মাথার ভেতর ঢুকতে পারল না। সে পরিকল্পনা বদলাল। লোকটাকে চমকে দেবার কোনো দরকার নেই। পরে হয়তো দেখা যাবে চমকে দিতে গিয়ে এমন কিছু ঘটল যে উল্টো সে নিজেই চমকাল। লোকটির বিষয়ে আগে সে পুরোপুরি জানবে। তারপর অন্য ব্যবস্থা।ফতে মাপ নেবার জন্যে ফিতা বের করল। দরজিদের মতোই উঁচু গলায় মাপ বলতে বলতে কাগজে লিখে নিল।

লম্বা – ২৯

বুক – ৩৪

পুট – ৬

হাত – ১২

মুহরি – ১৬

গলা – ১৩.৫

ফতে বলল, একটু দোয়া রাখবেন স্যার দরজির কাজটা যেন তাড়াতাড়ি শিখতে পারি। খবরের কাগজে নকশা করে, খবরের কাগজ কেটে কেটে কয়েকদিন চেষ্টা করেছি আউল লেগে যায়।মিসির আলি বললেন, সব কাজ সবার জন্যে না।ফতে সামান্য চমকাল মিসির আলি এই কথাটা কেন বললেন। তিনি কি কিছু বুঝতে পারছেন? না এটা শুধুই কথার কথা। ফতে বলল, স্যার আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। যদি কিছু মনে না নেন।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

জিজ্ঞেস কর।

ফতে মিনমিনে গলায় বলল, আমার বিষয়ে আপনার কী ধারণা?

তোমার প্রশ্নটা বুঝতে পারছি না। আরো পরিষ্কার করে বল।

আমাকে দেখলে আপনার কী মনে হয়?

মনে হয় তুমি সব সময় আতঙ্কে আছ। সবাইকে ভয় পাচ্ছ।

ফতে মুখ শুকনা করে ফেলল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। এই লোক কী করে বুঝল সে সবাইকে ভয় পায়। তার ভয় তো সে প্রকাশ করে না। নিজের ভিতর লুকিয়ে রাখে। লুকানো জিনিস সে জানল কীভাবে? স্যার আমি যাই?

ফতুয়ার লেখা কাগজটা ফেলে গেছ। মাপটা নিয়ে যাও। লম্বার মাপে ভুল আছে-লম্বা বাইশ। তুমি মাপ নিয়েছ বাইশের বলেছ ঊনত্রিশ, লিখেছও ঊনত্রিশ।মিসির আলি সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরেই থাকলেন। প্রতিমা এল না। এতে তার টেনশন কমল না-যে কোনো সময় চলে আসবে। এই টেনশন থেকেই গেল।সন্ধ্যায়, ফতুয়া আনতে গেলেন। দরজির দোকান ফতে সুন্দর সাজিয়েছে। ঝলমলে বাতি জ্বলছে।

টাকা দিয়ে মিসির আলি ফতুয়া নিলেন। দোকানের মালিক ফতে ছিল না। মিসির আলি কেমন যেন স্বস্তিবোধ করলেন। স্বস্তিবোধ করার কারণটা তার কাছে স্পষ্ট না। মিসির আলি মাথা নিচু করে হাঁটছেন। বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। তার মনে ক্ষীণ সন্দেহ-বাসায় ফিরে দেখবেন প্রতিমা এসেছে। দেড়টনি একটা ট্রাক নিয়ে এসেছে। সে ট্রাকে মিসির আলির জিনিসপত্র তুলে অপেক্ষা করছে কখন মিসির আলি আসবেন।

এতটা এই মেয়ে নিশ্চয়ই করবে না, আবার করতেও পারে। অস্বাভাবিক মানুষ পারে না এমন কাজ নেই। কাউকে চট করে অস্বাভাবিক বলা ঠিক না। মানুষ স্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিকের সীমারেখায় বাস করে। একজন স্বাভাবিক মানুষ মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করে, আবার খুবই অস্বাভাবিক মানুষ হঠাৎ স্বাভাবিক আচরণ করে। এখানেও কথা আছে-কোন আচরণগুলিকে আমরা স্বাভাবিক আচরণ বলব। স্বাভাবিকের মানদণ্ড কে ঠিক করে দেবো? মিসির আলি যে আচরণকে স্বাভাবিক ভাবছেন-ফতে মিয়া কি তাকে স্বাভাবিক ভাববে?ভ্রূ কুঁচকে মিসির আলি ফতের কথা ভাবতে শুরু করলেন। ফতেকে কি খুব স্বাভাবিক মানুষ বলা যায়?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

মিসির আলি মাথা নেড়ে নিজের মনে বললেন, হ্যাঁ বলা যায়।মিসির আলি আবারো নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ফতেকে কি অস্বাভাবিক বলতে চাইলে বলতে পারে? প্রশ্ন এবং উত্তরের খেলা চলতে লাগল। কিছু দাবা খেলোয়াড় আছে সঙ্গী না পেলে নিজেই নিজের সঙ্গে দাবা খেলে—মিসির আলিও ইদানীং তাই করেন। নিজেই প্রশ্ন করেন। নিজেই উত্তর দেন। কাজটা বেশিরভাগ সময় করেন। পথে যখন হাটেন। এটাও বয়স বাড়ার কোনো লক্ষণ কি না। তিনি জানেন না। একটা বয়সের পর সবাই কি এ রকম করে? করার কথা।

মিসির আলির নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার নমুনা এ রকম—

প্রশ্ন : ফতের কোন আচরণটা সবচেয়ে অস্বাভাবিক?

উত্তর : সে ভীতু প্রকৃতির মানুষ। ভয়ে সে অস্থির হয়ে থাকে। ভীতু মানুষরা কারো চোখের দিকে সরাসরি তাকায় না। আর তাকালেও খুব অল্প সময়ের জন্যে তাকায়। এ ধরনের মানুষ বেশিরভাগ সময় মেঝের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফতে সব সময় চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

প্রশ্ন : সে কেন চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে?

উত্তর : হয়তোবা চোখের ভাষা পড়তে চায়। হয়তো সে চোখের ভাষা সহজে বুঝতে পারে।

প্রশ্ন : তোমার এই হাইপোথিসিস কীভাবে প্রমাণ করা যাবে?

উত্তর : খুব সহজেই প্রমাণ করা যায়! চোখে সানগ্লাস পরে তার সামনে বসতে হবে। সানগ্লাসের কারণে তার চোখ দেখা যাবে না। কাজেই ফতে আর চোখের দিকে তাকাবে না।

প্রশ্ন : আর কোনো পদ্ধতি আছে?

উত্তর : একজন জন্মান্ধের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দিয়ে দেখা যেতে পারে।

প্রশ্ন : তার অস্বাভাবিকতার আর কোনো উদাহরণ কি আছে?

উত্তর : হ্যাঁ আছে। বড় একটা উদাহরণ আছে।

প্রশ্ন : বল শুনি।

উত্তর : না এখন বলব না। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে নিই।

প্রশ্ন : কী আশ্চর্য তুমি যা বলার আমাকেই তো বলছ। আমি তো বাইরের কেউ না।

উত্তর : যে প্রশ্ন করছে এবং যে উত্তর দিচ্ছে তারা একই ব্যক্তি হলেও আলাদা সত্তা। একটি সত্তা অন্য সত্তার থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে চাইতেই পারে।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

মিসির আলি ঘড়ি দেখলেন সাড়ে সাতটা বাজে। প্রায় দেড় ঘণ্টা তিনি হেঁটেছেন-কোনো এক চিপা গলির ভেতর ঢুকে পড়েছেন। জায়গাটা চিনতে পারছেন না। একজনকে জিজ্ঞেস করলেন—ভাই এই জায়গাটার নাম কী? সে এমনভাবে তাকাল যেন খুব গৰ্হিত কোনো প্রশ্ন তিনি করে ফেলেছেন।

জবাব না দিয়ে সে চলে গেল। আরেকজনকে একই প্রশ্ন করলেন, সে নিতান্তই বিরক্ত গলায় বলল, জানি না।অদ্ভুত এক গলি, তার চোখের সামনে দিয়ে কালো রঙের প্রকাণ্ড এক শূকর কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে চলে গেল। মেথরপট্টিতে শূকর পোষা হয় এই জায়গাটা নিশ্চয় মেথরপট্টি না। তিনি কোথায় এসে পড়েছেন?

রাত নটা।ফতে মিয়াকে নিউমার্কেটের কাঁচাবাজারে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। সে এসেছে মুরগি কিনতে। সে চারটা রোষ্টের মুরগি কিনবে। ফতের মামির কিছু বান্ধবী কাল দুপুরে খাবে। মামি রাতেই রোষ্ট রোধে ফেলতে চান।ফতে দাঁড়িয়ে আছে–বড় মাছের দোকানোর সামনে। বিশাল চকচকে বঁটি দিয়ে মাছ কাটা হয়–বঁটির গা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। কী অসাধারণ দৃশ্য! ফতের দেখতে ভালো লাগে। দৃশ্যটা দেখার সময় মেরুদণ্ড দিয়ে শিরশির করে কী যেন বয়।

শরীর ঝন ঝন করতে থাকে। ফতের বড় ভালো লাগে। মাছটা যদি জীবিত হয় তখন তার আরো ভালো লাগে। আজ একটা কাতল মাছ কাটা হচ্ছে। মাছটা জীবিত ছটফট করছে। আহা কী দৃশ্য! মাছ কাটা দেখে। ফতে গেল মুরগি কিনতে। ফতে মনের ভেতর চাপা আনন্দ অনুভব করছে। জীবিত মুরগিগুলিকে জবেহ করা হবে। জবেহ করার ঠিক আগে মুরগিগুলি আতঙ্কে অস্থির হয়ে ছটফট করতে থাকে, তখনো ফতের ভালো লাগে। ফতে ঠিক করেছে মুরগি জবেহ করার সময় সে বলবে মাথাগুলি যেন পুরোপুরি শরীর থেকে আলাদা করা হয়।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

খুব ছোটবেলায় একবার সে এই দৃশ্য দেখেছিল। বাড়িতে মেহমান এসেছে মুরগি জবেহ হচ্ছে। ধারালো বঁটি দিয়ে টান দিতেই মুরগির মাথাটা শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেল। যে মুরগি ধরে ছিল সে হাত ছেড়ে দিল। কী আশ্চৰ্য মাথা ছাড়া মুরগিটা তিন-চার পা এগিয়ে গিয়ে ধাপ করে পড়ে গেল। এই দৃশ্য এর পরে ফতে আর দেখে নি। যতবারই মুরগি কাটা হয়—ফতে আগ্রহ নিয়ে এই দৃশ্য দেখার জন্যে বসে থাকে। সে নিশ্চিত একসময় না একসময় সে দৃশ্যটা দেখবে।

কে জানে কপাল ভালো হলে হয়তো আজই দেখবে। আজ তার জন্যে শুভদিন। নিজের দোকান চালু হয়েছে।ফতে মুরগি কাটতে দিয়ে নিচুগলায় বলল, মুরগির মাথা পুরাটা আলগা করে ফেলেন।মুরগি কাটার লোক বলল, বুঝলাম না কী কন।ফতে বলল, এক পোচ দিয়ে মাথা আলাদা করে ফেলেন।লোকটা আপত্তি করল না। যা বলা হল তাই সে করল। ছোটবেলার ঘটনোটা ঘটল না।

মাথাবিহীন কোনো মুরগি দৌড় দিল না।ফতে আফসোসের ছোট্ট নিশ্বাস ফেলল। এ ধরনের মজাদার ঘটনা রোজ রোজ ঘাটে না। হঠাৎ হঠাৎ ঘটে।মুরগির কাটা মাথাগুলি ফতে আলাদা করে পলিথিনের ব্যাগে নিয়ে নিল। কাটা মাথাগুলি নিয়ে একটা মজা করা যাবে। যে বেবিট্যাক্সিতে করে সে বাড়িতে ফিরকবে মুরগির কাটা মাথাগুলি সেই বেবিট্যাক্সির সিটে রেখে দেবে। সিটের উপর রক্তমাখা মাথা রেখে ফাঁতে নেমে যাবে।

পরে যে যাত্রী উঠবে সে বসতে গিয়ে ভয়ে ভিরমি খাবে। চিৎকার–চোঁচামেচি করবে। ফতের ভাবতেই ভালো লাগছে। এই সময় সে কাছে থাকবে না এটাই একটা আফসোস।ফতে বেবিট্যাক্সি বাড়ি পর্যন্ত নিল না, বাড়ির কাছাকাছি এসে ছেড়ে দিল। বেবিট্যাক্সিওয়ালাকে বাড়ি চেন্নানো মোটেই ঠিক হবে না। কেন সে মুরপির মাথা সিটে রেখেছে তা নিয়ে দরবার করতে পারে। এই সব সূক্ষ্ম কাজ খুব ঠাণ্ডা মাথায় করতে হয়। সামান্য উনিশ-বিশও করা যায় না। ফতে এই কাজগুলি ঠাণ্ডা মাথায় করে বলেই এখনো টিকে আছে। কেউ তাকে ধরতে পারে নি। কোনোদিন পারকবেও না।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

চারটা মুরগি নিয়ে ফতে রওনা হয়েছে। তার বেশ মজা লাগছে। সে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে তার পরে বেবিট্যাক্সিতে যে উঠবে তার দশাটা কী হবে। ধরা যাক স্বামীস্ত্রী উঠেছে। প্রথমে উঠল। স্ত্রী। সে বসতে গিয়ে বলল, কিসের ওপর বসলাম গো? স্বামী বলল, তুমি সব সময় যন্ত্রণা কর! স্ত্রী বলল, হাতে যেন রসের মতো কী লাগল। এর মধ্যে স্বামী এসে উঠেছে। দেয়াশলাই জ্বালিয়ে আঁতকে উঠেছে-হতভম্ব গলায় বলছে সর্বনাশ শত শত মুরগির মাথা। কোত্থেকে আসল?

চারটা মুরগির মাথাই তখন তাদের কাছে শত শত মুরগির মাথা বলে মনে হবে। ভয় পেলে এ রকম হয়।ফতে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে ভাবল মুরগির মাথা না হয়ে যদি মানুষের মাথা হত তখন কেমন হত! চারটা মাথার তখন প্রয়োজন নেই। একটা কাটা মাথাই যথেষ্ট। সিটের এক কোনায় কাটা মাথাটা পড়ে আছে। অন্ধকার বলে সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। যাত্রী উঠিল। বেবিট্যাক্সি চলা শুরু করেছে। যাত্রী বলল, কে যেন ব্যাগ নাকি ফেলে গেছে।

বলেই সে হাত দিয়ে জিনিসটা তুলল। এরপর যে নাটক হবে তার কোনো তুলনা নেই। এই নাটক কল্পনায় দেখলে হবে না। এই নাটক দেখতে হবে বাস্তবে। বেবিট্যাক্সি নিয়ে ফতেকেই বের হতে হবে। যাত্রী যখন কাটা মাথাটা হাত দিয়ে তুলে ধরে হতভম্ব গলায় বলবে—এটা কী? তখন ফতে খুব স্বাভাবিক গলায় বলবে, এটা একটা ছোট বাচ্চার কাটা মাথা। সাইডে রেখে দেন।

ভাবতেই গা যেন কেমন করছে। মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শরীর ঝলমল করছে।কাজটা করতে হবে। একটা কাটা মাথা নিয়ে বের হতে পারলে অনেক মজা করা যাবে। হয়তো আত্মভোলা টাইপ কোনো যাত্রী উঠেছে। সিটের কোনায় কী পড়ে আছে সে তাকিয়েও দেখছে না। তাকে সে বলল, স্যার সিটের কোনায় ছোট বাচ্চার একটা কাটা মাথা আছে! একটু খেয়াল রাখবেন মাথাটা যেন পড়ে না যায়।

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

কিংবা ধরা যাক খুব সাহসী কোনো যাত্রী এসেছে। সে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলল, এই বেবি থামাও। গাড়ির ভেতর মানুষের মাথা কেন? কোত্থেকে এসেছে। চল থানায় চল।সে তখন খুবই বিনীত গলায় বলবে, মাথাটা স্যার আমি এনেছি। শুক্রবাদ থেকে আরেকটা মাথা তুলে ডেলিভারি দিতে হবে। মাল দুটা ডেলিভারি দিয়ে আপনার সঙ্গে থানায় যাব। কোনো সমস্যা নেই।

ফতের চোখ চকচক করছে। কল্পনা করতেই এত আনন্দ। আসল ঘটনার সময় না জানি কত আনন্দ হবে।আসল ঘটনার খুব দেরিও নেই। নকল ঘটনা ঘটতে ঘটতে আসল ঘটনা ঘটে। তার জীবনে সব সময় এ রকমই হয়েছে। অতীতে যেহেতু হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কোনো এক বর্ষার রাতে দেখা যাবে মাফলার দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে সে বেবিট্যাক্সি নিয়ে বের হয়েছে। সেই বেবিট্যাক্সির প্রাইভেট লেখা সাইনবোর্ড সে খুলে ফেলেছে।

এখন তারটা সাধারণ ভাড়ার বেবিট্যাক্সি। ফার্মগেট থেকে যাত্রী তুলেছে, যাবে উত্তরায়। মোটামুটি ফাঁকা রাস্তা। স্বামী-স্ত্রী এবং ছোট একটা বাচ্চা। বাচ্চাটাই প্রথম দেখল। সহজ, গলায় মাকে বলল-মা এটা কী? ফতের মামি তসলিমা খানম ফতেকে দেখেই রেগে উঠলেন। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, চারটা মুরগি কিনতে এতক্ষণ লাগে? তুমি কি ডিমে তা দিয়ে মুরগি ফুটিয়ে এনেছ?

ফতে কিছু বলল না। বলার কিছু নেই। সে যদি পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসত–তা হলেও তসলিমা খানম চোঁচামেচি করতেন। অন্য কোনো প্ৰসঙ্গ নিয়ে চোঁচামেচি। তখন হয়তো বলতেন-বুড়া মোরগ কোত্থেকে এনেছি? এটা কি রোষ্টের মুরগির সাইজ। রোষ্টের মুরগির যে মিডিয়াম সাইজ হয় তুমি জান না। নাকি জীবনে কখনো রোষ্ট খাও নি। তোমাকে কি রোষ্ট কোনোদিন দেওয়া হয় না। আবার বেয়াদবের মতো চোখে চোখে তাকিয়ে আছ কেন?

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৯

মামির চোঁচামেচিকে ফতে গ্রাহ্য করে না। কিন্তু ভাব করে যেন খুব গ্রাহ্য করছে। ভয়ে বুক কাঁপছে। এই অভিনয় সে ভালোই করে শুধু একটাই সমস্যা তাকে তাকিয়ে থাকতে হয়। চোখের দিকে না তাকালে সে মাথার ভেতর ঢুকতে পারে না। সমস্যা হচ্ছে চোখের দিকে তাকালেই লোকজন মনে করে সে বেয়াদবি করছে।তসলিমা খানমের মাথার ভেতর ঢোকা ফতের জন্যে খুব সহজ।

হুট করে ঢুকে যাওয়া যায়। তবে খুব সাধারণ একটা মাথা। ঢুকে কোনো আনন্দ নেই। এই মহিলার সমস্ত চিন্তাভাবনা সংসার নিয়ে। আজ কী রান্না হবে। ঘর কোথায় নোংরা। ধোপাখানা থেকে কাপড় আনতে হবে। সবুজ রঙের বিছানার চাদরটা কি শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেল। কাজের বুয়া চুরি করে নি তো।

এই মহিলার চিন্তাভাবনার মধ্যে শুধু একটাই মজার ব্যাপার আছে–খায়রুল কবির নামের একজন আধাবুড়ো মানুষ। এই আধাবুড়ো লোকটাকে এই মহিলা ডাকেন—বড়দা। আধাবুড়োটা তাকে ডাকে পুটুরানী। আধাবুড়ো শয়তানটা বিয়ে করে নি। সে বাসাবের একটা দোতলা বাড়িতে থাকে। ফতে কোনোদিন সে বাড়িতে যায

 

Read more

বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:১০ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.