Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

নদীর প্রবল স্রোতে হুমায়ূন ভেসে যেতে শুরু করেছেন । তিনি দূর থেকে বললেন, আমি যদি বেঁচে যাই, যদি দিল্লীর সিংহাসনে বসতে পারি তাহলে তোমার সৎকর্মের প্রতিদান আমি দেব । একদিনের জন্যে হলেও তুমি দিল্লীর সিংহাসনে বসবে ।

ভোর হয়েছে ।

হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম শের খাঁ’র হাতে বন্দি হয়েছেন । ভয়ে এবং আতঙ্কে তিনি অস্থির । পরাজিত সম্রাটের স্ত্রীর জন্যে কী অসম্মান অপেক্ষা করছে তা তিনি জানেন । রাজপুত রমণীরা এমন অবস্থায় আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে জহরব্রত পালন করেন । মুসলমানদের জন্যে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ বলে এমন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না ।

বেগা বেগমকে শের খাঁ’র সামনে উপস্থিত করা হলো । শেল খাঁ বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন ?

বেগা বেগম বললেন, অসম্মানের ভয়ে কাঁদছি ।

মা, শুনুন । আপনি যা ইচ্ছা করবেন তা-ই করা হবে । আমি আপনাকে মা ডেকেছি । পুত্রের হাতে মা’র কোনো অসম্মান হবে না এটা আপনি জানেন । আপনি কী চান বলুন ?

আমি দিল্লী যেতে চাই ।

আপনাকে এবং আপনার সঙ্গে যেসব মহিলা এবং শিশু আছে তাদের সবাইকে আমি এক্ষুনি দিল্লী পাঠাবার ব্যবস্থা করছি ।

সম্রাট হুমায়ূনের নয়নমণি আকিকা বেগম এবং তার এক বান্ধবী অম্বাকে পাওয়া যাচ্ছে না ।

আমি তাদের সন্ধানে লোক পাঠাচ্ছি । মা, আপনার আর কিছু কি লাগবে ?

বেগা বেগম বললেন, অজুর পানি লাগবে । জায়নামাজ লাগবে । আমি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ব ।

নফল নামাজ শেষে প্রার্থনায় বসে হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম বললেন, হে পরম করুণাময়, তোমার বান্দা শের খাঁ যে সম্মান আমাকে দিয়েছে সেই সম্মান তুমি তাঁকে বহুগুণে বর্ধিত করে ফেরত দিয়ো । হুমায়ূন-পত্নী হয়েও আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, শের খাঁ যেন তার জীবনে কোনো যুদ্ধে পরাজিত না হয় ।*

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

শুক্রবার । জুম্মার নামাজের সময় হয়েছে । শের খাঁ’র হাতে বন্দি সম্রাট হুমায়ূনের ইমামকেই নামাজ পড়াতে বলা হলো ইমাম খুৎবায় হুমায়ূনের নাম নিলেন ।

শের খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠে সামান্য ভুল হয়েছে । ভুল কী হয়েছে ইমাম সাহেব জানেন । তাঁকে নতুন করে খুৎবা পাঠ করতে বলা হচ্ছে । দ্বিতীয় দফায় খুৎবায় শের খাঁন নাম পাঠ করা হলো । নামাজের শেষে শের খাঁ নিজেকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করে ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করলেন । শের খাঁ হলেন শের শাহ্।

*চৌসার যুদ্ধের পর শের খাঁ কখনোই কোনো যুদ্ধে পরাজিত হন নি । তাঁর মৃত্যু হয়েছিল নিজের একটা কামানের বিস্ফোরণে ।

 

আপনি খুশি না আয়ে

না আপনি খুশি চলে,

লাই হায়াত আয়ে, কাজা লে চলি চলে ।

(পৃথিবীতে নিজের খুশিমতো আসি নি, খুশিমতো চলেও

যাব না । জীবন হাত ধরে নিয়ে এসেছিল বলেই এসেছি ।

মৃত্যু হাত ধরে নিয়ে চলে যাবে, তখন চলে যাব । )

সম্রাট হুমায়ূন মশক বুকে জড়িয়ে গঙ্গা নদীর তীরে শুয়ে আছন । কখন

নদীর স্রোত তাঁকে তীরে এনে ফেলেছে, তিনি জানেন না । অবসাদে,

কান্তিতে হতাশা ও বিষণ্নতায় তাঁর চোখ বন্ধ । তিনি ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় আছেন । তাঁর চোখের পাতা বন্ধ । সেই বন্ধ পাতা ভেদ করেও সূর্যের আলো তাঁর চোখে ঢুকে যাচ্ছে । চোখ কটকট করছে, কিন্তু তিনি মাথা ফেরাতে পারছেন না ।

আপনার কী হয়েছে ?

সম্রাট অনেক কষ্টে চোখ মেললেন । ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক রমণী কলসি হাতে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে । সে গঙ্গার পানি নিতে এসেছিল । রমণীর বয়স অল্প । মুখশ্রী কোমল ।

আপনি কে ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

সম্রাট বললেন, আমি বাদশাহ হিন্দুস্থান ।

রমণী বলল, বাদশাহ হিন্দুস্থান থাকবেন সিংহাসনে । কাদাপানিতে না ।

পায়ে সামান্য কাঁটা ফুটলেও হাতির মতো প্রাণী অচল হয়ে যায় । আমি পায়ে কাঁটা-ফোটা হাতি । তুমি কি আমাকে কোনো খাবার দিতে পার ?

আমার ঘরে ছাতু ছাড়া কিছু নেই । গুড় ‍দিয়ে ছাতু মেখে দিলে খেতে পারবেন ?

পারব । কিছু দুধ কি জোগাড় করতে পারবে ? আমার শরীরের এই অবস্থায় দুধ বলকারক ।

দুধের ব্যবস্থা করতে পারব ।

তুমি যে সেবা আমাকে করবে তা হাজার গুণে আমি ফেরত দেব ।

আমি ঋণ রাখি না । তোমার নাম কী ?

লছমি বাই । আমি বুঝতে পারছি আপনার নড়াচড়ার শক্তিও নেই । আপনি শুয়ে থাকুন । আমি খাবার এবং লোকজন নিয়ে আসছি ।

শুকরিয়া । আমি যে হিন্দুস্থানের সম্রাট এটা কি বিশ্বাস হচ্ছে না ?

না । আপনি এক দুর্ভাগা মজনুন (পাগল) ।

ভালো বলেছ, আমি এক দুর্ভাগা মজনুন ।

লছমি বাই চলে গেল । তাঁর গায়ের উপর দিয়ে একটা শকুন চক্কর খাচ্ছে । এটা অলক্ষণ । শকুন আগেভাগে মৃত্যুর খবর পায় । এই শকুনটা কি বুঝে ফেলেছে তিনি মারা যাচ্ছেন ?  ক্লান্ত অবসন্ন সম্রাট উড়ন্ত শকুন দেখতে দেখতে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন ।

বটগাছের নিচে দু’জন মোঘল চিন্তিত ভঙ্গিতে বসা । শের শাহ্’র একদল সৈন্য বটগাছ ঘিরে আছে । তাদের কাছে খবর আছে এই দুজনের একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি বৈরাম খাঁ । বৈরাম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মাথা শের শাহ্-কে দেখাতে হবে ।

তোমাদের মধ্যে কে বৈরাম খাঁ ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

দু’জনের একজন বৈরাম খাঁ । অন্যজন আবুল কাশেম খাঁ । তিনিও সম্রাট হুমায়ূনের একজন সেনাপতি । তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যা কথা বলছ । সে কে ?  আঙুল তুলে দুজনই একে অন্যকে দেখালেন ।

বৈরাম খাঁ’র চেহারা বৈশিষ্ট্যহীন । ছোটখাটো মানুষ । মুখের চামড়া কুঁচকানো । মাথার চুল খাবলা খাবলা করে উঠে গেছে । অন্যদিকে কাশেম খাঁ অসম্ভব রুপবান । স্বাস্থ্য-সৌন্দর্যে ঝলমলে একজন মানুষ । কাশেম খাঁ’র মাথায় একটাই চিন্তা যে কোনোভাবেই হোক বৈরাম খাঁকে দরকার । আবুল কাশেম খাঁকে না পেলেও সম্রাটের চলবে ।

কাশেম খাঁ শের শাহ্’র সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা চেহারা দেখে বুঝতে পারছ না কে বৈরাম খাঁ ? ওই উজবুকটা আমার নফর । মুনিবের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে বৈরাম খাঁ সেজেছে । তার কত বড় স্পর্ধা!

শের শাহ্’র সৈন্যদের কাশেম খাঁ’র কথা যুক্তিযুক্ত মনে হলো । তারা সঙ্গে সঙ্গেই কাশেম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মুণ্ডু নিয়ে উল্লাস ধ্বনি করতে করতে শের শাহ্’র তাঁবুর দিকে রওনা হলো । আসল বৈরাম খাঁ’র দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না ।

ইতিহাস কাউকে কাউকে মনে রাখে আবার কাউকে রাখে না । বৈরাম খাঁ’র বীরত্বগাথা ইতিহাস মনে রেখেছে । কাশেম খাঁ’র বীরত্বগাথা মনে রাখে নি ।

প্রবল জ্বরে হুমায়ূন ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন । তিনি গঙ্গা নদীর তীরেই কাদামাখা অবস্থায় পড়ে আছেন । বর্ষার ক্লান্তিহীন বর্ষণ হচ্ছে । নদীর পানি ফুলে ফেঁপে উঠছে । পানি উঠে এসেছে কোমর পর্যন্ত । ধুপ ধুপ শব্দে নদীর পাড় ভাঙছে । হুমায়ূনের ধারণা হলো, পাড় ভেঙে তিনি আবারও নদীতে পড়বেন । এবার পড়লে আর রক্ষা নেই । মশকের বাতাস বের হয়ে গেছে । সম্রাট চেষ্টা করলেন হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে । পারলেন না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

আশ্চার্যের ব্যাপার শকুনটা এখনো আছে । তার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছে । এই পাখিটির কাছে জীবন্ত প্রাণী অর্থহীন । মৃত প্রাণীই শুধু অর্থবহ । তিনি আবারও জ্ঞান হারালেন । অচেতন অবস্থায় তাঁর মনে হলো আকিকা বেগম তাঁকে ডাকছে-পিতাজি পিতাজি । তাঁর মেয়ে কখনো তাঁকে পিতাজি ডাকে না । আজ কেন ডাকছে ?  তাঁকে পিতাজি ডাকে অম্বা নামের মেয়েটা । আকিকা কি অম্বার কাছ থেকে পিতাজি ডাক শিখেছে ?

হুমায়ূনের কন্যা আকিকা বেগম এবং অম্বা আছে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে । হরিশংকর এই দুজনকে নিয়ে পালিয়েছিলেন । হরিশংকর বলেছিলেন, তোমরা আমার দুই কন্যা । আমার জীবন থাকতে তোমাদের কিছু হবে না । আমি তোমাদের লুকিয়ে রাখব। পরিস্থিতি শান্ত হলে দিল্লী পাঠানোর ব্যবস্থা করব ।

হরিশংকর অম্বাকে তার গ্রামের মানুষদের হাতে তুলে দিলেন । সহমরণ থেকে পালিয়ে আসা মেয়ে হলো কলঙ্কের কলসি । এই কলসি চূর্ণ হওয়া প্রয়োজন । যারা এই কাজে সাহায্য করবে তারা সবাই পুণ্যের ভাগ পাবে । হরিশংকরের পুণ্য প্রয়োজন । গঙ্গার তীরে রাতারাতি আগুন করে জ্বলন্ত অগ্নিতে অম্বাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো । ভয়াবহ চিৎকারে অম্বা ডাকল, আকিকা । আকিকা ।

আকিকা বেগম বান্ধবীকে বাঁচানোর জন্যে দৌড়ে আগুনে ঢুকে গেল । আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করছে । সেই আগুনের ভেতর দুই বান্ধবী দুজনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছে, পিতাজি! পিতাজি!

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

সম্রাট অচেতন জগৎ থেকে চেতন জগতে ফিরলেন । তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, তিনি মাটির ঘরে দড়ির এক চৌপায়ায় শুয়ে আছেন । তাঁর গায়ে দুর্গন্ধ কাঁথা । মাথার কাছে কুপি জ্বলছে । কুপি থেকে বুনকা বুনকা কালো ধোঁয়া উঠে ঘর অন্ধকার করে দিচ্ছে । গালভাঙা এক প্রৌঢ় খালি গায়ে তাঁর পায়ের কাছে বসে আছে । প্রৌঢ় তাঁর পায়ে তেল ঘষছে । চার-পাঁচ বছর বয়সের এক উলঙ্গ ছেলে কুকুরের মতো হামাগুড়ি দিয়ে বসে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে । ঘরের ভেতর চুলা জ্বলছে । মাটির হাঁড়িতে কিছু রান্না হচ্ছে । ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে । গঙ্গার পাড়ে দেখা হওয়া তরুণীই নাম সম্রাটের মনে পড়ল-লছমি বাই।

সম্রাটকে চোখ মেলতে দেখেই তরুণী প্রৌঢ়কে চোখে ইশারা করল । প্রৌঢ় এগিয়ে এসে সম্রাটের মাথা তুলে ধরল । লছমি মাটির ভাঁড় সম্রাটের মুখের কাছে ধরে বলল, মহিষের গরম দুধ । খেলে বল পাবেন ।

হুমায়ূন দুধ পান করলেন । হ্যাঁ এখন কিছুটা ভালো লাগছে । সম্রাট বললেন, জায়গাটার নাম কী ?

বীরভূম ।

গ্রামের নাম কী ?

নোকরা ।

এই নামগুলি মনে রাখতে হবে । সম্রাট ঠিক করেছেন, তিনি যদি দিল্লীতে ফিরে আবার সিংহাসনে বসতে পারেন তাহলে হতদরিদ্র এই পরিবারের ভাগ্য ফিরিয়ে দেবেন । এই কারণেই নামগুলি মনে রাখা দরকার । তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা । লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা …

সম্রাটের কথায় বাচ্চা ছেলেটা মজা পেয়ে হেসে উঠতেই প্রৌঢ় এস সশব্দে তার গালে চড় দিল। চড় খেয়েও বাচ্চাটির কোনো ভাবান্তর হলো না । তার মুখ এখনো হাসি হাসি ।

আচার্য হরিশংকর ভীত চোখে তাকিয়ে আছেন শের শাহ্’র দিকে । শের শাহের লোকজন তাঁকে ধরে এনেছে ।

শের শাহ্ বললেন, সম্রাটের মেয়ে আকিকা বেগম কোথায় ?

বাদশাহ নামদার পর্ব –১৫

হরিশংকর বললেন,  আমি জানি না । জেনানা মহলে যখন হইচই শুরু হলো সে ছুটে গের নদীর দিকে । আমার ধারণা সে নদীতে ডুবে মরেছে ।

তোমার সঙ্গে একটা পুঁটলিতে বেশ কিছু ধনরত্ন পাওয়া গেছে ।

এগুলি কোথায় পেয়েছ ?

সম্রাট হুমায়ূন উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছেন ?

আমার এক কন্যার জন্যে এইসব উপহার ।

আমি যে এখন দিল্লীর সম্রাট এটা কি জানো ?

জানি ।

সম্রাটের সামনে মিথ্যা বলা যায় না এটা জানো ?

হরিশংকর চুপ করে রইলেন ।

শের শাহ্ বললেন, হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী । তোমাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দিলাম । তুমি জ্ঞানী মানুষ। আমি জ্ঞানকে সম্মান করি । কাজেই তোমাকে একটা বিশেষ সুবিধা আমি দেব ।

সম্রাট শের শাহ্’র অনেক দয়া ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *