বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

তিনি সহজ গলায় বললেন, পড়তে যাটিভির সামনে বসে আছিস কেন ? বলেই তিনি মেয়েদের ঘরে ঢুকলেনমন্টু আবারাে টিভি ছাড়লএক্স ফাইলে আজকের গল্পটা খুবই জটিল

বৃষ্টি বিলাসএক লােকের অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছেসে তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেকিন্তু সব সময় পারে না ইচ্ছা শক্তি খাটাতে হলে তার আশেপাশে গাছ লাগেটবে বসানাে গাছ হলেও হয়ইচ্ছা শক্তি কাজে লাগানাের পর গাছটা মরে যায়মন্টু টিভির পর্দার সঙ্গে প্রায় চোখ লাগিয়ে আছেসাউন্ডটা আরেকটু বাড়াতে পারলে ভাল হতসেটা ঠিক হবে না। 

সুলতানা মেয়েদের ঘরে ঢুকলেন শামা বলল, বাবা কি ঘুমিয়ে পড়েছে ? সুলতানা বললেন, হ্যা ঘুমুচ্ছেতুমি ভাত খেয়ে নাওআমি খাব নাক্ষিধে নেই। 

এশা বলল, মা শােন, খেতে যাওবাবার শরীর খারাপ করেছে বলে বাবা খাচ্ছে নাতাই বলে তুমিও খাবে না এটা কেমন কথা

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

বললাম না ক্ষিধে নেই। 

খেতে বসলেই ক্ষিধে হবেআমি এত আগ্রহ করে রান্না করেছি তুমি খাবে না এটা কেমন কথা

তাের বাবা শখ করে মাছটা এনেছেসরিষা বাটা রান্না হবে বলে সরিষা কিনে এনেছেসে খেতে পারল না, আর আমি খাব এটাই বা কেমন কথা

এশা ঝগড়ার ভঙ্গিতে বলল, না খেয়ে তুমি কী প্রমাণ করতে চাচ্ছ মা ? তুমি কি প্রমাণ করতে চাচ্ছ যে বাবার সঙ্গে তােমার গভীর প্রণয়

আমি কিছুই প্রমাণ করতে চাচ্ছি নাক্ষিধে মরে গেছে, খেতে ইচ্ছা করছে বলে খাব নাতােরা ঘুমুতে যা। 

সুলতানা চলে গেলেনশামা এশার দিকে তাকিয়ে বলল, মা এই কাজগুলাে 

যে করে, মন থেকে করে, না দায়িত্ব থেকে করে

এশা বলল, তােমার বিয়ে হােক, তখন তুমি নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর পাবেশামা বাতি নিভিয়ে বিছানায় গেলএশা বলল, আমরা আজ এত সকাল সকাল শুয়ে পড়লাম, ঘুমতাে আসবে না। 

আয় শুয়ে শুয়ে গল্প করি এশা তুই কি একটা জিনিস লক্ষ করেছিস, বাতি নিভিয়ে গল্প করতে এক রকম লাগে আবার বাতি জ্বালিয়ে গল্প করতে অন্য রকম লাগে ? একই গল্প শুধুমাত্র বাতি জ্বালানাে নিভানাের কারণে দুরকম হয়ে যায় ?

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

এশা বলল, মুত্তালিব চাচার কি ইলিশ মাছের ডিম পছন্দ হয়েছিল

শামা বলল, খুব পছন্দ হয়েছেচেটেপুটে খেয়েছেনতুই রান্না করেছিস শুনে বলল তােকে একটা মেডেল দেবেরুপার মেডেলমেডেলে লেখা থাকবেদ্রৌপদী পদক। 

দ্রৌপদী কি খুব ভাল রাঁধতেন

উনার পাঁচটা স্বামী ছিল না

এশা হাসছেশামা বলল, হাসছিস কেন? এশা বলল, বেচারি দ্রৌপদীর কথা ভেবে হাসছিসে কী বিপদেই না ছিল! পাঁচটা স্বামীকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখাতাে সহজ কথা নাএকটা স্বামীকেই ভুলানাে যায় না, আর পাঁচ পাঁচটা স্বামীকোনাে স্বামী হয়ত লাজুক, সে স্ত্রীকে একভাবে চাইবেআবার কোনাে স্বামী নির্লজ্জ, সে চাইবে অন্যভাবে। 

শামা বলল, এশা চুপ করতাে, তাের মুখে এই ধরনের কথা একেবারেই মানাচ্ছে না। 

কেন ? তােমার কাছে কি মনে হয় আমি এখনাে ছােট ? ছােটইতাে। 

আমি অনেক বড় হয়ে গেছি আপাযতটা বড় তুমি আমাকে ভাব, আমি তার চেয়েও বড়তুমি তাে এখনাে বিয়ে কর নিআমি কিন্তু বিয়ে করে ফেলেছি। 

শামা উঠে বসতে বসতে বলল, তার মানে

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

এশা কিছু বলল না, হাসলঅন্ধকারে তার হাসি শােনা গেলশামা বলল, এই তুই কি ঠাট্টা করছিস

রকম ঠাট্টা করবি নাতুই যেভাবে বললি আমার মনে হলাে সত্যি বুঝি কিছু করে ফেলেছিস। 

এশা বলল, আমি যা করি খুব চিন্তা ভাবনা করে করিইচ্ছা হলাে আর হুট করে ঘটনা ঘটিয়ে ফেললাম আমার বেলায় রকম কখনাে হবে নাযদি আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে গােপনে বিয়ে করি তাহলে বুঝতে হবে এটা ছাড়া আমার হাতে অন্য কোনাে পথ খােলা ছিল না। 

তুই কি গােপনে বিয়ে করেছিস

এখনাে করি নি, তবে... তবে আবার কী ? বিয়ে করবছেলেটা কে? এশা হাসলশামা কঠিন গলায় বলল, হাসি বন্ধ করে বলতাে ছেলেটা কে ? তুমি চিনবে নাখুবই আজেবাজে টাইপের ছেলেআজেবাজে টাইপ ছেলের সঙ্গে তাের পরিচয় হলাে কীভাবে ? যেভাবেই হােক, হয়েছেছেলে করে কী

কিছু করলেতাে বলতাম না আজেবাজে টাইপ ছেলেকিছুই করে নামানুষের কাছ থেকে চাঁদা তােলে। 

তার মানে

রবীন্দ্র জয়ন্তী করবে তার জন্য চাঁদা তুলবে, নজরুল দিবস করবে তার জন্য চাদা তুলবে, পাড়ায় ক্রিকেট খেলার চাদা, দুঃস্থজনগণের জন্য চাদাএপাড়ার মানুষদের মাসের মধ্যে দুতিনবার তাকে চাঁদা দিতে হয়যে চাদা দেয় সে হাসি মুখে দেয়, সেও হাসি মুখেই চাঁদা নেয়চাঁদা তােলা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সে একজন ডিরেক্টরতার ব্যবহারও অত্যন্ত ভালঅফিস বসদের ব্যবহার সাধারণত ভাল হয় নাতারা খিটখিটে স্বভাবের হয়ইনি সে রকম। 

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

তুই আমার সঙ্গে ইয়ারকি করছিস নাতাে

শামা বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যাচ্ছিল, এশা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, যাচ্ছ কোথায়

শামা বলল, বাবাকে ডেকে তুলিতাের কথাগুলি তাঁকে বলি। 

এশা বলল, বাবার শরীর ভাল নাঘুমুচ্ছেনতাছাড়া বাবাকে তােমার কিছু বলতে হবে নাযা বলার আমিই বলব। তুমি চুপ করে বিছানায় বস। 

সুলতানার শােবার ঘর থেকে কথাবার্তা শােনা যাচ্ছেদরজা খােলা হলাে স্বামী স্ত্রী দুজন এক সঙ্গে বেরুচ্ছেনসাড়াশব্দ পেয়ে এশা এবং শামা ঘর থেকে বের হয়েছে। 

এশা বলল, কী হয়েছে

সুলতানা লজ্জা লজ্জা গলায় বললেন, কাণ্ড দেখ নাতাের বাবা এখন বলছে ভাত খাবেতার নাকি শরীর ভাল লাগছেক্ষুধা হচ্ছে। 

এশা বলল, তােমরা খাবার টেবিলে বসােআমি খাবার গরম করে আনছিআবদুর রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে সংকুচিত গলায় বললেন, আমার মনে হয় ফুড পয়জনিং হয়েছিলবমির সঙ্গে পয়জন সবটা বের হয়ে গেছেএখন শরীর ফ্রেশ লাগছে। 

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)– হুমায়ূন আহমেদ

এশা খাবার গরম করছেশামা দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেশামা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বােনের দিকে তাকাচ্ছেতার মুখ থমথম করছেশামা বলল, ছেলের নাম কী

এশা হালকা গলায় বলল, নামেতাে আপা কিছু যায় আসে নাওর নাম সলিম হলেও যা, দবির হলেও তা, আবার খলিলুল্লাহ হলেও ঠিক আছে। 

আমি মনে হয় ছেলেটাকে চিনতে পারছিএকদিন কলেজে যাবার জন্যে রিকশা পাচ্ছিলাম না, তখন ফর্সামতাে লম্বা একটা ছেলে রিকশা ঠিক করে দিয়ে 

আমাকে বলল, আপা উঠুন। 

রিকশাওয়ালা কি তােমার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে ? ভাড়া নেবে না কেন

এশা হালকা গলায় বলল, রিকশাওয়ালা তােমার কাছ থেকে ভাড়া নিলে বুঝতে হবে মাহফুজ নামাহফুজ রিকশা ঠিক করে দেবে আর রিকশাওয়ালা ভাড়া নেবে রকম হতেই পারে না

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-১০)- হুমায়ূন আহমেদ

ছেলের নাম মাহফুজ ? হ্যা তুই কি সত্যি সত্যি তাকে বিয়ে করেছিস ? আমার গা ছুঁয়ে বলতােপ্লিজ। 

এশা বিরক্ত গলায় বলল, টেনশনে তােমার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছেতুমি টেনশন করছ কেন ? টেনশন করব আমিতােমার এখানে টেনশন করার কিছু নেই। 

আমি টেনশন করব না

নাআমরা যখন এক সঙ্গে ছিলাম তখন একজন আরেকজনের সমস্যা দেখেছিএক সঙ্গে থাকার সময় শেষ হয়েছেতােমার একটা জীবন শুরু হতে যাচ্ছেতুমি তােমারটা দেখবেআমি দেখব আমারটা। 

(চলবে)

বৃষ্টি বিলাস (পর্ব-৯)- হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.