আমাদের বায়ােকেমিক শাস্ত্রে ওষুধের সংখ্যা মাত্র বারাে। বারােটা ওষুধে সর্বরােগের উপশম। লক্ষণ বিচার করে ঠিকমতাে ওষুধ দিতে পারলেই হলাে।….. শশী ভট্টাচার্য মনে হয় বান্ধবপুরে স্থায়ী হয়ে গেছেন। বান্ধবপুরে প্রাইমারি স্কুল চালু হয়েছে। তিনি তার শিক্ষক | ছাত্রসংখ্যা তিন। তার প্রধান কাজ ছাত্র সংগ্রহ করা। অপ্রধান কাজ হরিচরণের জমিদারির হিসাব–নিকাশ দেখা। শশী ভট্টাচার্যের বর্তমান পরিচয় পাগলা মাস্টার।।
যে মাস্টার কালাে একটা চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘুরে বেড়ায়। ছােট ছেলেপুলে দেখলে পেছন থেকে এসে ঘাড় চেপে ধরে বলে– তাের বাবার কাছে আমাকে নিয়ে যা । তােকে স্কুলে ভর্তি করাব। পেট এত মােটা কেন ? পেটভর্তি কৃমি গজগজ করছে। হা কর ওষুধ খাবি।
রােগী পালাতে চেষ্টা করে। ঝেড়ে দৌড় দেয়। পেছনে পেছনে দৌড়ান। শশী মাস্টার। একদিন রােগীর পেছনে ছুটতে শশী মাস্টার শশাংক পালের সামনে পড়ে গেল। শশাংক পাল বললেন, আপনার পরিচয় ? | শশী মাস্টার বললেন, আমার বর্তমান পরিচয় আমি একজন দৌড়বিদ। রােগী ধরার জন্যে দৌড়াচ্ছি।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
ও আচ্ছা! আপনি পাগলা মাস্টার। আপনার কথা শুনেছি। আমার নাম শশাংক পাল । জমিদারি ছিল। হাতিতে চড়ে ঘুরতাম। এখন হাঁটাহাঁটি করি।শশী মাস্টার বললেন, হাঁটাহাঁটি করা শরীরের জন্যে ভালাে। ভিক্ষুক শ্রেণীর যারা সারাদিন হাঁটার মধ্যে, তারা রােগমুক্ত।
শশাংক পাল বললেন, আমি বর্তমানে ভিক্ষুক শ্রেণীতেই পড়ি, তবে রােগমুক্ত না। নানান রােগ শরীরে স্থায়ী হয়েছে। ভালাে কথা, আপনি কি মদ্যপান করেন?
শশাংক পাল বললেন, মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে ভালাে হতাে। আপনার সঙ্গে মদ্যপান করতাম। একা মধ্যপান করা বড়ই কষ্টের।
শশী মাস্টার বললেন, আপনি বােতল নিয়ে আমার এখানে চলে আসবেন। আপনি বােতল নামাবেন আমি ব্যাঞ্জো বাজাব। কলের গানের গানও শুনতে পারেন। আমার একটা কলের গানও আছে।
আপনার কলের গানের কথা শুনেছি। কলের গানের গান আমি পছন্দ করি। যে গানে গায়ককে দেখা যায় না সেই গান মূল্যহীন। আপনার চামড়ার বাক্সে কি ওষুধ ? লিভারের ব্যথার কোনাে ওষুধ যদি থাকে দিন। খেয়ে দেখি । আমি আবার ওষুধ খেতে খুব পছন্দ করি। যে–কোনাে ওষুধ আগ্রহ করে খাই।
বৈশাখ মাসের এক রাতের কথা। আকাশে নবমীর চাঁদ উঠেছে। শশী মাস্টারের টিনের চালে চাঁদের আলাে পড়েছে। টিনের চাল ঝলমল করছে। বনভূমির ঝাকড়া সব গাছ মাথায় জোছনা মেখে দুলছে। সৃষ্টি হয়েছে অলৌকিক এক পরিবেশ। শশী মাস্টার কলের গান ছেড়ে জোছনা দেখতে ঘরের বার হয়ে থমকে দাঁড়ালেন। জামঘাছের নিচে টুকটুকে লালশাড়ি পরে এক তরুণী দাড়িয়ে আছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী ভট্টাচার্যের হঠাৎ মনে হলাে, এ কোনাে মানবী না। নিশ্চয়ই স্বর্গের উর্বশীদের কেউ। কিংবা দেবী স্বরস্বতী স্বয়ং মর্তভূমে নেমে এসেছেন। শশী ভট্টাচার্য বললেন, কে ? ………তরুণী চমকে উঠল। কিন্তু জবাব দিল না। ছুটে পালিয়েও গেল না । শশী ভট্টাচার্য বললেন, আপনি কে ? এখানে কী করেন ? তরুণী নিচু গলায় বলল, গান শুনি। আপনি কি এই অঞ্চলের ?
তরুণী হঁ–সূচক মাথা নাড়ল। শশী ভট্টাচার্য বললেন, কলের গানে গান হচ্ছে। চোঙের ভেতর দিয়ে গান আসে। একটা যন্ত্র । হাত দিয়ে দম দিতে হয়। আপনি কি যন্ত্রটা দেখবেন ? …….আপনি কি প্রথম গান শুনতে এসেছেন ? নাকি আগেও এসেছেন ? আগেও আসছি। তরুণী চারটা আঙুল দেখাল। শশী মাস্টার বললেন, গান শুনতে ভালাে লাগছে ?
আরেকটা খাল দিব! থাল কী ? গােল থালের মতাে জিনিস। যেখানে গান বাঁধা থাকে। ………তরুণী বলল, গান কি দই যে বাঁধা থাকব? ………একটা থাল এনে আপনাকে দেখাই ? থালটা যন্ত্রের ভেতর দিয়ে হ্যান্ডল চাপলেই খাল থেকে গান হয়।
তরুণী হা–সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, আপনার নাম কী ? নাম বলব না। বলতে না চাইলে বলবেন না। আপনি দাঁড়ান, আমি থাল এনে দেখাচ্ছি । তরুণী বলল, আচ্ছা।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী মাস্টার রেকর্ড নিয়ে এসে তরুণীকে দেখতে পেলেন না। জামগাছের নিচে কেউ নেই। আশেপাশেও নেই। কোনাে এক বিচিত্র কারণে তার সারারাত ঘুম হলাে না। তিনি গভীররাতে ডায়েরি খুলে লিখলেন—
I saw an Indian lady at the dead of night. Her captivating beauty was all engulfing. For a moment I lost all my senses, I felt like bowing down at her feet.
শ্রাবণ মাস। হাওরে পানি এসেছে। নদীনালা ফুলে ফেঁপে উঠছে। ধনু শেখ তার একতলা লঞ্চ বিক্রি করে দোতলা লঞ্চ কিনেছেন। এই লঞ্চের প্রধান বিশেষত্ব তার হন। ঘাটে ভিড়েই এমন বিকট শব্দে ‘ভো’ দেয় যে বাজারের লােকজন চমকে উঠে। লঞ্চের দ্বিতীয় বিশেষত্ব হিন্দু মুসলিমের আলাদা আসন। হিন্দুরা দোতলায়।
মুসলমানরা একতলায়। কোনাে মুসলমান দোতলায় উঠতে পারবে । দোতলায় ভাতের হােটেল আছে। ব্রাহ্মণ বাবুর্চির হাতে হােটেল। ছয় আনায় অতি উত্তম ব্যবস্থা। পেটচুক্তি ভাত। সবজি, ডাল, ছােট মাছের চচ্চড়ি। খাওয়ার শেষে একবাটি মিষ্টি দই ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
মুসলমানদের জন্যে আলাদা হােটেল নেই। যারা খেতে চায় দোতলার খাবার নিচে চলে আসে। তবে মুসলমানরা সাধারণত কিছু খায় না। তাদের এত পয়সাকড়ি নেই। ……দোতলা লঞ্চ চালুর দিনও ধনু শেখ গেল নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে। তার আশীর্বাদ নিতে ।
নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, দোতলা লঞ্চ কিনেছ খবর পাইছি। অল্পদিনে ভালাে দেখাইলা। ……..ধনু শেখ বিনীত গলায় বলল, আপনার আশীর্বাদ। আপনার আশীর্বাদ বিনা এই কাজ সম্ভব ছিল না।
লঞ্চের নাম নাকি দিছ— জয় মা কালী সার্ভিস ? …………জে কর্তা। . তুমি মুসলমান হইয়া লঞ্চের নাম দিলা জয় মা কালী ? …………ধনু শেখ বলল, বাতাস বুইজ্যা পাল তুলছি। হিন্দু যাত্রী বেশি। সেই কারণে হিন্দু নাম।
নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, মুসলমান যাত্রী যদি বেশি হওয়া শুরু করে তখন কি নাম পাল্টাইবা ? ……..ধনু শেখ হাসিমুখে বললেন, অবশ্যই। তখন নাম হইব মা ফাতেমা সার্ভিস। ………মা ফাতেমাটা কে ? আমাদের নবিজির কন্যা। ভালাে। ভালাে। খুব ভালাে।
