আমার অনেক দিনের ইচ্ছা আপনেরে লঞ্চ করে সােহাগগঞ্জ বাজারে নিয়া যাব। একটু ইজ্জত করব । নিবারণ চক্রবর্তী বিরক্ত গলায় বললেন, ইজ্জত আমার যথেষ্টই আছে। তােমার ইজ্জতের প্রয়ােজন নাই। ধনু শেখ বলল, অবশ্যই অবশ্যই।
এই ঘটনার দু‘দিন পরই নিবারণ চক্রবর্তীর দোতলা লঞ্চ সোহাগগঞ্জে অচল হয়ে পড়ে গেল। ইঞ্জিনে যে ডিজেল দেয়া হয়েছিল সেখানে নাকি পানি মেশানো ছিল। ডিজেল কেনা হয়েছিল ধনু শেখের দোকান থেকে। সে ডিজেল এবং কেরােসিনের ডিলারশিপ পেয়েছে। তার কাছ থেকে ডিজেল না কিনে উপায় নেই।
শশী মাস্টার ভােরবেলা ঘর ছেড়ে বের হন। মাধাই খালে একঘণ্টা সঁতার কাটেন। ভেজা কাপড়েই যান স্কুলে। ভেজা কাপড় গায়ে শুকালে স্বাস্থ্য ভালাে। থাকে এই যুক্তিতে ভেজা কাপড় গায়ে শুকান। স্কুলের ছাত্র পড়ানাে শেষ করে, জমিদারির কাগজপত্র নিয়ে বসেন। দুপুরে হরিচরণের সঙ্গে ফলাহার করেন। হরিচরণের সঙ্গে টুকটাক কিছু কথাবার্তা হয় । সবই ধর্মবিষয়ক। ঈশ্বরের স্বরূপ কী ? উপনিষদ বলছে— জগত মায়া। মায়ার অর্থ কী ? জগৎ যদি মায়া হয় তাহলে কি প্রেম–ভালােবাসা, স্নেহ–মমতাও মায়া ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী মাস্টারের নিজের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বরাবরই সন্ধ্যা হয়। নিত্যদিনের এই রুটিনে একদিন ব্যতিক্রম হলাে। হঠাৎ জ্বর এসে যাওয়ায় স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি ফিরে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। জামগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তার ঘরে। কলের গানের সামনে বসে আছে। পেতলের চোঙের ভেতর চোখ রেখে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছে। শশী মাস্টারকে দেখে তরুণী ফ্যাকাশে হয়ে গেল। শশী মাস্টার নিজের বিস্ময় গােপন রেখে বললেন, ঐ রাতে আপনাকে দেখাবার জন্যে থাল এনে দেখি আপনি নাই। চলে গেলেন কেন?
তরুণী জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। শশী মাস্টার বললেন, কলের গান কীভাবে বাজে দেখাব ? ………..তরুণী হা–সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, আপনি কি আমার বাড়িতে এর আগেও ঢুকেছেন।
তরুণী হা–সূচক মাথা নেড়ে তিনটা আঙুল উচিয়ে দেখাল। সে তিনবার ঢুকেছে। ……কলের গান দেখার জন্যে ? ………আপনার নাম জানতে পারি ? আজ কি আপনি আপনার নামটা বলবেন ? জুলেখা। ….মুসলমান ? ………গান খুব পছন্দ করেন ?
জুলেখা হঁ–সূচক মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আপনি নিজে একটা বাজনা বাজান আমি দেখছি। বেঞ্জো । ……..হ্যা, ব্যাঞ্জো। আপনার বাজনা ভালাে না। তাল কাটে। আপনি কি গান গাইতে পারেন? …….আমি কি আপনার একটা গান শুনতে পারি ?
কলের গানটা বাজান। আমি দেখি । শশী মাস্টার কলের গান চালু করলেন। মীরার ভজন হচ্ছে। শশী মাস্টার অবাক হয়ে লক্ষ করলেন— গান শুনতে শুনতে এই অস্বাভাবিক রূপবতী মেয়েটি চোখের পানি ফেলছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
শশী মাস্টার বললেন, কলের গানটা আপনি নিয়ে যান। আমি আপনাকে দিলাম। উপহার। ……জুলেখা বলল, আপনার জিনিস আমি নিব কী জন্যে ? আপনে আমার কে ? আরেকটা থাল দিব ? অন্য গান। জুলেখা হা–সূচক মাথা নাড়ল।
সেই রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে শশী মাস্টার ডায়েরি লিখতে বসলেন— What a shame! I am deeply in love with the muslim lady– fasta TA OCE দেয় পয়ে তপস্যার ফল। অনেক রাতে শশী মাস্টার একটি কবিতাও লিখলেন— ………এক জোড়া কালাে আঁখি এত মূল্য তারি! নিতান্ত পাগল ছাড়া কে করে প্রত্যয় ? জগতের যত রত্ন লাজে মানে হারি— বিনিময়ে দিতে পারি, যা কিছু সঞ্চয়!
অনেকদিন পর হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি ইসলামি গান‘ শিরােনামে রূপবতী জুলেখার একটি রেকর্ড প্রকাশ করে। সেখানে তার নাম লেখা হয় চান বিবি। গানের প্রথম কলি— কে যাবি কে যাবি বল সােনার মদিনায়। সেই গল্প যথাসময়ে বলা হবে। এই ফাঁকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থাটা বলে নেই । সম্রাট পঞ্চম জর্জ এবং রানী মেরী বেড়াতে এসেছেন ভারতবর্ষে (ডিসেম্বর, ১৯১১)। তাদের সম্মানে দিল্লিতে এক মহা দরবার অনুষ্ঠিত হলাে। সেই দরবারে সম্রাট হঠাৎ বঙ্গভঙ্গ রদ ঘােষণা করলেন। মুসলমানরা মর্মাহত।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্যে যে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ইংরেজের প্রিয়পাত্র হয়েও তিনি বঙ্গভঙ্গের কঠিন সমালােচনা করলেন। তার সঙ্গে যুক্ত হলেন আইনজীবী মােহাম্মদ আলি জিন্নাহ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মােহম্মদ আলি, মাওলানা জাফর আলি খান। রাজনীতির আসরে এই সময় যুক্ত হয়েছেন বরিশালের চাখার থেকে আসা এক তরুণ। তাঁর নাম এ কে ফজলুল হক।
