মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

ছেলেটা হাসূচক মাথা নাড়লহরিচরণের প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে কোলে নিতেকোলে নেবার জন্যে সময়টা ভালােআশেপাশে কেউ নেই কেউ দেখে ফেলবে নাতিনি এক মুসলমান কাঠমিস্ত্রির ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেনএই দৃশ্য হাস্যকরধর্মেও নিশ্চয়ই বাধা আছেযবনপুত্র অস্পৃশ্য হবার কথাব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রশূদ্রের নিচে যবনের অবস্থান

হরিচরণ সন্দেশ এবং এক গ্লাস পানি হাতে ফিরলেনছেলেটা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা সেখানে নেইজামতলাতেও নেই পেয়ারা বাগানেও নেইদিঘির পানিতে ডুবে যায় নি তাে ? তার বুক ধ্বক করে উঠলতিনি দিঘির দিকে তাকালেনদিঘির জল শান্তসবুজ শ্যাওলার যে চাদর দিঘি জুড়ে ছড়িয়ে আছে সে চাদরে কোনাে ভাঙচুর নেই। 

ছেলেটার নাম জানা থাকলে তাকে নাম ধরে ডাকা যেততিনি নাম জানেনএই কাজটা ভুল হয়েছেদুটা পিঁপড়া যখন মুখােমুখি হয় তখন তারা কিছুক্ষণ আলাপ আলােচনা করেবেশিরভাগ সময়ই মানুষরা এই কাজ করে

একজন আরেকজনকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়তিনি পেয়ারা বাগানের দিকে গেলেনপেয়ারা বাগানের পরই ঘন বেতঝােপছেলেটা বেতঝােপের ওপাশে যায় নি তাে ? সেখানেও তাকে পাওয়া গেল নাআকাশের মেঘ ঘন হয়েছেযেকোনাে মুহূর্তে বৃষ্টি নামবেহরিচরণ ঘাটের কাছে ফিরে গেলেনতাঁর হাতে সন্দেশসন্দেশ থেকে অতি মিষ্টি গন্ধ আসছেদারুচিনির গন্ধ নাকি ? সন্দেশে গরম মসল্লা দেয়া নিষেধদেবীর ভােগে সন্দেশ দেয়া হয়সেই সন্দেশ বিশুদ্ধ হতে হয়এলাচ দারুচিনি দিয়ে বিশুদ্ধতা নষ্ট করা যায় নাতাহলে গন্ধটা কিসের? দুধের গন্ধ ? ঘন দুধের কি আলাদা গন্ধ আছে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃষ্টি শুরু হয়েছেআষাঢ় মাসের বড় বড় ফোটার বৃষ্টিকিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে ভিজিয়ে দেবেদৌড়ে ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে নাতিনি বৃষ্টিতে ভিজছেনএই বয়সে বৃষ্টিতে ভেজার ফল শুভ হবে নাতারপরেও তিনি ঘাট ছাড়তে পারলেন নাতার কাছে মনে হলাে, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন 

ছেলেটা ভিজতে ভিজতে আসছেমুকুন্দ কলাপাতার ঠোঙ্গায় পিঁপড়ার ডিম নিয়ে এসেছেসে অবাক হয়ে বলল, বিষ্টিত ভিজেন ? অসুখ বাধাইবেনঘরে যান। 

হরিচরণ বললেন, যাব একটু পরেতুমি সন্দেশ দুটা ঐ ছেলেটারে দিয়া আস। 

কোন ছেলে ? কাঠমিস্ত্রির ছেলেআজ আর বর্শি নিয়ে বসব না । 

মুকুন্দ অনিচ্ছার সঙ্গে যাচ্ছেভিজতে ভিজতে যাচ্ছেতার এক হাতে পিঁপড়ার ডিম অন্য হাতে সন্দেশমাছ মানুষের খাদ্যহরিচরণ হঠাৎ ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন, ডিমগুলির জন্যে তার খারাপ লাগছেএই ডিম থেকে আর কোনােদিন পিপড়ার জন্ম হবে নাতারা পৃথিবীর অতি আশ্চর্য রূপরসগন্ধের কিছুই জানবে না। বড়ই আফসােসের কথাতিনি কি মুকুন্দকে বলবেনডিমগুলি যেখান থেকে এনেছে সেখানে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে? হয়তাে এখনাে সময় আছেজায়গামতাে পৌছে দিলে কিছু ডিম থেকে পিপড়া জন্মাবে। মুকুন্দ অনেকদূর চলে গেছে, এখন ডাকলে সে শুনতে পাবে নাতবু তিনি ডাকলেন, মুকুন্দ! মুকুন্দ

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মুকুন্দ শুনতে পেল নাকিন্তু কেউ একজন হাসলহরিচরণ চমকে হাসির শব্দ যেদিক থেকে আসছে সেদিকে তাকালেনকী আশ্চর্য, লাল প্যান্ট পরা ছেলেটাসে দিঘির অন্যপ্রান্তেপাড় বেয়ে পানির দিকে নামছেবৃষ্টির পানিতে দিঘির পাড় পিচ্ছিল হয়ে আছেছেলেটা কি একটা দুর্ঘটনা ঘটাবে ? পা পিছলে পানিতে পড়ে যাবে ? তিনি ডাকলেন, এই, এই উঠে আসউঠে আস বললামএই ছেলে, এই

ছেলেটা তাঁকে দেখলকিন্তু তার দৃষ্টি দিঘির সবুজ পানিতেতার হাতে কাদামাখা পেয়ারাসে পেয়ারা পানিতে ধুবেতিনি উঁচু গলায় আবারাে ডাকলেন, এই ছেলেএই তখনি ঝপ করে শব্দ হলােকিছুক্ষণ ছেলেটির হাত পানির উপর দেখা গেলতারপরেই সেই হাত তলিয়ে গেল হরিচরণ পুকুরে ঝাপ দিলেন। 

হরিচরণ কীভাবে দিঘির অন্যপ্রান্তে পৌছলেন, কীভাবে ছেলেটাকে পানি থেকে তুললেন তা তিনি জানেন নাশুধু এইটুকু জানেন পানি থেকে তােলার পর দেখা গেল, ছেলেটার ডানহাত অনেকখানি কেটেছেসেখান থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছেস্বপ্নে শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে এইভাবেই রক্ত পড়ছিলতিনি বিড়বিড় করে বললেন, বাবু! বেঁচে আছিস তো! বলেই পুকুরপাড়ে জ্ঞান হারালেন। 

তাঁর জ্ঞান ফিরল নিজের খাটে গভীর রাতেতার চারপাশে মানুষজন ভিড় করেছেনেত্রকোনা সদর থেকে এলএমএফ ডাক্তার সতীশ বাবু এসেছেন। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি বুকে স্টেথিসকোপ ধরে আছেনপাশের ঘর থেকে বৃদ্ধা মায়ালতার কান্না শােনা যাচ্ছেবৃদ্ধা কারণে অকারণে কাঁদেহরিচরণ বললেন, ছেলেটা কি বেঁচে আছে

মুকুন্দ বলল, বেঁচে আছেছেলেটার নাম কী ? জহিরজহির তাহলে বেঁচে গেছে ? জে আজ্ঞে । 

হরিচরণ বললেন, ঠাকুরঘরের তালা খােলঘরে বাতি দাওঠাকুরঘরে যাব। 

মুকুন্দ বিনীতভাবে বলল, সকালে যানএখন শুয়ে থাকেনআপনার শরীর অত্যধিক খারাপ। 

ঠাকুরঘরের তালা খােল । 

গভীর রাতে ঠাকুরঘরের দরজা খােলা হলােপ্রদীপ জ্বালানাে হলােছােট্ট ঘরশ্বেতপাথরের জলচৌকিতে কষ্টিপাথরের রাধাকৃষ্ণ কৃষ্ণ বাঁশি ধরে আছেনতাঁর কাঁধে মাথা রেখে লীলাময় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রী রাধিকা। 

হরিচরণ পদ্মাসন হয়ে বসলেনমুকুন্দকে বললেন, ছেলেটাকে নিয়ে আস, আমি একটু দেখব। 

ঠাকুরঘরে নিয়ে আসব ? কী বলেন এইসব! হ্যা, ঠাকুরঘরে নিয়ে আসসে আমার কোলে বসবেমুসলমান ছেলে তাে! হােক মুসলমান ছেলে। 

জহিরের মা জহিরকে কোলে নিয়ে এসেছেসে তার সবুজ শাড়ি দিয়ে ছেলেকে ঢেকে রেখেছেতার চোখে উদ্বেগবাড়িতে এত লােকজন দেখে হকচকিয়ে গেছে। হরিচরণ উঠানের জলচৌকিতে বসেছেনতার নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছেশরীর ঘামছেতিনি জহিরের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাগাে! আপনার ছেলে কি ভালাে আছে

জহিরের মা জবাব না দিয়ে ছেলেকে আরাে ভালাে করে শাড়ি দিয়ে ঢাকল হরিচরণ বললেন, আমার এখানে ডাক্তার আছেছেলেকে দেন, ডাক্তার দেখুক। 

আমার ছেলে ভালাে আছে

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *