মাওলানা এশার নামাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে হাতির গলার ঘণ্টার আওয়াজ পেলেন। সােনাদিয়ার জমিদার শশাংক পালের হাতির গলার রপার ঘণ্টা। অতি মধুর আওয়াজ। তিনি শুনেছেন সােনাদিয়ার জমিদার আরেকট। হাতি কিনেছেন। মাদি হাতি। এখন তিনি দুই হাতি পাশাপাশি নিয়ে চলেন। মাদি হাতিটা থাকে সামনে, পুরুষটা পিছনে।
এরা যখন থেমে থাকে তখন না কি পুরুষ এবং মেয়ে হাতি শুড় জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকে। নিশ্চয়ই খুব মধুর দৃশ্য। তিনি এখনাে দেখেন নি। একবার সােনাদিয়ায় যাবেন। দেখে আসবেন। | হাতি নিয়ে কোরান মজিদে একটা সূরা আছে। সূরা ফিল। মাওলানা মনে মনে সূরা আবৃত্তি করে তার বঙ্গানুবাদ করলেন। তার ভালাে লাগল।
আলাম তারা কাইফা ফা’আ’লা রাব্বকা বিআছহবিল ফীল। হস্তিবাহিনীর সাথে তােমার প্রভু কীরূপ আচরণ করলেন তাহা কি তুমি লক্ষ কর নাই ? আলাম ইয়াজআ’ল কাইদাহুম ফী–দলীল।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করেন নাই ? জঙ্গলের পথ ছেড়ে বড় রাস্তায় উঠেই মাওলানা শশাংক পালের দেখা পেলেন। হাতির পিঠে শশাংক পাল বসে আছেন। হাতির গায়ের রঙ অন্ধকারে। মিশে গেছে। মাওলানা ইদরিসের মনে হলাে, জমিদার শশাংক পাল শূন্যের উপর বসে আছেন।
মাওলানা ইদরিস বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আদাব। বিধর্মীকে আসসালামু আলায়কুম বলা নিষেধ। তাদের বেলায় আদাব। আদাব শব্দের অর্থ আছে কি
তিনি জানেন না। শশাংক পাল বললেন, কে ? মাওলানা বললেন, জনাব আমার নাম ইদরিস। আমি জুম্মঘরের ইমাম। আমার অঞ্চলে গরু কাটা নিষেধ এটা জানাে তাে ? জি জনাব জানি ।
নিষেধ জেনেও অনেকে গরু কাটে। গভীর জঙ্গলের ভেতর এই কাজ করে মাংস ভাগাভাগি করে। এরকম সংবাদ যদি পাও আমাকে জানাবে। আমি ব্যবস্থা নিব। ভালাে কথা, হরিচরণ মুসলমান হয়েছে এরকম একটা খবর পেয়েছি।
খবরটা কি সত্য ? সত্য না, জনাব। আচ্ছা, ঠিক আছে। পথ ছাড়, আমি যাব । মাওলানা পথ ছেড়ে রাস্তার পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি আরাে দূরে সরে গেলেন। …….শশাংক পাল হাতি নিয়ে হরিচরণের বাড়িতে এসেছেন। হাতি দুটাই সঙ্গে এনেছেন। শশাংক পালের সঙ্গে তার এস্টেটের দুই ম্যানেজার এসেছেন। একজন হুঁকোবরদার এসেছে। পান বাসে একজন এসেছে। তার কাজ নানান মসলা দিয়ে পান বানানাে। শশাংক পালের তামাক খাওয়ার অভ্যাস আছে । অন্যের হুকোয় তিনি তামাক খান না।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
শশাংক পালের বয়স চল্লিশ। শরীরের উপর নানান অত্যাচারের কারণে বয়স অনেক বেশি দেখায়। চেহারায় বালকভাব আছে, তবে চোখ জ্যোতিহীন। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে হাতকাপা রােগ হয়েছে। গাছের পাতা কাঁপার মতাে হাতের আঙুল প্রায়ই থরথর করে কাঁপে। শশাংক পাল এই কারণেই শীত গ্রীষ্ম সবসময় মখমলের চাদরে শরীর ঢেকে রাখেন।
হরিচরণ জমিদার বাবুকে অতি যত্নে বৈঠকখানায় বসিয়েছেন। তাকে তামাক দেয়া হয়েছে। একজন পাখবরদার পেছনে দাঁড়িয়ে বাতাস করছে। এত বড় জমিদার হঠাৎ তার বাড়িতে কেন এই কারণ হরিচরণ ধরতে পারছেন না। একটা অনুমান তিনি অবশ্যি করছেন ব্রিটিশরাজকে খাজনা দেবার তারিখ এসে গেছে। শশাংক পাল হয়তাে খাজনার পুরাে টাকার ব্যবস্থা করতে পারেন নি। খাজনা জমা দেবার সময়ই শুধু জমিদাররা ধনবানদের খাতির করেন। ……..হরিচরণ! জে আজ্ঞে ।
নতুন হাতি খরিদ করেছি। গৌরীপুরের মহারাজার কাছ থেকে কিনলাম । তিনি কিছুতেই বিক্রি করবেন না। মহারাজা বললেন, আমি কি হাতি বেচাকেনার ব্যবসা করি ? তােমার হাতি পছন্দ হয়েছে নিয়ে যাও, কিছু দিতে হবে না। আমি বললাম, ঐটা হবে না। নগদ আট হাজার টাকা উনার খাজাঞ্চির কাছে জমা দিয়ে হাতি নিয়ে চলে এসেছি। ভালাে করেছি না ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
হরিচরণ হা–সূচক মাথা নাড়লেন। হাতির নাম রেখেছি বং। পুরুষটার নাম চং, মাদিটার নাম বং। দুইজনে মিলে বংচং। হা হা হা। ভালাে করেছি না ? ……….জে আজ্ঞে, ভালাে। শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, এখন মূল কথায় আসি। হঠাৎ হাতি কেনার কারণে আমি কিঞ্চিৎ অর্থসংকটে পড়েছি। আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে খাজনা পৌছতে হবে। পাচ হাজার টাকার সমস্যা। টাকাটা দিতে পারবে ?
হরিচরণ মুখ খােলার আগেই শশাংক পাল বললেন, আমি জিনিস বন্ধক রেখে টাকা নিব । বং থাকবে তােমার কাছে বন্ধক। একটা বন্ধকনামা তৈরি করে এনেছি। স্ট্যাম্পে পাকা দলিল। আমি বিশেষ বিপদে পড়েছি। বিপদ থেকে উদ্ধার কর।
হরিচরণ বললেন, আপনি নিজে এসেছেন এই যথেষ্ট। বন্ধকনামা লাগবে । হাতিও রেখে যেতে হবে না। | শশাংক পাল বললেন, এই কাজ আমি করি না। বন্ধকনামায় আমি দস্তখত করি নাই । টিপসই দিয়েছি। ইদানীং দস্তখত করতে পারি না। হাতকাপা রােগ হয়েছে, শুনেছ বােধহয়। জনসমক্ষে বিরাট লজ্জায় পড়ি বিধায় চাদরের নিচে হাত লুকিয়ে রাখি। এখন বলাে টাকাটা কি দিতে পারবে ? হরিচরণ বললেন, এত টাকা আমি সঙ্গে রাখি না। সকালে আপনার বাড়িতে দিয়ে আসব।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ
শশাংক পাল আরাে কিছুক্ষণ থাকলেন। শরবত খেলেন, পান খেলেন। কিছুক্ষণ গল্প করলেন। | উড়াউড়া শুনতে পেলাম তােমাকে না–কি সমাজচ্যুত করেছে। কথাটা কি সত্যি ? হরিচরণ একবার ভাবলেন বলেন, সমাজচ্যুতির ঘটনা আপনার বাড়িতেই ঘটেছে। আপনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। তারপর মনে হলাে এই মানুষকে পুরনাে কথা মনে করিয়ে দিয়ে কোনাে লাভ নেই। তিনি কিছুই মনে রাখতে পারেন না।
শশাংক পাল বললেন, তুমি না–কি সবার সামনে এক মুসলমান ছেলেকে চাটাচাটি করেছ ? গালে চুমা দিয়েছ ? হরিচরণ জবাব দিলেন না। …..শশাংক পাল গলা নামিয়ে বললেন, আবার কার কাছে যেন শুনলাম সেই মেয়ের মা রাইত নিশুথে তােমার ঘরে আসে। তুমি একা থাক, রাইত নিশুথে তােমার ঘরে মেয়েছেলে আসা তাে ভালাে কথা না। সমাজ থেকে পতিত হবে।
হরিচরণ বললেন, পতিত তাে আছিই। নতুন করে কী হবাে ? তা ছাড়া রাইত নিশুথে আমার কাছে কেউ আসে না । ঐ মেয়ে আমারে বাবা ডাকে। আমি তাকে কন্যাসম দেখি।
