মাতাল হাওয়া পর্ব:১৪ হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হাওয়া

লাইলী নিজের মনেই বললেন, এই মেয়েকে রাখা যাবে না। সে অনেক যন্ত্রণা করবে। আজ যন্ত্রণার শুরু।হাবীব বসেছেন চেম্বারে। তার সামনে জড়সড় হয়ে বসে আছে সফুরা। সফুরার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাবীব বলল, ভালো আছ?

সফুরা হা-সূচক মাথা নাড়ল। মুখে কিছু বলল না।হাবীব বললেন, হারুন উকিলকে ক্ষিতিশ বাবুর কথা তুমি বলেছ? সফুরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার হা-সূচক মাথা নাড়ল।হাবীব বললেন, একটা কথা আছে–নারীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী। এটা মনে রাখবা। শাপা অরণে আসে না। বুঝেছ?

জি।কে না-কি ভোষর হাত দেখে বলেছে তোমার স্বামীর ফাঁসি হবে। ঘটনা কি সতা? জি।ভালো গণকের সন্ধান পেয়েছ। স্ত্রীর হাত দেখে স্বামীর ভাগ্য বলে দেয়। সহজ কাজ না, কঠিন কাজ। গণকের নাম কী?

সফুরা স্পষ্ট গলায় বলল, নাদিয়া আম্মা হাত দেখে বলেছেন।ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে হাবীব বললেন, নাদিয়া হাত দেখাও শিখেছে। ভালো তো। তারে বলব সে যেন আমার হাত দেখে তার মার ভাগ্য বলে দেয়। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন তুমি সামনে থেকে যাও। কথা যা বলেছি মনে রাখবা। তোমার স্বামীর মামলা মোকদ্দমার বিষয় আমি দেখছি। তোমার পরামর্শের প্রয়োজন নাই।জি আচ্ছা।সন্তান কবে নাগাদ হবে?

জানুয়ারি মাসে।যে-কোনো সমস্যায় প্রণব বাবুকে বলবা।জি আচ্ছা।প্রণবকে আমার কাছে পাঠাও।সফুরা উঠে দাঁড়াল। হাবীবকে কদমবুসি করে ঘর থেকে বের হলো। আশ্চর্যের কথা, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সেও দরজার চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে পড়ে গেল। প্রণব কাছেই ছিল, ছুটে এসে সফুরাকে টেনে তুলল। বিরক্ত গলায় বলল, তুমি ভরা মাসের পোয়াতি। সাবধানে চলাফেরা কর না? ব্যথা পেয়েছ?

জি-না।যাও ঘরে গিয়া শুয়ে থাকো। নড়াচড়া করবা না।প্রণব এসে হাবীরের সামনে রাখা চেয়ারে বসল। হাবীব বললেন, নাদিয়াকে একটা খবর দাও তো। সে আছে কোথায়? দিঘির ঘাটে বসেছে।এত রাতে দিঘির ঘাটে কী?জোছনা দেখে। ভয়ের কিছু নাই। পাহারাদার রেখে দিয়েছি। ভাদু আড়ালে বসে পাহারা দিতেছে। নাদিয়া আম্মার সাথে হোসনা মেয়েটাও আছে। আপনাকে একটা খবর দিতে ভুলে গেছি।এখন দাও।

আপনি রোকেয়া হলের দু’টা মেয়ের ব্যাপারে সন্ধান নিতে বলেছেন। সন্ধান নিয়েছি। আগেই সন্ধান পেয়েছিলাম। বলতে ভুলে গেছি। আজকাল কিছু মনে থাকে না। বানপ্রস্থের সময় হয়ে গেছে।হাবীব বিরক্ত গলায় বললেন, ফালতু কথা না বলে মূল কথা বলো। সন্ধানে কী পেয়েছ?

তিনশ’ এগারো নম্বরে যে মেয়ে দুটা থাকে তাদের একজনের নাম বকুল বালা। সে কেমিস্ট্রির ছাত্রী। অন্যজনের নাম শেফালী, তার সাবজেক্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স। শেফালী মেয়েটার বিবাহ ঠিক হয়েছে। ছেলে ডাক্তার। এই দুই মেয়ের বাড়ির ঠিকানাও নিয়ে এসেছি। ঠিকানা বলব স্যার?

না। আর কিছু লাগবে না।হাবীব দিঘির ঘাটের দিকে রওনা হলেন। নাদিয়াকে দেখা যাচ্ছে। কেমন হতাশ ভঙ্গিতে বসে আছে। নাদিয়ার সামনে হোসনী। তার শরীর যথারীতি চাদর দিয়ে ঢাকা। সে মাথা নিচু করে আছে।

ঘাটের সিঁড়ির পেছনে ঘাপটি মেরে বসে আছে ভাদু। ভাদু তাকিয়ে আছে। নাদিয়ার পায়ের দিকে। শাড়ি সামান্য উঠে থাকার কারণে ডান পাটার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। তার ভাগ্য ভালো হলে পা নড়াচড়ার সময় শাড়ি হয়তো আরও উপরে উঠবে। ভাদুর কাছে মেয়েছেলের আসল সৌন্দর্য পায়ে। এই মেয়ের পা সুন্দর আছে। ভাদু চোখ বন্ধ করল। নিজেকে সামলানোর জন্যে কাজটা করল। ইশ এমন যদি হতো মেয়েটা একা। আশেপাশে কেউ নেই। আচমকা তার মুখ চেপে ধরলে সে শব্দ করতে পারবে না। মুখ চেপে কার্য সমাধা করে কিছুক্ষণ গলা চেপে ধরে থাকা, তারপর পালিয়ে যাওয়া। ভাদু ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে।

হাবীব মেয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে কোমল গলায় ডাকলেন, নাদিয়া।জি বাবা! অন্ধকারে বসে আছিস কেন? নাদিয়া বলল, অন্ধকার কোথায়! চাঁদের আলো আছে।হাবীব মেয়ের পাশে বসে মনে মনে একটি অতি জরুরি চিঠির মুসাবিদা করা শুরু করলেন। চিঠিটা লেখা হবে হাসন রাজা চৌধুরীর বাবা রহমত রাজা চৌধুরীকে।

রহমত রাজা চৌধুরী

জনাব,

আসসালাম! একটি জরুরি বিষয় জানাইবার জন্যে আমি আপনাকে পত্র দিতেছি। নানান কারণে আপনার পুত্রকে আমার পছন্দ। আমার একমাত্র কন্যা নাদিয়ার সঙ্গে কি তার বিবাহ হইতে পারে? আমি অধিক কথা বলিতে পছন্দ করি না। এই কারণে এক লাইনে মূল কথা বলিলাম।

ইতি

হাবীব খান।

পুনশ্চ : জানুয়ারি মাসের কুড়ি তারিখে আমার সর্ববৃহৎ আকারের একশ’ পাবদা মাছের প্রয়োজন। ডিসট্রিক্ট জজ আবুল কাশেম সাহেবের কন্যার বিবাহে এই মাছ প্রয়োজন।

এই চিঠি এখনই পাঠানোর প্রয়োজন নাই। আগে মামলার রায় হোক। তারপর। নিশ্চিন্ত মনে আগাতে হবে। মামলা চলতে থাকা মানে অস্বস্তি নিয়ে বাস করা। আজ বাটকু হারুন অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষিতিশাকে ভুলা দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। বই লেনদেনের রেকর্ড কোনো কাজের রেকর্ড না। তারপরেও রেকর্ড বই নষ্ট করে ফেলা দরকার। অতি দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে।হাবীব বললেন, মা যাই।নাদিয়া বলল, যাও।হোসনা মেয়েটার জবান ফুটেছে? নাকি এখনো চুপ?

এখনো চুপ, কোনো কথা বলে না বাবা।কথা না বলাই ভালো। জগতে বড় অনিষ্ট অধিক কথার কারণে হয়।হাবীব চলে গেলেন। ভাদু জন্তুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে এল। এত দূর থেকে ভালোমতো দেখা যায় না। সে খানিকটা চিন্তিত নতুন মেয়েটা সবসময় নাদিয়ার সঙ্গে আছে। দুইজনকে একসঙ্গে কায়দা করা যাবে না। দুইজনের একজন চিৎকার করবেই।

দিঘির ঘাটে হোসনা এবং নাদিয়া বসে আছে। তাদের গায়ে চাদের আলো পড়েছে। দিঘির এক কোনায় অনেকগুলি শাপলা ফুল ফুটেছে। এই ফুলগুলি বড় বড়। চাঁদের আলোয় ফুলের প্রতিবিম্ব পড়েছে পানিতে। বাতাসে ফুল কাঁপছে, প্রতিবিম্বও কাপছে। নাদিয়া আঙুল উঁচিয়ে বলল, ওই জায়গায় আমি একবার ভূত দেখেছিলাম।হোসনা আঙুল লক্ষ করে তাকাল। আর কোনো ভাবান্তর হলো না।

নাদিয়া বলল, মাঝেমাঝে তুমি কেঁপে ওঠো। এর কারণ কী বলো তো।হোসনা জবাব দিল না।নাদিয়া বলল, তোমার ঘটনা আমি শুনেছি। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে। তোমার মতোই আমি কষ্ট পাচ্ছি। যতবার তোমাকে দেখি ততবার কষ্ট পাই। আমি তোমাকে ঢাকায় নিয়ে যাব। সাইকিয়াস্ট্রিস্ট দিয়ে তোমার চিকিৎসা করাব। I Promise.নাদিয়া বলল, তুমি একটু কাছে আসো। আমি তোমার পিঠে হাত রেখে কথা বলি।

হোসনা নড়ল না। যেখানে বসে ছিল, সেখানেই বসে রইল। নাদিয়া বলল, তোমার হোসনা নামটা আমার পছন্দ না। আমি তোমার একটা নতুন নাম দিলাম, পদ্ম! এই নামটা কি তোমার পছন্দ হয়েছে? পদ্ম হঁ-সূচক মাথা নাড়ল।নাদিয়া বলল, প্রণব কাকার কাছে শুনেছি তুমি সুন্দর গান করতে। একটা গান কি আমাকে শোনাবে?

পদ্ম স্পষ্ট গলায় বলল, না।মানুষ যখন কাদে তখন চোখের জলের সঙ্গে কষ্ট বের হয়ে আসে। আবার যখন মানুষ গান গায়, তখন সুরের সঙ্গে কিছু কষ্ট বের হয়। লক্ষ্মী পদ্ম, আমাকে একটা গান শোনাও। কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে দেখো! এমন সুন্দর জোছনায় বনে যেতে ইচ্ছা করে। আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে। এই গানটা কি জানো?

পদ্ম হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।গাইবে।পদ্ম না-সূচক মাথা নাড়ল।আকাশের চাঁদ তার আলো ফেলে যেতে থাকল। মানুষের আবেগের সঙ্গে এই আলোর কোনো সম্পর্ক নেই।হাজেরা বিবির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। তার বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে, তবে গলার স্বর এখনো টনটনা। তিনি জানিয়েছেন ঘরে বিছানায় শুয়ে মৃত্যুতে তার মত নেই। তাকে মরতে হবে ঘরের বাইরে। ঘরে মারা গেলে আজরাইল ঘর চিনে ফেলবে, তখন আরও মৃত্যু হবে। তিনি একঘেয়ে গলায় সুর করে বলতে লাগলেন, দিঘির ঘাটে মরব। দিঘির ঘাটে মরব।

তাঁকে ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে খাট পাতা হয়েছে। তার মাথায় ছাতা ধরা হয়েছিল। হাজেরা বিবি বলেছেন, কালো ছাতা মাথায় ধরা যাবে না। কালো রঙ আজরাইলের পছন্দ। ছাতা দেখে দৌড়ে আসবে।ডাক্তার, কবিরাজ এবং হোমিওপ্যাথ—তিন ধরনের চিকিৎসকই উপস্থিত। তাদের জন্যে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তারা শামিয়ানার নিচে বসে আছেন। তাদের জন্যে চা এবং ডাবের পানির ব্যবস্থা আছে।

মাদ্রাসা থেকে পঞ্চাশজন তালেবুল এলেম এসেছে। তারা কোরান খতম দিচ্ছে। শম্ভুগঞ্জের পীর সাহেবকে আনতে লোক গেছে। এক বস্তা তেঁতুল বিচি আনা হয়েছে। তেঁতুল বিচি গুনা হচ্ছে। এক লক্ষ পঁচিশ হাজারবার দরুদে শেফা পাঠ করা হবে। তেঁতুল বিচি গণনাকার্যে ব্যবহার করা হবে।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন এসেছেন। তিনি হাবীবকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছেন, রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত টিকবে এরকম মনে হয় না। তিনি রোগীকে স্যালাইন দিতে চেয়েছিলেন। হাজেরা বিবি বলেছেন, মানুষের পেসাবের মতো এই জিনিস আমি শরীরে ঢুকাব না।

হাবীব তার মাকে বললেন, মা, কিছু খেতে মনে চায়? হাজেরা বিবি বললেন, মর্দ হাতির একটা বিচি ভাইজ্যা আইন্যা দে। খায়া দেখি জিনিস কেমুন।হাবীব বললেন, তুমি তো জীবনটা ঠাট্টা ফাজলামি আর ইয়ার্কিতে কাটায়া দিলে। এখন সময় শেষ; সাধারণভাবে কথা বলো। কিছু খেতে চাও?

হাজেরা বিবি বললেন, তোর বাপের অতি পছন্দের খানা ছিল সজনা দিয়ে খইলসা মাছের ঝোল। উনার মৃত্যুর পর এই জিনিস আমি আর কোনোদিনই খাই নাই। আজ যখন চইলা যাইতেছি, খইলসা মাছ খাইতে পারি।সজনা এবং খইলসা মাছের সন্ধানে চারদিকে লোক গেল।জন্মের যেমন আয়োজন আছে মৃত্যুরও আছে। প্রণব ব্যস্ত হয়ে সেই আয়োজন করছে। সারা দিন বাড়িতে প্রচুর লোক আসবে। তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী সাত দিন এই বাড়িতে চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে তোলা খাবার আসবে। সবাই খাবার দিতে চাইবে।

সবার খাবার নেওয়া যাবে না। যাদের খাবার গ্রহণ করা যাবে, তাদের একটা লিস্টি করতে হবে। কে সকালে পাঠাবে, কে বিকালে, কে রাতে সব লেখা থাকতে হবে।মৃত্যুর খবর সব আত্মীয়কে অতি দ্রুত জানাতে হবে। লোক মারফত এবং টেলিগ্রামে। কেউ যেন বলতে না পারে আমরা খবর পাই নাই। খবর না পাওয়া নিয়ে বেশিরভাগ সময় বিরাট পারিবারিক কোন্দল হয়।

আজ দুপুরে শ’খানেক মানুষ খাবে। তাদের আয়োজন করতে হবে। মাছ করা যাবে না। মৃত বাড়িতে মাছ নিষিদ্ধ। প্রণব একটা গরু এবং একটি খাসি জবেহ করার ব্যবস্থা নিলেন।জামে মসজিদের ইমাম সাহেব এসেছেন হাজেরা বিবিকে তওবা করাতে। হাজেরা। বিবি বললেন, আমি তওবার মধ্যে নাই। ইমাম সাহেব বললেন, তওবা কেন করবেন না আম্মা? আমরা সবাই জানা অজানায় কত পাপ করি!

হাজেরা বিবি বললেন, আমার সামনে কেউ অপরাধ করলে আমি তার শাস্তি দেই। কোনোদিন ক্ষমা দেই না। আমি নিজে কেন আমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা নিব? অপরাধ যা করেছি তার শাস্তি মাথা পেতে নিব। ক্ষমা নিব না। তবা করতে হয় আপনি আপনার নিজের জন্যে করেন। আমি বাদ।

হাজেরা বিবি নাদিয়াকে তার পাশে বসিয়ে রেখেছেন। নাদিয়াকে বলেছেন, আমার চোখের মণির দিকে তাকায়া থাক। মৃত্যুর সময় চোখের মণির ভেতর থাইকা গোলাপি আলো বাইর হয়। আমি দুইবার দেখছি। মজা পাইছি! তুই দেখ মজা পাবি।নাদিয়া দাদির চোখের মণির দিকে তাকিয়ে আছে। লাইলী এসে বললেন, আম্মা! আপনি একটু আল্লাখোদার নাম নেন।হাজেরা বিবি বললেন, খামাখা উনারে বিরক্ত কইরা কোনো লাভ আছে? তোমার ডাকতে ইচ্ছা হয় তুমি ডাকো।

এর পরপরই হাজেরা বিবি ঘোরের মধ্যে চলে যান। তাঁর জবান বন্ধ হয়ে যায়।হাজেরা বিবির খবর পেয়ে হাবীবের জুনিয়র উকিল আব্দুল খালেক এসেছেন। চেম্বারে চিন্তিতমুখে বসে আছেন। তাকে চা দেওয়া হয়েছে, তিনি চা খাচ্ছেন না। আরাম করে চায়ের কাপে চুমুক দিলে তিনি যে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন তা প্রকাশ পায় না।

হাবীব চেম্বারে ঢুকতেই আব্দুল খালেক উঠে দাঁড়ালেন এবং ভাঙা গলায় বললেন, কী সর্বনাশ হয়ে গেল।হাবীব স্বাভাবিক গলায় বললেন, সর্বনাশ এখনো হয় নাই। তবে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তুমি এসেছ ভালো হয়েছে, ফরিদের মামলাটা নিয়ে আলাপ করি।

আব্দুল খালেক বললেন, মামলা মোকদ্দমা নিয়ে আলাপ আজকে থাকুক।হাবীব বললেন, থাকবে কেন? কোনো কিছুই ফেলে রাখা ঠিক না। আলোচনাটা জরুরি। জজ সাহেবের মনে সন্দেহ ঢুকে গেছে যে ফরিদ সাজানো আসামি। ময়মনসিংহ বার্তর একটা কপি কেউ একজন তাকেও দিয়েছে। এখন আমাদের কী করা উচিত বলো?

বুঝতে পারছি না স্যার।জজ সাহেবের মনে যদি সন্দেহ ঢুকে যায় তাহলে ফরিদ খালাস পেয়ে যাবে। এটা আমাদের জন্যে খারাপ। তখন মূল আসামির খোঁজ পড়বে। নতুন তদন্ত। কাজেই আমরা চাইব না ফরিদ খালাস পাক।আমরা করব কী?

প্যাঁচ খেলাতে হবে। এখন প্রমাণ করতে হবে ফরিদ মূল খুনি। তাকে বাঁচানোর জন্যে এইভাবে মামলা সাজানো হয়েছে।ফরিদের খুনের মোটিভ কী? চিন্তা করে মোটিভ বের করো। আচ্ছা এই মোটিভ কেমন? ফরিদকে ওই লোক কোনো কারণে চূড়ান্ত অপমান করেছে। যেমন ধরো নেংটা করে কইতরবাড়ির চারদিকে চক্কর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এই রাগ থেকে খুন।

আব্দুল খালেক বললেন, খারাপ না।হাবীব বললেন, বুড়ি যে বাবুর্চি সাক্ষ্য দিয়েছিল সে আবার নতুন করে সাক্ষ্য দিবে। সে বলবে সকালবেলা বুড়ির কাছ থেকে সে যখন চা নেয় তখন সে বিড়বিড় করে বলছিল, আজ ঘটনা ঘটাব।… বুদ্ধি কেমন?

খারাপ না।আমি আইডিয়া দিলাম। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো। এখনই চিন্তা করা শুরু করো।আব্দুল খালেক বললেন, আপনার মাতা যদি ইন্তেকাল করেন তাহলে আমি এক বেলা তোলা খাবার পাঠাতে চাই, কিন্তু প্রণব বাবু বললেন, সব বুক হয়ে গেছে।

হাবীব বললেন, এই মৃত্যুই তো শেষ না। আরও তো মৃত্যু হবে। তখন পাঠাবা।আব্দুল খালেক বললেন, জি আচ্ছা।দুপুর তিনটার দিকে হাজেরা বিবি চোখ মেলে ডাকলেন, হাবু কই রে! হাবু! হাবীব দৌড়ে এলেন। হাজেরা বিবি বললেন, খইলসা মাছের সালুন কি হইছে?খোঁজ নিতেছি।তাড়াতাড়ি খোঁজ নে। ক্ষিধায় পরাণ যায়। মাদ্রাসার পুলাপান বিদায় কর, এরার চিৎকারে মাথাব্যথা শুরু হইছে।এখন কি ভালো বোধ করছেন?

এক ঘুম দিছি–শরীর ঠিক। ভালো খোয়াবও দেখছি। নাদিয়ার বিবাহ। ওই নাদিয়া কাছে আয়, তোরে নিয়া কী খোয়াব দেখলাম শুন।নাদিয়া কাছেই ছিল। সে আরও ঘনিষ্ঠ হলো। তার পাশে লাইলী এসে বসলেন। হাজেরা বিবি আনন্দ নিয়ে স্বপ্ন বলতে লাগলেন।দেখলাম তোর বিবাহ। বিরাট আয়োজন। তোর দাদাও আসছে বিবাহে শরিক হইতে। আমি বললাম, নাতনির বিয়া খাইতে আসছেন খুব ভালো কথা। তার জন্যে আনছেন কী?

সে বলল, খালি হাতে আসছি।আমি বললাম, এইটা কেমন কথা! খালি হাতে আসলেন কেন? নাতনি বইল্যা কথা।তোর দাদা বলল, আমার নসিব হইছে হাবিয়া দোজখে। সেইখানে আগুন ছাড়া কিছু মিলে না। এই কারণে খালি হাতে আসছি। আগুন হাতে নিয়া আসলে তুমি আবার মন্দ বলতা।নাদিয়া বলল, দাদি, তোমার শরীর পুরোপুরি সেরে গেছে। তুমি আবার মিথ্যা বলা শুরু করেছ।

হাজেরা বিবি বললেন, দিঘি দেইখা দিঘির পানিতে গোসল করতে মন চাইছে। ব্যবস্থা কর। আমার জোয়ান বয়সে একবার কী হইছে শুন। তোর দাদা বলল, ও বৌ নেংটা হইয়া দিঘির পানিতে সিনান করে। আমি ঘাটে বইসা দেখি তোমারে কেমুন দেখায়। আমি বললাম, আচ্ছা।

হাবীব চট করে সরে পড়লেন। আর সামনে থাকা যায় না।অনেক রাত।সফুরা চিঠি পড়তে বসছে। জেলখানা থেকে তার কাছে মাসে দু’টা চিঠি আসে। চিঠি সে পড়তে বসে মাঝরাতে। তার চিঠি পড়ার নিয়ম আছে। সে শুধু যে একটা চিঠি পড়বে তা না। আগের চিঠিগুলোও পড়বে। চিঠি পড়ার পর সবগুলি চিঠি বিছানায় ছড়িয়ে দিয়ে সে ঘুমাবে।

ফরিদ লিখেছে বৌ, জেলখানায় আমি খুব আনন্দে আছি। আমার এই কথা যে শুনবে সে অবাক হবে। কিন্তু কথা সত্য। আমার আনন্দে থাকার প্রধান কারণ আমি কোনো অপরাধ করি নাই। আমার আনন্দে থাকতে অসুবিধা কী?

জেলখানায় অনেক কিছু শেখানোর ব্যবস্থা আছে। বেতের কাজ, কাঠের কাজ, কামারের কাজ। আমি কাঠের কাজে ভর্তি হয়েছি। আমার এখনো সাজা হয় নাই বলে কাজে ভর্তি হওয়া সমস্যা। জেলার সাহেবের চেষ্টায় ভর্তি হতে পেরেছি। আমি প্রত্যেকদিন বই পড়ি এটা দেখে তিনি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আমার কাঠের কাজের ওস্তাদের নাম নুরু। খুনের কারণে ভার যাবজ্জীবন হয়েছে। যার যাবজ্জীবন হয় সে ব্যক্তিজীবন যে জেলে থাকে তা না।

সতেরো বছর জেল খাটার পর ছাড়া পায়। সেই হিসাবে আমার ওস্তাদ এক-দেড় বছরের মধ্যে ছাড়া পাবেন। ওস্তাদ আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। তিনি আমাকে ফরিদ ডাকেন না। ডাকেন ফড়িং। তিনি কাঠের কাজের বিরাট কারিগর। তার আত্মীয়স্বজন এখন আর কেউ নেই। তার স্ত্রীও গত হয়েছেন। জেল থেকে বের হয়ে কই যাবেন কী করবেন কিছুই জানেন না। আমি তাকে বলেছি, ওস্তাদ আপনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তার মতো ভালো মানুষ আমি দেখি নাই। সে আপনার সব ব্যবস্থা করবে। বউ, আমি ঠিক বলেছি না?

এইটুকু পড়েই সফুরা হাত থেকে চিঠি রাখল। তার পক্ষে আর পড়া সম্ভব। তার চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে আছে। পানি মোছা মাত্র আবার পানি জমা হচ্ছে। একজন মানুষ এত ভালো কীভাবে হয় সে বুঝতে পারছে না।সফুরা চিঠিটা একপাশে সরিয়ে রাখল। বাকি অংশ পরে পড়বে। জমা থাকুক। একসঙ্গে পড়লে তো সবই শেষ। সফুরা হাত বাড়িয়ে আরেকটা চিঠি নিল। অনেকবার পড়া চিঠি। তাতে কী?

বৌ, গত রাতে সুন্দর একটা বই পড়েছি। বইটার একটা কথা আমার পছন্দ হয়েছে। কথাটা তোমারে বলি। বাঘের চক্ষুলজ্জা আছে, মানুষের নাই। ঘটনা পরিষ্কার করি। তোমার সাথে যদি কোনো বাঘের সাক্ষাৎ হয়, তুমি যদি বাঘের চোখের দিকে তাকাও, আর বাঘ যদি তোমার চোখের দিকে তাকায়, তাহলে বাঘ তোমার উপর ঝাপ দিয়ে পড়বে না। চক্ষুলজ্জা পশুর আছে। মানুষের নাই।…রাত অনেক।

কিছুক্ষণ আগে দরুদে শেফা পাঠ শেষ হয়েছে। তালেবুল এলেমের দল চলে গেছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটাকা করে দেওয়া হয়েছে।সারা দিনের ক্লান্তি কাটানোর জন্যে প্রণব পুকুরঘাটে বসেছেন। তার সামনে ভাদু। ভাদুর হাতে তালপাখা। সে প্রণবকে বাতাস দিচ্ছে।

প্রণব বললেন, বাতাস লাগবে না। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।ভাদু হাওয়া করতেই থাকল।প্রণব বললেন, বিরাট ঝামেলা গেছে। এখন শান্তি। ভাদু বলল, স্যার আমি বিরাট কষ্টে আছি। কষ্টের কথা কাউরে বলতে পারতেছি না।প্রণব বললেন, আমাকে বল।আপনারে বলতে শরম লাগে।শরম লাগলেও বল। তুই বোকা মানুষ, তোর আবার শরম কী?

ভাদু বলল, বড় স্যারের আম্মারে কী ডাকব বুঝতেছি না বইল্যা মনে কষ্ট।প্রণব বললেন, অনেক বড় বড় বোকা আমি দেখেছি। তোর মতো বোকা দেখি নাই। বিরাট জ্ঞানী দেখার মধ্যে যেমন আনন্দ, বিরাট বোকা দেখার মধ্যেও আনন্দ।ভাদু মাথা নিচু করে আছে। মনে মনে ভাবছে, তুই এক মহাবোকা। তোরে দেখে আমি সবসময় আনন্দ পাই। আমি কী সেই পরিচয় যখন পাবি তখন নিজেই নিজের হাত চাবায়া খায়া ফেলবি।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *