মিসির আলি আপনি কোথায় পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি আপনি কোথায়

রাত নটা।মিসির আলি গরম চাদর গায়ে দিয়ে বারান্দায় বসেছেন। মাটির হাড়িতে তুষের আগুন করে তাঁর পায়ের কাছে রাখা হয়েছে যাতে তিনি পা গরম করতে পারেন। ফ্লাস্কে চা দেয়া হয়েছে। মিসির আলি পান খান না। তারপরেও পানের বাঁটায় পান দেয়া হয়েছে।আয়না বসেছে তাঁর সামনে। সে গায়ে চাদর দেয় নি। সম্ভবত তার তেমন শীত লাগে না। আয়না বলল, স্যার একটা পান বানিয়ে দেই পান খান।মিসির আলি বললেন, দাও।আয়না পান বানাতে বানাতে বলল, আমাকে প্রশ্ন করলেই আমি উত্তর দেব। এইটুক সাহায্য আপনাকে করব। কিন্তু নিজ থেকে কিছু বলব না।ঢুকে যাও এটা কি সত্যি?

জ্বি।মিসির আলি বললেন, এটা সত্যি হবার কোনো কারণ নেই। আয়না জিনিসটা কি? এক খণ্ড গ্রাস যেখানে পারা লাগানো হয়েছে। যাতে আলো প্রতিফলিত হয়। তুমি সেখানে ঢুকতে পার না।আয়না বলল, মার্থা মেয়েটা কি ভাবে চুকত?

মিসির আলি বললেন, মার্থার ব্যাপারটা আমার ছাত্র পুরোপুরি জানে না। কাজেই তুমিও জান না। এর মধ্যে অনেক মিথ্যা আছে। আমেরিকা ডিউক ইউনিভার্সিটির প্যারাসাইকোলজির প্রফেসর এরান সিমসন তাকে নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। বইটার নাম Martha deceit. এই নামের সহজ বাংলা হচ্ছে মার্থা বিষয়ক ধাপ্লাবাজি। বইটা আমার কাছে আছে। তুমি পড়ে দেখতে পার।

আয়না বলল, মার্থা মিথ্যা করে বলেছে সে আয়নার ভেতর থাকে।মিসির আলি বললেন, সে নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়ে। বাচ্চারা কল্পনার জগতে বাস করে। সে কল্পনা করেছে।স্যার আমি তো বাচ্চা মেয়ে না।মিসির আলি বললেন, বড়রাও কল্পনা করে। সিজিওফ্রেনিক রোগীরা শুধু যে কল্পনা করে তা-না। তারা সেই জগতে বাসও করে।

এখন আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, মাঝে মাঝেই তুমি ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দুই তিন দিন কাটিয়ে দাও। তখন কি করা?আয়না বলল, আমি কিছু করি না। আয়নার ভেতর ঢুকে পড়ি। ঐ জগতে থাকি।ধরে নিলাম তুমি আয়নার জগতে থাক। বের হয়ে আসা কেন?

স্যার আমি নিজের ইচ্ছায় আয়নায় ঢুকতেও পারি না। বের হতেও পারি না। ঘটনোটা আপনা। আপনি ঘটে। আমি যদি নিজের ইচ্ছায় ঢুকতে পারতাম তাহলে কারো সামনে ড়ুকতাম না। কাউকে ভয় দেখাতাম না।মিসির আলি সিগারেট ধরালেন। আয়না বলল, স্যার প্রশ্ন করুন।তুমি যে তরিকুল ইসলাম সাহেবের পালক মেয়ে এটা নিশ্চয় তুমি জান?

জ্বি জানি।তোমার আসল বাবা-মাদের বিষয়ে জান না? জানি না।তারা এই পৃথিবীর মানুষ না-কি আয়না জগতের মানুষ।আয়না জগতের মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।মিসির আলি বললেন, আয়না জগতটা কেমন? আয়না বলল, কেমন বলতে পারব না, যখন আপনাদের সঙ্গে থাকি তখন আয়না জগতের কথা তেমন মনে থাকে না। সেই জগৎটা ছায়া ছায়া, শান্তির জগৎ। মনে হয়। সেখানে ক্ষুধা তৃষ্ণা নেই। সেখানে সবাই একা থাকে।একা থাকে?

জ্বি একা থাকে। এটা মনে আছে। স্যার একটা কাজ করুন না। আপনি আমাকে হিপনোটিক সাজেশন দিয়ে আয়না জগতে নিয়ে যেতে পারেন কি-না দেখুন। আপনি মনে মনে এই কথা ভাবছেন বলেই বললাম।মানুষের মনের কথা কি তুমি ধরতে পারতে?

প্রথম যখন আয়না জগতে যাই এবং সেখান থেকে বের হয়ে আসি তখন থেকে পারি। আয়না জগতের সবাইতো একা একা থাকে। এই ভাবেই একজনের সঙ্গে অন্যজন যোগাযোগ করে। মানুষ এক সঙ্গে থাকে বলেই এমন ক্ষমতার তাদের প্রয়োজন হয় নি। তাছাড়া এই জগতে মোবাইল ফোনও আছে।মিসির আলি মাটির হাড়ির উপর পা রাখলেন। রাত বাড়ার সঙ্গে শীত বাড়ছে। পা ঠাণ্ড হয়ে আসছে। আয়না বলল, বোতলে গরম পানি ভরা আছে। একটা বোতল এনে দেব কোলে রাখবেন? দরকার নাই।স্যার আরো কোনো প্রশ্ন করবেন?

মিসির আলি বললেন, কোন লাইনে প্রশ্ন করব ধরতে পারছি না। তোমাকে প্রশ্ন করার দুটি লাইন আছে। প্রথম লাইনে তুমি Delusion এর স্বীকার। অসুস্থ একটা মেয়ে। যে নিজের জন্যে ভ্রান্তির এক জগৎ তৈরি করেছে। সে তাঁর ভ্রান্তির জগতে বাস করে। পৃথিবীর Realityর সঙ্গে যে যুক্ত না। কিছু ড্রাগস আছে। এ ধরনের জগৎ তৈরি করে। যেমন—L S D.

আর দ্বিতীয় লাইন হচ্ছে স্বীকার করে নেয়া তুমি সত্যি সত্যি আয়না জগতের বাসিন্দা। সেখানেই থাক। মাঝে মাঝে সেখান থেকে বের হয়ে অ্যাস। আমার সমস্যা হচ্ছে। আমি কোনটাই গ্রহণ করতে পারছি না। অন্ধকারে ঢ়িল ছোড়া আমার স্টাইল না। আমি লজিক ব্যবহার করি। লজিক পাশা খেলা না। লজিক অন্ধকারে ঢ়িল ছুড়ে না। আমি আজ রাতটা চিন্তা করব। কাল আরো কিছু প্রশ্ন করব। আমার ছাত্রও তখন সঙ্গে থাকবে।হিপনোটাইজ করবেন না?

করব। তোমাকে এবং আমার ছাত্রকে এক সঙ্গে করার চেষ্টা করব।স্যার আজকের অধিবেশনের কি এখানেই সমাপ্তি? হুঁ।আমি কি চলে যাব? চলে যাও।আপনি এখানেই থাকবেন? হ্যাঁ। শীতের মধ্যে বসে থাকতে ভাল লাগছে। তোমাদের বারান্দাটা সুন্দর। ঢাকায় যখন চলে যাব তখন বারান্দাটা মিস করব।আয়না বলল, স্যার আরেকটা সিগারেট ধরান। সিগারেট শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকি। আপনার গল্প শুনি।কি গল্প শুনবে? যে কোনো গল্প।রূপকথা?

বলুন। আপনার রূপকথা সাধারণ রূপকথা হবে না। এর মধ্যেও অন্য কিছু থাকবে।মিসির আলি বললেন, Delusion এর জগৎ নিয়ে কথা বলি। মানব জাতির একটা অংশ সব সময়ই ডিলিউসনের জগতে বাস করে। এদের মধ্যে বিখ্যাত সায়েন্টিস্ট আছেন, সংগীতজ্ঞ আছেন। লেখক, চিত্রকর আছেন। কাজেই তুমি ভেব না যে তুমি একা এবং অদ্বিতীয়।স্যার আমি ভাবছি না।

আবার একদল আছে যারা অন্যের ভেতর কঠিনভাবে ভ্রান্তি ঢুকিয়ে দেয়। এর সবচে বড়। উদাহরণ হলো পারস্যের হাসান সাকবা। এই হাসান সাব্বা পাহাড় ঘেরা এক সমতল ভূমিতে গোপন বেহেশত তৈরি করেছিল। সেই বেহেশতে অপূর্ব বাগান ছিল। দুধ, মধু এবং শরাবের নাহর ছিল। ষোল সতেরো বছরের অতি রূপবতী নগ্ন যুবতীরা ছিল। হাসান সাব্বা তার কিছু নির্বাচিত শিষ্যদের এই বেহেশতে প্রবেশের অনুমতি দিতেন।

তবে বেহেশতে ঢোকার আগে তাদের হেলুসিনোজেটিং ড্রাগ হাশিশ। অর্থাৎ ভাংএর শরবত খাওয়ানো হতো। শিষ্যরা পুরোপুরি এক ভ্রান্তির জগতে চলে যেতো। হাসান সাকবা পরে এদের দিয়েই গোপন হত্যাকাণ্ড ঘটাতেন। হাশিশা থেকে আরবী হালাশিন। সেখান থেকে ইংরেজি শব্দ এসেছে Assassin . অর্থাৎ গুপ্ত ঘাতক।এই দলটিকে ধ্বংস করার অনেক চেষ্টা করা হয়। কেউ পারে নি। অনেক পরে মোঙ্গল নেতা হালাকু খান তাদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছিলেন।গল্প শেষ করে মিসির আলি হাসলেন। আয়না বিস্মিত হয়ে বলল, স্যার হাসছেন কেন?

মিসির আলি বললেন, তোমাকে ভ্ৰান্তির জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্যে একজন হালাকু খাঁ দরকার। আমি হালাকু খাঁ না। আমি বৃদ্ধ মিসির আলি।তরিকুল ইসলামের ঘুম ভাঙ্গে ফজরের ওয়াক্তে। তিনি হিমশীতল ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে নামাজ আদায় করেন। এরপর তার আর অনেকক্ষণ কিছুই করার থাকে না। বাড়ির সবাই ঘুমে। তাদের ঘুম এত সহজে ভাঙে না। তরিকুল ইসলাম ঝাড়ু হাতে নেন।

উঠান ঝাড় দেয়া শুরু করেন। এতে দুটা কাজ হয়- উঠান হয় ঝকঝকে পরিষ্কার এবং তাঁর শীত কমে। কিছু এক্সসারসাইজও হয়। এই বয়সেও এক্সসারসাইজ করে শরীর ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।একটা বিষয় চিন্তা করে তরিকুল ইসলাম বেশ মজা পান। বিষয়টা হচ্ছে বাড়ির কেউই উঠান বাট দেয়ার ব্যাপারটা জানে না। তারা ধরেই নিয়েছে ঘুম থেকে উঠে দেখবে চারদিক ঝকঝকি করছে। কারো মনে কোনো প্রশ্ন নেই।

তরিকুল ইসলাম উঠান ঝাঁট দিচ্ছেন। অর্ধেকের মতো ঝাঁট দেয়া হয়েছে। হঠাৎ পেছন থেকে এসে কে যেন তার হাত ঝাণ্টে ধরল এবং ঝাড়ু দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। তিনি চমকে পেছনে ফিরে আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন। জামাই ফারুক এসেছে। তরিকুল ইসলাম বললেন, বাবা! কেমন আছ? ফারুক কদমবুসি করতে করতে বলল, আপনি ঝাঁট দিচ্ছেন কেন? বাড়িতে মানুষ নাই?

তরিকুল ইসলাম বললেন, ঝাড়ু দেয়া মানে একই সঙ্গে হাতের, পায়ের এবং কোমড়ের এক্সসারসাইজ। এই জন্যে ঝাড়ু দেই।ফারুক বলল, এক্সসারসাইজের জন্যে ঝাড়ু দিতে হবে না। আপনি ফ্রি হ্যান্ড এক্সসারসাইজ করবেন। বাবা এখন বলুন আমার স্যারের অবস্থা কি? উনি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন শুনে কি যে ভয় পেয়েছিলাম।

তোমার স্যার ভালো আছেন। ডাক্তার দেখে গেছে বলেছে কোনো ভয় নাই। উনার সুস্বাস্থ্য কামনা করে মসজিদে একটা মিলাদও দিয়েছি। কবিরাজ রোহিনী বাবু এসেছিলেন তিনি চীবন প্রাস বানিয়ে দিয়েছেন। সকাল বিকাল এক চামচ করে খেলে ঘোড়ার মতো তেজি শরীর হবে।স্যার কি ঘুমাচ্ছেন? সবাই ঘুমাচ্ছে। কখন যে উঠবে আল্লাহ পাক জানে। দাঁড়াও ডেকে তুলি।কে চা বানাবে? আমি বানাব। আপনার জন্যে ইলিশ মিষ্টি নিয়ে এসেছি।ইলিশ মিষ্টিটা কি?

সন্দেশ। ইলিশের পেটির মতো করে বানানো।তরিকুল ইসলাম আগ্রহের সঙ্গে বললেন, বের কর একটা খেয়ে দেখি। ভালো মিষ্টি দেশ থেকে উঠেই যাচ্ছে। নাটোরের কাচাগোল্লা এখন স্মৃতি ছাড়া কিছুই না। মেট্রিক পরীক্ষার আগের দিন নাটোরের কাঁচাগোল্লা খেয়েছিলাম। সেই স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। হাতে লেগে আছে মিষ্টির গন্ধ। তোমরা এই জমানার ছেলে।পুলে আসল মিষ্টির স্বাদ কিছুই জানলে না। আফসোস, বিরাট আফসোস।

উঠানে বেতের মোড়ায় স্বশুর জামাই চা খাচ্ছেন। তিরিকুল ইসলাম আনন্দে অভিভূত। জামাইকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। তাঁরকুল ইসলাম বললেন, দুপুরে মাছ কি খেতে চাও বল।ফারুক বলল, বিলের ফ্রেস ছোট মাছ খাব।পাঁচমিশালী গুড়ামাছ জোগার করব। কোনো সমস্যা নাই।কালি বোয়াল কি পাওয়া যায় বাবা?

এইতো বিপদে ফেললে এইসব জিনিস কি আর দেশে আছে? দেখি চেষ্টা করে।খলিসা মাছ? আরেক ঝামেলায় ফেলেছ। খলিসাতো প্ৰায় extinct মাছ। এখুনি বের হচ্ছি। সকাল সকাল না গেলে পাওয়া যাবে না।ফারুক বলল, বাবা আপনার জন্যে একটা চাদর এনেছিলাম। বের করে দেই? চাদরটা গায়ে দেন। দেব?

দাও।তরিকুল ইসলাম গায়ে চাদর জড়াতে জড়াতে বললেন, আরেক কাপ চা বানাওঁ। চা খেয়ে বের হই। আরেকটা কথা বাবা তোমাকে বলি মন দিয়ে শোন। আমি শিক্ষক মানুষ তো সব মানুষকে আমার কাছে মনে হয়। পরীক্ষার খাতা। সবাইকে নম্বর দেই! তুমি আমার কাছে নম্বর পেয়েছ একশতে একানব্বই। সন্টার মার্কের চেয়েও বেশি। আর আমার জার্মান প্রবাসী গাধা পুত্র পেয়েছে চব্বিশ। গ্রেস মার্ক দিয়েও তাকে পাস করানোর বুদ্ধি নেই।ফারুক বলল, আয়না। আয়না কত পেয়েছে?

তরিকুল ইসলাম চিন্তিত গলায় বললেন, ওর খাতাটা আমি বুঝি না। নাম্বারাও এই জন্যে দিতে পারি না।আয়না দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি উঠোনের দিকে। শ্বশুর জামাই চা খেতে খেতে গল্প করছে দেখতে ভালো লাগছিল। এখন ফারুক একা। মাথা নিচু করে উঠোনে হাঁটছে। একবারও দোতলার দিকে তাকাচ্ছে না। তাকালেই আয়নার হাসি মুখ দেখতো।

আয়না দোতলা থেকে নামল। তার কেন জানি হঠাৎ ইচ্ছা করছে ফারুককে চমকে দিতে। নিঃশব্দে তার পেছনে দাঁড়িয়ে হাউ’ করে চিৎকার দিলে কেমন হয়? আয়না খানিকটা অবাক হচ্ছে। এ রকম ইচ্ছাতো তার আগে কখনো হয় নি।হাউ চিৎকার শুনে ফারুক চমকে তাকালো। আয়না গম্ভীর গলায় বলল, কেমন আছ? ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?

আমিও ভালো আছি। তোমার শিক্ষকও ভালো আছেন। তবে তাঁর মাথা খানিকটা এলোমেলো।ফারুক বলল, আমার স্যার এমন একজন মানুষ যার মাথা কখনো এলেমেলো হয় না।তাই বুঝি?

ফারুক বলল, হ্যাঁ তাই— যদিও আমার গুরু শুড়ি বাড়ি যায় তবুও আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।আয়না বলল, শুড়ি বাড়ি যায় মানে? ফারুক বলল, কথার কথা বললাম, আমার গুরু কোথাও যান না।আয়না বলল, দোতলা থেকে দেখলাম তুমি বাবার জন্যে চা বানিয়ে এনেছি। আমার জন্যে চা বানিয়ে আন।এখুনি আনছি। ইলিশ সন্দেশ এনেছি। খাবে?

তুমি বললে খাব। সকালে আমি মিষ্টি খাই না। খেতে বলো না।আচ্ছা বলব না।আমি চা খাব আর তুমি আমার সামনে বসে বলবে কেন তুমি মিসির আলি নামের মানুষটাকে এত পছন্দ কর?ফারুক বলল, আচ্ছা যাও বলব।আয়না বলল, আমিও পছন্দ করি তবে আমার পছন্দের কারণ আর তোমার পছন্দের কারণ এক না।তোমার পছন্দের কারণ কি?

আয়না। হাসতে হাসতে বলল, বলব না।ফারুক চা বানিয়ে এনেছে। আয়না আগ্রহ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। ফারুক বলল, মিসির আলি স্যারকে এত পছন্দ করি কেন বলছি। মন দিয়ে শোন।মন দিয়ে শুনছি।তাঁর চিন্তা করার ধারা বা বুদ্ধিবৃত্তির বিন্যাস বাদ থাকুক মানুষ মিসির আলির একটা গল্প শোনা। মন দিয়ে শোন।বা বার মন দিয়ে শোনা বলছ কেন? আমি যা শুনি মন দিয়ে শুনি।

একদিন ক্লাসে তিনি বললেন, আমি মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তার চিন্তা করার ক্ষমতার ভেতর একটা সম্পর্ক বের করার চেষ্টা করছি। তোমরা হচ্ছে আমার প্রথম সাবজেক্ট। তোমরা সবাই তোমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করবে এবং বোর্ডে লেখা পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর দেবে।

১. রাতে বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে যাও না বাতি জুলিয়ে ঘুমুতে যাও?

২. উচ্চতা ভীতি কি আছে?

৩. দিঘির পানির কাছে গেলে কি পানিতে নামতে ইচ্ছা করে?

আগুন ভয় পাও?

৫. অপরিচিত কোনো ফুল হাতে পেলে গন্ধ শুঁকে দেখ?

আমরা সবাই আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা লিখলাম এবং আগ্ৰহ নিয়ে প্রশ্নগুলির জবাব দিলাম। কাজটা স্যার কেন করলেন জন? আমাদের মধ্যে হতদরিদ্র যারা তাদের খুঁজে বের করার জন্যে।আয়না বলল, মজার তো।ফারুক বলল, স্যার তিনজন হতদরিদ্র খুঁজে বের করলেন যাদের ইউনিভার্সিটির খরচ তিনি দিতেন। আমি ছিলাম তিন জনের একজন।বাহ্‌।আরেকটা গল্প বলব?স্যারের একবার প্লুরিসি হলো। খুবই খারাপ অবস্থা। তিনি এমন একটা ক্লিনিক বের করলেন যার খোজ কেউ জানে না। তিনি সেখানে ভর্তি হলেন। কেন জান?কেন?

যাতে ছাত্ররা তাঁকে খুজে না পায়। তাকে সেবার জন্যে ব্যস্ত না হয়। তিনি কারোর সেবা নেন না। মিসির আলি স্যার এমনই একজন পূণ্যবান ব্যাক্তি যার কাছাকাছি বসে থাকলেও পূণ্য হয়।আয়না বলল, তোমার চোখে পানি এসে গেছে। পানি মোছ।ফারুক চোখ মুছল।মিসির আলির সঙ্গে ফারুকের দেখা হল সকালে নাশতার টেবিলে। ফারুক বলল, স্যার আমাকে চিনেছেন?

মিসির আলি বললেন, তোমার নাম দেখে তোমাকে চিনতে পারি নি। এখন চিনেছি। খুব ভালো মত চিনেছি। তুমি অনার্স এবং এমএ দুটোতেই ফাস্টক্লাস ফাস্ট হয়েছিলে। ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হবার কথা ছিল। কি সব পলিটিক্সের কারণে হয়নি।ফারুক বলল, আমার বিষয় আর কিছু কি মনে আছে স্যার?

মনে আছে। আমার একবার প্লুরিসি হয়েছিল। মারতে বসেছিলাম। ভর্তি হয়েছিলাম। এমন এক ক্লিনিকে যার খোজ কেউ জানে না। তুমি কি ভাবে কি ভাবে সেখানে উপস্থিত হলে। কেমন আছ ফারুক?

স্যার ভালো আছি। আপনি সুস্থ আছেন এবং ভালো আছেন দেখে ভালো লাগছে।মিসির আলি বললেন, তুমি যে ডেকেছি সেই সমাধান আমি করতে পারিনি। পারব সে রকম মনে হচ্ছে না।ফারুক বলল, সব সমস্যার সমধান থাকে না। স্যার। যেসব সমস্যার সমাধানই নেই আপনি তার কি সমাধান করবেন? এইসব নিয়ে আমরা রাতে কথা বলব।মনে হয় বঙ্গোপসাগরে ডিপ্রেসন হয়েছে। দুপুর থেকে আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর থেকে টিপটপ বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস। তাঁরকুল ইসলাম আনন্দিত— ঝড় বৃষ্টি উপলক্ষে বিশেষ কিছু রান্না হবে।

খিচুড়ি, ঝাল গরুর মাংস। ময়মনসিংহে BT ট্রেনিংয়ের সময় তিনি গরুর মাংস রান্নার একটা পদ্ধতি শিখেছিলেন। সেটা করবেন কি-না বুঝতে পারছেন না। মাটির হাঁড়িতে মাংস, লবণ সামান্য তেল এবং এক গাদা কাচামরিচ দিয়ে অল্প আঁচে জ্বাল দেয়া। অন্য সব মসলা নিষিদ্ধ। মাংসের বিশেষ যে গন্ধ আছে, কাচামরিচ সেই গন্ধ নষ্ট করবে। আলাদা ফ্লেভার নিয়ে আসবে।। তিনি নিজেই গরুর মাংস আনতে গেলেন। গ্রামে কসাই-এর কোনো স্থায়ী দোকান নেই। শুধু হাটবারে মাংস বিক্রি হয়। সৌভাগ্যক্রমে আজ হাটবার।

বাড়িতে মেহমান শুধু না, জামাইও উপস্থিত। বিশেষ বিশেষ রান্নার অতি উপযুক্ত উপলক্ষ।মিসির আলি নিজের ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে আছেন। তিনি খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন। তার পায়ের উপর কম্বল। তার সামনে বসেছে আয়না এবং ফারুক। এরা দু’জন বসেছে খাটের শেষ প্রান্তে। সোলার লাইট কাজ করছে না। মেঘলা দিন ছিল বলেই প্যানেল চার্জ হয়নি। ঘরে হরিকেন জ্বলছে। টেবিলে দেয়াশলাই এবং মোমবাতি রাখা আছে।

ফারুক বলল, স্নাতটা ভূতের গল্পের জন্যে অসাধারণ। স্যার আমি অতিথিপুর রেলস্টেশনে একবার একটা ভূত দেখেছিলাম। এই গল্পটা বলব? ভূত সাধারণত মানুষের সাইজের কিংবা মানুষের চেয়ে লম্বা হয়। এই ভূতটা বামণ। ছয় সাত বছরের ছেলের হাইট।মিসির আলি বললেন, ভূতের গল্প থাকুক। তুমি বরং আয়নার গল্প শোনাও। তুমি একজন সাইকোলজিস্ট। তোমার চোখে আয়না মেয়েটি কি? তুমি তার অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের নিশ্চয়ই কোনো ব্যাখ্যাও দাঁড়া করিয়েছ। সেই ব্যাখ্যাও শুনি। আয়নার কি আপত্তি আছে?

আয়না মুখে কিছু বলল না। তবে মাথা নাড়িয়ে জানালো তার আপত্তি নেই।মিসির আলি তার ছাত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার সামনে সিগারেট খেতে কোনো বাধা নেই। সিগারেট ধরাও। আমি দেখলাম সিগারেটের খোঁজে পকেটে হাত দিয়ে চট করে হাত বের করে নিয়েছ তাই বললাম।ফারুক বলল, আমার সিগারেট লাগবে না। আপনার কথায় হঠাৎ টেনশান তৈরি হয়েছিল বলে সিগারেটের প্যাকেটে হাত দিয়েছিলাম। স্যার আয়না বিষয়ে আমার যা বলার তা ডায়েরিতে লিখেছি। এর বাইরে তেমন কিছু নেই।

মিসির আলি বললেন, আয়না এবং তুমি তোমরা দু’জনই ডিলিউসনে ভূগছ এমন কি কখনো মনে হয়েছে? জ্বি স্যার হয়েছে। শুরুতে আমি নিজেকেই। Delusion এর Patient ভেবেছি! এক সময় নিশ্চিত হয়েছি সমস্যা আমার না।কি ভাবে নিশ্চিত হয়েছ?

ফারুক বলল, আঙুর মেয়েটা যখন দেখল তার আপ ঢুকে পড়ছে আয়নার ভেতরে তখন আঙুর নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে। সে এমন একটা ঘটনা বানিয়ে বলবে না।মিসির আলি বললেন, তোমার স্ত্রীর মানসিক ক্ষমতা প্রবল। সে তার ক্ষমতা দিয়ে আঙুর মেয়েটিকে প্রভাবিত করতে পারে। এমন এক illusion তৈরি করতে পারে যাতে আঙুরের ধারণা হবে তাঁর আপা আয়নার ভেতর ঢুকে গেছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *