মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য পর্ব – ৫
বৃষ্টিতে ভেজার জন্যেই হয়তো তাঁর জ্বর এসে গেল। বেশ জ্বর। তবে আরামদায়ক জ্বর। একধরনের জ্বরে শারীরিক কষ্ট প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। আরেক ধরনের জ্বরে শরীরে ভোঁতা ভাব চলে আসে। অনুভূতির তীক্ষ্ণতা থাকে না। গরম কম্বলের ভেতর ঢুকে আরাম করতে ভালো লাগে। ক্ষুধা নামক শারীরিক যন্ত্রণার হাত থেকেও সামীয়ক ত্ৰাণ পাওয়া যায়। কারণ এ-জাতীয় জ্বরে ক্ষুধাবোধ থাকে না।রাত এগারটা। বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে যাবার নির্ধারিত সময়। মিসির আলি নিয়ম ভঙ্গ করলেন।
বিছানায় যাবার পরিবর্তে খাতা হাতে বসার ঘরে ঢুকলেন। গত কয়েকদিন ধরেই ওসমান গনি সম্পর্কে কিছু-কিছু নোট করেছেন। নোটগুলি পড়া দরকার। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে, তাঁর উচিত বাতি নিভিয়ে ঘুমুতে যাওয়া। তিনি নিশ্চিত জানেন ঘুম আসবে না। গত দু রাত তা-ই হয়েছে। প্রায় সারা রাত জেগে কাটিয়েছেন। তার চেয়ে খাতা নিয়ে বসে থাকা ভালো। পড়তে-পড়তে একসময় হয়তো সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়বেন! নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা বোধহয় তাঁর ভাগ্যে নেই। মিসির আলি পড়তে শুরু করলেন ওসমান গণি
ওসমান গনিকে আমি দেখি নি। কোটিপতি মানুষ। একজন বেহালাবাদক। যারা জন্ম থেকেই কোটিপতি এবং যারা পরবর্তী সময়ে কোটিপতি হয় তাদের প্রকৃতি ভিন্ন হয়? নিতান্ত দরিদ্র অবস্থা থেকে যারা কোটিপতির পর্যায়ে আসে, তাদেরকে এক জীবনে দু রকম সমস্যার পড়তে হয়। অর্থকষ্টের সমস্যা এবং প্রচুর অর্থ দিয়ে কী করা যায়। সেই সমস্যা। ওসমান গনির ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে।
যাদের ক্ষেত্রে এটা ঘটে, তাদের মধ্যে সামান্য পরিমাণে হলেও ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। সাধারণ মানুষদের বেলায় তার চরিত্র ব্যাখ্যা করে বলে দেওয়া সম্ভব বিশেষ-বিশেষ পরিস্থিতিতে সে কী করবে। রেগে যাবে, আনন্দিত হবে, না দুঃখিত হবে। হলেও কী পরিমাণ হবে। কিন্তু ওসমান গনি জাতীয় মানুষ, যাঁরা দুটি ধাপ অতিক্রম করেছেন—তাদের ক্ষেত্রে আগেভাগে কিছু বলা সম্ভব না। চরিত্রে প্রেডকাটিবিলিটি বলে কিছু তাঁদের থাকে না।
ওসমান গনি সম্পর্কে ডাক্তার এবং পুলিশ বলছে-স্বাভাবিক মৃত্যু। তার কন্যা বলছে আত্মহত্যা তাঁর কন্যার বক্তব্যই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। এ-জাতীয় চরিত্রের মানুষদের কাছে জীবন একসময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তারা একসময় ভাবতে শুরু করে, এ-জীবনে যা পাবার ছিল, সব পাওয়া হয়ে গেছে। আর কিছুই পাওয়ার নেই। আত্মহননের পথই তখন সহজ-স্বাভাবিক পথ বলে মনে হয়।এ-পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটায় কোনো জটিলতা নেই। জটিলতা যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর নাম অম্বিকাবাবু! অম্বিকাবাবুর সঙ্গে আমার এখনো দেখা হয় নি। তিনি নতুন এক আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেই আস্তানা আমি খুঁজে বের করেছি। যদিও এখনো ঠিক করি নি, ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি দেখা করব কি করব না।
অম্বিকাবাবুর কন্যার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কন্যার বক্তব্য অনুযায়ী তার বাবা অসুস্থ। তাঁর সঙ্গে দেখা করা যাবে না। অসুস্থ মানুষের সঙ্গে দেখা করতে না-দেওয়া মধ্যবিত্ত মানসিকতা নয়। মধ্যবিত্ত মানসিকতায় অসুস্থ মানুষদের সঙ্গেই বরং বেশি করে দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা আছে। মৃত্যুপথযাত্রী, যার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে, তাকেও দল বেঁধে লোকজন দেখতে আসবে এবং জিজ্ঞেস করবে, এখন শরীরটা কেমন?
তবে মধ্যবিত্ত মানসিকতায় একধরনের অসুস্থ রুগী আছে, যাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা হচ্ছে মানসিক রুগী। শরীরের রোগ আমরা দেখাতে তালবাসি কিন্তু মনের রোগ নয়। এই রোগ সম্পর্কে কাউকে জানতে দেওয়া যাবে না।পশুর মতো অম্বিকাবাবুকে গর্জন করতে আমি শুনেছি, তবে তা অভিনয়ও হতে পারে।তার পরেও অম্বিকাবাবু যে একজন মানসিক রূগী তা ধরে নেওয়া যায়। মেয়ের কথানুযায়ী তিনি অনেকদিন থেকেই অসুখে ভুগছেনঃ একজন মানসিক রূগী আমাকে দিয়ে একটি চিরকুট লিখিয়ে নিল যে— সাবধানবাণী সেই চিরকুটে লেখা তা অক্ষরে-অক্ষরে মিলে গেল। কাকতালীয় ব্যাপার বলে একে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আমার ধারণা, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে আমাকে সমস্যাটির সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। ওসমান গনি নিজে এই কাজটি করতে পারেন, যাতে তাঁর মৃত্যু নিয়ে একধরনের রহস্য তৈরি হয়। কিন্তু তিনি তা করবেন বলে মনে হয় না। একজন অসম্ভব ধন্যবান ব্যক্তি, যিনি নিজের ভুবন নিয়ে ব্যস্ত, তিনি আমাকে চিনবেন তা আশা করা ঠিক না। তাছাড়া ভদ্রলোক নিভৃতচারী। তার চেয়েও বড়ো যুক্তি, আমার নোটটি পেয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু হোম মিনিস্টারকে টেলিফোন করেছিলেন।তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে?
এই কি দাঁড়াচ্ছে না, যে, ওসমান গনির সমস্যার সঙ্গে আমাকে জড়িয়েছেন অধিকাচরণ। তাঁর উদ্দেশ্য কি ওসমান গনিকে সাবধান করা? এই কাজটি তো তিনি আমাকে না-জড়িয়ে করতে পারতেন। আমাকে জড়ালেন কেন? লেখা এই পর্যন্তই। মিসির আলি হাই তুললেন। তাঁর ঘুম পাচ্ছে। এখন শুয়ে পড়লে হয়তো ঘুম এসে যাবে। তিনি হাত-মুখ ধুয়ে রাতের শেষ সিগারেটটি খেলেন এবং তাঁর খাতায় পেনসিল দিয়ে লিখলেন, ওসমান গনির মৃত্যু একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমার ধারণা এই হত্যাকাণ্ডের নায়িকা তাঁর কন্যা নাদিয়া গান। ওসমান গনির স্ত্রীর মৃত্যু এই মেয়েটির হাতেই হয়েছে।
মিসির আলি অবাক হয়ে নিজের লেখার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হুট করে এই কথাগুলি কেন লিখলেন নিজেই জানেন না। হয়তো তাঁর উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। তাঁর হাতে কোনো যুক্তি-প্রমাণ নেই। তবু তাঁর মন বলছে, এই হচ্ছে ঘটনা। অম্বিকাচরণ বলে এক ভদ্রলোক ঘটনা জানেন। তিনি সাহায্য প্রার্থনা করছেন মিসির আলি নামের একজনের কাছে।মিসির আলি ঘুমুতে গেলেন রাত একটার দিকে। অনেক দিন পর তাঁর সুনিদ্রা হল।হোম মিনিস্টারের দর্শনপ্রার্থীর সংখ্যা অনেক। সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। ডাক্তারের চেম্বারের রুগীরা যেমন চাপা অশান্তি নিয়ে অপেক্ষা করে-সবার অপেক্ষার ধরন সে-রকম। কারণ মিনিস্টার সাহেব সবার সঙ্গে দেখা করছেন না! মিনিষ্টারের পি. এ. যে-ই আসছে তার নাম-ধাম এবং সাক্ষাতের কারণ লিখে নিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলছে, আজ মিনিস্টার সাহেব একটা ক্যাবিনেট মীটিং-এ যাবেন! আজ দেখা হবে না। অন্য আরেক দিন আসুন। এর মধ্যেও আবার কাউকেকাউকে বসতে বলছে। সরাসরি বলে দিলেই হয়—আপনার সঙ্গে মিনিস্টার সাহেব দেখা করবেন, আপনার সঙ্গে করবেন না।মিসির আলি সাক্ষাতের কারণের জায়গায় প্রথমে লিখেছিলেন ব্যক্তিগত। পরমুহূর্তেই মনে হয়েছে সাক্ষাতের কারণ ব্যক্তিগত নয়। তিনি এসেছেন ওসমান গনি প্রসঙ্গে কথা বলার জন্যে। এটা কোনোক্রমেই ব্যক্তিগত নয়। কাজেই ব্যক্তিগত শব্দটি কেটে তার নিচে লিখলেন- ওসমান গনি প্রসঙ্গ। লেখার পর মনে হল, এই ওসমান গনি যে সেই ওসমান গনি তা কি মিনিস্টার সাহেব বুঝতে পারবেন?
ওসমান গনি নামের আগে লেখা উচিত ছিল, বেহালাবাদক এবং শিল্পপতি ওসমান গনি। তাহলে আবার নতুন করে লিখতে হয়। পি. এ. ভদ্রলোক যদিও মাইডিয়ার ধরনের মানুষ, তবু তাঁর ধৈর্যেরও তো সীমা আছে।মিসির আলি অন্যদের মতো অপেক্ষা করছেন। মিনিস্টার সাহেব ভেতরে ডেকে নেবার ব্যাপারে কী পদ্ধতি ব্যবহার করছেন তা-ও বোঝা যাচ্ছে না। আগে এলে আগে যাবে এই পদ্ধতি নয়। অন্য কোনো পদ্ধতি কাজ করছে। যে- পদ্ধতিই হোক, সেই পদ্ধতিতে মিসির আলির নাম বোধহয় সবার শেষে। সবারই ডাক পড়ছে, শুধু মিসির আলির ডাক পড়ছে না। একটা বেজে গেছে। মিনিস্টার সাহেব নিশ্চয়ই দুপুরের খাবার খেতে যাবেন।
ঠিক একটা বাজতেই পি এ এসে বলল, আপনারা যাঁরা বাকি আছেন তাঁরা আগামী বুধবার আসুন। স্যার এখন লাঞ্চ ব্রেক নেবেন। তিনটায় স্যারের ক্যাবিনেট মীটিং আছে। মিসির আলি অন্যদের সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। পি এ তাঁর কাছে এসে বলল, স্যার, আপনি বসুন। স্যার আপনাকে বসতে বলেছেন।কতক্ষণ বসব? তা তো স্যার বলতে পারছি না। চা খান, চা দিতে বলি।বলুন।মিসির আলি ভেবেছিলেন, এই দুপুরে নিশ্চয়ই শুধু চা দেবে না! ভর-দুপুরে খালিপেটে চা খাওয়া ঠিক না, তা মিনিস্টার সাহেবের পি এ নিশ্চয়ই জানেন।চা আসার আগেই মিসির আলির ডাক পড়ল। হোম মিনিস্টার ছদারুদ্দিন হাসিমুখে বললেন, আসুন ভাই, ভাত খেতে-খেতে কথা বলি।
এটা শুধু যে ভদ্রতার কথা তা নয়, মিসির আলি লক্ষ করলেন, টেবিলে দুটা থালা সাজানো। মিনিস্টার সাহেব নিজেই টিফিন ক্যারিয়ার খুলছেন।মিসির আলি সাহেব, বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আসতে পারেন। সাবান, তেল, গামছা সব আছে। ইচ্ছা করলে গোসল সেরে ফেলতে পারেন। হা হা হা।আপনি কি আমাকে সত্যি-সত্যি আপনার সঙ্গে খেতে বলছেন? অবশ্যই। এতটা ভদ্রতা কেন দেখাচ্ছেন জানতে পারি কি? মিনিস্টার হলেই অভদ্র হতে হবে এমন কোনো কথা কি আছে? না, তা নেই। সব সাক্ষাৎপ্রাথীকে আপনি নিশ্চয়ই দুপুরে আপনার সঙ্গে খেতে বলেন না?
না, সবাইকে বলি না। তবে একজনকে সবসময় বলি। আমার প্রবলেম হচ্ছে আমি এক খেতে পারি না। খাবার সময় কথা না বললে আমার পেটের ভাত হজম হয় না। এই জন্যে যারা দেখা করতে আসে তাদের মাঝ থেকে একজনকে ঠিক করে রাখি, যার সঙ্গে ভাত খাব।সেটা কীভাবে ঠিক করেন? অ্যালফাবেটিকেলি? দেখুন। মিসির আলি সাহেব, খেতে বলেছি। খাবেন। এত কথা কেন? মিসির আলি খেতে বসলেন। আয়োজন অতি সামান্য। পটল ভাজি, টেংরা মাছের ঝোল, ডাল। ভাতের চালগুলিও মোটা—মোটা। ইরি হবারই সম্ভবনা। মিসির আলি সাহেব।জ্বি, খেতে পারছেন তো?
পারছি।খাবারের মান ভালো না। কী করব বলুন-মিনিস্টার হিসেবে যা পাই তাতে এর চেয়ে ভালো খাওয়া সম্ভব না। অধিকাংশ লোকের ধারণা, আমরা রাজার হালে থাকি।আপনি হয়তো থাকেন না, অনেকেই থাকে।তাও ঠিক। সব পাখি মাছ খায়, দোষ হয় মাছরাঙার। আমরা হলাম মাছরাঙা পাখি। এখন বলুন, কি জন্যে এসেছেন আমার কাছে? ওসমান গনি প্রসঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।বলুন।আমার কথা।
আপনি কতটুক গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন, সেটা ভেবেই কথা বলতে সংকোচ বোধ করছি।সংকোচ বোধ করবেন না, বলুন। আপনার কথা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। আপনি কে আমি জানি। আপনার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কেও জানি। আমার জানামতে পুলিশের কিছু জটিল মামলায় আপনি সাহায্য করেছেন। আমার আগে যিনি হোম মিনিস্টার ছিলেন তিনি আপনার প্রসঙ্গে একটা নোটও রেখে গেছেন। ওলিয়ুর রহমান সাহেব-চেনেন তাঁকে? জ্বি, চিনি।কীভাবে চেনেন?
একটা খুনের মামলার ব্যাপারে উনি আমার সাহায্য চেয়েছিলেন। আমি সাহায্য করেছিলাম।এখন আপনার বক্তব্য বলুন– ওসমান গনির মৃত্যুরহস্য সমাধানে আমি আপনাদের সাহায্য করতে চাই।বাক্যটা আবার বলুন। ভালোমতো শুনি নি।মিসির আলি বাক্যটি দ্বিতীয় বার বললেন। হোম মিনিস্টার খাওয়া বন্ধ রেখে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। যখন কথা বললেন তখন তাঁর গলার স্বরে বিরক্তি চাপা রইল–
ওসমান গনির মৃত্যুতে কোনো রহস্য নেই। কাজেই আপনি কী ধরনের সমাধানের কথা বলছেন বুঝতে পারছি না। হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। ডাক্তারদের তাই ধারণা। ডাক্তারদের ডেথ সার্টিফিকেটে এ-কথা পরিষ্কার লেখা আছে।আমার ধারণা এটা হত্যাকাণ্ড।একটা হাস্যকর ধারণা করার তো কোনো অর্থ হয় না।আপনার মনে হচ্ছে ধারণাটা হাস্যকর? অবশ্যই মনে হচ্ছে। শুধু আমার না, অনেকেরই মনে হবে। যাদের কল্পনাশক্তি অত্যন্ত উর্বর তাদের কথা অবশ্যি ভিন্ন। আপনি যদি বলতেন এটা আত্মহত্যা, তাও গ্রহণযোগ্য মনে করতাম। কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন যে বাথরুম ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজা ভেঙে তাঁকে বের করা হয়।
আমার মনে আছে।তার পরেও আপনি বলছেন হত্যাকাণ্ড? জ্বি, বলছি।হোম মিনিস্টার হাসতে-হাসতে বললেন, হত্যাকারী কে তাও কি জেনে গেছেন? অনুমান করছি।অনুমানও করে ফেলেছেন। আপনি দেখছি খুবই ওস্তাদ লোক। স্যার, আপনি শুরুতে বলেছিলেন, আপনি আমার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এখন কিন্তু তা করছেন না। আমার মনে হয় আপনার উচিত আমার কথা এককথায় উড়িয়ে না-দেওয়া।
আমার অনুমানক্ষমতা ভালো। অতীতে অনেক বার তার প্রমাণ দিয়েছি, ভবিষ্যতেও দেব।আপনি যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সব আপনি চোখের সামনে দেখতে পান! মিসির আলি কিছুনা-বলে খাওয়া শেষে করে উঠলেন। বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে বললেন, আমি তাহলে যাই?বসুন, খানিকক্ষণ বসুন। পান আছে, পান খান।আমার পান খাওয়ার অভ্যাস নেই।
পান এমন কিছু জটিল খাদ্য না যে তা খাবার জন্যে অভ্যাস করতে হয়। মুখে দিয়ে চিবোলেই পান খাওয়া হয়। এটা স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো। দীর্ঘ সময় চিবানো হয় বলে প্রচুর জারক রস বের হয়ে হজমে সহায়তা করে। বসুন। নিজের হাতে পান বানিয়ে দেব। খেয়ে দেখুন।হোম মিনিষ্টারের হাতে-বানানো পান চিবুতে-চিবুতে মিসির আলির মনে হল এখানে আসা ঠিক হয় নি। দিনটাই নষ্ট হয়েছে।মিসির আলি সাহেব।জ্বি? আপনার অনুমানশক্তি তো প্রবল। এখন বলুন দেখি আমার সম্পর্কে আপনার কী অনুমান? সংক্ষেপে বলুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে উঠতে হবে। নিন, সিগারেট টানতে-টানতে বলুন। আপনার সিগারেটের অভ্যাস আছে তো? আছে।
মিনিস্টার সাহেব নিজেই লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, স্যার, আপনি ভান করতে পছন্দ করেন। শুধু পছন্দ না, ভান করাটা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন, আপনি অতি সাধারণ খাবারের ব্যবস্থা দুপুরে করেন। এবং একজনকে সঙ্গে নিয়ে খান, যাতে সে প্রচার করতে পারে মিনিস্টার সাহেব কী রকম ভালোমানুষ এবং কত সাধারণ খাবার খায়। অর্থের অভাবে আপনি ভালো খাবার খেতে পারছেন না।
অথচ বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেট ক্রমাগত টানছেন। আপনি খদ্দরের পাঞ্জাবি পরেছেন। কিন্তু যে-ঘড়িটি আপনার হাতে আছে তার নাম রোলেক্স। আমি যতদূর জানি, পৃথিবীর দামী ঘড়ির মধ্যে এটি একটি। প্রায় লাখখানেক টাকা দাম। যিনি খদ্দরের পাঞ্জাবি পরবেন, তিনি হাতে দেবেন দুশ তিন শ টাকা দামের ঘড়ি। এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ঘড়ি আপনি নিজের টাকায় কেনেন নি। উপহার হিসেবে পেয়েছেন। এই একটা ব্যাপার অবশ্যি আছে। উপহার হিসেবে পেয়েছেন এটা কী করে অনুমান করেছি, ব্যাখ্যা করব?
মিনিস্টার সাহেব আরেকটি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললেন, তার প্রয়োজন নেই। আপনার অনুমানশক্তি ভালো, স্বীকার করছি।তাহলে কি আমি ধরে নিতে পারি আপনি আমাকে ওসমান গনি হত্যারহস্য নিয়ে কাজ করবার অনুমতি দেবেন? আপনার অতিরিক্ত আগ্রহের কারণ কী? আমার আগ্রহের কারণ হচ্ছে-আমি এই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি। কিংবা বলা যায় আমাকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সেই অংশ আপনার অজানা নয়। ওসমান গনি সাহেবকে আমি একটি চিরকুট লিখি। তিনি ঐ চিরকুট পাওয়ার পর আপনাকে টেলিফোন করেন।
হোম মিনিষ্টির শুকনো গলায় বললেন, ঠিক আছে-আপনি রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা করুন। কেস সিআইডি-র হাতে দিয়ে দিচ্ছি। ওদের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনি কাজ করবেন। পুলিশ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারে, সেই হিসেবেই সাহায্য চাওয়া হবে।আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। হোম মিনিস্টার তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন বিরক্ত চোখে। মিসির আলি সেই বিরক্তি অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে বললেন, স্যার, যাই। আপনাকে ধন্যবাদ।
Read more
