মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

গাছ ভর্তি নীল ফুল ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল আকাশলেকের পানিতেও নীল আকাশের ছায়া... একটা ড্রীম ড্রীম ব্যাপার হতাে কিনা বল।……………………………………. হয়তাে হতাে। ….সােনালু বলে একটা গাছ আছে যার ফুল ছােট ছােট ফুলের রং গাঢ় সােনালিকৃষ্ণচূড়া গাছের বদলে সোনালু গাছ হলে কেমন হয়। 

জানি না কেমন হতাে চিন্তা করাে চিন্তা করে বললা একটা জিনিস মাথায় রেখে চিন্তা করবেসােনালি রং বলে কিন্তু কিছু নেইপৃথিবী সাতটা রং নিয়ে খেলা করেরামধনুর সতি রংকারণ আমাদের চোখ এই সাতটা রঙই দেখতে পায়

পৃথিবীতে কিন্তু আরাে অনেক রং আছেআমরা সেইসব রং দেখতে পাই না কারণ আমাদের চোখ সেইসব রং দেখার জন্যে তৈরি নাসাতটা রং দেখার জন্যে আমাদের চোখ তৈরি হয়েছে বলেই আমরা সাতটা রং দেখছি। ………..নিন ফুচকা খানখেতে খেতে ইন্টারেস্টিং কী কথা বলবেন বলুননাকি রং বিষয়ক এইগুলিই সেই ইন্টারেস্টিং কথা

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

রঙের কথাগুলি তােমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না ? ……..না তেমন ইন্টারেস্টিং লাগছে নাবুকিস কথা বলে মনে হচ্ছেমনে হচ্ছে আপনি বই পড়ে থিওরি মুখস্থ করে এসে থিওরি কপচাচ্ছেন। ………………..সরি। 

সরি হবার কিছু নেইআপনি কন্ডিশন্ড হয়ে গেছেনথিওরি কপচাতে কপচাতে থিওরি কপচাননা আপনার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছেআপনি নিজে সেটা বুঝতে পারছেন নাআপনি কি ইন্টারেস্টিং কথাটা এখন বলবেন

হ্যা বলবআমি লক্ষ করেছিমােটর সাইকেলে করে একটা ছেলে প্রায়ই ইউনিভার্সিটিতে আসেতােমাকে লক্ষ করেতারপর চলে যায়মাঝে মাঝে তােমার গাড়ির পেছনে পেছনে যায়একদিন সে আমাকেও ফলাে করেছেছেলেটা কে ? …….জানি না তাে কে! …..একটা ছেলে দিনের পর দিন তােমাকে ফলাে করছে তারপরেও ব্যাপারটা তােমার চোখে পড়ল না

চোখে পড়ে নিছেলেটার সঙ্গে আলাপ করতে চাও? …….অবশ্যই চাই। ………..সে মােটর সাইকেল নিয়ে এখানেও আমাদের পেছনে পেছনে এসেছেএই মুহূর্তে সে আছে তােমার প্রায় বিশ গজ পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালেতার গায়ে বিসকিট কালারের শার্টছেলেটা সানগ্লাস পরে আছেতার চুল কোঁকড়ানাে। ………………………….আশ্চর্য কথা তাে

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

এই আশ্চর্য কথাটা বলার জন্যেই আজ আমি ইচ্ছা করে তােমার গাড়িতে এসেছিফুচকা খাওয়া বা তােমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আমার মূল উদ্দেশ্য নাএই কথাগুলি বলেছি তােমাকে চমকে দেবার জন্যে। 

বুঝতে পারছিকিছু কিছু মানুষকে আপনি চমকে দিতে পছন্দ করেনতুমি কি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলবে ? না আমি বলব ? ………….আমিই বলবফুচকা জিনিসটা তাে আমার খেতে খুবই ভালাে লাগছেআমি বরং এক কাজ করি আরাে হাফ প্লেট ফুচকা খাইএই ফাঁকে তুমি কথা বলে এসােআমি অপেক্ষা করছি। 

রাতের অস্পষ্ট আলােয় দেখা মানুষকে দিনের ঝলমলে রােদে দেখলে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগেরাতে যাকে রহস্যময় মনে হয় দিনে সেসাদামাটা একজন হয়ে যায়ভাইয়ার যে বন্ধু চোখে সানগ্লাস পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বােকা বােকা দেখাচ্ছেমনে হচ্ছে সে আমাকে দেখে ভয়ও পাচ্ছেতার ভয় পাওয়া উচিত নাভয় পাওয়া উচিত আমারএই ছেলেটা ভয়ঙ্কর মানুষদের একজন

সে এখন নিজেই ভয় পাচ্ছে অথচ এই মানুষটাই যখন ছাদে ভাত খাচ্ছিল তখন মােটেও ভয় পাচ্ছিল নাতাকে বােকা বােকাও লাগছিল না। চেহারাও রাতে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিলভীত মানুষের চেহারা হয়তাে খারাপ হয়ে যায়আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি এখানে কী করছেন? ……….কিছু করছি না। ………….আপনি কী প্রায়ই আমাকে ফলাে করেন ? ………..সানগ্লাস পরা মানুষটা এই প্রশ্নে মনে হয় খুবই বিব্রত হয়েছেমুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছেসে এখন কৃষ্ণচূড়া গাছের সৌন্দর্য দেখায় ব্যস্ত। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

কেন এই কাজটা করছেন? আমাকে কিছু বলতে চান ? …….কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেনকিছু বলতে চাই না। ……………আমাকে ফলাে করবেন নাপ্লিজলাল শার্ট পরা লােকটা কে ? …………….লাল শার্ট পরা লােক কে তা দিয়ে আপনার কোনাে প্রয়ােজন নেইপ্রয়ােজন আছে

তাহলে চলে যানআচ্ছাআচ্ছা বলে দাঁড়িয়ে থাকবেন নামােটর সাইকেলে উঠে স্টার্ট দিনপ্লিজ। …..মােটর সাইকেল চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি দাঁড়িয়ে রইলামস্যার আমার জন্যে অপেক্ষা করছেনতাঁর কাছে যেতে ইচ্ছা করছে নাহঠাৎ খানিকটা বিষণ বােধ করছিকেন করছি তাও বুঝতে পারছি নারাস্তার ওপাশেই আমার গাড়ি

ড্রাইভার গাড়ির কাচ নামিয়ে কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছেএকটা কাজ করলে কেমন হয় ? স্যারকে কিছু না বলে রাস্তা পার হয়ে গাড়িতে উঠে বসলে হয় না? তিনি খুবই অবাক হবেনঅপমানিত বােধ করার কথাতাতে সমস্যা কিছু নেই। 

আমি ক্লান্ত ভঙ্গিতে রাস্তা পার হলামস্যার কী করছেন বুঝতে পারছি নাতিনি নিশ্চয়ই ফুচকার প্লেট ফেলে দিয়ে দৌড়ে আমার দিকে আসছেন নাঘটনাটা হজম করছেন। স্যারের মতাে মানুষকে অনেক কিছু হজম করতে হয়

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বললামস্যার কী করছেন দেখতে ইচ্ছা করছেসেটা সম্ভব নাভদ্রলােক এখন কী করবেন? প্রথমেই ছােট্ট একটা বিপদে পড়বেনফুচকার দাম দিতে পারবেন নাফুচকার প্লেট হাতে নিয়েই তিনি বলেছেনমৃন্ময়ী, একটা ভুল করে ফেলেছিমানিব্যাগ আনি নিতােমার সঙ্গে টাকা আছে তাে

ফুচকার দাম দেয়ার মতাে টাকা সঙ্গে নেই এটা কোনাে বুদ্ধিমান মানুষের জন্যে বড় সমস্যা নাএই সমস্যার সমাধান বার করা যাবেতিনি সুন্দর করেই এই সমস্যার সমাধান করবেনতারপর কী হবে? তিনি চিন্তিত হয়ে বাসায় ফিরবেনআমার সঙ্গে যােগাযােগ করতে চাইবেন কিন্তু করতে পারবেন না আমার টেলিফোন নাম্বার তার কাছে নেই। 

ড্রাইভার বলল, বাসায় যাব আপাআমি বললাম, নাকোন দিকে যাব ? ….আপনার ইচ্ছামতাে যেকোনাে জায়গায় ঘােরাঘুরি করতে থাকুনআধ ঘণ্টা এই রকম ঘুরবেন, তারপর বাসায় যাবেন। 

ড্রাইভারের মুখ শুকিয়ে গেলআমাদের ড্রাইভার তিনজনতিন ড্রাইভারের একই অবস্থা হয়যখনই বলিআপনার ইচ্ছা মতাে কিছুক্ষণ গাড়ি নিয়ে চক্কর দিনতখন তাদের দেখে মনে হয় তারা অথই সাগরে পড়ে গেছেপরের ইচ্ছায় কাজ করতে এদের সমস্যা নেইনিজের ইচ্ছায় তারা কিছু করতে পারে না। …নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করার ক্ষমতা এদের নষ্ট হয়ে গেছে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

দোতলার টানা বারান্দায় বাবা বসে আছেনবাবার পাশে আজহার চাচাবারান্দায় চেয়ারগুলি এমনভাবে পাতা যে মুখােমুখি বসার উপায় নেইদুজন পাশাপাশি বসে আছেনকথা বলার সময় আজহার চাচা বাবার দিকে তাকাচ্ছেনহাতপা নাড়ছেন

বাবা মূর্তির মতাে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেনঠোট নাড়া দেখে আলাপের বিষয়বস্তু বােঝা যাচ্ছে না, তবে আজহার চাচার মুখ ভর্তি হাসি দেখে মনে হয় দারুণ মজার কোনাে কথা হচ্ছেবাবাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বিরক্তির শেষ সীমায় পৌছে গেছেনযেকোনাে মুহূর্তে তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াবেনসামনের বেতের গােল টেবিলটা লাথি দিয়ে ফেলে দেবেনএতে যদি বিরক্তি কাটা যায় তাহলে কাটা যাবেযদি কাটা না যায় তিনি হয়তােবা দোতলার বারান্দা থেকে লাফ দেবেন

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *