যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ শেষ : পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

রুবা চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। পারছে না। আমি চোখের পাতা টেনে দিলাম। রুবার গায়ের চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। দেখাচ্ছে মসৃণ কিন্তু হাত রাখলেই খসখসে। ভাব! অনেকটা সাপের গায়ের চামড়ার মতো। দূর থেকে কী মসৃণ দেখায়, কিন্তু হাত দিলেই খসখসে। আমি একবার সাপের গায়ে হাত দিয়েছিলাম। সাপুড়ে সাপের খেলা দেখাতে এসেছে। সবাই খেলা দেখছি।

আমি ভয়ে অস্থির হয়ে বাবার কোলে বসে আছি। সাপ এক একবার ফণা তুলছে, আমি আতঙ্কে জমে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠছি। বাবা এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, সাপ অতি নিম্নশ্রেণীর একটি প্রাণী। একে ভয়ে পাবার কিছু নেই। বিষদাঁত ভাঙা সাপ কেঁচোর কাছাকাছি। খোকন, তুমি সাপেব গায়ে হাত দাও। দাও হাত। হাত দিয়ে দেখ; একবার এর গায়ে হাত দিলেই তোমার ভয় ভেঙে যাবে। দাও, হাত দাও।

আমাকে হাত দিতে হলো। ধবিধার কথা অগ্রাহ্য করার সাহস আমাদের ভাইবোনদের কোনো কালেই ছিল না।সাপের গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলাম— কী খসখসে চামড়া! বাবা হাসিমুখে বললেন, ভয় ভেঙেছে খোকন? আমার ভয় ভাঙে নি, তবু আমি মাথা নাড়লাম। বাবা হৃষ্ট স্বাবে বললেননিম্নশ্রেণীর প্রাণিদের ভয় পেতে নেই, ভয় যদি পেতেই হয় মানুষকে ভয় পাবি। মানুষ অতি উচ্চশ্রেণীর প্রাণী মানুষকে ভয় পাওয়ার মধ্যেও আনন্দ আছে।

রুবা চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে কি? আমি তার গায়ে হাত রেখে বললাম, আমি কিছু খেয়ে আসি। আমার খিদে পেযেছে। একগাদা পোলাও খেয়েছি, তারপবেও খিদেয় মরে যাচ্ছি; ফ্রিজে কি খাবার কিছু আছে?

হুঁ।আমি খাবার ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরের দেয়ালে বিবাট একটা ঘড়ি আছে। ঘড়িতে দুটা বাজে। আশ্চৰ্য, আমি তো বিরাট একটা ভুল করেছি। খাবার ঘরে বাতি জ্বলছে, শোবার ঘরে বাতি জ্বলছে, বারান্দায় বাতি জ্বলছে, বসার ঘরে বাতি জ্বলছে। পুলিশ কেইস হলে অনেকেই সাক্ষ্য দেবে–অনেক রাত পর্যন্ত ঐ বাড়িতে বাতি জ্বলছিল।

খাবার ঘর ও বসার ঘরের বাতি নিভালাম। একসঙ্গে সবগুলো বাতি নেভানোও ঠিক না। সন্দেহ হবে। ফ্রিজ খুললাম। অনেক খাবারই আছে। পলিথিনের ব্যাগে মোড়া স্যান্ডউইচ, লাড্ডু, রসমালাইয়ের একটা হাঁড়ি।একটা লাড্ডুর অর্ধেকটা মুখে দিতেই আমার খিদে চলে গেল, বমি বমি ভাব হলো। প্রচুর খাওয়া হলে যেমন বমি ভাব হয় সে-রকম।আমি শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে এক গ্লাস ঠাণ্ড পানি নিয়ে বসলাম। রুবার ঘরের বাতি এখনো জ্বলছে।

বাতি নিভিয়ে দেওয়া দরকার। বাতি জ্বালানো থাকলে কেউ ঘুমুতে পারে না। রুবা তো একেবারেই পারে না। যদিও এই রুবা হলো অন্য রুবা। তবুও দীর্ঘদিনের একটা অভ্যাস।রুবার ঘরে ঢুকলাম। সে ঠিক আগের মতো শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। চোখ এখনো খুলে নি। এটা একটা ভালো লক্ষণ। সে কি ঘুমিয়ে পড়েছে? ডেকে দেখব? থাক, ডাকার দরকার নেই। কাঁটায় কাটায় এক ঘণ্টা পর এসে দেখব কী ব্যাপার। এই এক ঘণ্টা আমি বিশ্রাম নেব।

বারান্দায় চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে থাকব। আমার নিজের বিশ্রাম দরকার। অস্বাভাবিক ব্যাপার যা ঘটছে বিশ্রাম নিলে সেসব পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে।আমি বারান্দায় এসে বসলাম। জমিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে। বারান্দা চিক দিয়ে ঢাকা, তারপরেও চিকের ফাঁক দিয়ে শীতল হওয়া আসছে। একটা চাদরে গা ঢেকে বসা দরকার ছিল। পা তুলে বসলাম। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও মাথা থেকে সব চিন্তা দূর করতে হবে–নিয়তো শেষটায় পাগল হয়ে যাবে। বারান্দার বাতি নেভানো, তবু খানিকটা আলো আসছে। চাঁদের আলো? যখন গিয়েছে ড়ুবে পঞ্চমীর চাঁদ। কে বলত এ কথাটা? রুবা না? হ্যাঁ রুবা।

একদিন অফিস থেকে ফিরতে বেশ দেরি হলো–ইয়ার এন্ডিং-এর কামেলা। বাসায় ফিরেছি। রাত এগারোটায়। কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিল। আমি ঘরে ঢুকে দেখি বিরাট উৎসব। রুবার বন্ধু-বান্ধবরা বারান্দায় গোল হয়ে বসে আছে। আজ না কি চাঁদেব পঞ্চমী। চাঁদ ড়ুবে গেলে জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিন কবিতা পড়া হবে।রুবা পরীর মতো সেজে বসে আছে। গলায় ফুলের মালা। খোপায় ফুল। রুবা এসে বলল, তুমি চট করে হাত-মুখ ধুয়ে আমাদের সঙ্গে এসে বসো তো।কেন?

সুব্ৰত এসেছে।সুব্ৰতটা কে? আশ্চর্য! সুব্রতকে চেন না? বিখ্যাত আবৃত্তিকার। নান্দনিক গোষ্ঠীর সুব্রত দে। ও আজ কবিতা পাঠ করবে।আমি একাউন্টেন্ট মানুষ। আমি কবিতার কী বুঝি? তোমাকে কিছু বুঝতে হবে না। তুমি চুপচাপ বসে থাকবে। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।তিনটা প্যারাসিটামল খাও। আমি গরম এক কাপ চা বানিয়ে দিচ্ছি। চা খাও। চা খেয়ে আমাদের সঙ্গে বসো। জীবনানন্দ দাশের কবিতা তোমার ভালো লাগবে।

রুবা-প্রায় জোর করেই আমাকে বারান্দায় নিয়ে গেল। রুবার বন্ধু-বান্ধবরা একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। সুব্রত নামের ছেলেটা আমাকে পাত্তাই দিল না। সে পৌষমেলার কী এক গল্প করছিল–সেই গল্পই করতে লাগল। আমি বোকার মতো খানিকক্ষণ বসে। থেকে শোবার ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন শুনি কবিতা পাঠ হচ্ছে। সুব্রত না, কবিতা পড়ছে রুবা–

যখন গিয়েছে ড়ুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হলো তার সাধ;

বধু শুয়েছিল পাশে–শিশুটিও ছিল;

প্রেম ছিল, আশা ছিল–জ্যোৎস্নায়–তবু সে দেখিল

কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙ্গে গেল তার?…

কবিতা শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। গাঢ় গভীর ঘুম। এমন গাঢ় ঘুম অনেক দিন ঘুমাই নি।এখনো ঘুম পাচ্ছে। চোখ ভেঙে ঘুম নামছে। ঘুমিয়ে পড়াটা কি ঠিক হবে? যদি সময়মতো ঘুম না ভাঙে! যদি জেগে উঠে দেখি দশটা বেজে গেছে–চারদিক আলো হয়ে আছে।

খোকনা! খোকন! আমি ধড়মড় করে উঠলাম। বাবার গলা। শ্লেষ্মা জড়ানো ভারী স্বর। ভুল হবার কোনো কারণ নেই। বাবার গলা শুনব কেন? তিনি বেঁচে নেই। ডেড এন্ড গান। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি। বাবা আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি যেমন দাঁড়ান, খানিকটা কুজো হয়ে একটু বুকে এসেছেন। গা থেকে কড়া তামাকের গন্ধ আসছে। তাঁর গায়ে হলুদ কোট। কোটের তিনটা হলুদ বোতামের একটা লাল।

হলুদ বোতাম একটা খুলে পড়ে গিয়েছিল। মা কোথেকে যেন একটা লাল বোতাম এনে লাগিয়ে দিলেন। বাবা নির্বিকার। সেই কোট পরেই স্কুলে ক্লাস নিতে যান।খোকন, ওঠ্ ওঠ্। তোর এক ঘণ্টা ঘুমুবাব। কথা, তুই ঝাড়া দেড় ঘণ্টা ঘুমুচ্ছিস। ওঠ ওঠ। শেষে একটা বিপদ বাধবি।বাবা আপনি?

হ্যাঁ, আমি। বারান্দায় বসে বসে ঘুমুচ্ছিস কোন আক্কেলে? শেষটায় নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে, নিজের শরীরের দিকে লক্ষ্য রাখবি না? নিজের শরীরের যত্ন নিজে না করলে কে করবে? বৌ-মার অবস্থাও তো ভালো না।আমি কিছুটা কৌতূহল, কিছুটা ভয় নিয়ে বাবাকে দেখছি। শেভ করেন নি, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা সাদা-কালো দাড়ি। প্রতি দিন শেভ করা বাবার ধাতে ছিল না। প্রতি তিনদিন পর পর শেভ। পয়সা বাঁচানো।হাঁ করে কী দেখছিস রে খোকন?

আপনাকে দেখছি।দেখাদেখির কিছু নেই রে বাবা। সময় সংক্ষেপ। এখন কাজে লেগে পড়তে হবে। তুই একা পাববি না বলেই তোকে সাহায্য করতে এসেছি।আমাকে সাহায্য? আমাকে কী সাহায্য? বৌ-মার ডেডবডি সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে না? তুই একা পারবি? আমি হেসে ফেললাম। আমার বাবা, ঠােকরোকানা স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব এসেছেন আমাকে সাহায্য করতে। পুরো ব্যাপারটা এক ধরনের হেলুসিনেশন।

কিংবা আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি। মানুষ যখন ভয়াবহ কোনো সমস্যায় পড়ে তখন স্বপ্নে সে রিলিফ পায়। এও এক ধরনের রিলিফ। আমাকে সাময়িক রিলিফ দেওয়াবা জন্যে আমার বাবা আজহার উদ্দিন সাহেব চলে এসেছেন। কেমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলছেন, তোকে সাহায্য করতে এসেছি–হা হা হা।হাসছিস কেন রে খোকন? এটা কি হাসির সময়? আপনি একা এসেছেন কেন বাবা? মাকে নিয়ে এলেন না কেন?

তাকে আনব কী করে? তাকে কুকুরে কামড়াল না? ওর কি চলাফেরার অবস্থা আছে! তুই অকারণে দেরি করছিস। আয় আমরা কাজে নেমে পড়ি।আচ্ছা বাবা, আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মাথা খারাপ হবে কেন? আমার তো পাগলের বংশ না। এই বংশে কোনো পাগল নেই। আমাদের অতি উচ্চ বংশ।বাবা, আপনাকে দেখে ভালো লাগছে। বসুন। কিছু খাবেন বাবা গরম চা কিংবা কফি?চা খাওয়া যায়। শীতটাও বেজায় নেমেছে–তুই পাতলা একটা শার্ট গায়ে দিয়ে ঠাণ্ডায় বলে আছিস কীভাবে?

আমি আবারো হো হো করে হাসলাম। নিজের হাসির শব্দে নিজেই চমকালাম। কী আশ্চর্য কণ্ড ঘটছে স্বপ্নে, বাবাকে দেখছি। একেবারে বাস্তবের মতো স্বপ্ন। কিংবা কে জানে সত্যি সত্যি বাবা হয়তো পরলোক থেকে চলে এসেছেন। এখন পিতা-পুত্র মিলে ডেডবডি সরাব–হা হা হা।হাসছিস কেন রে খোকন?

এমনি হাসছি।চা বানালে তাড়াতাড়ি বানা। আদা থাকলে এক টুকরা আদা দিয়ে দিবি। আমার গলা বসে গেছে।বাবা ই ই করে গানের কী একটা কলিও যেন ভাজলেন। সখি হে সখি হে ধবনের গান। এ তো দেখি ভালো যন্ত্রণা হলো।আমি বারান্দা থেকে বসার ঘরে ঢুকলাম, বাবা পেছনে পেছনে এলেন। শব্দ কবে হাই তুল্য লন, আঙ্গুলো তুড়ি বাজলেন। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, এটা যদি স্বপ্ন হয়ে থাকে তা হলে বেশ কঠিন এবং জটিল স্বপ্ন। Powerful dream.

বাবা আনন্দিত গলায় বললেন, ঘর-দোয়ার তো খুব ঝকঝকে।আমি বললাম, আপনার বৌমার শুচিবায়ুর মতো আছে।আগ বলবি তো–আমি ধুলাপায়ে ঢুকেছি।কোনো সমস্যা নেই, ও তো আর কিছু বুঝতে পারছে না।তাও সত্যি। তুই ভালো কথা মনে করেছিস। এখন মূল বিষয়ে আয়–ডেডবডি কীভাবে সরাবি বলে ঠিক করেছিস। পদ্ধতিটা কী? ডিসপ্যাবসান পদ্ধতি।সেটা কী? সত্যি জানতে চান?

অবশ্যি জানতে চাই।ডেডবডিটা, টুকরো টুকরো কবে বড় একটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া। পূব ভালো পদ্ধতি। ফুল প্রুফ।আমার কাছে তো খুব ভালো পদ্ধতি বলে মনে হচ্ছে না। নোংরা পদ্ধতি বলে মনে হচ্ছে। কাটাকুটি কে করবে? তুই?

হুঁ।পারবি? এত দিনের চেনা একটা মেয়ে। তার উপর প্রচণ্ড রাগ থাকলে অবশ্যি পারবি। আছে প্ৰচণ্ড রাগ? কিছুটা আছে।তোর বলার ভঙ্গি থেকে মনে হয় রাগ কমে গেছে। এখন তো কাটাকুটি করতেই পাববি না। তাছাড়া রক্ত টক্ত বের হয়ে বিশ্ৰী অবস্থা হবে। ডিসপারসান পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি নেই? তোর মাথা তো বেশ পরিষ্কার। চিন্তা ভাবনা কবে কিছু বের করতে পারিস না?

বাবা আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মোটা চশমার আড়ালে বাবার চোখে আগ্রহ ঝিকমিক করছে। সেই চোখ দেখে আমার পেটে হাসি গুড়গুড়িয়ে উঠছেকী বিশ্ৰী ঝামেলা তৈরি হয়ে গেছে। আমি আমার চোখের সামনে আমার নিজের মনেরই একটি অংশকে দেখতে পাচ্ছি। সেই অংশটি বাবাব রূপ ধরে সামনে এসেছে। আমাকে তান দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি জানি যথাসমযে সে নিজ মূর্তি ধরবে।

খোকন! জি বাবা।কই চা খাওয়াবি বলেছিলি তার কী করলি! চা বাবা আপনি খাবেন না–কারণ আপনার আসলে কেনো অস্তিত্ব নেই। আমি যদিও আপনাকে দেখছি, আসলে আপনি আমার সমানে নেই। আমার মাথার নিউবোনে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে বলে আমি আজগুবি সব ব্যাপার দেখতে শুরু করেছি।তোর মাথায় কী হয়েছে?

কী হয়েছে আমি জানি না। বড় কোনো সাইকিয়াট্রিন্টের কাছে গেলে তিনি হয়তো বলতে পারতেন। তা তো সম্ভব না।বাবা চিন্তিত গলায় বললেন, বৌমার মৃত্যু তোকে খুব এফেক্ট করেছে। নিজের হাতে খুন করেছিস তো, এই জন্যেই বেশি লাগছে। ভাড়া করা লোক পেলি না? ওরা যা করার চুপি চুপি করত— তুই টাকা দিয়ে খালাস। মানুষ মারতে আজকাল কত নেয়? রেট কত?

চুপ করুন তো বাবা।তুই নিজ হাতে খুন করেছিস বলে কি তোর কোনো অপরাধ বোধ আছে? না। গুড। না থাকাই উচিত। মৃত্যু হলো কপালের লিখন। যার যেভাবে মৃত্যু লেখা সেভাবেই হবে। তুই নিমিত্ত মাত্র, বৌমার কপালে লেখা ছিল তোর হাতে মৃত্যু। তুই হাজার চেষ্টা করেও সেই লেখা ফেরাতে পারতি না। কাজেই যা হবার হয়েছে। বি হ্যাপি।

বাবা আবার গুন গুন শুরু করলেন–সখি হে! সখি হে। বাবার প্ৰিয় গান। গান থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, বি হ্যাপি মাই সান।আমি হ্যাপিই আছি। আপনি চলে যান।চলে যাব? হ্যাঁ চলে যাবেন। অবশ্যই চলে যাবেন।তোকে এমন ব্যামেলায় ফেলে যাব? হ্যাঁ যাবেন। আমার ঝামেলা আমিই মেটাব। ঝামেলা কবার সময় তো আব্ব আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করে করি নি।

তবু… ..তুই আমার ছেলে। তোর কষ্ট দেখে কষ্ট হয়।বাবা, আমার কোনো কষ্ট নেই। আপনাকে হাতজোড় কবে অনুরোধ করছি আপনি চলে যান।আচ্ছা বেশ যাচ্ছি–বৌমার ডেডবডি কীভাবে সরাবি একটু বলে দে। তোর মাকে বলতে হবে তো। গেলেই জিজ্ঞেস করবে। একটা বস্তায় ভরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসব।কোথায় ফেলবি?

জানি না কোথায়। এখনো ঠিক করি নি।আজে বাজে কোনো জায়গায় ফেলিস না। এত ভালো একটা মেয়ে।ভালো মেয়ে।অবশ্যই ভালো মেয়ে। সে যে ভালো মেয়ে সেটা আমি যেমন জানি, তুইও জানিস। জানিস না? বাবা চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলেছেন। তাকাচ্ছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। বাবার চোখে এই দৃষ্টি সহ্য করা সম্ভব না। কী শীতল, কী ঠাণ্ডা চোখ! খোকন! জি বাবা।তুই অসুস্থ। ভয়ঙ্কর অসুস্থ। জন্ম থেকেই তুই অসুস্থ ছিলি। আমরা বুঝতে পারি নি। তুই যে কাণ্ডটা করেছিস, অসুস্থ বলেই করেছিস। তোর এই অসুখ আরো বাড়বে–তুই এমন কাণ্ড আরো করবি। সেটা কি ঠিক হবে?

ঠিক হবে কি হবে না, তা নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না। আপনি কেউ না।আমি কেউ না তা কী করে বললি রে ব্যাটা? আমি তোর বাবা না? মনে নেই একবার তোর পেটে যন্ত্রণা হলো–সারারাত তোকে কোলে নিয়ে হোটলাম। তোর মা বলল, কতক্ষণ আর তুমি হাঁটবে–আমার কোলে দাও। আমি খানিকক্ষণ হাঁটি। কিন্তু তুই মার কোলে যাবি না, বানরের বাচ্চার মতো আমার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাইলি–ভুলে গেছিস?

না। ভুলি নি।তোকে কোলে নিয়ে হাঁটতে আমার কোনো কষ্ট হয় নি। তুই পেটের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলি, সেই জন্যে কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমি আল্লাহর কাছে মানত করলাম তোর পেটের ব্যথা সারলে আমি একশ রাকাত নামাজ পড়বা। মানতটা করার সঙ্গে সঙ্গে তোর পেটের ব্যথা কমে গেল।আপনি মানত অদায় কবেছিলেন?

অবশ্যই। তোকে তোর মার কাছে দিয়ে জায়নামাজে বসলাম। নামাজ শেষ করে। তারপর উঠলাম।আপনি এত তালো মানুষ কিন্তু আপনার ছেলে এত খারাপ হলো কেন? সেটা তো বাবা বলতে পারি না। জগৎ বড়ই বিচিত্ৰ। তোর মার কথাই ধর। এমন একজন মহিলা, অথচ কী কুৎসিত মৃত্যু হলো। যে কুকুরটাকে এত আদর করত, তার মরণ হলো কুকুরের হাতে।

আপনি চলে যান তো বাবা।আচ্ছা যাচ্ছি। বৌমাকে একবার দেখে যাব না? তাকে দেখাব কিছু নেই।আহা, একটু দেখে যাই। চোখের দেখা আর কিছু না। মাথা হাত বুলিয়ে আদর করে চলে যাব। ওর পেটে যে একটা বাচ্চা ছিল সেটা বোধহয় তোকে বলে নি। না—কি বলেছে? আমি কিছু বললাম না। এক দৃষ্টিতে বাবাকে দেখছি। এ কে? সত্যি কি বাবা এসেছেন? না মাথার ভেতরের কোনো ভ্ৰান্তি উঠে এসেছে?

বাবা হাই তুলতে তুলতে বললেন, দুমাসের একটা বাচ্চা ছিল–বৌমা ভেবেছিল তোর জন্মদিনে বলবে। তোকে অবাক করে দেবে। কবে যেন তোর জন্মদিন?আমি চুপ করে রইলাম। বাবা হাসিমুখে বললেন–আমার মনে হয় আজই তোর জন্মদিন। আমার অবশ্যি দিন তারিখ মনে থাকে না। গুবলেট করে ফেলি। তোর মা ঠিক ঠাক বলতে পারত। একবার ভেবেছিলাম তোর মাকেও নিয়ে আসি। কুকুরে কামড়ানোর পর ওর শরীর ভালো না… এই জন্যেই আনি নি।

বাবা প্লিজ আপনি চলে যান। আমি আপনার পায়ে পড়ছি।আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি। যাচ্ছি। বৌমাকে একবার দেখে যাব না? কখনো দেখি নি।আচ্ছা যান দেখে যান–ও শুয়ে আছে। ওব সঙ্গে ইচ্ছা করলে কথাও বলতে পারেন। ও এখনো মরে নি, কথা বলে হাঁটে পানি খায়…

গলায় বালিশ চেপে ধরে রাখলে কেউ কি আর বেঁচে থাকে রে বোকা? তুই যা দেখছিস সব মনের কল্পনা। মনের বিকার। তোর স্নায়ু ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। এই জন্যেই তোকে নিয়ে এত চিন্তা লাগছে।আমাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আমি ভালো আছি। খুব ভালো আছি। আপনি চলে গেলে আরো ভালো থাকব। যান। আপনার বৌমাকে দেখে চলে যান।ওর গায়ে একটা কাপড় পরিয়ে দে বাবা। সুন্দর একটা শাড়ি পরিয়ে দে। ছেলের বৌ প্ৰথম দেখছি। ওর বিয়ের শাড়িটা আছে না?

হুঁ আছে।বিয়ের শাড়িটা পরা, আর কিছু গয়না টয়না পবিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দে। আমি মাকে দেখে চলে যাই।বাবা আমি এইসব কিছুই করব না।বাবা, তীব্র গলায় বললেন, তুই অবশ্যই কববি। আমি আমার বৌমার নগ্ন মূর্তি দেখব? আমি পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলাম। এটা স্বপ্ন হতে পারে না। স্বপ্নে এমন তীব্ৰ গলায় কেউ কথা বলে না। স্বপ্ন এত দীর্ঘ ও হয় না। এটা উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনাও না। উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা এত গোছানো হয় না। তাহলে কী হচ্ছে?

খোকন! জি বাবা।বৌমাকে বস্তায় ভরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না। তোর মা মনে কষ্টে পাবে।মা তো বেঁচে নেই বাবা।বাবা বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসলেন। আমি সেই হাসি দেখে চমকে উঠলাম। তার নিজের মৃত্যুর সময়ও তিনি ঠিক এই ভাবে হেসেছিলাম। মৃত্যুর সময় তিনি আমাদের সবাইকে লাইন বেঁধে দাড়া কবালেন। আমাদের প্রত্যেকের মাথায় হাত রেখে খানিকক্ষণ দেয়া করলেন। তারপর বিচিত্র ভঙ্গিতে খানিকক্ষণ হেসে মারা গেলেন।

খোকন।জি বাবা।বৌমাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না বাবা।আপনি কী করতে বলেন? তুই বৌমার বাবা-মাকে খবর দে। তোর বন্ধু ওসি সাহেবকে টেলিফোন করে সব খুলে বল।পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ফাঁসিতে বুলিয়ে দেবে।বাবা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তা হয়তো দিবে। কী আর করা।

বাবা, ফাঁসিতে ঝুলতে আমার ভয় লাগবে।ভয়ের কী আছে। ভয়ের কিছু নেই। মানুষের প্রধান কাজ হলো ভয়কে জয় করতে শেখা।আপনি আমাকে বলছেন পুলিশকে খবর দিতে? হ্যাঁ।আমি যদি তা করি আপনি কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসবেন? তুই পুলিশকে কিছু না বললেও তোকে আগের মতো ভালোবাসব। ছেলে-মেয়ে ভালো কি মন্দ বাবা-মার ভালোবাসা তার ওপর নির্ভর করে না রে বোকা।আপনি কি সত্যি বলছেন বাবা?

হ্যাঁ সত্যি বলছি। আরেকটা সত্যি কথা শুনে যা–বৌমা তোকে ভয়ঙ্কর ভালোবাসতো। তোর মা আমাকে যতটা ভালোবাসতো বৌমা তোকে ঠিক ততটাই ভালোবাসতো। তোর মার ভালোবাসা অপাত্রে পড়ে নি, কিন্তু আমার বৌমার ভালোবাসা পড়েছিল অপাত্রে।বাবার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তিনি তার ময়লা মাফলারে চোখ মুছছেন।আমি বললাম, বাবা আপনি এখানে দাঁড়ান। আমি আপনার বৌমাকে বিয়ের শাড়ি পরিয়ে আপনাকে খবর দেব।আচ্ছা।আব আমি আপনি থাকতে থাকতেই পুলিশকে খবর দেব।গুড।আপনি কি সত্যি এসেছেন। বাবা?

বাবা হাসলেন।আমি সুন্দর করে রুবাকে সাজালাম। শাড়ি পরালাম। গয়না পরালাম। রুবা কোনো নড়াচড়া করল না, কোনো শব্দও করল না। যে মৃত্যুর জন্যে আমি অপেক্ষা করছিলামসেই মৃত্যু তার ঘটেছে। আমি রুবার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম— রুবা, আমার বাবা তোমাকে দেখতে এসেছেন।রুবা তার উত্তরেও কিছু বলল না।রুবাকে সাজানো শেষ করে বসাব ঘরে এলাম। বাবা নেই। থাকবে না। আমি জানতাম। আমার মাথা যে ভ্ৰান্তি তৈরি করেছিল সেই ভ্ৰান্তি দূর হয়েছে।

আমি শোবার ঘরে ঢুকে থানায় টেলিফোন করলাম। শান্ত ভঙ্গিতে ওসি সাহেবকে বললাম, ওসি সাহেব আমি ভয়ঙ্কর একটা অপরাধ করেছি। আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি। আসুন, আপনি আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান।রুবার হাত ধরে আমি বসে আছি। কী অসম্ভব কোমল তার হাত।রুবা কান্ত হয়ে শুয়ে আছে। বেনরসিতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে রুবাকে। ওকে একটু কাজল পরালে হয় না? কোথায় আছে কাজলদানী?

দরজার ওপাশ থেকে আমাকে চমকে দিয়ে বাবা বললেন–ড্রয়ারে আছে রে খোকন। ড্রয়ারটা খোল।তিনি তাহলে এখনো যান নি? এখনো আছেন? আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গেল।আমি রুবাকে কাজল পরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।আকাশে চাঁদ আছে। বারান্দায় চাঁদের ক্ষীণ আলো। এটা কি রুবার সেই বিখ্যাত পঞ্চমীর চাঁদ? কখন ডুববে পঞ্চমীর চাঁদ?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *