গোলমালটা শুনেই পুটে বাইরে বেরিয়ে এসেই দেখে, দরজার কাছে বিল্টু বোস, সঙ্গে আরো কয়েকজন। বিল্টু বোস মন দিয়ে কাউকে কিছু একটা বোঝাচ্ছে, তবে আঙুলটা পুটেদের বাড়ির দিকে। পুটের কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে এর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নেয়। বিল্টুর পাশে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনাথদা, পুটেকে কিছুসময় দেখে বেশ জোর গলাতেই বলে,‘তুর পশ্চিমদিকের ঘরটর চালট ভাঙতি হবেক রে, রাস্তা বেঁকবেক নাই।’
-বেঁকবেক নাইত ব্যাঁকাও গে। আমার ঘরটর দিকেই লজর?
-শুনো পুটেদা, ইখানে তুর আমার কথা লয়, কথাট হল গিয়ে গেরামের। রাস্তা বাড়ানুর সময় যদি আমার ঘরট পড়ত, ভাঙি দিতম।
-বাজে বকিস না বিল্টে, তুদের ঐ কমলার ঘরের সিঁড়িট রাস্তাতে পড়লেক, ভাঙলি? রাস্তাট উল্টাদিকে ঘুরায় দিলি।
-উটো বলনা, সিঁড়িট ভাঙলে উয়ারা ঢুকতো কুথাকে?
-বা’রে আমার যে ঘরের চাল ভাঙছিস, বউ, বিটি লিয়ে উঠব কুথাকে সিটো ভাবিছিস?
-সিদ্ধান্তট আমার লয় পুটেদা, পঞ্চায়েতের, মাইনলে মাইনবে, নইলে পালায় যাও।
-পালায় যাও! কি বললি, এই গেরাম তুর একার, তুর বাপের? ইটো আমারও বটে সাতপুরুষের বাস।
চারদিকের হাওয়া আরো গরম হবার আগেই ঘরের ভিতর থেকে পুটের বউ বাইরে বেরিয়ে এসে পুটেকে ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। ‘চিত্কার কোরো না, এক্ষুণি তুমার মাথা বাজবেক, যদি ঘর ভাঙি দেয় গ্রাম থেকে বেরয় যাব।’
কিছু সময়ের মধ্যে বাইরেটাও ফাঁকা হয়ে যায়। রাস্তা মাপার লেবার দুজনও হাওয়া। ঘরের ভিতর থেকে পুটে, পুটের বউ দুজনার গলা বাইরের রাস্তা পর্যন্ত এসে পৌঁছালেও শোনার মত আর কেউ রইল না। আস্তে আস্তে গলা থেমে গেল পুটেদের দুজনেরও।
রাস্তা নিয়ে এই ঝামেলাটা চলছে প্রায় মাস সাত আট ধরেই। মাস আট আগে এক বিকালে বিল্টে বোস আর কয়েকজন পুটেকে ডেকে বলে,‘এত বছর তো ক্ষমতায় ছিলে, গাঁয়ের লগে তো একটা ইটও ঠিক করলে নাই, আমরা কিন্তু রাস্তাট করছি। প্রধানের সাথে কথা হনছে, টেণ্ডার পাশ হবেক বলে।’
পুটে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে বলে,‘ভালো কথা, আমরা পারি নাই তুরা পারছিস, কর। রাস্তা বানা, লাইট লাগা।’
-পারি নাই বল না, বল করি নাই।
-ঠিক আছে তাই হোক।
পুটে সেদিন আর কথা বাড়ায় নি। দিনকাল আর আগের মত নেই। আগের মত সকাল থেকে নিজের গ্রাম বা আশেপাশের গ্রাম থেকে কেউ আসে না। বলে না,‘পুটে দা, একটু দু’কলম লিখি দাও, বিটিটকে হাসপাতালে ভরতি করি, জ্বরে আর ভালছে নাই।’
শুধু জ্বর নয় মেয়ের বিয়ে, শ্রাদ্ধর টাকা চাল গাঁয়ের মন্দির তৈরি সবেই পুটের বাড়িতে লোকজন এসে হাজির হত। গাঁয়ের লোকের পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট দেবার কাজও করত পুটে। প্রথম দিকে নিজেই সার্টিফিকেট এনে দিত, পরে সব সার্টিফিকেট নিজের কাছেই রাখতে আরম্ভ করল। টাকা নিত, মুখের সামনে বলত, ‘মাগনায় দিব, ছাপাতে খরচ নাই?’ অবশ্য সবাইকে দিতও না। বিরোধী বাড়ি তো এক্কেবারেই না, খুব ধরলে দ্বিগুন টাকা।
কন্ট্রোলের মুক্তি প্রতি হপ্তাতে পঞ্চাশ কিলো চাল আর পঁচিশ কিলো আটা ঘরে দিয়ে যেত। পুটে খুশি হলেও মাঝে মাঝে বলে উঠত,‘বা’রে বেশ করলি, ভালো চালের বস্তাগুলান বাজারে ঝেরে এই পচা গুলান আমাকে দিছিস।’ মুক্তি আমতা আমতা করে বলে উঠত,‘কি যে বল,পুটেদা তুমি হলে কিনা জেলা কমিটির লোক, গাঁয়ের সব কিছু তো তুমিই দেখো। তুমাকে মিছা বলইব? বিল্টু বোসদের বাড়ির থেকেও লোক আসত। কাকা জ্যাঠার ছেলেরা, বিল্টু বোস নিজেও কয়েকবার এসেছে। তবে সার্টিফিকেট নিতে নয়। একবার গ্রামের রায়দের মরাইয়ে আগুন লাগাল। কারা নাকি সে সময় বিল্টুকে ঐ জায়গায় দেখে, ব্যাস আর যাই কুথা। পুলিশে রিপোর্ট হল। রাতে পুলিশ এল, বিল্টু সারাটা রাত লুকিয়ে থাকল ধানক্ষেতে। পরেরদিন ভোর হতেই পুটের বাড়ি,‘দাদা বাঁচাও, আমি ছিলম নাই গো, মিছা বলছি নাই।’
পুটে সব শোনে। ‘ঠিক আছে,তুর বউ,ছিলা সব এখন কুথাকে?’
-কুথাকে যাবেক কাল রেতের থেকে দু’চোখের পাতা এক করি নাই।
-বৌমাদের বাপের বাড়ি পাঠায় দে, আর তুই আমার ঘরকে থাক। ইখান থেইকে রাষ্ট্রপতিও ধরতে লারবেক।
বিল্টু বোস অবশ্য থাকেনি। পুটেদাকে বলে দিন পনেরো শ্বশুরবাড়ি পালায়। গ্রাম ঠাণ্ডা হয়, বিল্টু বোস গাঁয়ে ফেরে। কয়েকমাস বাদে বিল্টুর দলের একজন পাশের গ্রামে পুটেদের দলের একজনের খুনের মামলায় ধরা পড়ে, বিল্টে বোসেরও নাম জড়ায়। এবার অবশ্য বিল্টে বোস পুটের বাড়ি এলে পুটে বলে,‘ভাই সবই বুঝলম, কিন্তু দিনের আলোতে তুই এইরম ভাবে ঘরকে এলে লোকজন দেখি ফেলবেক। পরিস্থিতি তো ভাল লয়, কে কুথা থেকে খবর জানায় দিবেক আমি তুর সাথে পিরিত মানাচ্ছি।’ শেষের কথাগুলো বিল্টু বোসের গায়ে লাগে। রেগে ওঠে,‘বটে বটে আমারও দিন আসবেক, তুমাদের দিনও এবার যাবেক।’
দিন যে এত তাড়াতাড়ি বদলে যাবে সেটা পুটে এক্কেবারের জন্যে ভাবেনি। বড় বড় নেতাদের কথা মেনে আশেপাশের সব গ্রামে আগের বছরগুলোর মতই প্রচার চালানো, মিছিল মিটিং সবই চলল। কাজের কাজ কিছু হল না। সব দিক থেকে ঢেউয়ের মত হারের খবর আসতেই পুটেরা যে যার হুতরোর মধ্যে ঢুকতে আরম্ভ করে দিল। কোন দিন ভাবেনি তাদের দলেরও এমনি ভাবে বির্পযয় হবে। কয়েকজনকে চাকরির জন্য চিঠি লিখে জেলার নেতাদের কাছে পাঠালেও কোন দিন নিজের চাকরির প্রয়োজনের কথা ভুলেও ভাবেনি। অবশ্য বউ ছেলেমেয়েদের কোন দিন অভাব রাখেনি। বরং গ্রামের বাকি সবার থেকে ভালোই রেখেছে। জমিজমা কিছু আছে সেটা তবে কোন রকমে চলে যাবার মত। গাঁয়ে বিল্টু বোসদের লাফাঝাঁপা বারবার সঙ্গে পুটেকেও সরে থাকত হয়,গুটিয়ে যেতে হয়। গাঁয়ে তখন প্রথম প্রথম বিল্টুদের দল ক্ষমতায় এসেছে, হাঁটা চলার মধ্যে একটা জোর জোর ভাব। এই বুঝি সব ভেঙে আবার নতুন করে হবে। প্রায়ই মিছিল বের করে। পুটের বাড়ির কাছ দিয়ে বেরোনোর সময় সবার গলার জোর বেড়ে যায়। পুটেও মিছিলের চেষ্টা করে। কেউ বেরোতে খোঁজে না। পুটে তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে বলে,‘হ্যাঁরে আমাদের লগে জমি জিরেত হল, তুদের কাউর চাকরি হল আর তুরাই যাবি নাই? বেরুবি নাই?’
‘কিছু করবার নাই কাকা। বিল্টুদা বলি দিছে গেরামে অন্য পতাকা দেখলেই শেষ করি দিবেক। তুমিও ছাড়, শুননাই উধারের গেরামের আমাদের আর কেউ নাই। সব ইদিকে।’
কথাগুলো মন্দ নয়। সত্যি গ্রামে আর লোক নাই। দু’এক জন যারা আছে সব পুটের মতন, এক ধরণের মজবুরি। বাড়িতে এসে বউয়ের সাথে কথা বলে, আলোচনা করে, জিজ্ঞেস করে,‘কি করব?’ বউ উত্তর দেয় না। বলে,‘আমি কি জানি? তুমি ভাব, বুঝ। বিটি বড় হচে, গাঁয়েও থাকতে হবেক।’
পুটে জেলা কমিটির অফিসে যায়, বসে থেকে বোঝার চেষ্টা করে লোকজন কত কি আসছে। না এক্কেবারে নাই। হলঘরের পিছন দিকের চেয়ারে মোটা ধুলো। টেবিলটাও ভালো করে পরিষ্কার করা নেই। কয়েকজন পুটের মত লোক আসে। জেলার নেতাদের সামনে চেল্লায়, মার খাওয়ার কথা বলে অত্যাচারের কথা বলে। দাগ দেখায় জেলার নেতারা পাথরের মত বসে থাকে। গায়ে ধুলো লাগে, শরীর তাদেরও অসাড়। গ্রামে ফিরে ভালো লাগেনা কিছুই, বিল্টে বোসদের টিটকারি শুনতে হয়। গায়ে জ্বালা করে, কিছুই করার থাকে না, করা যায়ও না। কলে জল নিতে গেলে একটার বেশি দুটো বালতি নিলে কথা শোনায়। মেয়েকে কথা শোনায়। পুটেদের বাড়ির দেওয়ালে, দরজায় বিল্টে বোসরা তাদের দলের প্রতীক আঁকে, লেখে। রাতে ভয় আরো বেশি, সন্ধে থেকে খিড়কির, সদরের দরজা বন্ধ করে দেয়। কেউ ডাকলেও খোলে না, বলে সকালে এস। ঘরের জমানো টাকা ফুরায়, চাল বাড়ন্ত হয়। মেয়ের স্কুলের খরচে টান পড়ে। মাঠে ধান কাটার লোক নেই, কাটার পর বয়ে নিয়ে আসার গাড়ি নেই, বউ মেয়ের সাথে আনতে হয়। বউ বলে,‘রাখো তোমার পাটি, আগে তো পেট, প্রাণ।’ পুটে নিজের দলের অফিসে যাওয়া ছাড়ে। বিল্টের দলের মিছিলে পা মেলায়।
মাস কয়েকের শান্তি। সন্ধে বেলায় বেড়াতে পারে, কাজ করতে পারে। একশ দিনের কাজও পায়। তারপর আবার গাঁয়ের রাস্তা বাগাবার মিটিং হয়। সবার সাথে পুটেও যায়। এক মিটিংয়ে পুটের ঘরের চাল ভাঙবার কথা বলে। সেদিন পুটে রেগে যায়। বিল্টু বোসদের কাছে গিয়ে বলে, ‘আমি তো আর……………!’
-কি করব দাদা, ইখানে আমি তুমি লয়, কথা হল প্রয়োজনের।
তারপরেই মিছিলে যাওয়া বন্ধ করে। শহরের একটা দোকানে খাতা লেখার কাজ জোটায়। সকালে বেরোয় সন্ধেতে ফেরে। বাড়ির সবাইকে বলে যায়,‘কেউরির কথাকে রা কেরো না।’
রা কি মানুষে কারে রা কারে হাওয়া বাতাস, গাছের পাতা মেঘ জল, রাস্তাও। এক সন্ধেতে বিল্টে বোসের পার্টি অফিসে পুটের ডাক পড়ে। পুটে যেতেই বিল্টে বোস বলে,‘কি দাদা, আমাদের আর ভালো লাগছে নাই নাকি?’
হাসার চেষ্টা করে পুটে। ‘না ঠিক তা লয়, আসলে কাজে বেরয় যেছি তো তাই।’
-বেশ শুনো, তোমার বাড়ির রাস্তার দিকের ঘরের চালট ভেঙি দাও। রাস্তা ঘুরানোর সময় অসুবিধা হবেক।
-ঘর ভাঙি দিব! থাকব কুথাকে?
-সেট কি করব, তুমার লগে গাঁয়ের সবার অসুবিধা তো মানা যাবেক নাই।
পুটে বিল্টে বোসদের অনেক ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। নিজে এমনকি বিল্টে বোসদের জেলা অফিসে গিয়েও সব কিছু বোঝানের চেষ্টা করে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এর মধ্যে গ্রামে পাথর পড়তে আরম্ভ করে। পুকুরে কাঠের গুড়ি ফেলে বাঁধা হয়। রাস্তার ফাটাফুটি মেরামত করতে পাথর ফেলা হয়। এর মাঝে বেশ কয়েকবার পুটের ঘরের চারদিকটা মাপাও হয়।
পুটে তখন পাগলের মত ছুটছে। পঞ্চায়েতের প্রধান, বিডিও অফিস, জেলা অফিস থেকে আরম্ভ করে নিজের আগের পার্টি অফিস বাদ যায় না কিছুই। কাজ হয় না। সবার মুখে একটাই কথা,‘দেখছি কি করা যায় অথবা আমাদের তো হাত পা বাঁধা।’ অথবা ‘গ্রামের সবার যা সিদ্ধান্ত আমাদের সবার তাই সিদ্ধান্ত।’
বোল্ডারে রোলার চলে, ধাস দিয়ে রাস্তা প্লেন করা হয়। গ্রামের চারদিকে কান পাতলে একটাই কথা,‘বিল্টু বোস কাজ করলেক। এতদিন কার ফেলে রাখা রাস্তা করি তো দিলেক। ইবার গাঁট গুইনবেক।’ কয়েকদিন পরে পুটের দরজাতে ঘর ভাঙার সরকারি নোটিশ ঝোলে। গাঁয়ের লোকজন আর পুটের সাথে কথা বলে না। এক অদ্ভুত গ্রহ গাঁ’টকে কেমন যেন বদলে দেয়। পুটে কাজে যায় কিন্তু ভয়ে ভয়ে থাকে।এ ই বুঝি ঘর ভেঙে দেয়, এই বুঝি বউ মেয়ে চাপা পড়ে যায়। পুটে পঞ্চায়েতের এক সরকারি অফিসারের সাথে দেখে করে সব কথা বলে। ভদ্রলোক মন দিয়ে শুনে পরের দিন বাড়ির দলিল নিয়ে আবার অফিসে আসতে বলেন। রাতের অন্ধকারে একটা ছোট আলো জ্বলে ওঠে। পুটে তার পরের দিন আবার যায়। আফিসার দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর দেখে চমকে ওঠেন,‘একি এখানে তো রাস্তার ধারের এই জায়গাটা গোয়াল হিসাবে দেখানো রয়েছে। রাস্তার ধারে বসত বাড়ি তো নেই।’
-তাহলে!পুটের চোখ মুখ জ্বল জ্বল করে ওঠে।
-আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। আপনার ঘর ভাঙা হবে না।
গাঁয়ে ফিরে দরজার কাছ থেকেই পুটে চিত্কার করে ওঠে,‘আমার বসত বাটিকে গোয়াল দেখাবে, ঘর ভাঙার ধান্দা। তুরা শুন আমি কোর্টে যাব, দেখাচ্ছি মজা তুদের’
আশেপাশের কেউ কোন কথা বলো না। কোন প্রশ্ন করে না। কোন উত্তর নেই।
দুদিন পরেই সকালের দিকে পুটে কাজে বেরুনোর সময় দরজায় টোকা পড়ে। পুটে দরজা খুলতেই দেখে বাইরে বিল্টে বোস, তারপাশে পঞ্চায়েতের সেই অফিসার। তিনি পুটেকে দেখে একটু আমতা আমতা করে পুটের হাতে আরেকটা কাগজ গুঁজে বলে উঠলেন,‘এই দিকের ঘরটা সাতদিনের মধ্যে ফাঁকা করে দেবেন। ওটা ভাঁঙা পড়বে।’
পুটে অবাক হয়ে যায়। তাহলে সেদিন যে বুললেন,‘ইদিকের ঘরট গোয়াল বটে?’
অফিসার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তখন বিল্টে বোসের ডান হাত অফিসারের বাঁ হাতে টান দেয়।
