রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

প্রাইভেট ডিকেটিভ কে. কে. হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন,–খাইসে!জিগ্যেস করলুন,কী হল হালদারমশাই? হালদারমশাই একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে নোংরা রুমালে নাক মুছলেন। তারপর বললেন, জয়ন্তবাবুরে একখান কথা জিগাই।-বলুন হালদারমশাই।গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন,–আপনাগো কাগজে আইজ দুইখান মার্ডারের খবর লিখসে।–তাতে কী হয়েছে? কোথাও মার্ডার হয়েছে, তাই খবর লেখা হয়েছে।

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একখান মার্ডার তেমন কিসু না। ভিটিম চায়ের দোকানে বইসা চা। খাইত্যাছিল, কারা তারে বোম মারসে। কিন্তু আর একখান মার্ডার হইসে এক্কেরে ঘরের মধ্যে। ভিকটিমের মাথায় গুলি করসে খুনি। ভিকটিম তখন দরজার কাছাকাছি মেঝের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়সে। কিন্তু তার ডাইন হাতের মুঠায় একগোছা কঁচাপাকা চুল।এবার একটু কৌতূহলি হয়ে বললুম-তা হলে বোঝা যাচ্ছে ভিকটিম খুনির মাথার চুল উপড়ে নিয়েছে।

হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন,–প্রথম কথা, দরজা বন্ধ ছিল। পুলিশ দরজা ভাইঙা ওই অবস্থায় ভিকটিমরে দেখসে। কিন্তু এমন একখান হেভি মিস্ত্রির খবর আপনাগো কাগজে এইটুকখান কইরা ছাপসে। ওদিক প্রথমে যে মার্ডারের কথা কইলাম, সেইখবর ছাপসে বড় কইরা প্রথম পাতায়। ক্যান? আমি আমাদের কাগজ মন দিয়ে পড়ি না।

তা ছাড়া কাল শনিবার আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসেও যাইনি। হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে বললাম,–এমন হতে পারে প্রথম পাতার ভিকটিম একজন ভি.আই.পি। আর দ্বিতীয় খবরটা হয়তো দেরিতে পাওয়া গিয়েছিল। তখন কাগজে যেটুকু জায়গা ছিল, খবরটা কাটছাঁট করে কোনওরকমে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নাইট এডিটর।হালদারমশাই তেমনই উত্তেজিতভাবে বললেন,–নাইট এডিটর ঠিক করেন নাই।

অমন হেভি মিস্ত্রি! ভিকটিমের হাতের মুঠোয় খুনির চুল! তারপর আরও হেভি মিস্ত্রি, দরজা যখন বন্ধ ছিল তখন খুনি পলাইল কোন পথে? কর্নেল তার টাইপরাইটারে সম্ভবত প্রজাপতি, অর্কিড বা দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির পাখি নিয়ে প্রবন্ধ লিখছিলেন। এতক্ষণে তার কাজ শেষ হল। তারপর টাইপ করা কাগজগুলো গুছিয়ে ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন। এবং বললেন,–হালদারমশাই, খবরটা ছোট করে লেখা হলেও আপনি কয়েকটা পয়েন্ট মিস করেছেন।-মিস করসি? কী মিস করসি কন তো কর্নেল স্যার।

কর্নেল টাইপরাইটারের কাছ থেকে উঠে এসে আমাদের কাছাকাছি তার ইজিচেয়ারে বসলেন। তারপর চুরুট ধরিয়ে বললেন,–একটা লাইন আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে। দরজার ল্যাচ-কি ছিল। তার মানে কেউ ঘরের ভেতর থেকে ল্যাচ-কি তে চাপ দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাইরে থেকে আর খোলা যায় না।

আমার অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার দরজা কী আপনি লক্ষ করেননি? হালদারমশাই বলে উঠলেন,–হঃ! আপনি ঠিক কইসেন।বলে তিনি আবার সেই অংশটা পড়ার জন্য কাগজটা তুলে নিলেন। তারপর যথারীতি বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ হলে তিনি বললেন,–আর কী মিস করসি বুঝলাম না।

কর্নেল বললেন,–ভিকটিমের মুঠোয় ধরা পঁচাপাকা চুলের গোছা উল্লেখ করে খবরে লেখা হয়েছে, চুলগুলো পুলিশ সহজেই টেনে বের করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।হালদারমশাই বললেন,–ওই লাইনটা আমি মিস করি নাই কর্নেল স্যার! ওই চুল তো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোই লাগবো।কর্নেল হাসলেন,–হালদারমশাই কোনও মৃত মানুষের হাতের মুঠিতে আটকে থাকা কোনও জিনিস সহজে খুলে নেওয়া যায় না।

আপনি তো এসময় পুলিশের চাকরি করেছেন, ওই সহজ কথাটা আপনার চোখ এড়িয়ে গেল কী করে? অমনি হালদারমশাই নড়ে সিধে হয়ে বসলেন। তারপর কাঁচুমাচু হেসে বললেন,–হঃ, আমারই ভুল।এবার আমি জিগ্যেস করলুম,–কর্নেল, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন খুনিই ওই চুলগুলো ইচ্ছে করে পুলিশকে মিস গাইড করার জন্য হাতে গুঁজে দিয়েছিল।

তাই কি? কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–এজন্যই তোমাকে বলি জয়ন্ত, তুমি বোঝে সবই, তবে দেরিতে।এবার আমি খবরটা পড়ার জন্য হালদারমশাইয়ের কাছ থেকে কাগজটা নিলুম। হেডিংটা ছোট্ট ‘কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে রহস্যময় খুন’। খবরটা এক লাইন পড়েই বুঝতে পারলুম, ওটা আমাদের নতুন ক্রাইম রিপোর্টার দীপকেরই লেখা।সবে দুটো লাইন পড়েছি, এমনসময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল অভ্যাসমতো হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!

হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–এবার দ্যাখেন কে আসে!কথাটা শুনে বুঝতে পারলুম বরাবর যেমন হয়, কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রইংরুমে যখনই আমরা কোনও রহস্যময় ঘটনা নিয়ে আলোচনা করি, তখনই সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ-না-কেউ এসে পড়েন।কিন্তু আমাদের নিরাশ করে ঘরে ঢুকলেন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের এক ভদ্রলোক। তার পরনে সাদা-সিধে ধুতি-পাঞ্জাবি। হাতে একটা বাদামি রঙের ব্রিফকেস।

তিনি ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–কর্নেলসাহেব কি আমাকে চিনতে পারছেন? কর্নেল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছিলেন। বললেন, আমি যদি ভুল না করি তাহলে আপনি যদুগড়ের মধুরবাবু।ভদ্রলোক সোফায় বসে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনার স্মৃতিশক্তির ওপর আমার বিশ্বাস এখনও আছে। আপনি আমাকে ঠিক চিনেছেন। আমি যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার হতভাগ্য মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেই বটে।লক্ষ করলুম কর্নেলের চোখে যেন বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

তিনি বললেন, আমি আপনাকে চিনেছি বটে, কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যে আপনার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর রুদ্রনারায়ণ রায় আপনাকে ‘বাবুর বাবু’ বলে পরিহাস করতেন, কারণ আমিও দেখেছি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ বিলাসিতা ছিল। আপনার চেহারাতেও প্রাণবন্ত। ভাব ছিল। কিন্তু এখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি যেন দীর্ঘকাল রোগে ভুগেছেন।

মধুরবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার জীবনে এই তিনবছরে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। আমি যদুগড় ছেড়ে এসেছি তিন বছর আগে। কলকাতায় এক বিধবা দিদির কাছে বাস করছি। দিদির একটি মাত্র ছেলে। সে থাকে বোম্বেতে। যাই হোক, যেজন্যে আজ হঠাৎ আপনার কাছে এসে হাজির হয়েছি, তা বলি।

বলে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই, জয়ন্ত চৌধুরি, দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক, আর উনি প্রাইভেট ডেটেকটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার। তবে আমরা ওঁকে হালদারমশাই বলি।মধুরবাবু এবং আমাদের মধ্যে নমস্কার বিনিময় হল। তারপর তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন,–আমার কথাগুলো গোপনীয়।

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–যত গোপনীয়ই হোক, আপনি এদের সামনে স্বচ্ছন্দে খুলে বলতে পারেন। কারণ এরা দুজনেই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তবে আগে কফি খান। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। বলে কর্নেল হাঁক দিলেন,ষষ্ঠী, কফি কোথায়? ঠিক সেই মুহূর্তেই কফির-ট্রে হাতে নিয়ে ষষ্ঠী ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

তারপর ট্রে সেন্টার-টেবিলে রেখে নিঃশব্দে চলে গেল। আমি জানি কর্নেলের ঘরে নতুন কেউ এলেই ষষ্ঠী দ্রুত কফি তৈরি করে ফেলে।মধুরবাবুকে কর্নেল এক পেয়ালা কফি তুলে দিলেন। তারপর নিজে এক পেয়ালা কফি তুলে নিয়ে বললেন,–মধুরবাবু, কুমারবাহাদুরের কোনও খবর রাখেন?মধুরবাবু মাথা নেড়ে বললেন,–না।

তবে কুমারবাহাদুরের মেয়ে বল্লরীকে আমি আমার দুঃখ জানিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলুম। বল্লরীকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলুম। সে আমাকে আগের মতোই আপনজন ভেবে চিঠির উত্তর দিয়েছিল। তার বাবা নাকি এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই প্রায়ই আমার কথা বলেন।

বল্লরী রাগ করে বাবাকে আমার ঠিকানা দেয়নি। লিখেছিল,–কাকাবাবু আপনি এখানে ফিরে আসুন।কফি শেষ করে মধুরবাবু বললেন,–এবার তা হলে ব্যাপারটা বলি।কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন,–হাঁ বলুন।মধুরবাবু আবার একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ঘটনাটা ভারি অদ্ভুত।

গত পরশু, শুক্রবার বিকেলে অভ্যাস মতো আমি গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলুম। গঙ্গাদর্শনে আমার মন শান্ত হয়। তো আউটরাম ঘাটের দিকে একটা খালি বেঞ্চে বসে গঙ্গাদর্শন করছিলুম। রবিবার ছাড়া অন্যদিন গঙ্গার ধারে লোকজন কমই থাকে। কিছুক্ষণ পরে প্যান্টশার্ট পরা এক ভদ্রলোক বেঞ্চের অন্য কোণে এসে বসলেন। তাকে একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। এর কোনও কারণ ছিল তা নয়।

বেড়াতে গিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। যদি দৈবাৎ ভদ্রলোক যেচে পড়ে কথা শুরু করেন সেই ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের মুখে একরাশ কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ, মাথায় তেমনই এলোমেলো একরাশ কাঁচাপাক চুল। প্যান্ট-শার্ট-জুতো অবশ্য বেশ পরিচ্ছন্ন। একটু পরে চোখের কোনা দিয়ে দেখলুম তিনি ব্রিফকেসের ওপর একটা কাগজ রেখে কিছু লিখছেন।

লেখা শেষ হলে কাগজটা তিনি ভাঁজ করলেন। তারপর গঙ্গার দিকে আপন মনে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে সূর্য লাল হয়ে যখন অস্ত যাচ্ছে তখন লক্ষ করলুম তিনি ডানদিকে ঘুরে কী যেন দেখলেন। তারপর আমাকে ভীষণ অবাক করে বললেন,–কিছু যদি মনে করেন একটা অনুরোধ করব। আমি বললুম,–অনুরোধের কী আছে, বলুন। তিনি বললেন,–প্লিজ, আমার এই ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখুন।

আর এই চিঠিটা পড়ে দেখুন। কথাটা বলেই তিনি ব্রিফকেসটা একরকম জোর করেই আমার দুই উরুর ওপর রেখে সেই ভাঁজকরা কাগজটা আমার বুক পকেটে গুঁজে দিলেন। তারপর সবেগে পিছনের রেললাইন ডিঙিয়ে তিনি গাছপালার আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। আমি তো ভীষণ হতবাক হয়ে গেছি। তারপর পকেট থেকে সেই ভাঁজ করা কাগজটা খুলে পড়তে-পড়তে আমার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে গেল। কাগজটা আপনাকে দেখাচ্ছি।

কর্নেল বললেন, আপনার হাতে যে ব্রিফকেসটা দেখছি, ওটা নিশ্চয়ই সেই ভদ্রলোকের ব্রিফকেস।-ঠিক ধরেছেন। এটা আমার হাতে মানায় না। বেশ দামি ব্রিফকেস। বলে তিনি বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ কর্নেলকে দিলেন।কর্নেল ভাঁজ খুলতে-খুলতে জিগ্যেস করলেন,–একটা কথা। ওই ব্রিফকেসটা কি আপনি খুলেছিলেন, বা খোলার চেষ্টা করেছিলেন?মধুরবাবু বললেন,–আজ্ঞে না কর্নেলসাহেব।

আপনি তো আমাকে ভালোই জানেন। আমি কী প্রকৃতির মানুষ। হ্যাঁ, বলতে পারেন, মানুষের স্বভাব বদলায়, কিন্তু আমি বদলাইনি। তা ছাড়া আমার একটা ভয়ই পিছু ছাড়ছে না। যদি ব্রিফকেসটা খুলতে গেলেই কোনও সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটে যায়। আপনি তো জানেন আজকাল সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিরা এভাবে বিস্ফোরণ ঘটায়।

হালদারমশাই কান খাড়া করে কথা শুনছিলেন। তিনি বলে উঠলেন,–হঃ, ঠিক কইসেন। ওটার মধ্যে সাংঘাতিক এক্সপ্লোসিভ কিছু থাকতেও পারে। আর একটা কথা কই আমি। চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করসি। তাই আমার সন্দেহ হইত্যাসে সেই ভদ্রলোক আপনার কোনও শত্রুর চর হইতেও পারে।

কী কন কর্নেল স্যার! কর্নেল কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ে মধুরবাবুর দিকে তাকালেন, এটা একটা চিঠি। দেখা যাচ্ছে সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ ‘বারিন’ বলে যিনি স্বাক্ষর করেছেন, তাকে কি আপনি একটুও চিনতে পারেননি? –নাঃ এটাই আমার দুর্ভাগ্য। বারিনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা বছর দশেক আগে।

সে যদুগড়ে তার ব্যবসার ব্যাপারে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। দৈবাৎ রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা হয়। তখন তার মুখে দাড়ি ছিল না। তাছাড়া গায়ের রং ছিল খুব ফরসা। দশ বছর পরে সে মুখে একরাশ গোঁফদাড়ি নিয়ে আমার পাশে বসলে আমার পক্ষে তাকে চেনা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।

কর্নেল বললেন,–দ্যাখা যাচ্ছে সে আপনাকে চিনতে পেরেই আপনার কাছে এসে বসেছিল। বরং আমার অনুমান, তার কোনও শত্রু ওই সময়েই গঙ্গার ধারে তাকে ফলো করে আসছিল। তা ছাড়া চিঠি পড়ে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, সেই শত্রুর লক্ষ ছিল তাকে খুন করে ব্রিফকেসটা হাতানো। যাই হোক, চিঠির কথা পরে। এবার আপনি বলুন, তার অনুরোধমতো আপনি কী কাল সকালে তার ঠিকানায় ব্রিফকেসটা পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন।

–আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলুম আর শুনলুম— কর্নেল তার কথার ওপর বললেন,–বারিনবাবু তার ঘরে খুন হয়েছেন, তাই না? ..মধুরবাবু দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। আত্মসম্বরণ করার পর তিনি ধরা গলায় বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে গিয়ে দেখি, একটা দোতলা বাড়ির সামনে পুলিশের কয়েকটা গাড়ি আর বাড়ির ভেতরে-বাইরে পুলিশ গিজগিজ করছে।

আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন আগেই, কিন্তু কী ঘটেছে তা জানার জন্য একজন পান-সিগারেট বিক্রেতার কাছে একটা সিগারেট কিনলুম। তারপর তাকে জিগ্যেস করলুম, এখানে এত পুলিশ কেন দাদা? লোকটা বলল, ওই বাড়ির দোতলায় এক ভদ্রলোক থাকতেন। তাকে কে বা কারা গতরাত্তিরে কখন খুন করে গেছে।

সকালে একটা হোটেল থেকে ওর জন্যে ব্রেকফাস্ট নিয়ে গিয়েছিল একটা লোক। সে দরজা বন্ধ দেখে ডাকাডাকি করে। কিন্তু সাড়া পায়নি। তারপর হঠাৎ তার চোখে পড়ে দরজার বাইরে চাপ-চাপ খানিকটা রক্তের ছোপ। অমনি সে হোটেলে খবর দেয়। তারপর পাড়ার লোকেরা জড়ো হয়, পুলিশ ডাকে।মধুরবাবু দম নিয়ে বললেন,–কথাগুলি শোনামাত্র আমি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলুম। তারপর আমার দিদি নিরুপমাকে সব কথা খুলে বলেছিলুম।

সে খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমাকে পুলিশের কাছে যেতে বারণ করেছিল। তার মতে পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করবে না, উলটে আমাকেই হয়তো খুনি সাব্যস্ত করবে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্রিফকেসে যদি চোরাই মাল থাকে? দিদির কথা শুনে আমি আর থানায় যাইনি। তারপর গত রাতে নানাকথা ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় আপনার কথা। আপনার নেমকার্ডটা আমি খুঁজে পাইনি। তাছাড়া দিদির বাড়িতে টেলিফোনও নেই।

তাই সকাল হলে সোজা আপনার বাড়ি চলে এলুম। আপনার এ-বাড়িতে আমি একবার কুমারবাহাদুরের চিঠি নিয়ে এসেছিলুম, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে? কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তবে আপাতত একটা কাজ জরুরি বলে মনে হচ্ছে। কাজটা হল এই ব্রিফকেসটা খুলে ফেলা। চিন্তার কারণ নেই আমার কাছে মেটাল বা এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর যন্ত্র আছে।বলে কর্নেল উঠে গেলেন। আমরা হতবাক হয়ে বসে রইলুম।

দুই

লক্ষ করছিলুম হালদারমশাইয়ের চোখদুটি যথারীতি গুলি-গুলি হয়ে উঠেছে এবং গোঁফের দুই সুচাল ডগা তিরতির করে কাঁপছে। তিনি আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, আমার বিশ্বাস ব্রিফকেসটার ভেতরে টাকাকড়ি কিংবা সোনাদানা আছে।আমি কিছু বলার আগেই কর্নেল এসে ব্রিফকেসটার ওপর একটা ছোট্ট ডিটেকটর ছোঁয়ালেন।

কোনও শব্দ শোনা গেল না। মধুরবাবুকেও উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন,–মেসিনটা দিয়ে কী বুঝলেন কর্নেলসাহেব? কর্নেল দ্বিতীয় ডিটেকটরটা ব্রিফকেসের ওপর ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে হাসিমুখে বললেন, –আমাদের নিরাশ করল ব্রিফকেসটা।

এতে বিস্ফোরকও নেই, আবার কোনো অস্ত্রশস্ত্রও নেই।গোয়েন্দপ্রবর বলে উঠলেন, তা হলে আমি যা কইসিলাম জয়ন্তবাবুরে, তাই-ই সইত্য।বললুম,–হ্যাঁ, টাকাকড়ি সোনাদানা থাকতেও পারে। তবে সে সব থাকলে বারিনবাবু কি তার পুরোনো বন্ধুর হাতে বিশ্বাস করে রেখে যেতে পারতেন কি না, সেটা মধুরবাবুই বলতে পারবেন।

মধুরবাবু বললেন,–বারিন চিঠিতে লিখেছে ইচ্ছে হলে আমি তালা ভেঙে ব্রিফকেস খুলে দেখতে পারি কী আছে। কারণ সে জানে আমি তার কোনও জিনিস হাত দেব না, বা তালাও ভাঙব না।কর্নেল বললেন, তা হলে কী করা যায় আপনিই বলুন মধুরবাবু? –আজ্ঞে? আমি কী বলব? আপনি যদি ওটার তালা ভেঙে ভেতরে কী আছে দেখতে চান, আমার তাতে আপত্তি নেই। বরং জয়ন্তবাবু আর হালদারমশাই দুজন সাক্ষী থাকবেন।

কর্নেল হালদারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–হালদারমশাই, আপনি কী বলেন? হালদারমশাই এবার গম্ভীরমুখে বললেন,–আমি কী আর কমু, ব্রিফকেসের মালিক তো খুন হইয়া গেসেন। কাজেই এটা একটা মার্ডার কেস। তাই আমার মতে ওটা না ভাইঙা ও.সি. হোমিসাইডেরে খবর দিলে ভালো হয়।মধুরবাবু হাত তুলে মাথা নেড়ে আপত্তি জানিয়ে বললেন,–না-না, ওকাজ করলে আমি মারা পড়ে যাব। পুলিশ আমাকে ছাড়বে না।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন,–তা ঠিক। কিন্তু আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি। আপনি তো আমার কাছে এসেছেন। পুলিশের কাছে গেলে ঝামেলা হবে বলেই এসেছেন–তাই না? মধুরবাবু ব্যস্তভাবে বললেন,–হা, কর্নেলসাহেব। –তা হলে এটার ভেতর কী আছে তা জানতে আমাদের যেমন আগ্রহ, আপনারও তাই। মধুরবাবু বললেন,–হা। বারিনের কাজকর্মের খবর বহুকাল আমি জানি না।

আমার ধারণা ব্রিফকেসটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েই আমাকে দিয়ে কেটে পড়েছিল। কাজেই আপনি যদি তালা ভেঙে ভেতরের জিনিস দেখে নেন, তাহলে বারিনকে খুনের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।এবার কথাটা হালদারমশাইয়ের মনঃপুত হল। তিনি বললেন,–হঃ, এটা একটা পয়েন্ট বটে। পুলিশ খুনের মোটিভ বুঝে পাওয়ার আগেই আপনি তা পাইয়া যাবেন।

কর্নেল হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা ছোট বড় ভ্রু-ড্রাইভার এবং একটা ছোট্ট হাতুড়ি বের করলেন। তারপর ব্রিফকেসটা কোলে রেখে একটা ভ্রু-ড্রাইভারের মাথায় আস্তে হাতুড়ির ঘা দিতে থাকলেন। দুমিনিটের মধ্যেই একটা লক খুলে গেল। দ্বিতীয় লকটা খুলতে তার চেয়ে কম সময় লাগল। তারপর ব্রিফকেসটা তিনি টেবিলে রেখে ডালা খুললেন।

আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলুম ব্রিফকেসের ভেতর একটা টার্কিস তোয়ালে ভরা আছে। কর্নেল সেটা তুলে নিতেই দেখা গেল খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা প্রায় ব্রিফকেসের তলার সাইজের। কাগজের মোড়ক খোলার পর দেখলুম তিনটে একই সাইজের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি।

কর্নেল একটা-একটা করে ছবি আমাদের দেখালেন। তিনটে ছবিই পোর্ট্রেট। ফটোগ্রাফ নয়, অয়েল পেন্টিং। একটা ছবি নানা অলঙ্কারে সেজে থাকা এক মহিলার। বাকি দুটো দুজন পুরুষের। একজন যুবক, অন্যজন বয়স্ক। তিনটি ছবি দেখেই বোঝা যায় এই মানুগুলি অভিজাত পরিবারের। কর্নেল আতস কাঁচের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–তিনটি ছবির চিত্রকর একজন সাহেব বলে মনে হচ্ছে। জড়ানো ইংরেজি হরফে লেখা আছে “আর মার্লিন’ বা মার্টিন।

আমি বিখ্যাত চিত্রকরদের অনেকের নামই জানি না। তবে আমার কাছে বিদেশি চিত্রকরদের একটা এনসাইক্লোপিডিয়া আছে। সঠিক নামটা পেতেও পারি, কারণ দেখে তো মনে হচ্ছে এরা রাজা মহারাজা পরিবারের লোক। আর ছবিগুলোও আঁকা বহুবছর আগে।মধুরবাবু বললেন,–এবার ছবির তলায় কিছু আছে নাকি দেখুন তো।কর্নেল ছবি তিনটে টেবিলে রাখলেন তারপর ব্রিফকেসটা উপুড় করে ঝাড়বার ভঙ্গি করলেন। বললেন,–নাঃ, আর কিছু নেই।

আমি বললুম,–ওপরের ডালার ভেতরে একটা চেন দেখতে পাচ্ছি।আমি আর কিছু বলার আগেই কর্নেল চেন টেনে ভেতর থেকে কতকগুলো নেমকার্ড বের করলেন। তারপর বললেন,–নানা জায়গার নানা লোকের নেমকার্ড। এদের কেউ-কেউ কোনও কোম্পানির লোক।মধুরবাবুকে হতাশ দেখাচ্ছিল। তিনি বিস্ময়ের সুরে আস্তে বললেন,–এই তিনটে ছবির জন্য।

বারিন অমন করে ভয় পেয়ে পালালই বা কেন? সে কি এই ছবিগুলোর জন্যই খুন হয়ে গেল? কর্নেলসাহেব আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে আপনিই এই অদ্ভুত ঘটনার পিছনে কী আছে তা জানতে পারবেন, কারণ আপনার পরিচয় আমি ভালোই জানি।কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,–ঘটনাটা রহস্যজনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই রহস্য ফাঁস করতে হলে আপনার সাহায্য দরকার।

একটা কথা আপনাকে খুলেই বলি, আপনি যদি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন তবেই আমার পক্ষে ঠিকভাবে হাঁটা সম্ভব হবে।মধুরবাবু বললেন, আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। অবশ্য যদি এমন কোনও প্রশ্ন করেন যে বিষয়ে আমার জানা নেই তাহলে আমি ঠিক উত্তর দিতে পারব না।

এবার কে জানে কেন গোয়েন্দাপ্রবরের মুখে খি-খি হাসি শোনা গেল। তিনি বললেন,–এটা যে আদালতের ব্যাপার হইয়া গেল। যাহা বলিব সইত্য বলিব, মিথ্যা বলিব না।কর্নেল হেসে উঠলেন। বললেন,–ঠিক ধরেছেন। যাইহোক, মধুরবাবু প্রথমে আপনি আমার এই প্রশ্নটার উত্তর দিন। বারিনবাবুর পুরো নাম কী? আর তার সঙ্গে কবে কোথায় কোন সূত্রে আপনার পরিচয় হয়েছিল?

 

Read more

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (২য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.