রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (২য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

মধুরবাবু বললেন,–বারিনের পুরো নাম, বারীন্দ্রনাথ সিনহা। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ যদুগড় রাজ হাইস্কুলে। ওর বাবা ছিলেন রেলের অফিসার। যদুগড়ে বদলি হয়ে আসার পর বারিনকে তিনি ক্লাস সিক্সে ভরতি করে দেন। বারিন ছিল খুব আলাপি ছেলে। আমার সঙ্গে ওর হৃদ্যতা ছিল সবচেয়ে বেশি। তখন আমার বাবা ছিলেন যদুগড় রাজপরিবারের ম্যানেজার।

যাইহোক, আমরা দুজনে ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে পাটনার কলেজে পড়েছিলুম। বি.এ. পাশ করে বারিন কোথায় চলে গিয়েছিল জানি না। ওর বাবা রিটায়ার করে যদুগড়েই বাড়ি করেছিলেন। তার কাছে বারিনের কথা জানতে চাইলে তিনি রাগ করে বলতেন, ওই হতভাগার কথা তুমি জিগ্যেস কোরো না আমাকে।

আমি জানি না সে কোথায় কী করছে।কর্নেল বললেন, তারপর বারিনের সঙ্গে আপনার আবার কবে দেখা হয়েছিল? –আগেই বলেছি বছর দশেক আগে। সে যদুগড়ে কোনও কোম্পানির ব্যবসার কাজে এসেছিল।–বারিনবাবুর বাবা কি তখন বেঁচে ছিলেন? –না, তিনি মারা যাওয়ার পর বারিনের মা তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ভাগলপুরে।

তারপর তিনি যদুগড়ের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে জামাইয়ের কাছে গিয়ে থাকতেন।–বারিন আপনার কাছে এসব কিছু জানতে চায়নি? নাকি সে তার মায়ের এবং বোনের খবর জানত?মধুরবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–বারিন এ কথা জানত। সে বলেছিল, সে তখন বম্বেতে বড় একটা কোম্পানিতে কাজ করে। সেই কাজের সূত্রেই তাকে যদুগড়ে আসতে হয়েছে।

আমি তাকে রাজবাড়িতে আমাদের কোয়ার্টারে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল তার হাতে আর সময় নেই। এখুনি তাকে পাটনায় চলে যেতে হবে।-–আচ্ছা মধুরবাবু একটু স্মরণ করার চেষ্টা করুন তো, যদুগড়ে কোন ব্যবসায়ীর কাছে। বারিনবাবু এসেছিলেন? তা কি তিনি আপনাকে বলেছিলেন? মধুরবাবু চোখ বুজে কিছুক্ষণ আঙুল খুঁটলেন।

তারপর চোখ খুলে বললেন,–হা, বারিন আমাকে বলেনি, কিন্তু আমি তাকে হরদয়াল ট্রেডিং এজেন্সির অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলুম।কর্নেল বললেন,–ওই অফিসটা যে ব্যবসা সংক্রান্ত তা বোঝা যাচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন বা জানতেন ওরা কীসের ব্যবসা করত।

মধুরবাবু এবার বিকৃত মুখে বললেন,–হরদয়াল ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ব্যবসা করত। কিন্তু যদুগড়ে ওর বদনাম ছিল স্মাগলার বলে। একবার ওকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছিল। হংকং থেকে নেপাল থেকে যেসব ইলেক্ট্রনিক জিনিস চোরাচালান হয়, সেই চক্রের সঙ্গে হরদয়ালের যোগাযোগ ছিল।

–এখন কি ওই ট্রেডিং এজেন্সিটা আছে? –তিন বছর আগে আমি যদুগড় থেকে চলে এসেছি। তখন ওটা ছিল, তা দেখেছি। হরদয়াল মারা গেলে তার ছেলে রামদয়াল ব্যবসা চালাত। এই তিন বছরে সেটা উঠে গেছে কি না জানি না।কর্নেল বললেন, আপাতত আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। এবার আপনি আপনার কলকাতার ঠিকানা দিন।

বলে কর্নেল একটা কাগজের প্যাড আর কলম এগিয়ে দিলেন। মধুরবাবু তাতে নিজের নাম, বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলেন।কর্নেল সেটা হাতে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রেখে ব্রিফকেসের ছবিগুলো আগের মতো কাগজের মোড়কে ভরে রেখে দিলেন। তারপর তোয়ালেটা হঠাৎ কী খেয়ালে খুলে পায়ের কাছে ঝাড়লেন। তখনই দেখলুম তোয়ালের ভেতর থেকে একটা লম্বা-চওড়া খাম মেঝেয় ছিটকে পড়ল।

মধুরবাবু বলে উঠলেন,–আরে ওটা আবার কী? কর্নেল খাম খুলে একটা ভাঁজ করা খুব পুরোনো কাগজ বের করলেন। কাগজের ভাঁজগুলো কোথাও-কোথাও একটু আধটু ছিঁড়ে গেছে। সাবধানে ভাঁজখুলে অভ্যাসমতো তিনি আতস কাঁচের সাহায্যে দেখতে-দেখতে বললেন,–মধুরবাবু, রহস্য আরও ঘনীভূত হল মনে হচ্ছে।

মধুরবাবু সোফা থেকে একটু উঁচু হয়ে কাগজটা দেখতে-দেখতে বললেন, এটা একটা ম্যাপ মনে হচ্ছে! ম্যাপটাতে শুধু আঁকিবুকি ছাড়া স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই।কর্নেল বললেন,–আছে, তবে সেগুলোতে ইংরেজি এ বি সি ডি ইত্যাদি অক্ষর লেখা আছে। ম্যাপের দাগগুলো মোটা কিন্তু অক্ষরগুলো ছোট তাই সহজে চোখে পড়ে না।

মধুরবাবু জিগ্যেস করলেন,–এটা কীসের ম্যাপ বলে মনে হচ্ছে আপনার? কর্নেল একটু থেমে বললেন,–এটা কোনও জায়গার ম্যাপ হতে পারে, তবে ও ম্যাপ আঁকার উদ্দেশ্য কী এখন অনুমান করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে বললেন,–কর্নেলস্যার, কোথাও কোনও দামি জিনিস লুকোনো আছে-এটা তারই ম্যাপ হইতে পারে না? জয়ন্তবাবু কী কন? সায় দিয়ে বললুম,–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই।

এটা যাকে বলে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের ম্যাপ।মধুরবাবু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন,–গুপ্তধন? বারিন কি কোনও গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছিল? তা না হলে এ ম্যাপ সে এঁকে লুকিয়ে রাখল কেন? কর্নেলসাহেব এখন আমার মনে হচ্ছে ছবিগুলোর জন্য নয়, এই লুকিয়ে রাখা ম্যাপটার জন্যই বারিনকে কেউ অনুসরণ করেছিল। আর এটা না পেয়েই রাগের চোটে সে বারিনকে খুন করে চলে গেছে।

কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–মধুরবাবু আপনি কি ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখতে চান? মধুরবাবু হাত এবং মাথা জোরে নেড়ে বললেন,–না-না কর্নেলসাহেব, ওই সর্বনেশে জিনিস আমার কাছে রেখে আমি কি স্বেচ্ছায় কারও হাড়িকাঠে গলা গলিয়ে দেব? ওসব সাংঘাতিক জিনিস আপনিই রাখুন।

আর আমার একটা অনুরোধ, বারিন আমার এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তার এই শোচনীয় পরিণতির জন্য আমার মনে খুব আঘাত লেগেছে। আপনি দয়া করে বারিনের খুনিকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। আর সেইসঙ্গে সেই ম্যাপের রহস্য ফাঁস করুন। আমাকে আপনি সবসময়েই পাবেন।

কর্নেল ম্যাপটা খামে ভরে ভোয়ালের ভাঁজে রেখে ব্রিফকেসে ঢোকালেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার একটা নেমকার্ড বের করে মধুরবাবুকে দিলেন। বললেন,–দরকার হলে আপনি আমাকে ফোন করবেন। আর যদি প্রয়োজন মনে করেন, আপনার দিদিকেও আমার কথা খুলে বলবেন। কারণ তাঁর সাহায্যও যে আমার লাগবে না এমন কথা বলা যায় না।

মধুরবাবু চলে যাওয়ার সময় আমাকে ও হালদারমশাইকেও নমস্কার করে গেলেন।কর্নেল ব্রিফকেসটা নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। বুঝতে পারলুম তিনি এই কেসটাতে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। গুরুত্ব দেওয়ারই কথা, কারণ এই ব্রিফকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে তা প্রচণ্ড রহস্যময়।হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–আচ্ছা জয়ন্তবাবু, মধুরবাবুরে দেইখ্যা আপনার কী ধারণা হইল কন শুনি।

বললুম,–আপাত দৃষ্টিতে সাধাসিধে লোক বলেই মনে হল। একসময় খুব বিলাসিতায় জীবন কাটাতেন তা তো শুনলুম, কিন্তু এখন হয়তো তার তেমন কিছু রোজগার নেই। বিধবা দিদির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ইচ্ছে করলে তিনি তো ব্রিফকেসটার তালা ভেঙে টাকাকড়ি সোনাদানা আছে কি না দেখতে পারতেন। অন্য লোকে অন্ততত আগ্রহের জনও তেমনটি করে। কিন্তু উনি তা করেননি।

গোয়েন্দাপ্রবর একটিপ নস্যি নিয়ে নোংরা রুমালে নাক মুছে বললেন,–কিছু কওন যায় না। মাইনসের চেহারা দেইখ্যা বা কথা শুইন্যা কিছু বোঝা যায় না। জয়ন্তবাবু, চৌত্রিশ বৎসর চাকরি করসি– এই সময়েই কর্নেল ফিরে এসে বললেন,–হালদারমশাই আপনার চৌত্রিশ বছরের পুলিশি অভিজ্ঞতা দিয়ে আপাতত একটা কাজ করে ফেলুন।

হালদারমশাই ব্যগ্রভাবে বললেন,–কন কর্নেলস্যার।কর্নেল বললেন,–আপনাকে আমি নিহত বারিনবাবুর ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। আপনি আজ সন্ধ্যার মধ্যেই একটা খবর এনে দিন। ও বাড়িতে বারিনবাবু কি একা থাকতেন, নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ থাকত?কথাটা শোনামাত্র গোয়েন্দাপ্রবর কোনও কথা বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

তিন

এমনিতেই রবিবারের দিনটা আমি কর্নেলের বাড়িতে কাটাই। কিন্তু কোনও রহস্যজনক ঘটনার পিছনে দৌড়াতে হলে কর্নেলের হাত থেকে আমার রেহাই মেলে না। তাছাড়া আমার স্বার্থও থাকে। কারণ সেই ঘটনার ভিত্তিতে পাতার পর পাতা রিপোর্টিং লিখে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় প্রকাশের সুযোগ পাই এবং তাতে পত্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে সুনাম কুড়োই।

দুপুরে খাওয়ার পর অভ্যাসমতো ডিভানে চিত হয়ে ছিলুম। সেই সময় লক্ষ করলুম কর্নেল ঘরের ভেতর থেকে সেই ব্রিফকেসটা নিয়ে এলেন। তারপর সেটার ভেতর থেকে সেই ম্যাপটা বের করলেন। আমার চোখে ঘুমের টান এসেছিল, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল কর্নেল ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে তা থেকে কোনও সূত্র বের করবেন।তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। ঘুম ভাঙল ষষ্ঠীচরণের ডাকে।

তার হাতে যথারীতি চায়ের কাপ-প্লেট। এটা বহুদিনের রীতি। ষষ্ঠী জানে ঘুমের পর আমি চা খেতেই ভালোবাসি। ডিভানে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে জিগ্যেস করলুম,–ষষ্ঠী তোমার বাবামশাই কি সাধের বাগান পরিচর্যা করতে গেছেন? ষষ্ঠী ফিক করে হেসে বললে,–আজ্ঞে দাদাবাবু, উনি আমাকে বলে গেছেন, তোর দাদাবাবুকে বলবি তার গাড়িটা আমি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি।এমন ঘটনা নতুন নয়।

কিন্তু বরাবরই এতে আমার রীতিমতো অভিমান হয়। কেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে ওঁর কোনও অসুবিধা হয়? বললুম,–তোমার বাবামশাই কখন ফিরবেন তা কি বলে গেছেন?ষষ্ঠী বলল,–আজ্ঞে না। বলেই সে চমকে ওঠার ভঙ্গি করল–এই রে! সাড়ে-চারটে বাজতে চলল। ছাদের বাগানের কথা ভুলেই বসে আছি।

সে দ্রুত চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। চা খাওয়ার পর কাপ প্লেটটা নিয়ে সোফার কাছে গেলুম এবং সেটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিলুম। ঠিক এই সময়ই টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই হালদারমশাইয়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,কর্নেল স্যার, আমি হালদার কইত্যাদি।কর্নেলের কণ্ঠস্বর নকল করার চেষ্টা করে বললুম-বলুন হালদারমশাই।

কিন্তু গোয়েন্দপ্রবরকে যতই অবহেলা করি, তার কান প্রাক্তন পুলিশের কান। তিনি বললেন, –জয়ন্তবাবু, এখন জোক করার মুডে আমি নাই।অগত্যা হাসতে-হাসতে বললুম,–আপনি কি ছদ্মবেশে আছেন, নাকি কেউ আপনাকে অ্যাটাক করেছিল?হালদারমশাই বললেন,–বুসছি, কর্নেল স্যার ছাদের বাগানে আছেন। থাকলে প্লিজ শিগগির ডেকে দ্যান।বললুম,–হালদারমশাই আপনার কর্নেল স্যার আমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে পালিয়েছেন।

–কী কাণ্ড! ষষ্ঠীরে কইয়া জাননি কিছু? –ওই তো বললুম, ষষ্ঠীকে ঠিক ওই কথাটাই তিনি বলে গেছেন–জয়ন্তর গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি!–আপনি তখন কী করত্যাসিলেন? –ঘুমোচ্ছিলুম। আপনি তো ভালোই জানেন দুপুরে আমার ভাত-ঘুমের অভ্যাস আছে।–তা হইলে তো একটু গণ্ডগোল হইয়া গেল।

–কীসের গণ্ডগোল? –কর্নেল স্যার থাকলে তেনার লগে কনসাল্ট করতাম।–আপনি আমার সঙ্গে কনসাল্ট করতে পারেন।হঠাৎ ফোনের লাইন কেটে গেল। আমি কয়েকবার হ্যালো-হ্যালো করার পর রিসিভার নামিয়ে রাখলুম। তারপর কেন যেন মনে হল কেউ কি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল? একটু উদ্বেগ বোধ করলুম।

এই প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোক মাঝে মাঝে ভুলে যান তিনি এখন পুলিশ ইন্সপেক্টর নন, তাছাড়া জেদের বসে অনেক সময়েই এমন হঠকারি কাজ করে বসেন যে কর্নেলকে সেজন্য অনেক ছোটাছুটি করতে হয়।এইসব ভাবতে-ভাবতে দৃষ্টি গেল সোফার নিচে। যেখানে মধুরবাবু বসে ছিলেন সেখানে সোফার তলায়ে কী একটা ছোট্ট চাকতির মতো জিনিস পড়ে আছে।

তখনই হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিলুম। ততক্ষণে ঘরের আলো কমে এসেছে। আগে কর্নেলের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে জিনিসটার দিকে তাকালাম। একটা তামার চাকতি বলেই মনে হল। চাকতিটার সাইজ এক টাকার কয়েনের মতো। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেখতে-দেখতে আবিষ্কার করলুম চাকতির গায়ে অজানা ভাষার হরফে কীসব লেখা আছে। উলটো পিঠে একটা মূর্তি আঁকা। মূর্তিটা দেখতে ভয়ঙ্কর।

খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলুম। কর্নেলের ড্রইং রুমে দেশ বিদেশের বিস্ময়কর বহু জিনিস আছে বটে, কিন্তু সেগুলো সবই কাঁচের আলমারির ভেতর সাজানো আছে। এটা নিশ্চয়ই কর্নেলের নয়। তাহলে কি এটা মধুরবাবুর পকেট থেকে দৈবাৎ তার অজান্তে পড়ে গিয়েছিল? মনে পড়ল মাঝে-মাঝে তিনি রুমাল বের করে মুখ মুছছিলেন।

মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতায় শীতের আর পাত্তা নেই বরং বাইরে বেরুলে গরম লাগে। কিন্তু কর্নেলের ড্রইং রুমের ফ্যানের হাওয়া সত্ত্বেও উত্তেজনা মানুষকে ঘামিয়ে তুলতে পারে।আরও একটু চিন্তার পর আমার বিশ্বাস দৃঢ় হল, এটা কোনও দেশের প্রাচীন মুদ্রাও হতে পারে। কিন্তু মধুরবাবু এটা পাঞ্জাবির ডান পকেটে না রেখে বাঁ-পকেটে রেখেছিলেন কেন, যে পকেটে কি না রুমাল ভরা আছে।

ইতিমধ্যে ষষ্ঠী ছাদ থেকে নেমে এসে ঘরের সব আলো জ্বেলে দিল। তারপর মুচকি হেসে বলল,–দাদাবাবু টিকটিকিবাবু আসছেন।ষষ্ঠী হালদারমশাইকে টিকটিকিবাবু বলে। মিনিট দুই-তিন পরে ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী পিছনের করিডোর দিয়ে গিয়ে বাইরের লোকেদের জন্য দরজা খোলে। কিন্তু তাকে দরজা খুলতে নিষেধ করে আমি নিজেই ড্রইংরুমের সংলগ্ন ছোট ওয়েটিং রুমটা দিয়ে এগিয়ে গেলুম। তারপর দরজা খুললুম।

হালদারমশাইকে দেখে অবাক হয়ে বললুম,–কার সঙ্গে মারামারি করে এলেন? আপনার কপালে ছোট একটা ব্যান্ডেজ দেখছি। ডান হাতের বুড়ো আঙুলেও পট্টি বাঁধা।হালদারমশাই বাঁকা হেসে বললেন,–ও কিছু না। কর্নেল স্যার ফেরেন নাই? বললুম,–না।ড্রইংরুমে এসে হালদারমশাই ধপাস করে সোফায় বসে বললেন,–এক গ্লাস জল খামু। ষষ্ঠীরে ডাকেন।আমি হাঁক দিলুম,–ষষ্ঠী, শিগগির এক গ্লাস জল নিয়ে এসো।

ষষ্ঠী তখনই জল এনে দিল। তারপর তার টিকটিকিবাবুর ক্ষতচিহ্নের দিকে তাকিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে ঠোঁট ফাঁক করল। কিন্তু আমি তাকে চোখ টিপে নিষেধ করে ইশারায় চলে যেতে বলুলম। কারণ, হালদারমশাই এখন অন্য মেজাজে আছেন। ষষ্ঠীকে ধমক দিতেও পারেন।ষষ্ঠী চলে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলুম,–মনে হচ্ছে আপনার ওপর কেউ হামলা করেছিল।

হালদারমশাই জলের গ্লাস রেখে এক টিপ নস্যি নিলেন, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে সেই নোংরা রুমাল বের করে নাক মুছে বললেন,–আইজ একটু ভুল করসিলাম। সঙ্গে আমার লাইসেন্সড রিভলভারটা ছিল না। আর্মস ছাড়া আমি কখনও কোনও স্পটে যাই না। আসলে কর্নেল স্যারের কথা শুইন্যাই সোজা স্পটে চলে গিসলাম।–তা আপনার ওপর হামলা করল কে? গোয়েন্দাপ্রবর ক্ষোভের সঙ্গে বললেন,–আমি তখন আপনার লগে ফোনে কথা কইতেসিলাম।

সেই ফোনটা পাইসিলাম একটা ফামের্সিতে। আইজ রবিবার, কিন্তু ফার্মেসিটা খোলা ছিল। আপনার লগে কথা কইত্যাসি, এমনসময়ই এক হালায় হঠাৎ আমার পিছন থিক্যা ফোনটা কাড়বার চেষ্টা করল। ফার্মেসির মালিক কর্মচারী সবাই মনে হল লোকটারে ভয় পায়। তারা চুপচাপ দাঁড়াইয়া থাকল।

এদিকে আমি এমন কাণ্ড দেইখ্যা একটুখন অবাক হইসিলাম। ফোনটা কাড়িয়া লইয়া লোকটা কইল,–এক্ষুনি এখান থেইক্যা কাইট্যা পড়ো। নইলে এই দেখসো আমার কী আসে! জিগ্যেস করলুম,–ছোরা ছুরি নাকি ফায়ার আর্মস? হালদারমশাই জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ছয়-সাত ইঞ্চি লম্বা একখান ছোরা।জিগ্যেস করলুম,–আপনাকে কি সে ওটা দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল?গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন, নাঃ, আমিই হালার হাত থেইক্যা ড্যাগারখান কাইড়া লইছি।

কাড়াকাড়ির সময় আমার কপালে আর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে ড্যাগারের ডগা একটুখানি লাগসে।–তারপর কী হল? –হালার প্যাটে হাঁটুর গোঁত্তা এমন জোরে মারসি, সে তখনই টেলিফোন শুঙ্কু নিচে গড়াইয়া পড়সিল। তারপর আর সাড়াশব্দ নাই।–তার মানে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল? –হঃ! তো আমি ফার্মাসিতে কইলাম আমারে দুইখান ব্যান্ডেজ লাগাইয়া দিন।

দোকানের একজন কর্মচারী আমার হুকুম পালন করল। আমি তারে কইলাম,–আমি কে আপনারা জানেন? লালবাজারের ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক। অমনি দ্যাখলাম যেটুকু ভিড় জমসিল, তখনই সাফ হইয়া গেল। আমি বুক ফুলাইয়া রাস্তায় নাইম্যা একটা ট্যাক্সি ডাকলাম।

–আর লোকটা ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল? এবার গোয়েন্দ্ৰপ্ৰবর খোলা মনে হেসে বললেন, আমি আর পিছু ফিরি নাই।–লোকটা কে তা চিনতে পেরেছিলেন? –না। তবে এইটুকু বুঝঝি হালা আমারে জগদীশবাবুর বাড়ি থিক্যা ফলো কইরা আইছিল।–জগদীশবাবু কে? –কমু। কর্নেল স্যারেরে আইতে দিন, তারপর ডিটেলস সব জানতে পারবেন।

কর্নেল এলেন প্রায় আধঘণ্টা পরে। তখন প্রায় ছ’টা বাজে। তিনি এসেই হালদারমশাইকে দেখে বলে উঠলেন,–যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটেছে দেখছি। তখন আপনি আমার কথা শুনেই বেরিয়ে গেলেন, আমি সুযোগ পেলুম না যে আপনাকে একটু সাবধান করে দেব।হালদারমশাই বললেন,–ও কিসু না। তারপর পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা ড্যাগার বের করে বললেন,–কর্নেলস্যার, আপনি তো জানেন আমার মাথা আফটার অল–।

কর্নেল সহাস্যে বললেন, পুলিশের মাথা–এই তো? যাই হোক, বসুন আমি পোশাক বদলে আসি। আর জয়ন্ত, তোমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেজন্য এই বৃদ্ধের প্রতি মনে-মনে খুব রেগে আছ। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, তোমার কেমন চমৎকার একটা ভাত-ঘুম হয়ে গেল। বলবে, তুমি সঙ্গে গেলে কি আমার কোনও অসুবিধে হতো? হ্যাঁ, হতো।

বলে তিনি ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে আমি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ভাঁজ করা ড্যাগারটা খুলে ফেললুম। ছ’ইঞ্চির বেশি লম্বা শান দিয়ে ধারাল করা অস্ত্র। হালদারমশাই ছোরাটা আমার হাত থেকে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন,–মনে হইত্যাসে ষষ্ঠীচরণ এখনই কফি লইয়া আইবে। সে ফায়ার আর্মর্স দেইখ্যা ভয় পায় না, কিন্তু ড্যাগার দেইখ্যা খুব ভয় পায়।

একটু পরে কর্নেল ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। তার পেছনে ষষ্ঠীচরণও কফি আর দু-প্লেট স্ন্যাকস নিয়ে এসে গেল। এবং সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে চুপচাপ চলে গেল।এরপর কিছুক্ষণ আমরা কফি পানে মন দিলুম। কফি শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, –এবার হালদারমশাইয়ের রিপোর্ট শোনা যাক।

হালদারমশাই ইনিয়ে-বিনিয়ে যে ঘটনা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই : কর্নেলের কথা অনুসারে হালদারমশাই বারিনবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাড়িটার মালিক একজন অবাঙালি ভদ্রলোক। তার নাম, জগদীশ প্রসাদ রাও। বাড়িটা দোতলা, এবং নতুন। ওই গলির মধ্যে বাড়িটা চোখে পড়ার মতো।

সামনের একটা গেট আছে, ভেতরে ছোট্ট একটা লন।সামনের অংশটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এবং পাঁচিলে কাঁটাতারের বেড়া আছে। হালদারমশাই গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে ডাকেন। তারপর দারোয়ানের হাতে তার নেমকার্ড দিয়ে বলেন, বাড়ির মালিকের সঙ্গে তার দেখা করা জরুরি। দারোয়ান বলে তার সাহেব এখন বিশ্রাম করেছেন। দেখা করতে হলে চারটের পর আসতে হবে।

হালদারমশাই একটু গলা চড়িয়ে ইংরেজিতে বলেন, তিনি একজন ডিটেকটিভ। এবং এই বাড়িতে আজ যে ভদ্রলোক খুন হয়েছেন তার আত্মীয় তাকে এই খুনের তদন্তের ভার দিয়েছেন। এতে কাজ হয়। ডান দিকে দোতলার একটা ঘরের দরজা খুলে ব্যালকনিতে এক ফরসা রঙের ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন।

তিনি কথাটা শুনতে পেরেছিলেন। তাই দারোয়ানকে বলেন, হালদারমশাইকে যেন নিচের বসার ঘরে নিয়ে আসে।এরপর জগদীশবাবুর সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথাবার্তার আর বাধা ছিল না। জগদীশবাবু বলেন, নিহত বারিনবাবু ছিলেন তার একজন বন্ধুমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। গত মাসে বারিনবাবুকে তার বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ জানান।

জগদীশবাবুর ফ্যামিলি মাসখানেকের জন্য দেশে গেছে। তার দেশের বাড়ি হরিয়ানায়। কাজেই দোতলার যে ঘরটা আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠ কারো জন্য খালি রাখা হয়, অর্থাৎ তার গেস্টরুম, সেখান তিনি বারিনবাবুকে অস্থায়ী ভাবে থাকতে দিয়েছিলেন। বারিনবাবুর কাছে এযাবৎ কোনও লোক দেখা করতে আসেননি।

ওঘরে একটা বাড়তি টেলিফোন আছে, সেটা তিনি বারিনবাবুকে ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছিলেন।এসব কথা হালদারমশাই তাঁকে প্রশ্ন করেই জানতে পেরেছেন। এরপর হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে জগদীশবাবু বলেন, গতরাত্রে কখন এমন একটা শোচনীয় কাণ্ড ঘটেছে তিনি টের পাননি।

দারোয়ানও এতটুকু জানতে পারেনি। বারিনবাবু পাড়ার একটা হোটেলের সঙ্গে নিজের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কারণ, উনি কখন খাবেন তার কোনও সময়ের ঠিক ছিল না।এরপর হালদারমশাইকে নিয়ে তিনি দোতলায় বারিনবাবুর ঘরে যান।পুলিশ যা তদন্ত করার করে নিয়ে চলে গেছে। তাই ঘরের চাবি জগদীশবাবুর কাছে আছে।

ঘরে ঢুকে হালদারমশাই যথাসাধ্য খুঁটিয়ে দেখে কোনও সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘরের রক্ত ততক্ষণে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। জগদীশবাবু তাকে বলেন, তার ধারণা কোনও চেনা লোক বারিনবাবুর কাছে এসেছিল। কিন্তু সে তা হলে নিশ্চয়ই পাঁচিলের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে ছিল। এমনকী জগদীশবাবুর ধারণা, তাকে বারিনবাবুই গভীর রাতে কোনও এক সময় পাঁচিল ডিঙিয়ে আসতে বলেছিল।

পুলিশ দেখেছে দারোয়ানের ঘরের পাশে একটা বকুলগাছ আছে। সেই বকুলগাছে খুনির আসার চিহ্ন পুলিশ খুঁজে পেয়েছে। এখন জগদীশবাবুর আক্ষেপ, তিনি বারিনবাবুর ওপর কেন যে এত আস্থা রেখেছিলেন বুঝতে পারছেন না।এসব কথা বলার পর হালদারমশাই একটু দম নিয়ে বললেন,–ঘরে বারিনবাবুর যেসব জিনিস ছিল, তা পুলিশ সিজ কইরা লইয়া গ্যাসে, কিন্তু আমার মনে একখান ধন্ধ ঢুকসে।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–কী ধন্ধ? গোয়েন্দপ্রবর খুব চাপা স্বরে বললেন,–কর্নেলস্যার, আমার সন্দেহ, বারিনবাবুরে ওই জগদীশবাবুই খুন করসেন।কর্নেল বললেন,–সেটা অসম্ভব কিছু নয়।এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন, –বলুন মধুরবাবু…বলেন কী? আপনার লেটার বক্সে হুমকি দেওয়া চিঠি? ঠিক আছে, কাল দিনের বেলায়-ধরুন, সকাল নটার মধ্যে আপনি চলে আসুন।

চার

সেই সন্ধ্যায় কর্নেল হালদারমশাইকে জগদীশবাবুর কাজ কারবারের খোঁজ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। হালদারমশাই চলে যাওয়ার পর আমি সোফার নিচে কুড়িয়ে পাওয়া সেই চাকতিটা কর্নেলকে দেখিয়েছিলুম। চাকতিটা যে মধুরবাবুর পকেট থেকেই পড়েছে, আমার এই ধারণার কথাও বলেছিলুম।

কিন্তু কর্নেলের মতে ওই চাকতিটা তোয়ালের ভঁজের ভেতরেই সম্ভবত রাখা ছিল। সোফার নিচে কার্পেটের ওপর ভোয়ালেটা লম্বা করে ঝেড়ে ফেলার সময় অবশ্য কোনও শব্দই শোনা যায়নি। তারপর কর্নেল আমাকে অবাক করে বলেছিলেন, তুমি এটাকে তামার চাকতি ভাবছ, কিন্তু এটা আসলে একটা ব্রোঞ্জের সিল।

 

Read more

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.