রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

আতস কাঁচের সাহায্যে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় সিলটা পরীক্ষা করে দেখার পর কর্নেল বলেছিলেন,–প্রাচীন লিপি বিষয়ে আমার যতটুকু জ্ঞান, তাতে মনে হচ্ছে, এই লিপিগুলি ব্রাহ্মি। আর উলটো পিঠে যে মূর্তিটা দেখছ, সেটা বৌদ্ধ ধর্মের এক অপদেবতার। তার নাম ‘মার।রহস্যটা ক্রমেই এত জটিল হয়ে উঠল দেখে সে রাতে আমার ভালো ঘুমই হয়নি।সকালে বেড-টি খাওয়ার পর বাথরুমে গিয়েছিলুম, তারপর প্যান্টশার্ট পরে সাধের বাগানে যাব।

ভাবছিলুম। কারণ কর্নেলের এখন ছাদেই থাকার কথা। কিন্তু চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ড্রইং রুমের ভেতর থেকে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুন। ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যে বিরক্ত মুখে সোফায় বসে আছেন। মনে হল ভদ্রলোক আমার মতোই বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। সবে আটটা বাজে, তাই বোঝা যায় উনি ঘুম থেকে উঠেই এখানে চলে এসেছেন।আমাকে দেখে তিনি নমস্কার করলেন।

আমি একটু তফাতে বসে জিগ্যেস করলুম,–হাতের লেখা দেখে মধুরবাবু কি কাউকে চিনতে পেরেছেন? কর্নেল হেসে উঠলেন,–জয়ন্ত, মাঝে-মাঝে এমন ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করো আমার অবাক লাগে।বললুম,–বাঃ, অবাক লাগার কী আছে? মধুরবাবু এতবছর দিদির বাড়িতে বাস করেছেন, কতরকম লোকের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা থাকা তো স্বাভাবিক। তাদের হাতের লেখা দেখতে পাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

মধুরবাবু বিষণ্ণমুখে বললেন,–হাতের লেখা দেখে আমার মনে হয়েছে কেউ কোনও কমবয়সি ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে চিঠিটা লিখিয়েছে। কর্নেল সাহেবও আমার কথা স্বীকার করেছেন।কর্নেল বললেন,–হাঁ, এটা যে-কোনও কমবয়েসি এবং বানান ভালো না জানা ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে লেখানো হয়েছে, এতে আমি নিঃসন্দেহ। তুমি নিজেই পুরো চিঠিটা পড়ে দ্যাখো।

চিঠিটা নিয়ে দেখলুম, একটা একসারসাইজ খাতার পাতা ছিঁড়ে আঁকাবাঁকা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা আছে, মধুরকেষ্ট মালটা তুমি যে হাতিয়েছ তা জানি। আজ থেকে তিন দিনের মধ্যে ওটা তুমি আউটরাম ঘাটে গঙ্গার ধারে সেই বেঞ্চিতে যদি রেখে না আসো, তা তোমার মুণ্ডতেও একটা গুলি ঢুকে যাবে। ইতি–

চিঠিটা পড়ার পর বললুম,–একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বারিনবাবুকে যে শুক্রবার গঙ্গার ধারে ফলো করে গিয়েছিল, সে সম্ভবত দূর থেকে মধুরবাবুর হাতে ব্রিফকেসটা দেখেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হল মধুরবাবুর মতো নিরীহ মানুষের কাছ থেকে সে তত শুক্রবার রাত্রেই সোজা ওঁর দিদির বাড়িতে ঢুকে ওটা কেড়ে নিয়ে আসতে পারত। বিশেষ করে তার কাছে যখন পিস্তল বা রিভলভার আছে।মধুরবাবু বললেন, আমার দিদিকে আপনি দেখেননি। সে পাড়ায় খুব জনপ্রিয়। তার ডাকে পড়াশুদ্ধ এসে হাজির হবে। এই চিঠি যে লিখেছে সে নিশ্চয়ই একথাটা জানে।

কর্নেল বললেন,–লোকটা যে আপনার অলক্ষ্যে আপনাকে কাল সকালে বা আজ সকালে ফলো করে আসেনি, কে বলতে পারে? আমার ধারণা ব্রিফকেসটা ফেরত নেওয়ার জন্য সে তিন দিনের সময় দিয়েছে, তার কারণ সে জানে ওটা আপনার কাছে নেই।আমি বললুম,–তা হলে খালি ব্রিফকেসটা মধুরবাবুর হাতে দিয়ে পুলিশের সাহায্যে একটা ফঁদ পাতলেই তো হয়।

যেই লোকটা মধুরবাবুর হাত থেকে ব্রিফকেস নেবে অমনি তাকে পুলিশ এবং আমরা পাকড়াও করে ফেলব।কর্নেল হাসলেন,জয়ন্ত, লোকটা যেই হোক, সে অত বোকা নয়।মধুরবাবু কাতর মুখে বললেন, আমার কলকাতায় থাকতে এখন খুবই আতঙ্ক হচ্ছে। তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি সে কথামতো, ব্রিফকেসটা না পায়, তাহলে প্রচণ্ড ক্রোধে আমাকে হয়তো মেরে ফেলবে।

দিদিও বলছিল কর্নেলসাহেবরা যা করার করবেন, আমি যেন চুপি-চুপি যদুগড়েই ফিরে যাই।কুমারবাহাদুরের রাগ এতদিনে পড়ে গেছে, তাছাড়া ওঁর মেয়ে আমাকে অনুরোধ করে চিঠি লিখেছে, কাজেই যদুগড়ে ওঁদের আশ্রয়ে থাকলে আমি নিরাপদে থাকতে পারব।কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কিছু ভাবছিলেন। তিনি চোখ না খুলেই বললেন, –এই প্ল্যানটা মন্দ নয়।

আপনি বরং আজই যদুগড়ে চলে যান। যাতে সেই লোকটা আপনাকে ফলো করার সুযোগ না পায় সেইজন্য আপনি একটা ট্যাক্সি করে অলিগলি ঘুরতে-ঘুরতে হাওড়া স্টেশনে চলে যাবেন। ট্যাক্সিওলা জিগ্যেস করলে বলবেন, আমার ইচ্ছে মতো আমি যাব। তোমার তো মিটারের অঙ্ক বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।মধুরবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–এই অবস্থায় তাই করতে হবে।

টাকাকড়ি আমার হাতে তত নেই। দিদির কাছে ধার চাইলে অবশ্য পেয়ে যাব। দিদি জামাইবাবুর প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকা ছাড়াও মাসে-মাসে পেনসেন পাচ্ছে। তাছাড়া নিজের বাড়ি। একতলায় ভাড়াতে আছে।কর্নেল বললেন,–বাঃ, তাহলে তো কোনও অসুবিধেই নেই। আপনি আজই সুযোগমতো কলকাতা থেকে কেটে পড়ুন। প্রয়োজনে আমি কুমারবাহাদুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার খবর নেব।

মধুরবাবু করজোড়ে বললেন,–কিন্তু কর্নেলসাহেবকে একটু অনুরোধ, এইসব ঘটনার কথা যেন কুমারবাহাদুরের কানে না যায়।–না, না, সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় যদুগড়ের রাজবাড়িতে–তাই না! তাই আপনার খবর নিতে আমার কোনও অসুবিধে নেই।মধুরবাবু আমাদের দুজনকে নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

দেখলুম কর্নেলের একদফা কফি খাওয়া হয়ে গেছে। তাই বললুম,–এমন জমজমাট রহস্যের গোলকধাঁধায় পড়ে আমার নার্ভ অসাড় হয়ে গেছে। রাত্রে ভালো ঘুমও হয়নি।কর্নেল এবার তার বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন এবং যথারীতি ষষ্ঠীকে দেখলুম পরদার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছে। কর্নেল হাঁক দিয়ে বললেন,–ষষ্ঠী, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফি না আনলে তোর গর্দান যাবে।

ষষ্ঠীর মুখ পরদার আড়ালে হারিয়ে গেল। বললুম,–কর্নেল, গত রাতে আমি লক্ষ করেছি আপনি আপনার বেডরুমে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কী যেন করছিলেন।কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–হা, তুমি ঠিকই ধরেছ। আমি বৌদ্ধযুগের ওই ব্রোঞ্জের সিলটা একটা সিল সংক্রান্ত পুরোনো বইয়ের পাতায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলুম।

–খুঁজে পেয়েছেন তো? –হ্যাঁ, রাত একটা নাগাদ ওই সিলটার ছবি খুঁজে পেয়েছি। ওটা থেরবাদী, অর্থাৎ বৌদ্ধ স্থবির সম্প্রদায়ের একটা সিল। ঐতিহাসিক ডক্টর ফাগুসন লিখেছেন এই সিল-এ পালি ভাষায় এবং ব্রাহ্মি লিপিতে যা লেখা আছে, তাতে প্রাচীন মগধ অর্থাৎ আধুনিক বিহারের একটা মঠে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের আভাস পাওয়া যায়।চমকে উঠে বললুম,–তা হলে ঘুরে-ফিরে গুপ্তধনের কথাই ফিরে আসছে।

-হ্যাঁ। আসছে বটে। এবার শুনলে তুমি আরও অবাক হবে সিল-এর যে পিঠে অপদেবতা মার-এর মূর্তি খোদাই করা আছে, তার নিচের দিকে কয়েকটা আঁকাবাঁকা রেখা আতস কাঁচে লক্ষ করে আমি একটা কাগজে তা নকল করেছি। তারপর তোয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখা পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া কাগজটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে অবাক হয়েছি। সিল-এর আঁকাবাঁকা রেখাগুলো আসলে একটা ম্যাপ। যে ম্যাপ বড় আকারে পুরোনো কাগজে আমরা দেখেছি।

এই সময়েই ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি এবং স্ন্যাকস রেখে গেল। কফি খেতে-খেতে বলুলম, –আমার নার্ভ চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। আমার চোখে এখন কী ভাসছে জানেন? কর্নেল বললেন,–প্রাচীন মগধ। অর্থাৎ আধুনিক বিহার।আমি উত্তেজিত ভাবে বললুন,কর্নেল, এমনকী হতে পারে না, বিহারের কোথাও সেই মঠের ধ্বংসাবশেষ বারিনবাবু আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু গুপ্তধন নিশ্চয়ই খুঁজে পাননি। আপনি কী বলেন? –ঠিক বলেছ ডার্লিং।

হাসতে-হাসতে বললুম,যাক, অনেকদিন পরে আবার আপনার মুখ থেকে ডার্লিং শব্দটা বেরোল। তার মানে আপনার অঙ্ক ঠিক পথেই এগোচ্ছে।–নিছক অঙ্ক নয়, মনে হচ্ছে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক। অর্থাৎ ভগ্নাংশের অঙ্ক। তাই বড় জটিল।একটু পরে বললুম,–আপনি যদুগড়ে হয়তো অনেকবার গেছেন। কারণ, সেখানকার রাজবংশের কুমারবাহাদুর আপনার বন্ধু। যদুগড় অঞ্চলে নিশ্চয়ই অনেক ঘোরাঘুরি করেছেন। ওখানে কি কোথাও বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ লক্ষ করেননি?

কর্নেল হাসলেন,–ভগ্নাংশটা তুমি নিমেষে সমাধান করে ফেললে? –এমনকী হতে পারে না? বিহারে তো বহু জায়গায় বৌদ্ধদের কীর্তিকলাপের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে।কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমনসময় ডোরবেল বাজল। তিনি অভ্যাসমতো হাঁকলেন,–ষষ্ঠী– একটু পরে সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তিনি সোফায় বসে বললেন,–মর্নিং কর্নেলস্যার। মর্নিং জয়ন্তবাবু।

কর্নেল বললেন,–কোনও সুখবর এনেছেন মনে হচ্ছে হালদারমশাই!হালদারমশাই মুচকি হেসে বললেন,–খবর একখান আনসি, তা সু কিংবা কু এখনও জানি না। তবে আগে ষষ্ঠীর হাতের কফি খামু, নার্ভ চাঙ্গা করুম, তারপর সব কমু।ষষ্ঠী হালদারমশাইকে দরজা খুলে দিয়েই তার জন্য স্পেশাল কফি তৈরি করতে গিয়েছিল। শিগগির সে সেই কফি নিয়ে এল।

হালদারমশাই কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–আঃ!ষষ্ঠী দাঁড়িয়ে আছে দেখে কর্নেল বললেন,–ওঃ, বুঝেছি। তুই বাজার যাবি।ষষ্ঠী বলল,–আধঘণ্টা লেট হয়ে গেল। টাটকা মাছ আর পাব কিনা কে জানে? কর্নেল উঠে গেলেন। বুঝলুম ষষ্ঠীকে বাজারের টাকা দিতে যাচ্ছেন। সেই সুযোগে আমি চুপি-চুপি জিগ্যেস করলুম,–কী খবর এনেছেন, তার একটু আভাস দিন না হালদারমশাই।

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর কাজ কামের হদিশ পাইসি।কী হদিশ শোনার সুযোগ পেলাম না। কর্নেল এসে গেলেন। ইজিচেয়ারে বসে তিনি চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন,–এবার আপনার খবরটা বলে ফেলুন হালদারমশাই।হালদারমশাই তেমনই চাপাস্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর ব্র্যাবোর্ন রোডে ব্যবসার অফিস আছে।

-কীসের ব্যবসা? কর্নেলের প্রশ্নের উত্তরে হালদারমশাই আরও চাপা গলায় বললেন,–নীলামের ব্যবসা। আইজ সকাল সাতটায় ওনার বাড়িতে আবার গিসলাম। একটুখান মেক-আপ করসিলাম। মাথায় পরচুলা আর গোঁফ-দাড়ি ছিল। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। জগদীশবাবুর গাড়ি বার হইয়া গেল, তারপর দেখলাম জয়ন্তবাবুর বয়েসি একজন ইয়াং ম্যান ওনার বাড়ি ঢুকত্যাসে।

অমনি তারে গিয়া কইলাম, জগদীশবাবুর লগে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। লোকটি কইল, তিনি তো কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। আপনি কে? কইলাম আমি ভবানীপুরের এক জমিদার বাড়ির থিক্যা আসত্যাসি। আমার নাম রাখালচন্দ্র বিশ্বাস। আমার কর্তামশাইয়ের টাকার অভাব। তাই উনি আমারে এখানে আইতে কইলেন।

জগদীশবাবু নাকি পুরোনো মাল বেচাকেনার কারবার করেন। যুবকটি কইল, তাহলে আপনি দুপুর একটা নাগাদ স্যারের অফিসে দেখা করবেন। আমি কইলাম, ঠিকানা? সে তার পকেট থেইক্যা এই কার্ডখান বার কইরা আমাদের দিল।বলে গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেলকে একটা কার্ড দিলেন।কর্নেল সেটা পড়তে-পড়তে বললেন, হ্যাঁ, ভদ্রলোক দেখছি পুরোনো আসবাব পত্রের বেচাকেনা করেন। মহাবলী অকসন হাউস।

অবশ্য এই নিলামের কারবারিরা সুযোগ পেলে গোপনে প্রত্নদ্রব্যের ব্যবসা করেন। যাইহোক, আপনি একটা কাজের মতো কাজ করেছেন। যুবকটিকে তার নাম জিগ্যেস করেননি? –করসিলাম। কইল, স্যারেরে কইবেন চঞ্চল সাহা আপনারে এই কার্ড দিছেন। সে আরও কইল, আমি ওনার একজন এজেন্ট।আমি বললুম,–কর্নেল, ভগ্নাংশটা আর তো তবে জটিল মনে হচ্ছে না।

কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। হালদারমশাই বললেন, আমার সন্দেহ বারিনবাবু এই ব্যবসার লগে যুক্ত ছিল। আমি এখনও কইতাসি জগদীশবাবুই বারিনবাবুরে খুন করসেন।কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–হালদারমশাই, আপনি এক কাজ করুন। এখনই মধুরবাবুর বাড়ি চলে যান। গিয়ে তাকে বলুন তার সঙ্গে আপনিও যদুগড়ে যাবেন। আপনার পরিচয় তো মধুরবাবু পেয়েছেন।

আপনি এবার ওঁর দিদি নিরুপমার সঙ্গে দেখা করে আপনার আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে বলবেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আপনাকে মধুরবাবুর বিপদে সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন। নিরুপমাদেবী যেন আমাকে ফোন করে কথাটা যাচাই করে নেন। আর একটা কথা। সামান্য কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে আপনার এজেন্সির কনট্র্যাক্ট পেপারে ওঁদের সই করিয়ে নিন। বলবেন আইনের স্বার্থে এটা করা দরকার।

–হ বুসসি। কনট্র্যাক্ট পেপারে সই করলে মধুরবাবু আমার ক্লায়েন্ট হইয়া যাবেন। কোনও ঝামেলা বাধলে ওই কনট্র্যাক্ট পেপার আমার কাজে লাগবো।কথাটা বলেই তিনি যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। আমি বললুম,–তা হলে হালদারমশাই আর মধুরবাবু যদুগড়ে চলে যাচ্ছেন?কর্নেল একটু হেসে বললেন,–অপেক্ষা করো, আমরাও যদুগড়ে যাব। তার আগে শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডটা স্পষ্টভাবে গড়ে নিতে হবে।

আমি জিগ্যেস করলুম,–আচ্ছা কর্নেল, ওই তিনটে ছবি সম্পর্কে কি কোনও চিন্তা-ভাবনা করেছেন? –ও নিয়ে এখন চিন্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। ছবি তিনটে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনও রাজপরিবারের ছবি।বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,–প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। আমরা ব্রেকফাস্ট করে নিয়েই বেরিয়ে পড়ব।–কোথায় যাবেন? –এখন কোনও প্রশ্ন নয়। যথাসময়ে তুমি নিজেই তা জানতে পারবে।

পাঁচ

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বললুম,–কাল বিকেলে আপনি একা এই গাড়ি নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন জিগ্যেস করতে ভুলে গিয়েছি।কর্নেল বললেন,–পুরাতত্ত্ববিদ ডক্টর সুবিমল চক্রবর্তীর কাছে।তোমাকে সঙ্গে না নেওয়ার কারণ ছিল। ডক্টর চক্রবর্তীকে তুমি নিশ্চয়ই চেনো।

সেবার একটা দুপাঠ্য প্রাচীন লিপির অর্থোদ্ধারে– কথাটা মনে পড়ায় বললুম,–ও সেই রাগি ভদ্রলোক? যিনি চেঁচিয়ে কথা বললে ভাবেন তাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে, আবার আস্তে কথা বললেও ভাবেন তাকে ব্যঙ্গ করে করা হচ্ছে? কর্নেল হেসে উঠলেন,–কাজেই বুঝতেই পারছ, তোমাকে আবার দেখলে উনি খাপ্পা হয়ে আমাকেও ভাগিয়ে দিতেন।

তোমাকে বলেছিলুম মনে পড়ছে, যারা কানে কম শোনেন, তারা খুব সহজেই রেগে যান।-ওঃ সে এক সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা। আপনি না থাকলে ভদ্রলোক আমাকে বিনা দোষে লাঠিপেটা করে ঘর থেকে বের করে দিতেন। তো কালকে আপনি ওই বৌদ্ধ সিলটা ওঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন? -ঠিক ধরেছ, ডক্টর চক্রবর্তীর মতে ওই সিলটা তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় তৈরি হয়েছিল।

তা ছাড়া ওঁকে ম্যাপটাও দেখিয়েছিলুম। ওঁর মতে ম্যাপে যে ইংরেজি অক্ষরগুলো লেখা হয়েছে, তা কোনও শব্দের প্রথম অক্ষর। যাই হোক, গাড়ি চালাতে-চালাতে কথা বললে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলবে। দেখছ না এখন পিক আওয়ার শেষ হয়নি।কর্নেলের নির্দেশে আমি পার্ক স্ট্রিট দিয়ে ধর্মতলার মোড়ে যখন পৌঁছুলাম, তখন প্রচণ্ড জ্যাম।

একটু বিরক্ত হয়ে বললুম,–আমরা যাচ্ছিটা কোথায় বললে কি আপনার মহাভারত অশুদ্ধ হবে!কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সহস্যে বললেন, না। তবে তোমাকে একটা চমক দেওয়ার ইচ্ছে আছে। কাজেই তুমি চুপ করে থাকো।এরপর সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে সোজা বিডন স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছুলাম। কর্নেল ডাইনে বিডন স্ট্রিটে গাড়ি ঢোকাতে ইঙ্গিত দিলেন।

কয়েকটা বাড়ির পর বাঁদিকের একটা গলির মুখে উনি গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বললেন, এখানে পার্ক করে রাখো, কোনও দাউ গাড়ি ঢোকাতে ইভিনিউ দিয়ে করে থাকে অসুবিধৌত বললেন। তা দিলেন। কয়েবিডন স্ট্রিটের সে গাড়ি লক করে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। গলির ভেতর কিছুটা এগিয়েই দেখি ডানদিকে প্রাচীন আমলের একটা বিরাট দেউড়ি।

তার ভেতরে তেমনি প্রাচীন একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির গড়নে ইতালীয় ভাস্কর্যের ছাপ স্পষ্ট। একতলা এবং দোতলায় মোটা-মোটা থাম। লনের দুপাশে ফুলের সমারোহ। গেটে কর্নেলকে দেখামাত্র একজন পেল্লাই চেহারার গুফো লোক সেলাম দিয়ে বলল,–আসেন, আসেন, কর্নেলসাহাব। হামার মালিক থোড়া আগে আমাকে খবর ভেজেছেন, কী কর্নেলসাহাব আসবেন। তা আপনার গাড়ি কুথায়?

কর্নেল বললেন,–বেশিক্ষণ থাকব না বলে গাড়ি গলির মোড়ে রেখে এসেছি। তা তুমি কেমন আছ রামলাল? রামলাল গেট খুলে দিয়ে বলল,–আপকা কৃপা, হামি খুব ভালো আছি।এইসময়েই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়িবারান্দার তলা থেকে বেরিয়ে আমাদের দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। নমস্কার করে বললেন,রাজবাহাদুর আপনার আসার কথা আমাকে বলেছেন।

এতক্ষণে সত্যি চমকে উঠলুম। কারণ এই ভদ্রলোকের নাম অচিন্ত্যবাবু। ইনি কর্নেলের বাড়ি কয়েকবার গিয়েছিলেন। তারপরই মনে পড়ল ভানুগড় রাজবাড়ি থেকে চুরি যাওয়া অমূল্য কিছু জুয়েলস কর্নেল উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। সেই রহস্যময় কেসের সময় আমাকে আমার কাগজের কর্তৃপক্ষ ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়েছিলেন।

অচিন্ত্যবাবুও আমাকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি বললেন,–নমস্কার, নমস্কার, জয়ন্তবাবু। তা আপনারা কি ট্যাক্সিতে এসেছেন?কর্নেল বললেন,–না, আপনি তো জানেন আমার ছ্যাকড়া লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়িটা বেচে দেওয়ার পর জয়ন্তর উৎকৃষ্ট ফিয়াটেই আমি চাপতে অভ্যস্ত। জয়ন্তর ঘাড়ে চেপেই ঘুরি।অচিন্ত্যবাবু বললেন,–কী আশ্চর্য! গাড়ি কি বাইরে কোথাও রেখে আসছেন? কর্নেল বললেন,–হা, কারণ রাজাসাহেবের সঙ্গে মাত্র কয়েকটা কথা বলেই আমরা অন্য জায়গায় যাব। গাড়ি ওখানেই থাক।

অচিন্ত্যবাবু আমাদের গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে একটা প্রশস্ত হলঘরে নিয়ে গেলেন। বনেদী রাজা-জমিদারের বাড়ির এইসব হলঘর কর্নেলের সাহচর্যে অনেক দেখেছি। এটা তার ব্যতিক্রম নয়। দেয়ালে বড়-বড় তৈলচিত্র। গোলাকার বিশাল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে সারবদ্ধ গদিআঁটা চেয়ার, ইতস্তত প্রকাণ্ড চীনা ফ্লাওয়ার ভাস এবং বিবিধ ভাস্কর্য সাজানো।

একপাশে আরামদায়ক সোফায় আমাদের বসতে বলে অচিন্ত্যবাবু কারপেট বিছানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন, সেই সময়ই কুকুরের হাঁকডাক কানে এল। আতঙ্কে দেখলুম দুটো প্রকান্ড বিদেশি কুকুরের গলায় চেন হাতে নিয়ে সিঁড়ির মাথায় ধপধপে সাদা ফতুয়া আর ধুতি পরে এক ভদ্রলোক আবির্ভূত হলেন। তার চেহারায় আভিজাত্য স্পষ্ট।

গলার কাছে পৈতে দেখা যাচ্ছিল। বুঝলুম তিনি ব্রাহ্মণ এবং এও বুঝলুম তিনিই রাজাসাহেব। তার কণ্ঠস্বরও বেশ গম্ভীর। তিনি বললেন,–অচিন্ত্য এই বেয়াদপ দুটোকে বেঁধে রেখে এসো। নইলে ওরা আমাদের কথাবার্তায় বলেন বাধাবে।অচিন্ত্যবাবু কুকুর দুটোকে নিয়ে চলে গেলেন। তারপর রাজাসাহেব রেলিং ধরে নামতে-নামতে সহাস্যে বললেন,–ডনি আর জনিকে সঙ্গে নিয়ে আসছিলুম কেন জানেন, কর্নেলসাহেব? আপনাকে যেন ওরা একটু বকে দেয়।

কথাটা বলেই তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন।কর্নেল বললেন,–গতরাত্রে আপনি তো আমাকে নিজেই বকে দিয়েছেন। কারণ, আমি নাকি আপনাকে মন থেকে মুছে ফেলেছি।রাজাসাহেব সোফায় আমাদের মুখোমুখি বসে বললেন,–তা বকেছি, কারণ আমার প্রিয় বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে যে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির ক্যাকটাসটা পাঠিয়েছিলুম, তার প্রাপ্তিস্বীকার করেননি।

কর্নেল কপালে একটা মৃদু থাপ্পড় মেরে বললেন,–মাই গুডনেস! তাইতো! কিন্তু দোষটা আপনারই। সঙ্গে কোনও চিরকুট ছিল না। তাছাড়া আমিও তখন বাড়িতে ছিলুম না তাই পরে ওটার কথা ভুলে গিয়েছিলুম। কিন্তু রাজাসাহেব, আপনার তো উচিত ছিল একটা ফোন করে আমাকে জানানো।রাজাসাহেব বললেন,–আলবত ফোন করেছিলুম।

–আমি নিশ্চয়ই ফোন ধরিনি, কারণ আমি তখন বাড়িতে ছিলুম না। নিশ্চয়ই আমার পরিচারক ষষ্ঠীচরণ ফোন ধরেছিল। যাগ্যে, আপনার পাঠানো ক্যাকটাস বাড়ছে। চমৎকার ফুল ফুটিয়েছে। এবার কাজের কথায় আসা যাক। কারণ হাতে সময় কম।রাজাসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। এই ভদ্রলোক আপনার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি।

সায় দিয়ে আমি নমস্কার করতেই তিনি আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন,–আপনার আমি ভক্ত। সত্যি বলতে কী, কর্নেলসাহেবকে আমি আপনার চোখেই দেখি।কর্নেল বললেন,–রাজাসাহেব, আর নয়, এখনই উঠব। কাজের কথাটা—বাধা দিয়ে রাজাসাহেব বললেন,–কফি আসছে, আপনিই তো বলেন, কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।

তা ছাড়া কতদিন পর আপনার সঙ্গে বসে আমি কফি খাব–এও আমার জীবনের একটা আনন্দ।একটু পরেই অচিন্ত্যবাবুর সঙ্গে একজন পরিচারিকা কফির ট্রে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তারপর সে কর্নেল ও আমাকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে আবার দোতলায় উঠে গেল। রাজাবাহাদুর বললেন, অচিন্ত্য তুমি নিজের কাজে যাও।অচিন্ত্যবাবু দোতলায় উঠে গেলেন।

তারপর কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–কাল রাত্রে আপনাকে ফোনে যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণ মুখার্জির কথা বলেছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর তো আপনার বেয়াই। মধুরবাবুকে আপনি অনেক বছর ধরেই চিনতেন। বিশেষ করে আপনি যখন ভানুগড়ে থাকতেন তখন শুনেছি আপনি প্রায়ই বেয়াই বাড়ি যেতেন। আমার প্রশ্ন, মধুরবাবু সম্পর্কে আপনার নিশ্চয়ই একটা ধারণা হয়েছিল। অর্থাৎ সে কী প্রকৃতির লোক, আপনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন।

রাজাসাহেব বললেন,–আরে সে তো এক বাবুর বাবু। সবসময়ই খুব সেজে-গুঁজে থাকত, সেন্ট মাখত। কিন্তু তাকে তো আমার খারাপ বলে মনে হয়নি।–আপনার বেয়াইমশাই কেন ওকে বছর তিনেক আগে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আপনি কি তা জানেন? রাজাসাহেব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,–রুদ্রনারায়ণ, অর্থাৎ আমার বেয়াইমশাই গতবার কলকাতায় এসে আমার বাড়িতেই উঠেছিলেন।

তার কাছে তত বেশি কিছু শুনিনি। তবে উনি বলেছিলেন, মধুর রাজবাড়ি থেকে একটা অমূল্য প্রাচীন জিনিস হাতিয়েছে বলে তার সন্দেহ।–জিনিসটা কী তা আপনাকে উনি বলেননি? রাজাসাহেব চাপাস্বরে বললেন,–আমার বেয়াইমশাই বাবার বাতিক ছিল পুরাদ্রব্য সংগ্রহ করে ব্যক্তিগত জাদুঘর বানানোর।

-জানি। পাতালের সেই গোপন জাদুঘর আমি দেখে এসেছি। কিন্তু জিনিসটা কী? আমাকে অবাক করে রাজাসাহেব বললেন,–একটা খুব প্রাচীন বৌদ্ধ সিল। তবে মধুরবাবুকে উনি হাতেনাতে ধরেননি, শুধু সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া মধুরবাবু নাকি স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন বলে খবর পেয়েছিলেন।

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–অসংখ্য ধন্যবাদ রাজাসাহেব। আমি শুধু এই গোপন খবরটুকুই আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলুম।রাজাসাহেব ব্যগ্রভাবে বললেন,–বাই এনি চান্স আমার বেয়াইমশাই কি আপনাকে সেই হারানো সিল-এর সন্ধানে অনুরোধ করেছেন?

 

Read more

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৪র্থ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.