রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৪র্থ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না। আমি অন্য কেস-এর সূত্রে সেই হারানো সিল-এর কথা জানতে পেরেছি। যাইহোক, আপনাকে একটা অনুরোধ, আপনি যেন এ বিষয়ে আপনার বেয়াইমশাইকে কোনও কথা জানাবেন না। যথা সময়ে আপনি এবং আপনার বেয়াইমশাই সবই জানতে পারবেন। কিন্তু এখন যদি আপনি তাকে কিছু জানান, তা হলে, আমার সব চেষ্টা একেবারে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমি এবার আসি।

রাজাবাহাদুর গম্ভীরমুখে দরজা অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন। তারপর আমরা গেটের দিকে চললুম।কিছুক্ষণ পরে দুজনে গাড়িতে চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলুম। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, আমার সঙ্গে আজ বেরিয়ে যা জানতে পেরেছ, তা যেন ঘুণাক্ষরে অন্য কারও কানে না ওঠে।

বললুম–কখনও কি আমি তেমন কিছু করেছি? –করোনি, কিন্তু তোমাকে সতর্ক করা দরকার আছে। –এবার কোথায় যাবেন? কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ব্র্যাবোর্ন রোডে। চলো, আমি শর্টকাটে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি।বললুম,–আমার ধারণা আপনি জগদীশপ্রসাদ রাওয়ের মহাবলী অকসন হাউসে যাচ্ছেন।

–তুমি বুদ্ধিমান।তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। অলিগলি রাস্তা ঘুরে আমরা ব্র্যাবোর্ন রোডে পৌঁছুলাম। তারপর কর্নেলের নির্দেশে একটা পার্কিং-এর জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানেই গাড়ি দাঁড় করালুম।কর্নেল বললেন,–গাড়ি লক করে চলে এসো।রাস্তার ওপারে গিয়ে একটা গলির ভেতর কর্নেল ঢুকলেন। তারপর বললেন,–এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে।বাড়িটা ছ’তলা। দোতলায় সাইনবোর্ড–মহাবলী অকসন হাউস।

দোতলায় গিয়ে বারান্দায় কয়েক’পা হেঁটে হলঘরের মতো একটা বিরাট ঘর চোখে পড়ল। ভেতরে অবশ্য মোটা-মোটা থাম দেখা যাচ্ছিল। আর দেখা যাচ্ছিল নানা ধরনের সেকেলে আসবাবপত্র। হলঘরটার প্রথম দরজায় কোলাবসিবল গেট এবং সেটা তালাবন্ধ। কয়েক-পা এগিয়ে আর একটা কোলাবসিবল গেট। কিন্তু সেটা খোলা। গেটের পাশে টুলে একজন বন্দুকধারী এবং উর্দি পরা লোক বসে আছে। বুঝলুম সে নিরাপত্তারক্ষী। ভেতরে কোনও লোক দেখলুম না।

কর্নেলকে দেখে সম্ভবত বিদেশি ভেবেই রক্ষী উঠে দাঁড়িয়ে একটা সেলাম দিল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে বললেন,–জগদীশপ্রসাদ রাও-এর সঙ্গে দেখা করতে চাই।সাহেবকে হিন্দি বলতে দেখে রক্ষী একটু অবাক হয়েছে মনে হচ্ছে। সে ইশারায় পাশে একটা ঘর দেখিয়ে দিল।সেই ঘরের দরজায় অবশ্য কোনও লোক নেই। ভেতরে ঢুকে দেখি একটা করিডোর। আর সার-সার কয়েকটা কেবিন। একটা কেবিন থেকে বেয়ারা গোছের একজন তোক বেরিয়ে এসে কর্নেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল।

কর্নেল হিন্দিতে বললেন,–মিস্টার রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই।বলে তিনি তার হাতে নিজের নেমকার্ড খুঁজে দিলেন।লোকটা তখনই যে কেবিন থেকে বেরিয়েছিল, সেই কেবিনে ঢুকে গেল। তারপর প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে সেলাম দিয়ে বলল,–আপলোগ আইয়ে।কর্নেলের সঙ্গে কেবিনে ঢুকে দেখলুম প্রকাণ্ড অর্ধবৃত্তাকার সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওধারে একজন তাগড়াই চেহারার টাই-স্যুট পরা প্রৌঢ় ভদ্রলোক বসে আছেন।

কর্নেল বাংলায় বললেন,–আপনি কি মিস্টার জগদীশপ্রসাদ রাও? মিস্টার রাও খাঁটি বাঙালির মতোই বললেন,–আগে বসুন, তারপর কী বলতে চান বলুন।আমরা দুজনেই পাশাপাশি বসলুম। তারপর কর্নেল বললেন, আপনার এই অকশন হাউসের নামডাক শুনেছি। তবে আমি সেজন্য আসিনি। এসেছি অন্য একটা কারণে। আমার এক আত্নীয় বারিন দত্ত আপনার বাড়িতে ছিল।

মুহূর্তে মিস্টার রাওয়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। আস্তে বললেন, তাকে কেউ গত শুক্রবার রাতে মার্ডার করেছে। আপনি কি পুলিশের কাছে সেই খবর শুনে আমাকে কিছু জিগ্যেস করতে এসেছেন? কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। বারিন আপনার বাড়িতে খুন হয়েছে তা জানি। আমি শুধু আপনার কাছে জানতে এসেছি, তাকে কেউ খুন করার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে আপনার ধারণা? মিস্টার রাও সেইরকম জ্বলন্ত চোখ পাকিয়ে বললেন, আমি জানতুম না সে একজন চোর।

সে আমাকে বলেছিল পুরোনো জিনিস কেনাবেচার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আছে। আমি যদি তাকে থাকবার জায়গা দিই তাহলে সে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু সে আমার অফিস থেকে তিনটে দামি পোর্ট্রেট চুরি করেছিল। সেটা তার মৃত্যুর পর জানতে পেরেছি। কাজেই ওর সম্পর্কে আমি কোনও কথা বলব না। আপনারা আসতে পারেন।

ছয়

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ জগদীশবাবুর দিকে ঘুরে বললেন,–একটা জরুরি কথা জিগ্যেস করতে ভুলে গেছি। আশা করি আপনি সঠিক জবাব দেবেন।জগদীশবাবু নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন,–জবাব দেওয়ার মতো হলে তবেই দেব।কর্নেল বললেন, আপনি কখনও আপনার ব্যবসার কাজে কি যদুগড়ে গিয়েছিলেন? –যদুগড়? কোন যদুগড়? –বিহারের যদুগড়।

জগদীশবাবু একটু চমকে উঠলেন মনে হল। তিনি বললেন,–কেন? –সেখানকার রাজবাড়িতে অনেক মূল্যবান জিনিস আছে।–তা সব রাজবাড়িতেই থাকতে পারে।এবার কর্নেল একটু গম্ভীর কণ্ঠস্বর বললেন, আপনি যদুগড় রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণবাবুকে কি চেনেন? আবার লক্ষ করলুম জগদীশবাবু কেমন যেন বিব্রত বোধ করছেন। তিনি আস্তে বললেন, –তাকে আমি চিনি না।

কর্নেল তেমনই গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বললেন, আমার কাছে খবর আছে আপনি তাকে চিনতেন, এবং এখনও চেনেন। কারণ গত তিনবছর ধরে মধুরবাবু কলকাতাতেই আছেন এবং তিনি বারিনবাবুর ছেলেবেলার বন্ধু। তাই প্রায়ই আপনার বাড়িতে, অর্থাৎ বারিনবাবুর কাছে যাতায়াত করতেন।

জগদীশবাবু এবার যেন নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। তাঁর হাবভাব একেবারে বদলে গেল। তিনি বললেন, আপনি কে? আপনার প্রকৃত পরিচয় কী? কর্নেল আগের মতো মেজাজে বললেন, আপনার কাছে একজন প্রাইভেট ডিকেটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার গিয়েছিলেন। তাই না? –হ্যাঁ। কিন্তু কী ব্যাপার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

–মিস্টার হালদারের পিছনে আপনি কেন একজন খুনি দুবৃত্তকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন? না, আপনি কিছু গোপন করার চেষ্টা করবেন না। আমি সবই জানি।–আপনি কি সি. বি. আই. অফিসার? –আপনি আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। মধুরবাবু সম্পর্কে আমি যা বলেছি, তা ঠিক কি না? জগদীশবাবু একটু ইতস্তত করার পর বললেন,–মধুরবাবু কি না জানি না, একজন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের প্রৌঢ় ভদ্রলোক বারিনবাবুর সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা করতে আসতেন।

পোশাক-আশাকে তাকে সাধারণ লোক বলেই মনে হতো। –গত শুক্রবার বিকেলে আপনি কি বাড়িতে ছিলেন? –না! ব্যবসার কাজে বেরিয়েছিলুম।–কখন বাড়ি ফিরেছিলেন? –রাত দশটার পরে।–বারিনবাবুর ঘরে তখন কি আলো জ্বলছিল? –অত লক্ষ করিনি। তা ছাড়া রাতে বারিনবাবু মাতাল অবস্থায় থাকতেন। তাই তাকে এড়িয়ে থাকতুম।কর্নেল তাকে বললেন, আপনি আমাকে যেসব কথা বললেন, পুলিশ আপনাকে জেরা করলে যেন ঠিক তাই বলবেন।

বলে কর্নেল শার্টের বুক পকেট থেকে একটা খুদে টেপ রেকর্ডার বের করে তাকে দেখালেন এবং বললেন, আপনি উলটো কথা বললে বিপদে পড়বেন, কারণ এই যন্ত্রে আপনার সবকথা রেকর্ড করা হয়ে গেছে। আরও শুনুন, আপনি যদি মিস্টার হালদারের মতো আমাদের পিছনেও গুন্ডা লেলিয়ে দেন, তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।

আমাকে অবাক করে কর্নেল তার প্যান্টের পকেট থেকে তার রিভলভারটি দেখিয়ে বেরিয়ে এলেন। আমি তাকে অনুসরণে দেরি করলুম না।এরপর রাস্তা পেরিয়ে আমার গাড়িতে ওঠার পর কর্নেল হেসে উঠলেন। বললুম,–হাসছেন কেন? ব্যাপারটা তো খুব সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। আপনি কী করে জানলেন যে মধুরবাবুর ও বাড়িতে যাতায়াত ছিল? কর্নেল বললেন,–আন্দাজে বহুবার ঢিল ছুঁড়ে লক্ষভেদ করতে পেরেছি।

এবারও পারলুম। সেজন্যই হাসছি। তা ছাড়া সঠিক জায়গায় ঢিলটি লাগলে অন্যপক্ষের কী অবস্থা হয়, তা তো নিজের চোখেই দেখলে।গাড়ি স্টার্ট দিয়ে যেতে-যেতে বললুম–এবার নিশ্চয়ই বাড়ি? কর্নেল বললেন,–অবশ্যই।যেতে-যেতে বলুলুম,–এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। মধুরবাবু বারিনবাবুর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন, আপনি এমনটা কী করে অনুমান করলেন? সব অনুমানের মোটামুটি এক অস্পষ্ট ভিত্তি তো থাকেই! কর্নেল বললেন,–ওটা আমার নিছক একটা অঙ্ক।

–তা হলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে মধুরবাবু যে ঘটনার কথা বলে ব্রিফকেসটা নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ঘটনা একেবারে মধুরবাবুর বানানো।কর্নেল বললেন, এখন এসব কথা নয়। বাড়ি ফিরে স্নানাহার করার পর বিশ্রাম দরকার।-কেন? রহস্যের জটিল জট তো প্রায় আপনাআপনি খুলেই পড়েছে।

কর্নেল টুপি খুলে মাথার টাকে হাত বুলিয়ে বললেন,–জয়ন্ত, তোমাকে বহুবার যুক্তিশাস্ত্রে অবভাস তত্ত্বের কথা বলেছি। যা যেমনটি দেখছ তা সবময়ই সর্বক্ষেত্রে তেমন নাও হতে পারে। রেললাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুমি দেখবে দুটো লাইন যেন ক্রমশ কাছাকাছি হতে-হতে একত্রে মিশে গেছে। কিন্তু ওটা তোমার দেখার ভুল।

এরপর আর কথা বলা চলে না। বাড়ি পৌঁছুতে প্রায় পৌনে একটা বেজে গিয়েছিল। স্নানাহারের পর খেয়ে নিয়ে কর্নেল ড্রইংরুমে তার ইজিচেয়ারে বসেছিলেন এবং চুরুট টানছিলেন। আমি যথারীতি ডিভানে চিৎপাত হয়ে ভাতঘুমের চেষ্টা করছিলুম। একটু পরে লক্ষ করলুম, কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়েল করছেন। তাপপর তিনি মৃদু স্বরে কার সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন বোঝা যাচ্ছিল না।

এই অবস্থায় ভাতঘুমের হাত থেকে আমার রেহাই ছিল না। সেই ভাতঘুম ভেঙেছিল ষষ্ঠীর ডাকে,–সাহেব! চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাকে জিগ্যেস করেছিলুম,–আজ তোমার বাবামশাই আমার গাড়ি চুরি করেননি তো?ষষ্ঠী সহাস্যে বলল,–আজ্ঞে দাদাবাবু, বাবামশাই আপনার গাড়ি চুরি করেননি। লালবাজারের সেই পুলিশবাবু, কী যেন নাম তার–বললুম,–নরেশবাবু? –আজ্ঞে হ্যাঁ। লালবাজারের নরেশবাবুই বটে। ওই যাঃ, ছাদের বাগানে কাকের বড় উৎপাত।

বলে সে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনসপেক্টর নরেশ ভদ্র এসে কর্নেলকে তুলে নিয়ে গেছে। তাহলে দেখছি রহস্যটা আবার অন্যদিকে মোড় নিল।কিছুক্ষণ পরে টেলিফোন বেজে উঠল। উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলুম। হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। দুষ্টুমি না করে বললুম-আপনি কোথা থেকে বলছেন। –জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেল স্যার নেই? –না বেরিয়েছেন।

–আমি যদুগড় থিক্যা কইত্যাসি। আমি উঠসি সরকারি ডাকবাংলোতে। আর মধুরবাবু আছেন রাজবাড়িতে। একটু আগে মধুরবাবু টেলিফোনে আমারে কইলেন, কুমারবাহাদুর তার ফিরে যাওয়াতে খুশি হয়েছেন। কিন্তু কুমারবাহাদুরের জামাই তাকে যেন থাকতে দিতে চান না। তাই তিনি এক বাল্যবন্ধুর বাড়িতে গিয়া থাকবেন ভাবসেন। আমি তারে কইলাম, অপমান সহ্য কইরা অন্তত আরও একটা দিন থাকেন। আমি কর্নেলস্যারেরে ফোন করত্যাসি, যাতে তিনি শিগগির আইসা পড়েন।

বললুম,–কর্নেল এলেই কথাটা বলছি। আর কোনও জরুরি কথা আছে? যদুগড়ের পশ্চিমে নদীর ধারে আদিবাসিরা বুনো আলুর খোঁজে মাটি খুঁড়ত্যাছিল। সেখানে তারা একটা পাথরের মূর্তি দেখসে। সেই মূর্তি দেখার জন্য সেখানে সারাদিন খুব ভিড়।–আপনি যাননি দেখতে? –না। কর্নেল স্যার আইলে ওনারে শিগগির আইতে কইবেন। হালদারমশাই লাইন কেটে দিলেন। আর প্রায় মিনিট পনেরো পরে কর্নেল ফিরে এলেন।

তখন তাকে হালদারমশাইয়ের টেলিফোনের কথাটা বললুম। তিনি বললেন,–আজ রাতের ট্রেনেই আমরা যদুগড় যাচ্ছি।একটু পরে ষষ্ঠী কফি আর স্ন্যাকস দিয়ে গেল ঘরের আলো জ্বেলে দিল। কফি খেতে-খেতে বললুম,–লালবাজারে নরেশবাবু আপনাকে নাকি উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–শ্রীমান ষষ্ঠীচরণের শ্রীমুখের খবর তা বুঝতে পারছি। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ, জয়ন্ত, ষষ্ঠীও ক্রমশ গোয়েন্দা হয়ে উঠছে।

বললুম,–তা হতেই পারে। আপনি বলুন না ব্যাপারটা কী।কর্নেল বললেন,–ধূর্ত জগদীশ রাও লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে আমার চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল। এবং সবকথা জানিয়েছিল। ভাগ্যিস ফোনটা ধরেছিলেন নরেশবাবু! তিনি ওকে আরও ভয় দেখিয়ে বলেছেন, আমি সত্যিই সি.বি.আই. অফিসার। নিহত বারিনবাবু। সম্পর্কে এখনও কোনও গোপন তথ্য থাকলে যেন পুলিশকে জানিয়ে দেয়।

–কিন্তু আপনাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন নরেশবাবু? –জগদীশবাবুর কথায় নরেশবাবু জেনে গিয়েছিলেন বারিনের হত্যাকাণ্ডের রহস্যে আমি নাক গলিয়েছি। তাই নরেশবাবু আমার কাছে জানতে এসেছিলেন কথাটা সত্যি কি না। যাইহোক সেই সুযোগে আমি ওঁর কাছে বারিনবাবুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তদন্তের ফলাফল জানতে চেয়েছিলুম। নরেশবাবু সঙ্গে কেস ফাইল আনেননি। তাই ওঁর সঙ্গে লালবাজারে গিয়ে সেই রিপোর্ট দেখে এলুম।

–রিপোর্টে কী দেখলেন, বলতে আপত্তি আছে? –না। গুলি করা হয়েছিল বারিনবাবুর কপালে আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঠেকিয়ে। গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার থেকে ছোঁড়া। ফরেনসিক রিপোর্টে বারিনবাবুর হাতের মুঠোর কাঁচাপাকা চুলের গোছা পরচুলা নয়। তিনি আততায়ীর মাথার চুল খামচে ধরেছিলেন। খুনির মাথার চুলগুলো ছিল লম্বা। আর একটা ব্যাপার, নরেশবাবুর নিজের মনে হয়েছে খুনির রিভলভারে সাইলেন্সর লাগানো ছিল, তাই কেউ গুলির শব্দ শুনতে পায়নি।

যাই হোক, লালবাজারে বসেই তোমার জন্য ট্রেনের ফার্স্টক্লাসের একটা স্লিপার বুক করতে বলেছি। তুমি তো জানো, ইস্টার্ন রেলের সব অফিসারই আমাকে খানিকটা পাত্তা দেন।এবার কর্নেল কফিতে মন দিলেন। আমি জানি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার হিসেবে কোথাও ট্রেনে বা প্লেনে যেতে কর্নেলের পয়সা খরচ হয় না। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের চোখেও উনি একজন ভি.ভি.আই.পি.।

রাত দশটায় ডিনার সেরে নিয়ে কর্নেলের নির্দেশে তৈরি হয়ে নিলুম। মাঝে-মাঝে কর্নেলের ডেরায় আমাকে কাটাতে হয় বলে আমার কয়েক প্রস্থ পোশাক-আশাক এখানেই থাকে। আর যেহেতু আমি কর্নেলের কনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার রহস্যভেদের কাহিনি ফলাও করে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লিখি, সেইহেতু কর্নেলের কথামতো বাইরে বেরুলেই আমাকে পকেটে লাইসেন্সড রিভলভার এবং কিছু বুলেট রাখতে হয়।

কর্নেল বলেছিলেন, হাওড়া স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন ছাড়বে রাত সাড়ে এগারোটায়। তাই সাড়ে দশটাতেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলুম। ছ’নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাছে যেতেই একজন রেলওয়ে অফিসার কর্নেলকে নমস্কার করে তার হাতে যেটা গুঁজে দিলেন, সেটা আমারই টিকিট। কর্নেল পার্স বের করে টাকা মিটিয়ে দিলেন। তারপর বললেন,–থ্যাঙ্কস রজত। তুমি জয়ন্তকে দেখতে চেয়েছিলে তো, এই সেই জয়ন্ত।

ভদ্রলোক আমাকে নমস্কার করলেন। প্রতি নমস্কার করে আমি কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কারণ অবাক হয়ে দেখলুম কথাটা বলেই তিনি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।কাছে গিয়ে বললুম,–এখনও তো গাড়ি ছাড়ার সময় হয়নি। আপনি হঠাৎ ঘোড়দৌড় শুরু করলেন কেন?কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মহাবলী অকশন হাউসের মালিক সেই জগদীশবাবুকে দূর থেকে লক্ষ করেছি। তিনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না জানি না।

হুইলার বুকস্টলের ওপাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটা ব্রিফকেস।বললুম,–গিয়ে জিগ্যেস করলেই হয়, তিনি যদুগড় যাচ্ছেন কি না।কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন,–এই থামের আড়ালে আমরা দাঁড়াই। দেখা যাক উনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না।প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। আমি জিগ্যেস করলুম,–এই ট্রেনেই কি আমরা যাব? –হ্যাঁ। তা ছাড়া তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না, আমরা ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। এই কামরাতেই আমরা যাব।

–তা হলে উঠেপড়া যাক।–এক কাজ করো। তুমি উঠে গিয়ে বারো নম্বর কুপের একটা লোয়ার সিটে বসে পড়ো, আমি একটু পরে যাচ্ছি।–তার মানে জগদীশবাবু এই ট্রেনেই চাপছেন কি না তা দেখতে চান। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–যা বললুম করো। তুমি ডান দিকে কাত হয়ে সবেগে পা ফেলে দরজায় উঠবে।তাঁর কথামতো আমি কামরায় উঠে গেলুম।

তারপর বারো নম্বর কুপ খুঁজে নিয়ে বাঁ-দিকে নিচের বার্থে জানালার কাছে বসলুম। আমার একটা সুটকেস আর ব্যাগ সিটের তলায় ঢুকিয়ে রাখলুম। তারপর জানলা দিয়ে কর্নেলকে খুঁজলুম। তার পিঠের কিটব্যাগটি যথারীতি আঁটা আছে এবং চেনের ফাঁক দিয়ে প্রজাপতি ধরার জালের লাঠির কিছু অংশ মাথা উঁচিয়ে আছে। ডান হাতে একটা গাবদাগোবদা ব্যাগ।

তিনি হুইলার স্টলের দিকেই তাকিয়ে আছেন। মিনিট পাঁচেক পরে তিনি ট্রেনে উঠলেন। তারপর বারো নম্বর কুপে ঢুকে ডান দিকে লোয়ার বার্থে বসলেন। জিগ্যেস করলুম,জগদীশবাবুকে কি এই ট্রেনে উঠতে দেখলেন? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ভদ্রলোক কোটিপতি। বাড়িতে এবং অফিসে এয়ারকন্ডিশনড ঘরে থাকেন। কাজেই এই ট্রেনেও তিনি এ.সি. কম্পার্টমেন্টে চেপে যাবেন তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

–আচ্ছা কর্নেল, এমন তো হতে পারে উনি এই ট্রেনে দিল্লি যাচ্ছেন।-হ্যাঁ, তাও যেতে পারেন। তবে যদুগড় স্টেশনে নেমে তুমিও একটু সতর্ক থেকো এবং চোখ খোলা রেখো।তার মানে আমাদের যেন তিনি দেখতে না পান–এই তো? কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল ট্রেন ছাড়ার খবর। তারপরই হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা চলতে শুরু করল। সেই সময়েই কি একটা অস্বস্তি এবং আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসল। জগদীশবাবু এই ট্রেনে যাচ্ছেন!

সাত

যদুগড় স্টেশনে ট্রেনটা যখন থেমেছিল, তখন ভোর পৌনে ছ’টা বাজে। কর্নেলের পিছনে সাবধানে নেমে বললুম,–জগদীশবাবুকে কি দেখতে পাচ্ছেন? কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে আমাকে চুপচাপ থাকতে বললেন। মাঝারি স্টেশন কিন্তু ট্রেনটা দিল্লি যাবে বলেই বড্ড ভিড়। প্রায় আধঘণ্টা সামনে টি-স্টলের কাছে দাঁড়িয়ে দুজনে চা খেলুম। চা খেয়ে কর্নেল চুরুট ধরালেন। সেই চুরুট শেষ হওয়ার পর তবে তিনি পা বাড়ালেন।

জগদীশবাবুর কথা আর তাকে জিগ্যেস করলুম না।গেটে গিয়ে দেখলুম কয়েকটা বাস আর অজস্র রিকশা নিচের চত্বর থেকে সামনের রাস্তায় পৌঁছুনোর জন্য যেন যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার অবাক লাগল ঘন কুয়াশা দেখে। কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে আছে। আর শীতের কথা বলার নয়।জিগ্যেস করলুম,–আমরা কোন বাহনে চেপে যাব? একে-একে সবগুলোই তো চলে গেল।

কর্নেল হাসলেন,–ওই দ্যাখো, একটা জিপ এগিয়ে আসছে।অবাক হয়ে বললুম,–ওটা তো পুলিশের জিপ মনে হচ্ছে।কর্নেল কিছু বলার আগেই জিপটা এসে আমাদের কাছাকাছি থেমে গেল। তারপর একজন পুলিশ অফিসার জিপ থেকে নেমে কর্নেলকে সেলাম ঠুকে বললেন,–একটু দেরি হয়ে গেল স্যার।কর্নেল সহাস্যে বললেন,–মোটেও দেরি হয়নি।

কর্নেল জিপের সামনে উঠলেন এবং পিছনের সিটে ওঠার জন্য আমাকে অনেক কসরত করতে হল। পুলিশ অফিসার জিপে স্টার্ট দিয়ে বললেন, আমি কখনও আপনাকে স্বচক্ষে দেখিনি। আমার সৌভাগ্য যে আপনার সেবা করতে পারছি।কর্নেল জিগ্যেস করলেন, আপনার পরিচয়ই তো এখনও দিলেন না।-স্যার আমার নাম শাহেদ খান। আমার বাংলা বলা শুনে আপনি অবাক হতে পারেন।

আসলে আমার বাবা ইউ.পি.-র লোক। আর মা কলকাতার বাঙালি মেয়ে, আমি কলকাতাতেই মানুষ হয়েছিলুম।কুয়াশায় চারদিক ঢাকা থাকলেও আবছা দেখা যাচ্ছিল উঁচু-নিচু নানা আকারের টিলা-পাহাড়। চড়াই-উতরাই হয়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা একটা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গেলুম। নদীতে তত জল নেই। বালির চড়া আর কালো-কালো পাথর দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে জিপ বাঁয়ে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগিয়ে গেল।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা একটা বাংলোর সামনে পৌঁছুলাম। মিস্টার খান বললেন,–এটা যদুগড়ের এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের গেস্টহাউস বলতে পারেন। এস.পি. সাহেবের মেসেজ। পেয়েই ও.সি. মিস্টার জয়রাম পাণ্ডে এই বাংলোটাই আপনার জন্য ঠিক করেছেন। শুনেছি আপনি প্রকৃতির মধ্যে ঘুরতে ভালোবাসেন। তাই আমার ধারণা আপনার এখানে থাকতে ভালোই লাগবে।

একটা টিলার গায়ে এই একতলা বাংলোতে ঢুকে আমার ভালোই লাগল। বাংলোর চৌকিদার আমাদের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে একটা ঘরে ঢোকাল। কর্নেল তখনও লনে দাঁড়িয়ে মিস্টার খানের সঙ্গে কথাবর্তা বলছিলেন।তারপর মিস্টার খান জিপ নিয়ে চলে গেলেন এবং কর্নেল এসে বাংলোয় ঢুকলেন। বললুম-কখনও দেখিনি আপনি রহস্যের সমাধানে পুলিশের অতিথি হয়েছেন, আমার মাথায় একটা ধাঁধা ঢুকে গেছে।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, তুমি কি দ্যাখোনি, বরাবরই রহস্যের শেষ দৃশ্যে আমাকে পুলিশের সাহায্য নিতে হয়।চমকে উঠে বললুম,–বলেন কী? আপনি বারিনবাবুর হত্যা রহস্যের শেষ দৃশ্যে পৌঁছে গেছেন, অথচ আমি আপনার পাশে থেকেও কিছু টের পেলুম না? কর্নেল পিঠের কিটব্যাগ এবং গলায় ঝোলানো ক্যামেরা ও বাইনোকুলার খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর মাথার টুপি খুলে রেখে বললেন,–তীক্ষ দৃষ্টিশক্তি এবং একটু বুদ্ধি থাকলেই চারপাশে কী হচ্ছে টের পাওয়া যায়।

না ডার্লিং, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি নেই মোটেই বলছি না, দৃষ্টিশক্তি এবং বুদ্ধি তোমার যথেষ্টই আছে। তবে তুমি তা খরচ করতে বড্ড আলসেমি করো–এই যা।কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলোর চৌকিদার ট্রেতে কফি আর স্ন্যাকস নিয়ে এল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী? সে সেলাম দিয়ে বলল,–সাব, হামার নাম গয়ানাথ।

–তোমার বাড়ি যদুগড়ে? –হাঁ সাব।–তুমি যদুগড়ের রাজবাড়ি কেয়ারটেকার মধুরবাবুকে চেনো? –জি সাব, ওই বাবুকে হামি চিনতুম। তিনবছর আগে রাজবাড়ি থেকে তাকে কুমারবাহাদুর তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।বলে সে একটু হেসে উঠল,–তাজ্জব বাত সাব, কাল বিকেলে সেই মধুরবাবুকে আবার দেখতে পেলুম। বাজারে এক ব্যবসায়ী আছে। তার টি.ভি., ক্যামেরা, এইসব জিনিসের কারবার। মধুরবাবু তার টেবিলের সামনে বসে চা খাচ্ছিলেন।

–তা হলে মধুরবাবু আবার যদুগড়ে ফিরেছেন? –আপনি কি তাকে চেনেন সাব? –হ্যাঁ, চিনি।–মধুরবাবুর নামে এখানে বদনাম আছে। কেউ তাকে বিশ্বাস করে না।কথাটা বলেই গয়ানাথ চলে গেল।কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আমি বাথরুম থেকে আসছি ইতিমধ্যে যদি টেলিফোন বাজে তুমি ধরবে এবং একটু অপেক্ষা করতে বলবে।

বলে তিনি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন। মিনিট দশেক পরে পোশাক বদলে তিনি ফিরে এলেন। বললুম,–কেউ আপনাকে ফোন করেনি।কর্নেল বললেন,–তা হলে আমি হালদারমশাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করব।নোটবই খুলে নম্বর দেখে তিনি ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–আমি মিস্টার কে, কে. হালদারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

…কী হালদারমশাই, কেমন বুঝছেন?…হ্যাঁ আমরা এসে গেছি।…ধরমচাঁদ লাখোটিয়ার বাংলোতে উঠেছি। আপনি চলে আসুন।ততক্ষণে কুয়াশা সরে রোদ ফুটছে। বাংলোর নিচে কিছুটা দূরে এই নদীটা দেখা যাচ্ছে। নদীর ওপারে আগাছার জঙ্গলের ভেতর বড়-বড় কালো পাথর হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ওধারে ঘন শালবন।

 

Read more

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৫ম পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.