রাজবাড়ির চিত্ররহস্য (৫ম পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

মিনিট কুড়ি পরে সাইকেল রিকশায় চেপে গোয়েন্দা প্রবর আবির্ভূত হলেন। কর্নেল বারান্দায় গিয়ে তাঁকে সম্ভাষণ করে ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–একখান আশ্চর্য খবর লইয়া আইসি। আমি বাংলোর বারান্দায় বইয়া চা খাইত্যাসি, সেই সময়ই দেখলাম, কলকাতার সেই জগদীশবাবু একটা গাড়ি থিক্যা নামলেন, তারপর তিনি একটা বাড়ির বারান্দায় উঠলেন।

গাড়িখান বাড়িটার পাশের গ্যারেজ ঘরে ঢুকল। কিন্তু আমার চোখ ছিল জগদীশবাবুর দিকে একটু পরে দরজা খুইল্যা এক ভদ্রলোক বারাইলেন। তারপর জগদীশবাবুরে ঘরের ভেতর লইয়া গেলেন। সেই সময়ই বাংলোর চৌকিদার কইল আমার টেলিফোন আছে।যাইহোক ফোনে আপনার কথা শুইন্যা এখানে আসবার সময়ই বাড়িটা লক্ষ করসি। গেটে ইংরিজিতে লেখা আছে মাতাজি ধাম’। তার নিচে লেখা আছে হরদয়াল অগ্রবাল।

আমি বলে উঠলুম,–সেই হরদয়ালবাবুর বাড়ি? যিনি স্মাগলিং করে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন? কিন্তু এখন তো তিনি বেঁচে নেই, কাজেই হালদারমশাই যাঁকে দেখেছেন, তিনি তার ছেলে রামদয়াল।কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–আঃ জয়ন্ত, হালদারমশাইকে কথা বলতে দাও।বকুনি খেয়ে চুপ করে গেলুম। হালদারমশাই বললেন,–এবার মধুরবাবুর কথা শোনেন, কাইল সন্ধ্যায় উনি আমার কাছে আইসিলেন।

তিনি কইলেন, কুমারবাহাদুর জামাই রাজবাড়িতে তার থাকা পছন্দ করসে না। তাই তিনি তার এক বন্ধুর বাড়িতে থাকবেন। তারপর আপনারা এলে তিনি কলকাতায় ফিরে যাবেন। হ্যাঁ, আর একটা কথা। কাইল দুপুরে আদিবাসিরা বুনো আলুর লতা খুঁজতে গিয়ে কী একটা দেবতার মূর্তি উদ্ধার করসে। সেই মূর্তি এখন।কর্নেল তার কথার ওপরে বললেন,–পুলিশের জিম্মায়।

হালদারমশাই হতভম্ব হয়ে বললেন, আপনি ক্যামনে জানলেন? কর্নেল বললেন,–পুলিশ সূত্রে জেনেছি। যাইহোক, এবার আপনাকে একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি। আপনি আপনার বাংলো থেকে ‘মাতাজি ধাম’ বাড়িটার দিকে লক্ষ রাখবেন। দৈবাৎ যদি মধুরবাবুকে ওই বাড়িটার কাছে দেখতে পান, অমনি আমাকে টেলিফোনে খবর দেবেন।

এক মিনিট, বরং আপনি এখনই রাজবাড়িতে গিয়ে আগে খবর নিন মধুরবাবু নামে কেউ ওখানে আছেন কি না। জিগ্যেস করলে বলবেন, মধুরবাবুর সঙ্গে আপনার চেনাজানা আছে।হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–যাই গিয়া। তবে একটা কথা কর্নেলস্যার। রাজবাড়িতে যদি মধুরবাবু না থাকেন আমি কি মাতাজি ধামে এসে কারুকে জিগাইমু? কর্নেল বললেন,–ওঃ না। আপনি শুধু লক্ষ রাখবেন বাড়িটার দিকে।হালদারমশাই যথারীতি সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

কর্নেল চৌকিদারকে সাড়ে আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে বলেছিলেন। ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–মর্নিং! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…নমস্কার মিস্টার পাণ্ডে…না-না, একেবারে রাজার হালে আছি। এবার শুনুন, আমি কিছুক্ষণ পরে রাজবাড়িতে কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে যাব। একটা জরুরি কাজের কথা তাই বলে নিই।

আমি যেখানে থেকেই হোক আপনাকের রিং করলে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফোর্স নিয়ে পৌঁছোনোর জন্য যেন তৈরি থাকবেন।….হ্যাঁ, মিস্টার খানের কাছে শুনেছি, লালবাজার পার্টি দুপুরের ট্রেনে এসে যাবেন।….হা, ঠিকই বলেছেন। এই কেসটা কলকাতা এবং যদুগড় দুটো জায়গারই কেস। তবে ধড়টা এখানকার, লেজটা কলকাতার। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।

জিগ্যেস করলুম,–এখনই কি বেরুচ্ছেন? -হ্যাঁ, রেডি হয়ে নাও। আমরা পায়ে হেঁটেই যাব। রাজবাড়ি শর্টকাটে যাওয়া যায়। বলে তিনি তার সেই পেটমোটা ব্যাগ খুলে যা বের করলেন তা দেখে আমার অবাক হওয়ার কারণ ছিল না। বারিনবাবুর ব্রিফকেসে পাওয়া সেই তিনটে ছবি তিনি সেই তোয়ালেতেই জড়িয়ে বাঁধলেন। তারপর সেটা বগলদাবা করে বললেন,–চলো, বেরুনো যাক, হালদারমশাইয়ের ফোন যখন পেলুম না, তখন বোঝা যাচ্ছে তিনি মাতাজি ধামের কাছে মধুরবাবুকে দেখতে পাননি।

এমনও হতে পারে রাজবাড়িতে গিয়েই আমরা হালদারমশাইয়ের দর্শন পাব।বাংলোর পাশ কাটিয়ে একটা সংকীর্ণ পায়ে চলা পথে কর্নেল হাঁটছিলেন। পথের দু-ধারে ঘন ঝোঁপ। আমরা যাচ্ছি উত্তর দিকে। বাঁ-দিকে একটু দূরে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ো। তারপর পথের দু-ধারের ঘন গাছপালা আর কিছু দেখতে দিল না।মিনিট দশেক হাঁটার পর কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন।

আস্তে বললেন, আমরা রাজবাড়ির কাছে এসে পড়েছি। এবার তোমাকে কষ্ট করে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে আমার সঙ্গে আসতে হবে।একটু পরে চোখে পড়ল উঁচু একটা বাউন্ডারি ওয়াল। জায়গায়-জায়গায় ফাটল ধরেছে, ইটও বেরিয়ে আছে। সেই পাঁচিলের সমান্তরালে পশ্চিম দিকে কিছুটা চলার পর খোলামেলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কুমারবাহাদুরকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছা আছে।

তাছাড়া সদর রাস্তায় বগলে এই বোঁচকাটা রাখা নিরাপদ মনে করিনি। চমকে উঠে জিগ্যেস করলুম,–নিরাপদ মনে করেননি? কেন? –ভুলে যেও না, জয়ন্ত, এই ভোয়ালেটা এবং তার ভেতরের জিনিস এখানে কারও চেনা হতেই পারে।আরও অবাক হয়ে বললুম,–এটা মধুরবাবু ছাড়া আর কে চিনবেন?কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন।

আবার উত্তরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাউন্ডারি ওয়ালের শেষে একটা গেটের সামনে পৌঁছুলাম। গেটের কাছে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরা একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। কর্নেলকে দেখা মাত্র সে সেলাম ঠুকে বলে উঠল,–কর্নেলসাব! আপনি যে আসবেন তার খবর তো দেননি? খবর দিলে আপনাকে কষ্ট করে পায়ে হেঁটে আসতে হতো না।

কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর আছেন? –হ্যাঁ, কর্নেলসাব। আপনারা আসুন, আমি ওনাকে খবর দিচ্ছি।’ বিহার অঞ্চলে রাজা-জমিদারদের রাজবাড়ি কর্নেলের সঙ্গগুণে অনেক দেখেছি। তবে এই রাজবাড়ি বেশ পরিচ্ছন্ন এবং দেশি-বিদেশি ফুল এবং গুল্মে সাজানো। আমরা এগিয়ে কিছুটা গেছি, এমনসময় কর্নেলের মতোই বৃদ্ধ এবং প্রকাণ্ড চেহারার পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়ি বারান্দার ছাদে আবির্ভূত হলেন।

তিনি বললেন,–কী আশ্চর্য, আমি কি স্বপ্ন দেখছি? কর্নেল বললেন,–না, হঠাৎ-ই আমাকে চলে আসতে হল। হাতে সময় কম, আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেই বেরুতে হবে।গেটে দেখা সেই লোকটি আমাদের হলঘরের ভেতর দিয়ে দোতলায় নিয়ে গেল। চওড়া বারান্দায় কয়েকটা বেতের চেয়ার এবং টেবিল ছিল। সেখানে আমরা বসলুম।

কুমারবাহাদুর বললেন, আপনার সঙ্গী এই যুবকটিকে দেখে আমার ধারণা ইনিই সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি।এরপর কর্নেল বগলদাবার তোয়ালে জড়ানো ছবিগুলো টেবিলে রেখে বললেন, দেখুন তো, এগুলো চিনতে পারেন কিনা?তোয়ালে খুলে ছবিগুলো দেখামাত্র কুমারবাহাদুর কর্নেলের হাত চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। আমি তো হতবাক।কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর, আমার হাতে সময় কম।

এই ছবিগুলো আমি কীভাবে উদ্ধার করেছি যথাসময়ে জানতে পারবেন।এবার আর দুটো হারানো জিনিস আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।বলে উনি জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে সেই প্রাচীন বৌদ্ধ সিলটা এবং ভাজকরা ম্যাপটা তার হাতে তুলে দিলেন। কুমারবাহাদুর সিল এবং ম্যাপটা দু-হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বললেন,–সত্যিই আমি স্বপ্ন দেখছি।

–স্বপ্ন নয়। আপনাদের জাদুঘর থেকে এই ছবি এবং সিল হারানোর কথা আপনার কলকাতার বেয়াইমশাইয়ের কাছে শুনেছি। কিন্তু তার আগেই দৈবাৎ এগুলো আমার হস্তগত হয়েছিল। তাই দেরি না করে আপনার হারানো জিনিস আমি ফেরত দিতে এসেছি।কুমারবাহাদুর চোখ মুছে বললেন, আমার মেয়ে-জামাই আজ পাটনা গেছে। ওরা ফিরবে কয়েকদিন পরে। ওরা থাকলে খুবই আনন্দ পেত।

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মধুরবাবু ফিরে এসেছেন শুনলুম, কোথায় তিনি? –কাল পাটনা যাওয়ার আগে জামাই মধুরকে দেখে খুব চটে গিয়েছিল। সে বলে গেছে ওই লোকটাকে যেন আমি আর আশ্রয় না দিই। কিন্তু কী করব বলুন। মধুর এসে আমার হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। তারপর বলল,–জাদুঘরের হারানো জিনিস আমি নাকি শিগগির ফিরে পাব। তাই তো পেলাম দেখছি। আমার অবাক লাগছে।

আট

কর্নেল বললেন,–এবার একটা গুরুত্বপুর্ণ গোপন কথা আছে। কিন্তু এখানে নয়, সেটা আপনার ঘরে বলতে চাই।কুমারবাহাদুর তখনই বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলেন, আমরা তাকে অনুসরণ করলুম। লক্ষ করলুম তার হাতে একটা চাবির গোছা আছে। একটা ঘরের পরদা সরিয়ে তালা খুললেন। তারপর বললেন,–আসুন।ঘরে ঢুকে কর্নেল বললেন,–দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছি।

তারপর কুমারবাহাদুর এবং আমরা একটা টেবিল ঘিরে বসলুম। কুমারবাহাদুর ছবিগুলো, ব্রোঞ্জের সিল এবং ম্যাপটা টেবিলে রাখলেন। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, আপনি কি ছবিগুলোর ফ্রেম এবং পিছন দিকটা লক্ষ করেছেন? কুমারবাহাদুর একটা ছবি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন,–ফ্রেম তো তেমনি আছে।–কিন্তু পিছনের দিকটা দেখে কি আপনার খটকা লাগছে না? এবার কুমারবাহাদুর বলে উঠলেন,–কী আশ্চর্য! পিছনের দিকটাই নতুন করে কাগজ সাঁটা হয়েছে।

ছবিগুলো কি কেউ খুলেছিল? কর্নেল বললেন,–আমিই খুলেছিলাম। কারণ বহু বছর আগের বাঁধানো ছবির পিছন দিকটা দেখে সন্দেহ হয়েছিল, পিছনগুলো কেউ খুলেছে।এবার কুমারবাহাদুর উত্তেজিতভাবে বললেন,–ছবি ভোলার কারণ কী? –কারণ ছবিচোর জানত এই তিনটে ছবির ভেতরই বহুমূল্য রত্ন লুকনো আছে। আমি দেখাচ্ছি। ভেতরে এই দেখুন দুটো করে পুরোনো পিসবোর্ড আছে।

আতস কাঁচে দেখেছি দুটো পিসবোর্ডের মধ্যে আবছা নকশা কাটা কোনও জিনিসের ছাপ পড়েছে।কুমারবাহাদুর চমকে উঠে বললেন,–তা হলে এর ভেতর মূল্যবান রত্ন লুকোনো ছিল।–ছিল। সেগুলো ছবিচোর হাতিয়ে নিয়ে নতুন করে পিছনে কাগজ এঁটে রেখেছিল। ব্রোঞ্জ, সিল আর নকশা নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তিনখানা বহুমূল্য নকশাদার হালকা পাতের অলঙ্কার পেয়েই সে খুশি হয়েছিল।

যাইহোক, আর কোনও কথা নয়, আমি একবার টেলিফোন করব।কুমারবাহাদুর টেলিফোন দেখিয়ে দিতেই কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–হালদারমশাই কী খবর বলুন।… কতক্ষণ আগে?…এইমাত্র? ঠিক আছে। আপনি এসে বাড়িটার কাছাকাছি কোনও জায়গায় দাঁড়ান। যেখান থেকে ও বাড়ির কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না।

কর্নেল আবার ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–মিস্টার পাণ্ডে, আপনারা তৈরি আছেন তো?…তা হলে এখনই বেরিয়ে পড়ুন এবং রামদয়াল অগ্রবালের বাড়ি ‘মাতাজি ধাম’ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলুন। আমি এখনই বেরুচ্ছি।কুমারবাহাদুর কান ভরে শুনছিলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন, কর্নেলসাহেব, কী ব্যাপার বলতে আপত্তি আছে? কর্নেল হেসে বললেন, আপাতত আছে। কারণ আমার এই অভিযান সার্থক হবে কি না নিশ্চিত নই।

আপনি অপেক্ষা করুন, যথাসময়ে এসে আপনাকে সব বলব।কর্নেল ঘরের দরজা খুলে বেরুলেন, আমি তাকে অনুসরণ করলুম। সিঁড়ির মাথায় গিয়ে একবার ঘুরে দেখলুম কুমারবাহাদুর দরজার বাইরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।আমরা গেটের কাছাকাছি পৌঁছেছি এমনসময় পাশের একতলা ঘর থেকে সেই হাফপ্যান্ট পরা লোকটি সেলাম ঠুকে বলল,–এখনই চলে যাচ্ছেন কর্নেলসাব?কর্নেল বললেন,–মগনলাল, আবার আমরা আসব।

সেই সময়ই নিচের রাস্তায় দুটো পুলিশের জিপ এবং একটা কালো রঙের প্রিজন ভ্যান ঝড়ের বেগে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেল। কর্নেল বললেন,–চলো জয়ন্ত, আমরা এবার শর্টকাটে না গিয়ে সদর রাস্তা দিয়েই হেঁটে যাই।রাস্তাটা চড়াইয়ের দিকে উঠেছে। মিনিট দশেক হাঁটার পর সমতল রাস্তায় পৌঁছে দেখলুম বাঁ-দিকে মাতাজি ধাম-এর সামনে পুলিশের তিনটে গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে। এবং রাইফেল হাতে নিয়ে পুলিশবাহিনী বাড়িটা ঘিরে রেখেছে।

একটু তফাতে হালদার মশাই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখেই হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। তারপর চাপাস্বরে কর্নেলকে বললেন, এখনই জাল ফ্যালাইয়া তো দিলেন। কোন মাছটারে ধরবেন বুঝতে পারতাসি না।কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, আপনার কথা শুনেই জাল ফেলেছি। আসুন দেখি কী অবস্থা।হালদারমশাই কী বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন।

একদিকে আমি তো একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। কিছু বোঝার শক্তি যেন হারিয়ে গেছে। আমাদের দেখে সেই এস. আই. মিস্টার শাহেদ খান চাপা হেসে বললেন,–কর্নেলসাহেবের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।কর্নেল বারান্দায় উঠে শুধু বললেন,–অর্থাৎ আমার টাইমিং সেন্স কাজে লেগে গেছে।প্রথম ঘরটা বসবার ঘর। সেই ঘরে দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল ছাড়া আর কেউ নেই। শাহেদ খান ভেতরের ঘরের দরজায় পরদা তুলে বললেন, স্যার কর্নেলসাহেবরা এসে গেছেন।

ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর কেউ ডাকলেন,–আসুন কর্নেল সাহেব। কর্নেল তার পিছনে আমি এবং হালদারমশাই ঢুকে দেখি এটা যেন একটা গোডাউন। ঘরের এখানে-ওখানে স্তূপাকৃতি প্রকাণ্ড সব প্যাকেট সাজানো এবং এককোণে জানালার ধারে ছোট্ট সোফাসেটে বসে আছেন জগদীশ প্রসাদ। একজন ভুড়িওয়ালা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এবং আমাদের সুপরিচিত সেই মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেমশাই।

সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজ ছড়িয়ে রেখে তার ওপর সূক্ষ্ম নকশাকাটা অর্ধবৃত্তাকার মুকুটের মতো গড়নের তিনটে জিনিস। প্রত্যেকটিতে নানারঙের রত্নখচিত আছে। তার ওপর আলো পড়ে আমার চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছিল। আরও একটা জিনিস দেখতে পেলুম। টেবিলের একপাশে একটা ব্রিফকেস খুলে রাখা হয়েছে। সেটা নোটে ভর্তি। হালদারমশাই আমার কানে-কানে বললেন,–কী কারবার দ্যাখসেন? কর্নেল সোফার কাছে গিয়ে বললেন, মিস্টার পাণ্ডে, একেবারে ঠিক সময়েই এসে পড়েছিলেন দেখছি।

দৈত্যাকৃতি মিস্টার পাণ্ডের ডান হাতে রিভলভার ছিল। উনি সেটা বাঁ-হাতে নিয়ে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর বললেন,–দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়নি। কারণ এই তিন ঘুঘু বেটাচ্ছেলে ভেবেছিল বাইরের ঘরের দরজা খোলা রাখলে সন্দেহ হবে না যে ভেতরে ঘরে কিছু হচ্ছে।

মিস্টার পাণ্ডে ছাড়া ঘরে সশস্ত্র দুজন পুলিশ অফিসার হাতে রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশও দেখতে পেলুম। বুঝলুম তারা স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক। তারপরই দেখলুম মধুরবাবু হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠেছেন। তিনি কাঁদতে-কাঁদতে বললেন,–আমি কিছু জানি না কর্নেলসাহেব। রাজবাড়িতে আমার জায়গা হবে না দেখে আমি রামদয়ালজির কাছে একটা চাকরির আশায় এসেছিলুম।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার মতো ধূর্ত মানুষ আমি এ যাবৎ কাল দেখিনি। আমাকে একটা অদ্ভুত গল্প বলে আপনি যে নাটকের সূত্রপাত করেছিলেন, তা কোথায় পৌঁছুবে আমি জানতে পেরেছিলুম বারিনবাবুর হাতে মুঠোয় কঁচাপাকা একগোছা চুল থাকার কথা শুনে।হালদারমশাই বলে উঠলেন,–অ্যাঁ, কী কইলেন? কঁচাপাকা চুল? –হ্যাঁ, হালদারমশাই।

মধুরবাবুর মাথা লক্ষ করে দেখুন। উনি যেদিন আমার কাছে যান, সেদিন আমার চোখ পড়েছিল, ওঁর মাথার সদ্য ছাঁটা ছোট-ছোট চুলে। আপনারা জানেন মধুরবাবু খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। তাঁকে কুমারবাহাদুর ঠাট্টা করে বাবুর বাবু’ বলতেন। তাছাড়া আমিও ওঁকে যখন প্রথম দেখেছিলুম, তখন ওঁর মাথায় ছিল, টেরিকাটা ঝাঁকড়া চুল।

মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–কলকাতার এই জগদীশবাবুর ব্রিফকেস থেকে আমরা একটা রিভলভার উদ্ধার করেছি। মনে হচ্ছে সেটাই মার্ডার উইপন। লালবাজার থেকে আমাকে বারিন সিনহা নামে এক ভদ্রলোকের শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের কেস হিস্ট্রি রেডিও মেসেজে পাঠানো হয়েছে।কর্নেল বললেন,–লালবাজারের ডিটেকটিভরা সদলবলে দুপুরের মধ্যেই এসে পড়বেন। তাদের হাতে এই তিনজনকেই আপনারা হয়তো তুলে দেবেন।

–দেব। কিন্তু এই কয়েক লাখ টাকার তিনটে রত্নখচিত সোনার মুকুট কোথায় এবং কে দেখতে পেয়ে চুরি করেছিল? –আপাতত সংক্ষেপে বলি। এই মধুর মুখুজ্যে ছিল এখানকার রাজবাড়ির কেয়ারটেকার। তার বাবাও ছিলেন রাজ এসটেটের ম্যানেজার। পুরুষানুক্রমে এ বাড়িতে থাকার দরুন মধুরবাবু জানতে পেরেছিল কুমারবাহাদুরের পূর্বপুরুষদের তিনটি বাঁধানো ছবির পিছন দিকে সাবধানে এই তিনটি রত্নখচিত মুকুট লুকোনো ছিল।

মধুরকৃষ্ণ রাজবাড়ি থেকে সেগুলো হাতিয়ে এই জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলেছিল এবং ছবির পেছনে নতুন করে কাগজ এঁটে দিয়েছিল। তাই প্রথম দিনই ওর কাটা চুল এবং এই নতুন করে আঁটা কাগজ আমার মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। এরপর মধুরকৃষ্ণ প্রথমে বারিনের সঙ্গে তারপর জগদীশপ্রসাদের সঙ্গে এগুলো নিয়ে দরাদরি শুরু করে। এ অবশ্য আমার অনুমান।

তারপর জগদীশ আর মধুরকৃষ্ণ দুজনে কেন বারিন সিনহাকে খুন করল তাও আমার কাছে স্পষ্ট। এই মুকুটগুলোর দাম বাজার দরে এত বেশি টাকা, যে বারিনের পক্ষে তা কেনা সম্ভব ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা বারিন বেঁচে থাকলে তাকেও সমান বখরা দিতে হবে। অতএব তাকে শেষ করে ফেলাই উচিত।

এরপর মধুরকৃষ্ণ খুব ভয় পেয়েছিল। কারণ জগদীশপ্রসাদ এরপর তাকেও হয়তো মেরে ফেলবে। তাই নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে সে একটা ব্রিফকেসে শুধু ছবিগুলো আর দু-একটা জিনিস ভরে আমার কাছে নিয়ে গিয়ে একটা গপ্পো ফেঁদে আসলে আমার কাছে আশ্রয়ই চেয়েছিল। সে জানে আমি তার গল্পটা শোনার পর তাকে আশ্রয় দেব। যাইহোক, সে রত্নগুলো নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে আমার কথা মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার হালদারের সঙ্গে যদুগড়ে এসেছিল।

এটা কিন্তু আমারই একটা চাল। শেষ পর্যন্ত সে এখানে এসে সাধু সেজে রাজবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে নিশ্চয়ই কোটিপতি স্মাগলার এই রামদয়ালের কাছে রত্ন বেচতে চাইবে। এটা আমি অনুমান করেছিলুম।মিস্টার পাণ্ডে জগদীশ প্রসাদকে দেখিয়ে বললেন,–কিন্তু এই ভদ্রলোক কীভাবে জানলেন যে মধুরবাবু এখানে এসে রামদয়ালের দ্বারস্থ হবে? কর্নেল বললেন, আমার অনুমান জগদীশ প্রসাদের হাত থেকে বাঁচতে মধুরকৃষ্ণ অনেক ভেবে তাকেও বখরা দিতে চেয়েছিল।

দেখা যাচ্ছে, এদের তিনজনের মধ্যেই একটা যোগাযোগ হয়ে যায়, এবং ঠিক সময়ে জগদীশ তার বখরা নিতে এখানে এসে পড়ে। আজকাল টেলিফোনের উন্নতির যুগে পরস্পর যে যেখানেই থাকুক যোগাযোগ করা কঠিন কিছু নয়।মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–সবকথা আমি এই তিন বেটাচ্ছেলের মুখ থেকে বের করে নেব। আমার নাম জয়রাম পাণ্ডে! আমি যে কী, তা অন্তত এই রামদয়াল অগ্রবাল ইতিমধ্যেই ভালোই জেনে গেছে।

কর্নেল বললেন,–তা হলে আপনার বমাল আসামিদের নিয়ে থানায় চলে যান। লালবাজারের লোকেরা এসে পড়লেই আইনত যে ব্যবস্থা করা উচিত তা করবেন।এই বলে কর্নেল সবে ঘুরেছেন, হালদারমশাই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কয়েক পা বাড়িয়ে মধুরবাবুর মাথায় একটা জায়গায় চুল সরিয়ে দেখালেন। তারপর বললেন,–দ্যাখসেন! বাঁ-কানের পাশে একটুখানি জায়গা লাল হইয়া আসে।

এই জায়গাটা কাইল দুপুরে হঠাৎ আমার চোখে পড়সিল। জিগাইলাম ফেঁড়া হইসে নাকি মধুরবাবু? মধুরবাবু সেইখানে হাত বুলাইয়া কইলেন, কী একটা হইসিল। আমি চুলকাইয়া দিসিলাম। কে জানে সেপটিক না হয়!বলে হালদারমশাই খি-খি করে হাসতে-হাসতে কর্নেলকে অনুসরণ করলেন।আমরা তিনজনে ‘মাতাজি ধাম’ থেকে বেরিয়ে যে বাংলোয় কর্নেল এবং আমি উঠেছি, সেখানে গেলুন। কর্নেল চৌকিদারকে বললেন,–একজন গেস্ট আছে।

কোনও অসুবিধে হবে না তো? চৌকিদার বলল,–কোনও অসুবিধে হবে না স্যার, শুধু হুকুম করুন, কখন আপনারা লাঞ্চ খাবেন।কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–ঠিক একটায় আমরা খেয়ে নেব। তবে আপাতত তুমি আমাদের তিন পেয়ালা কফি এনে দাও।কিছুক্ষণ পরে চৌকিদার কফি দিয়ে গেল। কফি খেতে-খেতে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একটা কথা বুঝতে পারতাসি না কর্নেলস্যার।… হঃ, আপনি কথাটা তখন মিস্টার পাণ্ডেরে কইসিলেন বটে, কিন্তু আমি বুঝি নাই।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–বলুন হালদারমশাই।–মধুরবাবু মিথ্যা একখান গল্প কইয়া আপনার কাছে গিসল ক্যান? সে তত ওই রত্নগুলি হাতাইয়া বাকি সব জিনিস নষ্ট কইরা ফেলতে পারত। কিন্তু তা না কইরা সে আপনার কাছে গেল ক্যান? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জগদীশপ্রসাদের ভয়ে।

–এবার কন যখন সে বারিনবাবুর কাছে গিয়াসিল তখনই কি জগদীশবাবু বারিনবাবুকে খুন করেন?–হ্যাঁ।–তা হলে বারিনবাবু জগদীশবাবুর চুল না ধইরা মধুরবাবুর চুল ধরলেন ক্যান? –দৃশ্যটা আমি মনে-মনে সাজিয়েছি। শুক্রবার রাত্রে তিন স্যাঙাতে মিলে মধুরবাবুর চুরি করা রত্ন নিয়ে আলোচনা করছিল। ধরা যাক, তিনজনেই ঠিক করে রত্নগুলো যদুগড়ে গিয়ে রামদয়ালের কাছে বিক্রির প্রস্তাব করা হবে।

কারণ, তিনজনই রামদয়ালকে চেনে। জগদীশবাবুও যে চিনত, তা তো আমরা এখন জানি। এখানে এসে তার বাড়িতেই জগদীশবাবু ঢুকেছিল।যাইহোক, এবার সেই দৃশ্যের কথায় আসি, কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর মধুরবাবু উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময়েই জগদীশবাবু মধুরবাবুর চক্রান্ত অনুসারে আচমকা এগিয়ে এসে বারিন সিনহার কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি করেন।

আচমকা আক্রান্ত হওয়ার মুখে মানুষ সহজাত বোধে যা করে, বারিনবাবু ঠিক তাই করেছিল। হাত বাড়িয়ে জগদীশবাবুর চুল ধরতে গিয়ে মধুরবাবুর মাথাটা হাতের কাছে পেয়েছিল। তাই সে মধুরবাবুরই একগোছা চুল ছিঁড়ে নেয়।আমি জিগ্যেস করলুম,–আপনি তা হলে একেবারে প্রথম থেকেই মধুরবাবুকে সন্দেহ করেছিলেন।– সে তো আগেই বলেছি। মধুরবাবুর মাথার চুলছাঁটা দেখে আমার অবাক লেগেছিল।যখন অবাক লেগেছিল। তখন অবশ্য তার প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মধুরবাবু যখন বলল,–বারিন নামে তার এক বন্ধু খুন হয়েছে, সে নাকি ব্রিফকেস দিয়েছিল–তার হাতের মুঠোয় একগোছ কাঁচাপাকা চুল আছে। জয়ন্ত, খুনি যত ধূর্তই হোক এইভাবেই একটা বেঁফাস কথা বলে ফেলে কিংবা তার ধরা পড়ার কোনও সূত্র নিজের অজান্তে রেখে যায়। একটু চিন্তা করো জয়ন্ত, ভিকটিমের হাতের মুঠোয় কাঁচাপাকা চুল থাকার কথাটা বলে মধুকৃষ্ণ কি বোকামি করেনি? আসলে সে বারিনবাবুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলেছিল।

হালদারমশাই ততক্ষণে কফি শেষ করেছেন। একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন,–আমরা কি আইজ যদুগড়ে থাকব? কর্নেল সহাস্যে বললেন,–নিশ্চয়ই থাকব। আর এই সুযোগে আপনাকে আর জয়ন্তকে রাজবাড়ির বিস্ময়কর পাতাল-জাদুঘর দেখাব।

( সমাপ্ত )

 

Read more

নরহরি দাস – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

Leave a comment

Your email address will not be published.