রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৩)

আপনার নাম কী? 

‘স্যার, আমার নাম সুলেমান।

রূপালী দ্বীপ

সুলেমান সাহেব! আপনি দয়া করে বিদায় হােন। আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। 

“জ্বি আচ্ছা, লাইটারটা রাখুন স্যার। 

লাইটার দিয়ে কী করব?” ‘আপনার সিগারেট নিভে গেছে। 

শুভ্র লাইটার হাতে নিজের জায়গায় ফিরে এল। আনুশকা বলল, শুভ্র, তুমি কি জরীকে দেখেছ? সে কোথায় জান? 

‘এখন কোথায় জানি না। তবে তাকে যেতে দেখেছি। হনহন করে যাচ্ছিল। একটা স্যুটকেসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। 

ও আমার উপর রাগ করে উঠে চলে গেছে। কী নিয়ে রাগ করল? ‘কোনকিছু নিয়ে না। রাগটা ওর মনে ছিল। বের হয়ে এসেছে। তুমি কি রাগ। ভাঙিয়ে ওকে নিয়ে আসবে? 

‘আমি গেলে ওর রাগ ভাঙবে?’ ‘ঘঁ, ভাঙবে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৩

শুভ্র জরীকে খুঁজতে বের হল। আশ্চর্য কাণ্ড ! জরী কোথাও নেই। একজন মানুষ তাে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না! কোথায় গেল সে? আখাউড়ায় ট্রেন কিছুক্ষণের জন্যে থেমেছিল। জরী কি তখন নেমে গেছে? শুভ্রর বুক কাঁপছে। সে আবার খুঁজতে শুরু করল। 

‘স্যার, আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?” 

‘না, কাউকে খুঁজছি না। আপনাকে না বলেছি আমার পেছনে ঘুরঘুর করবেন না ?” 

সুলেমান এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। সে কি ছায়ার মতাে শুভ্রকে অনুসরণ করছে? 

সুলেমান ইতস্তত করে বলল, ‘ভেজা শাড়িপরা মেয়েটি স্যার বুফে কারে আছে। 

ও আচ্ছা, থ্যাংক অ্য। আপনি কি সারাক্ষণই আমার পেছনে পেছনে আছেন?” ‘আমি স্যার দূর থেকে লক্ষ রাখছি। ‘আমি কী করছি না করছি সব দেখছেন? 

‘জ্বি স্যার। ‘আমি যে বুফে কারের ম্যানেজারের গায়ে থুথু দিয়েছি, তাও দেখেছেন? 

সুলেমান কিছু বলল না। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র একবার ভাবল বলে, এই ব্যাপারটা আপনি দয়া করে বাবাকে বলবেন না। তারপর মনে হল, এটা বলা ঠিক হবে না। অন্যায় অনুরােধ। অন্যায় অনুরােধ আর যে–ই করুক, সে করতে পারে না। 

বুফে কার অন্ধকার। টেবিলগুলির উপর বালিশ এবং চাদর বিছিয়ে বুফে কারের লােকজন শুয়ে আছে। একটি টেবিলই শুধু খালি। তারই এক কোণায় জড়সড় হয়ে জরী বসে আছে। খােলা জানালায় বৃষ্টির ছাট আসছে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৩

শুভ্র ডাকল, জরী! জরী খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, এসাে। বসাে আমার সামনে। ‘একা একা কী করছ?” 

ভাবছি।” কী ভাবছ?” ‘শৈশব থেকে ভাবা শুরু করেছি। চার বছর বয়স থেকে আরম্ভ করেছি, যেসব 

স্মৃতি মাথায় জমা আছে সেগুলি দেখার চেষ্টা করছি। 

‘কোন পর্যন্ত এসেছ ?” 

ক্লাস টেন। ক্লাস টেনে এসেই বাধা পড়ল। তুমি উদয় হলে। ‘শীত লাগছে না?” 

লাগছে। শীতে মরে যাচ্ছি। মনে হয় জ্বরও এসেছে। দেখাে তাে, গায়ে জ্বর আছে কি না। 

জরী হাত বাড়িয়ে দিল। কত সহজেই না সে তার হাত বাড়িয়েছে। দ্বিধা নেই, সংকোচ নেই। বরং একধরনের নির্ভরতা আছে। 

শুভ্র বলল, তােমার গায়ে জ্বর। ‘বেশি জ্বর?” ‘া, বেশি। অনেক জ্বর। তােমার বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হয়নি। 

বৃষ্টিতে না ভিজলেও আমার জ্বর আসত। আমি যখন বড় ধরনের কোনাে সমস্যা থেকে মুক্তি পাই, তখন আমার জ্বর এসে যায়। 

সেই জ্বর কতদিন থাকে? সে হিসাব করিনি। ‘ভেজা কাপড় বদলাবে না? 

‘বদলাতে পারলে ভাল হত। নিজেকে অশুচি লাগছে, তবে নােংরা বাথরুমে ঢুকে কাপড় বদলাতে ইচ্ছে করছে না। 

তা হলে কী করবে? ভেজা কাপড়ে বসে থাকবে?” 

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *