রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৫)

সবাই হাসছে, শুধু জরী হাসছে না। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। এক সময় সে মনে মনে বলল, আল্লাহ, তুমি আমার মনটা ভাল করে দাও। 

রূপালী দ্বীপআনুশকা বলল, জরী, তাের ঠাণ্ডা লাগবে। মাথা ভেতের টেনে নে। কচ্ছপের মতো সারাক্ষণ মাথা বের করে রেখেছিস কেন? 

জরী বলল, আমার ঠাণ্ডা লাগছে না।। ‘বাইরে দেখার কিছু নেই, অন্ধকারে শুধু শুধু তাকিয়ে আছিস। 

জরী শান্ত গলায় বলল, এই মুহূর্তে আমার অন্ধকার দেখতেই ভাল লাগছে। “ফিলসফারের মত কথা বলছিস যে? “আচ্ছা, আর বলব না। ‘চল, তােকে নিয়ে চা খেয়ে আসি । ‘জায়গা ছেড়ে নড়তে ইচ্ছা করছে না। ‘আয় তো তুই। 

জরী উঠল। আনুশকা জ্বরীর হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, চোখ মােছ। তাের চোখে পানি। মুখের হাসি সবাইকে দেখানো যায়, চোখের পানি কাউকে দেখাতে নেই। 

‘তুই নিজেও তো ফিলসফারের মতাে কথা বলছিল। ‘ফিলসফি ছোঁয়াচে রোগের মতাে। একজনকে ধরলে সবাইকে ধরে। কিছুক্ষণ পরে দেখবি, আমাদের বল্টও ফিলসফারের মতো কথা বলা শুরু করবে। 

তারা দুজন একই সঙ্গে বন্টুর দিকে তাকাল। বন্টু বলল, তােমরা যাচ্ছ কোথায় ? 

‘চা খেতে যাচ্ছি। ‘চলো, আমিও যাব। তােমাদের বডিগার্ড হিসেবে যাব। 

‘বন্দু, তােমাকে যেতে হবে না। তুমি যেখানে বসে আছ সেখানে বসে থাক। নাে মুভমেন্ট। 

‘বন্টু নামটা না ডাকলে হয় না? আমার সুন্দর একটা নাম আছে – অয়ন। 

আনুশকা বলল, এমন কাব্যিক নাম তােমাকে মানায় না। বন্দু হল তােমার জন্যে সবচে’ লাগসই নাম। বন্টু। মিঃ বি। 

বুফে কার একেবারে শেষ মাথায়। এদের অনেকক্ষণ হাঁটতে হল। আনুশকা এখনাে জরীর হাত ধরে আছে। হাত ধরাধরি করে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়া বেশ ঝামেলার ব্যাপার, কিন্তু আনুশকা হাত ছাড়ছে না। আনুশকা বলল, জরী, তাের কোন জানিটা সবচে’ ইন্টারেস্টিং মনে হয়? 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৫

‘ট্রেন জার্নি। ‘আমারো, কী জন্যে বল তাে?” ‘চারদিকে দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। 

‘হয়নি। ট্রেনে চলার সময় ঝিক ঝিক শব্দ হতে থাকে। একধরনের তাল তৈরি। হয়, নাচের তাল। এইজন্যেই ভাল লাগে। 

‘আমি এইভাবে কখনাে ভাবিনি। 

‘আমিও ভাবিনি। বাবার কাছে শুনেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটাই বােধহয় ট্রেন জার্নি ভাল লাগার আসল কারণ। 

‘কামরায় গাড়িভরা ঘুম, রজনী নিঝুম। 

ট্রেনে উঠলেই অনুশকার এই লাইনগুলাে মনে হয়। এখনাে মনে হচ্ছে, যদিও কারাে চোখেই ঘুম নেই – রজনীও নিঝুম নয়। ট্রেনের শব্দ ছাড়াও আকাশে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি কি হবে? হলে খুব ভাল হয়। আনুশকা বলল, এক কামরা থেকে আরেক কামরায় যাবার ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং না ? 

– জরী বলল, হুঁ। সায় দেবার জন্যে সায় দেয়া। সে আসলে কিছু শুনছে না। তার শুনতে ইচ্ছা করছে না। সব মানুষই দিনের কিছু সময় নিজের সঙ্গে কথা বলে। পাশের অতি প্রিয়জনও কী বলছে না বলছে তা কানে যায় না। | আনুশকা বলল, এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাবার ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং কেন বল তো? 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৫

‘জানি না। 

‘প্রতিটি কামরার আলাদা অস্তিত্ব আছে। এক–একটি কামরা পার হচ্ছি, আর মনে হচ্ছে – আমরা আলাদা অস্তিত্ব অতিক্রম করে করে এগুচ্ছি।‘ 

হুঁ‘। 

‘তুই আমার কথা কিছুই শুনছিস না। মন দিয়ে শুনলে হেসে ফেলতি। কারণ আমি খুব সস্তা ধরনের ফিলসফি করছি। 

‘আচ্ছা। 

বুফে কারের ম্যানেজার বলল, কাটলেট আর বােম্বাই টোস্ট ছাড়া কিছু নেই। আনুশকা বলল, কাটলেট এবং বােম্বাই টোস্ট খাবার জন্যে আমরা আসিনি। আমরা চা খেতে এসেছি। 

‘চা নাই। ওভালটিন আছে।”

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৫

ওভালটিন, ওভালটিন কে খায়? বাংলাদেশ হচ্ছে চায়ের দেশ। এখানে পাওয়া যাবে চা। বিদেশিদের জন্যে কফি। ওভালটিন কেন?‘ 

ম্যানেজার হাই তুলল। জবাব দেবার প্রয়ােজন মনে করল না। ওভালটিন বিক্রি করলে লাভ অনেক বেশি থাকে। এই তথ্য মেয়ে দুটিকে দেবার তার প্রয়ােজন নেই। আনুশকা বলল, ভাই, আপনি এমন বিশ্রী করে হাই তুলবেন না। আমরা চা খেতে এসেছি। চা খাব। আপনি কোখেকে জোগাড় করবেন তা আপনার ব্যাপার।। 

‘এগারােটার পর সার্ভিস বন্ধ। 

‘বন্ধ সার্ভিস চালু করুন। আমরা ঐ কোণায় বসছি। চা না খেয়ে যাব না। শুনুন, চিনি যেন কম হয়। গাদাখানিক চিনি দিয়ে সরবত বানিয়ে ফেলবেন না। 

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *