রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৬)

ম্যানেজারের কোনো ভাবান্তর হল না। সে আবার হাই তুলল। চলতি ট্রেনে ছােটখাটো ঝামেলা হয়। এসব পাত্তা দিলে চলে না। চা অবশ্য সে সহজেই দিতে পারে। টী–ব্যাগ আছে, গরম পানি আছে।

রূপালী দ্বীপ কিন্তু দরকারটা কী? মেয়ে দুটি খানিকক্ষণ বসে থেকে বিরক্ত হয়ে চলে যাবে। রাগারাগিও হয়তাে করবে। করুক ! অসুবিধা কী? 

সুন্দরী মেয়ে রাগারাগি করলেও দেখতে ভাল লাগে। ম্যানেজার মনে মনে অতি কুৎসিত একটা গালি দিল। সুন্দর সুন্দর মেয়েদের এইসব গালি দিতেও লাগে। ওদের 

শুনিয়ে গালিটা দিতে পারলে হয়তাে আরো ভাল লাগত। সেটা সম্ভব না। | জরী এবং আনুশকা মুখােমুখি বসেছে। জানালা খােলা। খােলা জানালায় হুহু করে হাওয়া আসছে। এদের শাড়ির আঁচল পতাকার মতাে পতপত করে উড়ছে।। আনুশকা বলল, কী বাতাস দেখেছিস? 

“আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ – দারুণ বৃষ্টি হবে। ঝমঝমিয়ে একটা বৃষ্টি দরকার। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলেই তার মনের মেঘ কেটে যাবে। 

‘মন বিশেষজ্ঞ হলি কবে থেকে? | ‘অনেক দিন থেকে। আমি নিজেই রােগি, নিজেই ডাক্তার। আমার নিজের মন। কীভাবে খারাপ হয়, কীভাবে ভাল হয়, তা আমি মনিটার করি। মনিটার করতে করতে আমার এখন একধরনের ক্ষমতা হয়েছে। মন ভাল করার কৌশল আমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৬

বৃষ্টি নামলেই আমার মন ভাল হয়ে যাবে ? “ইয়েস ম্যাডাম। 

‘তাের মন হয়তাে ভাল হবে। কিন্তু সবার মন তো আর তাের মতো না। আমরা সবাই আলাদা আলাদা। 

‘আলাদা হলেও এক ধরনের মিল আছে। দুঃখ পেলে সবারই মন–খারাপ হয়। সবাই কাঁদে। কেউ শব্দ করে, কেউ নিঃশব্দে। 

জরী ছােট্র নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সবাই যে কঁাদে তা কিন্তু না, কেউ কেউ হেসেও ফেলে।। 

আনুশকা চুপ করে গেল। জরী বলল, চা কিন্তু এখনো দেয়নি। লােকটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দেবে না। দেখ দেখ, কী বিশ্রী করে তাকাচ্ছে ! 

আনুশকা বলল, কী ব্যাপার, এখনাে যে চা আসছে না ? ম্যানেজার বলল, একবার তাে বলেছি এগারােটা বাজে, সব বন্ধ। ‘আমরা কিন্তু চা না খেয়ে যাব না।‘ 

ম্যানেজার মনে মনে তার প্রিয় গালটা দিল। আফসোস, এরা শুনতে পাচ্ছে না। শুনতে পেলে দৌড়ে পালিয়ে যেত। সে যেখানে বসেছে সেখান থেকে মেয়ে দুটিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। তাতে অসুবিধা নেই। পেছন দিক থেকে একজনের পেটের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ফর্সা পেট দেখতে ভাল লাগছে। এখান থেকে 

অনুমান করা যায় গােটা শরীরটা কেমন। 

আনুশকা ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, কী, চা দেবেন না? ম্যানেজার বলল, না। আনুশকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘না’ শব্দটা শুনতে কী খারাপ লাগে লক্ষ করেছিস জরী? অথচ এই শব্দটাই আমরা সবচে বেশি শুনি। 

‘আমরা নিজেরাও প্রচুর বলি। ‘আমি বলি না। আমি সব সময় “হ্যা” বলার চেষ্টা করি। 

‘সবার সাহস তো তোর মতাে না। 

আনুশকা বলল, আমি আসলে কিন্তু ভীতু ধরনের একটি মেয়ে। সবসময় সাহসী মুখােশ পরে থাকি। আমাদের মধ্যে সত্যিকার সাহসী যদি কেউ থাকে, সে হল তুই নিজে। 

‘আমাকে সাহসী বলছিস কেন? 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৬

‘বিয়ের আসর থেকে তুই পালিয়ে এসেছিস। তাের গায়ে এখনাে বেনারসী শাড়ি। কস্টা মেয়ে এই কাজ পারবে? 

‘কাজটা কী আমি ঠিক করেছি? 

‘তা তাে আমি বলতে পারব না। তুই বলতে পারবি। আমি বাইরে থেকে তাের ব্যাপারে কি মতামত দেব?”। 

“যে ছেলেটার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছিল সেই ছেলেটা ভাল না, মন্দ ছেলে। 

‘মানুষের ভাল–মন্দ চট করে বােঝা যায় না। তাের সঙ্গে তো ছেলেটার পরিচয়ই হয়নি। তুই বুঝলি কী করে সে মন্দ? | ‘বিয়রে দুদিন আগে সে আমাকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাচ্ছিল। গাড়িতে করে যাচ্ছি, হঠাৎ সে আমার গায়ে হাত দেয়। ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। আমরা পেছনের সীটে। 

‘গায়ে হাত দেয় মানে কী? হাতে হাত রাখে ? যে ছেলে জানে দু‘দিন পর তাের সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছৈ, সে অবশ্যই তাের হাতে হাত রাখতে পারে। আমি তাতে কোনাে সমস্যা দেখি না। 

‘হাতে হাত রাখা নয়। অন্য ব্যাপার, কুৎসিত ব্যাপার। আমি মুখে বলতে পারব । এবং এই ব্যাপারটা ড্রাইভারের সামনে ঘটে। ড্রাইভার গাড়ির ব্যাক ভিউ মিররে পুরাে ব্যাপারটা দেখতে পাচ্ছিল। সে ছিল নির্বিকার, কারণ এ–জাতীয় ঘটনা এই গাড়িতে আরও ঘটেছে। এটা ড্রাইভারের কাছে নতুন কিছু ছিল না। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৬

‘তুই তখন কী করলি? 

‘কঠিন গলায় ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম। তারপর গাড়ির দরজা খুলে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। 

: কী ঘটেছিল বাসার সবাইকে বললি? 

‘হা, বিয়ে ভেঙে দেয়ার জন্য আমি আমার বড় চাচার পা পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে কঁদিলাম। বড় চাচা রাজি হলেন না, কারণ ছেলের নাকি মস্তানদের সঙ্গে ভাল কানেকশন। এরকম কিছু করলে ভয়ংকর ক্ষতি হবে। 

‘জেনেশুনে তাের বড় চাচা এমন একজন ছেলের সঙ্গে তাের বিয়ে ঠিক করলেন? 

করলেন। কারণ ঐ ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হলে চাচার ব্যবসার সুবিধা 

হয়। 

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *