রূপা পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

রূপা পর্ব – ১

দোতলায় রূপাদের তিনটা কামরা। একটায় তার বাবা থাকেন। সেটা সবচে ছোট। বড় ঘরে তার নাকি ফাপড় লাগে। ঘুম ভাঙলে মনে হয় মাঠে শুয়ে আছেন। তার ধারণী শোবার ঘর এমন হবে যে বিছানায় শুয়ে সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যাবে। বুকশেলফ, টেবিল, ওয়ারড্রোব সব থাকবে বিছানার সঙ্গে লাগানো।দোতলার বিশাল সাইজের দুটা ঘরই রূপার। একটাকে রূপা ছবি আঁকার স্টুডিও বানিয়েছে।

এই ঘরের ছোট দুটা জানালা ভেঙে বড় একটা জানালা করা হয়েছে। ঘরে প্রচুর আলো আসে। এই ঘরের সঙ্গে টেরাসের মতো আছে। টেরাসে সুন্দর বাগান। এক কোনায় বিশাল চৌবাচ্চা বানানো হয়েছে হারুন সাহেবের উৎসাহে। সেখানে দেশী মাছ ছাড়া হয়েছে, শিং, মাগুর, কৈ, তেলাপিয়া মাছগুলি আনন্দে আছে। হারুন চৌবাচ্চা আরো বড় করে সেখানে গলদা চিংড়ি চাষের চেষ্টা করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। রূপা রাজি হচ্ছে না। সে বলেছে বাড়ির ছাদে পুকুর বানানোর কিছু নেই। ছাদ হচ্ছে সুন্দর বেড়ানোর একটা জায়গা। সেখানে মাছ চাষ করতে হবে কেন?

হারুন বলেছেন, মাছ কি অসুন্দর? মাছ অসুন্দর না। চৌবাচ্চা থেকে ছিপ দিয়ে তোমার মাছ ধরাটা অসুন্দর।অসুন্দরকে বাদ দিয়ে সুন্দর হয়? বাবা তোমার সঙ্গে আমি বাজে তর্কে যাব না। যাবি না কেন? কোনো একটা তর্কে গেলেই তুমি টিচার ভাব ধরে ফেল। ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছ এরকম ভঙ্গি। আর আমি যেন তোমার ছাত্রী। তাও বুদ্ধিমান কোনো ছাত্রী না। বোকা ছাত্রী।

রূপা যদিও বলে মাছের চৌবাচ্চা তার খুব অপছন্দ, ঘটনা তা না। সে চৌবাচ্চার পাশে বসে মাছ দেখে অনেকটা সময় কাটায়। গত মাসে মাছের একটা জল-রঙ ছবি এঁকেছে। ছবিতে একটা ড়ুবন্ত মাছের গায়ে আলো পড়েছে। ছবির নাম–জনে মীন রাশি। পুরো ছবিতে একটাই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। নীল রঙের নানান শেড।হারুন ছবি দেখে বলেছেন, নামের অর্থ কি? জন্মে মীন রাশি বলতে তুই কি বুঝাচ্ছিস?

ছবিটা দেখে তোমার কেমন লাগছে সেটা বল। নাম কোনো ব্যাপার না।হারুন বললেন, দর্শক নামের সঙ্গে ছবি রিলেট করবে। নাম ব্যাপার হবে না কেন? মনে কর আমি একটা গোলাপের ছবি এঁকে ছবির নাম দিলাম হংস ডিম্ব! তার কোনো অর্থ হবে? বাবা! ধরে নাও ছবিটার কোনো নাম নেই। এখন বল ছবি কেমন লাগছে।

হারুন গম্ভীর গলায় বললেন, ছবি দেখে মনে হচ্ছে পেইন্টারের কাছে নীল রঙের একটা টিউবই ছিল। সে তা দিয়েই ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা খুব যে সফল হয়েছে তাও না।বাবা তুমি ইতিহাস বুঝ, ছবি বুঝ না।সেটাই তো স্বাভাবিক রে মা। তোরা যারা ছবি আঁকিস তারা ছবি বুঝবি। ইতিহাস বুঝবি না।বাবা, আমি ওয়াটার কালারে গোল্ড মেডেল পাওয়া মেয়ে।

ক্রিয়েটিভ ক্ষেত্রে গোল্ড মেডেল কোনো কাজের কথা না। পিকাসো কখনো গোল্ড মেডেল পান নি। জয়নুল আবেদিন কোলকাতা আর্ট স্কুল থেকে পাস করেছিলেন। তার রেজাল্ট ভাল ছিল না। পাকিস্তানের ওরিয়েন্টাল পেইন্টার আবদুর রহমান চুঘতাই আর্ট কলেজের পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন।বক্তৃতা বন্ধ কর বাবা।শেষ কথাটা শোন Louvre Museum-এ ভারতবর্ষের মাত্র একজন পেইন্টারের ছবি আছে। তিনি কখনো আর্ট স্কুলে বা কলেজে পড়েন নি। তার নাম জানতে চাস? না।জেনারেল নলেজ বাড়াবি না? না।

তার নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের কে হন সেটা বল।আমি জানি না। দয়া করে এখন চুপ কর।আচ্ছা যা চুপ করলাম। জন্মে মীন রাশি নিয়ে মন খারাপ করিস না। যখন ভাল ছবি আঁকবি আমিই প্রথম বলব।তোমার কিছু বলার দরকার নেই। রূপা বসে আছে চৌবাচ্চার দক্ষিণ দিকে। আকাশে মেঘ জমছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। চৌবাচ্চার পানিতে বিদ্যুৎ চমকের প্রতিবিম্ব পড়ার সঙ্গে মাছদের জগতে এক ধরনের আলোড়ন তৈরি হচ্ছে।

রূপার দেখতে মজা লাগছে। মাছরা ভয় পাচ্ছে। সবচে বেশি ভয় পাচ্ছে তেলাপিয়াগুলি। বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে সঙ্গে এরা লাফিয়ে পানি থেকে শূন্যে উঠে যাচ্ছে। একটা মাছ তো রূপার কোলে এসে পড়তে পড়তে পড়ে নি।রূপাদের দোতলা বাড়িটা কলাবাগানের ভেতরের দিকে। তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই ভূতের গলি গিয়েছে। রূপার দাদা এক বিঘা জমিতে ছোট্ট একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ভূতের বাড়ি। তিনি বৃক্ষপ্রেমিক মানুষ ছিলেন। বাড়ি ঘিরে নানান ধরনের গাছপালা লাগিয়েছিলেন।

ভূতের বাড়ি নামকরণের জন্যেই কি-না কে জানে এই বাড়িতে ভূতের খুব উপদ্রপ শুরু হয়। নিশিরাতে ছাদে নূপুর পায়ে হাঁটার শব্দ। ঝড় নেই, বাতাস নেই, আপনাআপনি জানালা বন্ধ হচ্ছে, খুলছে। রান্নাঘরের মিটসেফের সব খাবার দেখা যায় রান্নাঘরময় ছড়ানাে।রূপার দাদা হাজী শরিফউদ্দিন নিজেও একদিন ভূতের হাতে পড়লেন। রাতে বাথরুমে গিয়েছেন।তারপর আর বাথরুম থেকে বের হতে পারেন না। দরজা খুলে না। তিনি ছিলেন দোতলায় একা। এক তলায় একজন দারােয়ান আর রান্নার ছেলে। শরিফউদ্দিন চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছেন। কেউ শুনছে না।

দরজা খুলল ফজরের আযানের পর। শরিফউদ্দিন বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে গেলেন। ভূতের বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে গেল।রূপার জন্মের পর বাড়ির নাম বদলে হারুন বসবাস শুরু করলেন। বাড়ির নতুন নাম হল রূপা। রূপার ধারণা তাদের বাড়িতে এখনাে ভূত আছে তবে ভূতদের আগের সেই ক্ষমতা নেই। আশেপাশে বিশাল সব অ্যাপার্টমেন্ট হাউস হওয়ায় তারা কোনঠাসা হয়ে আছে।বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। রূপা দোতলা থেকে একতলায় নামল। মলিনার সঙ্গে সিঁড়ির গােড়াতেই দেখা। মলিনা বলল, আফা খানা লাগামু? উনি বিদায় হয়েছেন?

জ্বে না। একবার আমারে বললেন, ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দাও। পানি দিলাম। পানি খাইয়া আবার ঘুম। আমারে বললেন, তােমার নাম মলিনা, অর্থাৎ মলিন। নামটা সুন্দর না। এখন থেকে আমি তােমাকে ডাকব মলি। আমি বললাম, ভাইজান আপনের যা মনে চায় ডাকবেন। আমার কোনাে সমস্যা নাই। আমারে মহারানী ডাকলেও যা, মরনি ডাকলেও তা।রূপা বলল, তুমি কি তাকে বলেছ যে উনি ভুল ঠিকানায় এসেছেন ?

বলার সুযোগ কই পাইলাম আফা। উনি আছেন ঘুমের মধ্যে। আমারে বলেছেন প্লেইনে উঠলে কি জানি হয়। তখন খালি ঘুম ধরে। দুই তিন দিন সমানে ঘুমাইতে হয়। আজব ব্যাপার না আফা? আল্লাহ বাচাইছে যে আমি কোন দিন প্লেইনে উঠি নাই।হারুন আবার টেলিফোন করেছেন। তাঁর উদ্বিগ্ন গলা শোনা গেল। ব্যাটা বিয়ে হয়েছে? না।কেন? কি করছে? ঘুমাচ্ছে।রূপা! তুই ঠিক করে বল তো সমস্যা কি?

আমি তেমন কোনো সমস্যা দেখছি না। জেট লেগের ধাক্কায় পড়ে ঘুম দিয়েছে। তার ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না।আমি টেলিফোন ধরে আছি–যা থাপ্পড় দিয়ে ঘুম ভাঙ্গা। কষে থাপ্পড় দিবি যেন আমি টেলিফোনে থাপ্পড়ের শব্দ শুনতে পাই।বাবা অস্থির হয়ো না।অজানা অচেনা একজন ট্রেসপাস করেছে আমি অস্থির হব না? না। কারণ এতদূর থেকে অস্থির হয়ে তুমি কিছু করতে পারবে না। যে ট্রেসপাস করেছে সে কোনো সন্ত্রাসী না।বুঝলি কি করে?

চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি।চোখের ডাক্তার হয়ে গেছিস? ফাজিল মেয়ে। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম, এর মধ্যে যন্ত্রণা বিদায় করবি। পাঁচ মিনিট পর আবার টেলিফোন করব।বাবা, তোমার ঐ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাধর মেয়ের বিষয়ে একটা কথা জানতে চাচ্ছি। তোমার রাগ একটু কমিয়ে প্রশ্নের জবাব দাও।কি জানতে চাস? মনে কর তুমি মদিনার কাছে গেলে। তোমার হাতে হাতঘড়ি সেখানে বাজে বঁটা, পকেটে আছে পকেট ঘড়ি। তার টাইম সেট করা হয়েছে আটটায়। তোমার সঙ্গের মোবাইল টেলিফোনের ঘড়িতে নয়টা। এখন মদিনা কোন সময়টা বলবে?

এই পরীক্ষা তো করি নি। ইন্টারেস্টিং পরীক্ষা।বাবা! তুমি ইন্টারেস্টিং ঘড়ি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাক। এখানে কি হচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে।মেয়েদের বুদ্ধি কাজে লাগে না।বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারলেই কাজে লাগে। বেশির ভাগ মানুষ কাজে লাগাতে পারে না। বাবা টেলিফোন রাখি ঐ লোকের ঘুম মনে হয় ভেঙেছে।

রাশেদ গেস্টরুম থেকে বসার ঘরে এসেছে। রূপাকে দেখে বলল, আপনি বললে হয়ত বিশ্বাস করবেন না, আমার জীবনটা ভুলে ভর্তি। ছোটখাটো ভুল না। বড় বড় ভুল। আপনি যখন বললেন, আপনার নাম রূপা তখনই আমার বুঝা উচিত ছিল, যে ঠিকানায় আমার যাবার কথা সে বাড়ির মেয়েটির নাম রুনা। রুনার সঙ্গেও আমার কথা হয়েছিল। একবার না অনেক বার। যাই হোক, আমি তিন মিনিটের মধ্যে বিদায় হচ্ছি।

রূপা বলল, এখন রাত দশটা চল্লিশ। বাইরে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থায় বের হবেন এবং ভুল করে আবারও অন্য একটা বাড়িতে উঠবেন। সেই বাড়ির মেয়ের নাম হয়ত রুমা। তাকে ব্রাজিলের চকলেট দেবেন, ভয়েস রেকর্ডার দেবেন। এটা ঠিক হবে?

আমি হোটেলে উঠব। দিনে ঠিকানা খুঁজে বের করব।যাদের কাছে যাচ্ছেন তাদের টেলিফোন নাম্বার নিশ্চয়ই আছে। তাদের টেলিফোন করে দিন তারা এসে আপনাকে নিয়ে যাক।টেলিফোন বুক আনতে ভুলে গেছি।ভাল করেছেন। আসুন খেতে বসি। খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যাবেন।থ্যাংক য়্যু। তুমি খুবই ভাল মেয়ে।আমাকে তুমি তুমি করে বলবেন না। তুমি বলার মত ঘনিষ্ঠতা আপনার সঙ্গে আমার হয় নি।সরি।যান হাত মুখ ধুয়ে আসুন। আমরা ডিনার করি। ক্ষিধে লেগেছে না?

হুঁ।রূপা খাবার টেবিলের দিকে রওনা হল। তার মোবাইল ফোন বাজতে শুরু করেছে। হারুন টেলিফোন করেছেন। রূপা ধরল না। খাওয়া-দাওয়া শেষ হোক তারপর বাবাকে সব জানানো যাবে।মলিনা শুকনা মুখে খাবার ঘরে ঢুকে বলল, আফা উনি তো চলে গেছেন। জিনিসপত্র সব ফালায় ধুইয়া বৃষ্টির মধ্যে রওনা।সে কি! আমি বললাম, বৃষ্টির মধ্যে যান কই? উনি বললেন, হোটেলে। তারপর ইংরেজিতে কি যেন বললেন। মনে হয় ভাবছেন আমি ইংরেজি জানি। আমিও ভাব ধরলাম ইংরেজি জানি। আমি বললাম, ইয়েস। ইয়েস।

রূপা বলল, কথা বন্ধ করে খাবার দাও। আগে মোমবাতি জ্বালাও। যে রকম ঝড়-তুফান হচ্ছে এক্ষুণি কারেন্ট চলে যাবে।কারেন্ট গেল মোমবাতি জ্বালানোর পর। রূপা টেলিফোন করল তার বাবাকে।বাবা, ঢাকায় ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে–তোমার দিকের খবর বি কি হচ্ছে।না। ঐ লোক কি গেছে?

হ্যাঁ বাবা, চলে গেছে। তুমি শোকরানা নামাজ পড়তে পার।ভেরি গুড। আমি তো টেনশানে পড়ে গিয়েছিলাম ভদ্রলোক তিনটা স্যুটকেস ফেলে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় নেমেছে। রাস্তাঘাট কিছুই চিনে না, কোথায় যাবে কে জানে। হয়ত মলম পার্টির হাতে পড়বে মলম পার্টি চোখে মলম ডলে মানিব্যাগ নিয়ে চলে যাবে। কিংবা ক্ষুর পার্টির হাতে পড়বে। তারা পেটে ক্ষুর বসাবে। রাস্তায় মরে পড়ে থাকবে।এত রাতে ছাড়লি কেন?

বাবা! তোমার কি এখন মায়া লাগছে।হারুন চুপ করে রইলেন। রূপা বলল, তোমার মায়া লাগছে তার কারণ কি জান বাবা? তার কারণ লোকটা তার সবকিছু ফেলে গেছে। জিনিসপত্র সব নিয়ে গেলে মায়া লাগত না। এই লোক কিন্তু তার জিনিসপত্র নিতে ফিরে আসবে না।কীভাবে জানিস ফিরে আসবে না।তুমি তো প্যারানরমাল ক্ষমতাধর মানুষের খোঁজে সারা দেশ ঘুরে বেড়াও, তোমার নিজের মেয়েরই যে এই ক্ষমতা আছে তা জান না। বাবা রাখি? প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে।কি রান্না করেছে?

জানি না কি রান্না করেছে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আর ভাল লাগছে রূপা লাইন কেটে দিল। হারুন লাইন কাটার পরেও হ্যালো হ্যালো করতে লাগলেন।রাস্তার মোড় পর্যন্ত যেতেই রাশেদ পুরোপুরি ভিজে গেল। বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা। দমকা বাতাস। বাতাস পেছন দিক থেকে আসছে। তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। রাশেদের একবার মনে হল সে ফিরে যায়। হট সাওয়ার নিয়ে খেয়েদেয়ে কম্বল গায়ে শুয়ে থাকে। রূপাদের বাড়ি খুঁজে বের করা সমস্যা না।

গাছপালায় ভর্তি বাড়ি। বাড়ির নাম রূপা। ফিরে গেলেই হয়, রূপা যদি জিজ্ঞেস করে, চলে গিয়েছিলেন কেন? তখন সত্যের মতো করে কিছু মিথ্যা বলতে হবে। যেমন হঠাৎ সিগারেট খাবার ইচ্ছা করল। ডিনারের শেষে সিগারেট খাব। এই জন্যেই সিগারেটের সন্ধানে গিয়েছিলাম। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পড়ব ভাবিনি।রাশেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মাথার ভেতরের লজিক অংশ বলছে ফিরে যাও। আবেগ অংশ বলছে না।

রূপার ওপর হঠাৎ রাগ উঠে যাওয়াতেই সমস্যা হয়েছে। এমন মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে, কি কোমল গলার স্বর, সে কি করে বলে, আমাকে তুমি তুমি করে বলবেন না। তুমি বলার মতো ঘনিষ্ঠতা আপনার সঙ্গে আমার হয়নি। সে কি ভেবেছে ঘনিষ্ঠতা করার জন্যে তুমি বলা? মেয়েটিকে অনেকগুলি কারণে তুমি সে বলতে পারে। কারণগুলো ভাবতে ভাবতে হাঁটা যাক। কোনকিছু নিয়ে ব্রেইনকে ব্যস্ত রাখলে সে ঝড়-বৃষ্টি তুচ্ছ করবে। ক্ষিধের কষ্টও কমিয়ে দেবে। আচ্ছা এখন তুমি সমস্যা–

আমি বয়সে তোমার চেয়ে বড়। কাজেই তুমি বলেছি। এটা বড় কোনো অন্যায় না। অসৌজন্যমূলক কোনো আচরণও না। সামাজিকভাবে স্বীকৃত আচরণ ব্যবস্থা।আমি যে দেশে বাস করছি সেখানে আপনি তুমি তুই নেই। সবাই তুমি। আমার ভুল সেখান থেকেও হতে পারে।কোনো মানুষই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ না। সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক। তুমি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করেছ। ভুল করে তোমার বাড়িতে উঠে পড়েছি জেনেও তুমি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বের করে দাওনি।

বরং ঝড়-বৃষ্টিতে বের না হয়ে রাতে ডিনার করে থেকে যেতে বলেছ। কাজেই তোমার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়নি তা-না। ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতার কারণে আমি তোমাকে তুমি বলতে পারি।আচ্ছা ঠিক আছে ধরে নিলাম আমি তোমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করার জন্যে তুমি বলেছি। এতেই সমস্যা কি? মানুষের স্বভাব হচ্ছে ঘনিষ্ঠ হওয়া। দূরে সরে যাওয়া না।রাশেদের হঠাৎ পা পিছলালো।

সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে উঠে দাড়াল। বিদেশের অচেনা পথঘাটে সাবধানে হাঁটতে হয়। বাংলাদেশ এখন তার কাছে বিদেশ। তার পাসপোর্ট আমেরিকান। তার অনেক সাবধানে হাঁটা উচিত ছিল।ঠাণ্ডায় শরীরে কাঁপুনি উঠে গেছে। বুকে ঠা না বসলেই হল। তার লাংসে সমস্যা আছে। যে পরিমাণ রক্ত তার লাংসের পরিষ্কার করার কথা সে পরিমাণ করতে পারে না।

চারদিক জনশূন্য। এমন কিছু রতি হয়নি যে সব লোকজন ঘরে ঢুকে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ঝড়-বৃষ্টির দেশ। সামান্য দমকা বাতাসে শহরের পথঘাট জনশূন্য হবার কথা না। রাশেদ অন্যমনস্কভাবে কিছুদূর হাঁটল। রাস্তার মাথায় একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। চুলায় আগুন জ্বলছে। আগুন দেখা যাচ্ছে। দোকানি চাদর গায়ে দিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দোকানির সঙ্গে ছয় সাত বছরের একটা ছেলে। সে একই চাদরের নিচে। সম্ভবত দোকানির ছেলে। রাশেদ এগিয়ে গেল।শীতে তার শরীর কাঁপছে। দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ হচ্ছে। রাশেদ বলল, আমাকে আগুন গরম এক কাপ চা খাওয়াতে পারবেন?

দোকানি বলল, পারব স্যার। ইশ আপনার কি অবস্থা! পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম।আপনার কপাল কাটছে? রক্ত পড়তাছে।পড়ুক রক্ত। আপনার দোকানে খাবার কি আছে? আমি খুব ক্ষুধার্ত। দুপুরে লাঞ্চে দিয়েছিল স্যালমন মাছ। মাছ খেতে পারি না বলে খাইনি। এখন ক্ষুধায় মারা যাচ্ছি।কেক আছে, খাবেন? কেক কিন্তু টাটকা না, বাসি।কত দিনের বাসি? এক হপ্তা।কেক বাদ। আর কি আছে? ডিম আছে। ডিম সিদ্ধ করে দিলে খাবেন?

হ্যাঁ খাব। থ্যাংক য়্যু।আপনে বাইরে দাঁড়ায়া বিষ্টিতে ভিজতেছেন। ভিতরে আসেন। একটা গামছা দেই। মাথাটা মুছেন।থ্যাংক য়্যু এগেইন। ভাই আপনার নাম কি? সামছু।সামছু আমি একটা জরুরি কথা বলতে ভুলে গেছি। আমার সঙ্গে বাংলাদেশি কোনো টাকা নেই। আমেরিকান টাকা আছে, ডলার।স্যার টেকা পরে দিয়েন অসুবিধা নাই। আপনে কই মেলা দিছেন? মেলা দিছেন মানে কি? যান কই?

ভাল কোনো হোটেলে যাব। রাতটা হোটেলে থাকব।সামছু চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। কেটলিতে দুটা ডিম ছেড়ে দিতে দিতে বলল, সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে স্যার? একটা সিগারেট দেই। টান দিলে শীতটা কমব।সিগারেট খাই না।স্যার গরিবের একটা কথা কি শুনবেন? অবশ্যই শুনব।

 

Read more

রূপা পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *