রূপা পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

রূপা পর্ব – ৩

হারুন বললেন, আচ্ছা যা, তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না এটা মানলাম। আমি যে একজন গাধা মানব সেটাও মানলাম।হারুন কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তখন হন্তদন্ত হয়ে মলিনা চুকল। তার হাতে রূপার মোবাইল ফোন সেট। মলিনা বলল, আফা আম্মা টেলিফোন করছেন। রূপার মা টেলিফোন করলেই মলিনার মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা যায়।

রূপা বলল, মাকে বল আমি ভাত খাচ্ছি। এখন টেলিফোন ধরব না। তোমাকে আগেও বলেছি খাওয়ার সময় আমাকে টেলিফোন দিবে না।হারুন বললেন, তুই যে কাজটা করলি তা অভদ্রতা এবং অসভ্যতা। বাইরের কেউ টেলিফোন করেনি, তোর মা টেলিফোন করেছে। নিশ্চয়ই জরুরি কোনো কথা।রূপা বলল, যে কোনো কথা জরুরি ভাবলেই জরুরি, না ভাবলেই জরুরি না।এটা কার কথা?

জ্ঞান রূপার কথা।হারুন রাগি গলায় বললেন, এইসব বাণীগুলি তুই একটা খাতায় লিখে ফেল। আমি নিজ খরচে ছাপিয়ে দেব। একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বের হবে। বইয়ের নাম হবে কথামৃত। লেখিকা জ্ঞান রূপা।রেগে রেগে কথা বলছ কেন বাবা?

তুই তোর মার সঙ্গে অভদ্রতা করেছিস দেখে রাগ উঠেছে। সন্তানরা মাবাবার সঙ্গে অদ্ৰতা করবে এটা আমার পছন্দ না।রূপা বলল, বাবা-মা অকারণে আমার উপর রাগ করবে এটাও আমার পছন্দ না। কাজেই এখন অপছন্দে অপছন্দে কাটাকাটি।রূপার মার নাম শায়লা খানম। বাংলা সাহিত্যে এম.এ, তিনি স্কুল শিক্ষক বাবার পাঁচ ছেলেমেয়ের সর্বশেষ জন। তরুণী বয়সে অসম্ভব রূপবতী ছিলেন। এখনো সেই রূপ ধরে রেখেছেন। হারুনের ধারণা এখন শায়লা আগের চেয়েও রূপবতী। যতই দিন যাচ্ছে ততই না-কি তার রূপ বাড়ছে।রূপার যখন সাত বছর বয়স তখন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে তিনি রূপার ঘরে ঢুকলেন। নরম গলায় বললেন, ভয় লাগছে না-কি মা?

রূপা বলল, হ্যাঁ।শায়লা বললেন, ভয় লাগারই কথা, মনে হচ্ছে কাছেই কোথাও বাজ পড়ছে।রূপা বলল, আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে ঘুমাবে? শায়লা বললেন, হ্যাঁ।রূপার আনন্দের সীমা রইল না। রূপার ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। ফ্যানের হুক থেকে একটা দোলনা ঝুলে। রূপার খাটটা কুষ্টিয়ার এক জমিদার বাড়ি থেকে কেনা। খাটের চারদিকে আয়না বসানো। খাটে বসলেই আয়নায় অনেকগুলি রূপ দেখা যায়। কিন্তু রূপা তার ঘরে রাতে একা ঘুমুতে তার খুবই ভয় লাগে। আকবরের মা কাজের বুয়া মেঝেতে বিছানা করে রূপার সঙ্গেই ঘুমায়। তারপরেও রূপার ভয় যায় না। শুধু মা পাশে থাকলে তার ভয় লাগে না।

রাতের খাবার শেষ করে শায়লা রূপার সঙ্গে ঘুমুতে এলেন। রূপা মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার আর ভয় লাগছে না মা।শায়লা বললেন, খুব ভালো।রূপা বলল, মা গল্প বল।শায়লা বললেন, গল্প না, আজ রাতে তোমার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা বলি। মন দিয়ে শোন।রূপা বলল, আচ্ছা। শুধু যখন বজ্রপাত হবে তখন মন দিয়ে শুনতে পারব না।শায়লা বললেন, জরুরি কথাটা হচ্ছে, আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তোমাকে ঠিক করতে হবে, তুমি আমার সঙ্গে যাবে না-কি তোমার বাবার সঙ্গে থাকবে? তুমি কোথায় যাবে?

চিটাগাং। সেখানের এক কলেজে আমি চাকরি পেয়েছি। যাবে আমার সঙ্গে? রূপা বলল, হুঁ। হুঁ না, স্পষ্ট করে বল–আমি তোমার সঙ্গে যাব।রূপা কি বলল, বুঝা গেল না, সেই সময় প্রচণ্ড বজ্রপাত হল।শায়লা বললেন, এখন কি কবিতা বলে তোমাকে ঘুম পাড়াব? রূপা বলল, হুঁ।শায়লা রূপার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কবিতা শুরু করলেন। সক মায়েরা সন্তানদের ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়ান। শায়লা কবিতা আবৃত্তি করেন। একটি কবিতাই আবৃত্তি করেন

দিনের আলো নিবে এল সূয্যি ডোবে ডোবে।

আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে

মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।

মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ ঠঙ।

পরের অংশ রূপার কাছে অস্পষ্ট। রূপা দেখল এক সন্ধ্যাবেলা তার মা ব্যাগ। স্যুটকেস নিয়ে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও তিনি বলেছেন, চিটাগাং যাবেন আসলে তী-না, তিনি থাকবেন ঢাকাতেই। আকবরের মা বুয়া রূপাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, তোমার বাপ-মার ছাড়াছাড়ি হইছে।রূপা বলল, ছাড়াছাড়ি কি?

ছাড়াছাড়ি হইল তালাক। তারার তালাক হইছে।তালাক কি? তোমার মা অন্য এক লোকরে হাঙ্গা বইছে।হাঙ্গা বইছে মানে কি? অত কিছু বলতে পারব না। তোমার কপাল ভাঙছে।পুরো বিষয়টা হারুন মেয়েকে ব্যাখ্যা করলেন। সুন্দর করেই ব্যাখ্যা করলেন। তিনি মেয়েকে বললেন, তোমাদের ক্লাসে এমন কেউ কি আছে যাকে তুমি সহ্য করতে পার না। দেখলেই রাগ লাগে।রূপা বলল, আছে সুমি নাম।সে কি করে?

পেনসিল দিয়ে আমাকে খোঁচা দেয়। একদিন আমার স্যান্ডেলে থুথু দিয়েছিল। আমার অংক বইয়ের পাতা ছিঁড়েছে।সুমি অন্য সেকশানে চলে গেলে ভালো হয় না? খুব ভালো হয় বাবা।তোমার মার সঙ্গে আমার এই অবস্থা হয়েছে। তোমার মা চলে গেছেন অন্য সেকশানে।মা তো তোমাকে পেনসিল দিয়ে খোঁচা দেয় না।বড়রা পেনসিলে খোঁচা দেয় না। কথা দিয়ে খোঁচা দেয়। তোমার মা কথার খোঁচা দেন। আমিও দেই। খোঁচাখুঁচি করতে করতে দুইজনই ক্লান্ত। তোমার মা অনেক বেশি ক্লান্ত বলেই এখন অন্য এক ভাল মানুষকে বিয়ে করেছেন। বুঝেছ?

হুঁ।তোমার মা চাচ্ছেন তুমি তাদের সঙ্গে গিয়ে থাক। আমিও তাই চাচ্ছি। তোমার বয়স খুব কম। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্যে মায়ের আদর দরকার। মা তুমি কি যাবে তোমার মার সঙ্গে? রূপা বলল, না।হারুন বললেন, তোমার জন্যে যা ভাল তাই তোমার করা উচিত। তোমার জন্যে ভাল হল তোমার মার সঙ্গে থাকা। আমি প্রতি সপ্তাহে তোমাকে দেখতে যাব। খেলনা চকলেট এইসব নিয়ে যাব।

আমি মার সঙ্গে থাকব না। তোমার সঙ্গে থাকব।রূপা! তুমি তোমার মায়ের মতই জেদি হচ্ছ।আমি তোমার সঙ্গে থাকব।আচ্ছা যাও আমার সঙ্গে থাকবে। একটু বড় হও দেখবে কত ধানে কত চাল। আমি কথার খোঁচা দিতে শুরু করব। তুমি পালাবার পথ পাবে না।শায়লা মেয়েকে নিজের কাছে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কোনো লাভ হয় নি।রূপী তার মাকে টেলিফোন করল। শায়লা বললেন, তোর খবর কি?

রূপা বলল, ভাল।জরুরি একটা বিষয় নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।বল।কথাটা তোর বাবার বিষয়ে। সে আশেপাশে নাই তো? না।তোর বাবা ইদানীং খুব বিরক্ত করছে।কি করছে? মাছ পাঠাচ্ছে, তরিতরকারি পাঠাচ্ছে। টেলিফোনে খোঁজ-খবর করছে। ব্যাপারটা আমার কাছে ভাল লাগে না, টগরের বাবার কাছেও না। টগরের বাবা অতিমাত্রায় ভদ্র। সে কখনো কিছু বলবে না। কিন্তু সে যে বিরক্ত হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে। এই মাসের ১২ তারিখ সে কি করেছে তা-কি জানিস?

জানি না।আমাকে দামী একটা শাড়ি পাঠিয়েছে। ১২ তারিখ তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল এই উপলক্ষে শাড়ি। এখন ব্যাপারটা আমার জন্যে কতটা অস্বস্তিকর বুঝতে পারছিস? যে বিয়ের অস্তিত্বই নেই সেই বিয়ের দিন আবার কি?ঠিক বলেছ মা।টারের বাবা আমাকে বলল, তুমি তোমার প্রথম হাজব্যান্ডকে নিয়ে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে এসো। ঘণ্টা দুই স্মৃতি রোমণ কর।ভদলোককে কিছু সময় দাও। ভদ্রলোক তোমার হাত ধরতে চাইলে হাত ধরতে দাও। তিনি তোমাকে মিস করেন। কি রকম বিব্রতকর অবস্থা বুঝতে পারছিস?

পারছি।তুই কি তোর বাবাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারবি? পারব তবে বলব না।বলবি না কেন? কারণ সমস্যাটা তোমার, আমার না। তোমার সমস্যা তুমি সমাধান করবে। বাবাকে টেলিফোন করে বলবে, স্টপ দিস ননসেন্স। মা টেলিফোন রাখলাম। রূপী ফোনের লাইন কেটে দিন। হারুন তখনি মেয়ের পাশে এসে দাড়ালেন, আগ্রহ নিয়ে বললেন, এতক্ষন তুই কি তোর মার সঙ্গে কথা বলছিলি?

রূপা বলল, হ্যাঁ।কি বলল তোর মা? হাবিজাবি কথা।হাবিজাবি কি কথা? আমি ভাল আছি, তুমি কেমন আছে এই জাতীয় কথাবার্তাকে বলে হাবিজাবি muit আর কিছু বলেনি? না। আমার বিষয়ে তোর মা কিছু বলেছে? না।আজ একটা বিশেষ দিন তো। আমি ভাবলাম এই বিষয়ে তোকে কিছু বলল কি না।বিশেষ দিনটা কি? তোর মার সঙ্গে আজ আমার প্রথম দেখা হয়।তোমাদের তো আর প্রেমের বিয়ে না। প্রথম দেখাটা এত ইস্পর্টেন্ট কেন হবে?

হারুন লজ্জিত গলায় বললেন, তোর মাকে দেখে বাসায় ফিরে বিরাট এক কবিতা লিখেছিলাম। বয়স কম ছিল তো। খানিকটা বোকাও ছিলাম। পুরো কবিতাটা আমার মুখস্ত আছে। শুনবি? রূপা বলল, না শুনব না। তুমি ছাদে চলে যাও। নিজের মনে কবিতা আবৃত্তি করতে থাক। ছাদে অনেক গাছপালা আছে, তারা তোমার কবিতা শুনে মজা পাবে। বাবা প্লিজ।

চারা লাইন শোন। চার লাইন কবিতায় তোর তেমন কোনো ক্ষতি হবার কথা না।রূপা হতাশ গলায় বলল, শুনাও।হারুন সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি শুরু করলেন। তাকে আনন্দে অভিভূত হতে দেখা গেল। রূপা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল।

আষাঢ়ের কলি ছিল

সময় সন্ধ্যা

চারদিক সুনসান

জীবন বন্ধ্যা॥

গিয়েছিলাম মালিবাগ

বাড়ি নম্বর সাত

কিছু সময় কাটালাম

হয়ে গেল রাত।

আমার এক বন্ধু

নাম সুমন

বলল সে আজ তুমি

থাকে কিছুক্ষণ

শায়লা নামে এক মেয়ে

ঐ বাড়িতে থাকে।

দেখবে তার শান্ত মুখ

কোন এক ফাঁকে…

রূপা বলল, চার লাইন বলার কথা। তুমি দেখি ফেরদৌসির শাহানামা শুরু করেছ। কবিতা বন্ধ।হারুন বন্ধ করলেন না, আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে আবৃত্তি করতে লাগলেন।

সুমনের কথা সত্য

মিথ্যা মোটেই নয়

শায়লার সঙ্গে আমার

হল পরিচয়॥

রাশেদ বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে। তার গায়ে নীল রঙের কম্বল। কম্বল থেকে ওষুধের গন্ধ আসছে। ফরমালডিহাইডের গন্ধ। HCHO. সোডিয়ামের সঙ্গে ফরমালডিহাইড কি কোন বিক্রিয়া করে?

Na + HCHO কি হয়? আচ্ছা হঠাৎ সোডিয়ামের কথা কেন মনে হল? প্রচুর সোডিয়াম আমরা লবণের কারণে খাচ্ছি। এই সোডিয়াম শরীর কীভাবে বের করে? হেভি মেটাল শরীর বের করতে পারে না। লেড পয়জনিং হয়। মারকারি পয়জনিং হয়, মারকারির ইংরেজি কুইক সিলভার। রাশেদের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার নাম সিলভার। না না সিলভার না, অন্য কিছু, সেটাও সিলভার। তা কি করে হয়।আপনি এখন কি একটু ভাল বোধ করছেন? রাশেদ বলল, আমি কোথায়? আপনি হাসপাতালে।ও আচ্ছা হাসপাতাল। আপনি ডাক্তার? জী।রাশেদ বলল, সোডিয়াম অতি রিএ্যাকটিভ একটা ধাতু। আমাদের শরীর ভর্তি সোডিয়াম। এখন…

ডাক্তার বললেন, আপনি কথা বলবেন না। চুপ করে শুয়ে থাকুন। আপনার নিঃশ্বাসের কষ্ট কি কমেছে? অক্সিজেন মাস্ক কে খুলেছে, আপনি নিজেই খুলেছেন?জানি না।আপনার পরিচিত কেউ কি আছে যে আপনার টেক কেয়ার করবে। রাতে আপনার সঙ্গে থাকবে।না।ডাক্তার রাশেদের মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিলেন।আপনি চোখ বন্ধ করুন। তাকিয়ে থাকবেন না।

রাশেদ চোখ বন্ধ করল। তারপরেও নানান ধরনের আলো সে দেখতে পাচ্ছে। অনেক দূরে তারার আলোর মতো আলো দেখা যায়। সেই আলো ছুটে কাছে আসছে। ব্যাপারটা কি? আলোর গতিবেগ আমরা জানি। সেকেণ্ডে কত যেন? আচ্ছা অন্ধকারের গতিবেগ কত? আলো হল ফোটন। একটা সোডিয়াম এটমের গায়ে যদি ফোটন এসে আঘাত করে তাহলে কি সোডিয়াম থেকে ইলেকট্রন ছুটে বের হবে?

ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট। যিনি প্রথম ফটো ইলেকট্রিক এফেক্টের ব্যাখ্যা দেন তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। তার নাম কি বলতে হবে। সময় তিন সেকেন্ড। ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ান, ওয়ান থাউজেন্ড টু, ওয়ান থাউজেন্ড থ্রি। তিন সেকেন্ড শেষ। নাম বলতে না পারার জন্যে শাস্তি। কানে ধরে উঠবস কর। তার নাম আইনস্টাইন। এখন বললে হবে না, তিন সেকেন্ড পার হয়ে গেছে। ভিসকোয়ালিফাইড। ইউ লস্ট দ গেম। সেকেন্ড চান্স। এখন বলতে হবে মানুষ ধর মানুষ ভজ গান যে করেছে তার বাবার নাম। হিন্টস দেয়া হবে। তার একটা চায়ের দোকান আছে। তার নামের প্রথম অক্ষর হল সা। এখন রাশেদের মাথায় গান হচ্ছে–

মানুষ ধর মানুষ ভজ শুন বলিরে পাগল মন

মানুষের ভিতর মানুষ করিতেছে বিরাজন।

দুটা লাইন ক্রমাগত বেজে যাচ্ছে। রাশেদ বলল, পানি খাব।

তার পাশে কেউ নেই। রাশেদ আবার বলল, পানি খাব।

এ্যাপ্রন পরা একজন মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন, নিশ্চয়ই ডাক্তার। তার চেহারার সঙ্গে কোথায় যেন পরিচিত একজনের চেহারার মিল আছে। পরিচিত জনের নাম মনে আসছে না। ভুল হয়েছে, পরিচিত জনের নকল নাম মনে আসছে আসল নাম মনে আসছে না।ডাক্তার বললেন, কোন কিছুর প্রয়োজন হলে এই বোতামটা চাপবেন। আমি ছুটে আসব। আমি ডিউটি ডাক্তার। অক্সিজেন মাস্ক আবার আপনি খুলেছেন? রাশেদ বলল, আপনার নাম কি?

রুবিনা।আপনার চেহারার সঙ্গে একজনের চেহারার কোথায় যেন মিল আছে। তার নাম বলতে পারবেন? নাম বলতে পারলে পুরস্কার। বলতে না পারলে তিরস্কার। তিন সেকেন্ড সময়। ওকে স্টার্ট ওয়ান থাঊজেণ্ড ওয়ান, ওয়ান থাউজেন্ড টু, ওয়ান থাউজেন্ড থ্রী। পারলেন না। আপনি ডিসকোয়ালিফাইড। আর সুযোগ দেয়া হবে না। ফ্লাই উইথ দ্য উইন্ড।রাশেদ চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে সে দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে।

আচ্ছা সে কি মারা যাচ্ছে? মৃত্যুর আগে নাকি যাপিত জীবন পুরোটা চোখের সামনে ভেসে যায়। যদি সত্যি হয় তাহলে মৃত্যুর এই অংশটা ভালো। দ্বিতীয়বার পুরো জীবনযাপন করা।ঘরের ভেতর কে যেন সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটের কড়া গন্ধ নাকে আসছে। রাশেদ বাঁ দিকে তাকালো। পায়ের উপর পা তুলে রূপা ব্যানার্জি বসে আছে। তার হাতে সিগারেট।রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল ঘটনা সত্যি না। হাসপাতালের ঘরে সিগারেট খাওয়া যায় না। তার হেলুসিনেশন হচ্ছে।রূপা ব্যানার্জি বলল, মারা যাচ্ছি না-কি?

রাশেদ বলল, জানি না।জানি না বলার জন্যে তাকে ঠোঁট নাড়তে হল না। হেলুসিনেশনের পুরো ব্যাপারটা মাথার ভেতরে ঘটে। ঠোঁট না নেড়েও কথা বলা যায়। চোখ বন্ধ করেও দেখা যায়।রূপা ব্যানার্জি বলল, আমার কাছ থেকে পালিয়ে এসেও তো রক্ষা পাও নি। আমি চলে এসেছি।রাশেদ বলল, হুঁ।আমাকে দেখে খুশি হয়েছ?

রাশেদ বলল, সিগারেট খেও না। গন্ধ নাকে লাগছে।মরেই তো যাচ্ছ। সিগারেটের কড়া গন্ধ থাকুক কিছুক্ষণ। তাছাড়া সিগারেট আমি খাচ্ছি না। আমি খাচ্ছি চুরুট। হাভানা ব্র্যান্ড। একটান দিয়ে দেখবে? না।কিছু হবে না। একটা টান দাও।না রূপা, না।‘না রূপা না’ অনেক শুনেছি। এবার শুনব না।রূপা ব্যানার্জি উঠে দাঁড়িয়েছে। রাশেদের মুখের উপর লাগানো অক্সিজেন মাস্ক টান দিয়ে খুলে সে চুরুট ঠোঁটের ভেতর খুঁজে দিল। রাশেদ তাকে আটকাতে পারল না। তার হাত-পা অনড় হয়ে গেছে।

টান দাও, জোড়ে টান দাও। তোমার নষ্ট ফুসফুস চুরুটের ধোঁয়ায় শুদ্ধ করে নাও। এটা শুদ্ধি প্রক্রিয়া। রাশেদের জগত অন্ধকার হয়ে গেল।এক সময় সে চোখ মেলল। কত সময় সে পার করেছে তা বুঝতে পারছে না। দিন না রাত তা বুঝতে পারছে না। সে বাঁ দিকে তাকালো, রূপা ব্যানার্জি নেই। আধবুড়া একজন কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে বাচ্চা একটা ছেলে। ছেলেটার চোখ বড় বড়। লোকটা কথা বলছে তবে কথা স্পষ্ট না। কিছু বুঝা যাচ্ছে, কিছু বুঝা যাচ্ছে না।

স্যার, আমাকে চিনেছেন? আমি সামছু। আমার দোকানে এক রাইত ছিলেন। আমার পুলাটারে নিয়া আসছি। এর নাম কেনতু।রাশেদ বুঝার চেষ্টা করছে–এই দুটা চরিত্র কি বাস্তব। না তার মাথার কল্পনা। একটা বাচ্চা ছেলের নাম কিন্তু হবে না। কিন্তু কারো নাম হয় না। কাজেই এ দুজন আন রিয়েল। এখন সমস্যা What is reality? মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় যা ধরতে পারে তাই কি রিয়েলিটি।

 

Read more

রূপা পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *