রূপা পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

রূপা পর্ব – ৬

তোমাকে সব কিছুর বাইরে রাখব এটা কি করে ভাবছ? যাই হোক, বাবার বিয়ে নিয়ে অস্থির হয়ো না। শেষ পর্যন্ত বাবা বিয়ে করবে আমার তা মনে হয় না। কোনো কিছুতেই বাবার আগ্রহ বেশিদিন থাকে না। আর যদি বিয়ে হয় সেটা তোমার জন্যে ভাল হবে।আমার জন্যে ভাল হবে কীভাবে?

বাবা তখন আর হুটহাট টেলিফোন করে তোমাকে বিরক্ত করবে না। ঝুড়ি ভর্তি মাছ-মাংস পাঠাবে না। জন্মদিন উপলক্ষে শাড়ি পাঠাবে না। তুমি ব্ৰিত হবে না। বাবা ব্যস্ত থাকবে ছোট মাকে নিয়ে।ছোট মা? রূপা হাসতে হাসতে বলল, তুমি আমার মা, উনি ছোট মা। নতুন মাও ডাকতে পারি। তোমার কোনটা পছন্দ? নতুন মা না-কি ছোট মা? শায়লা বললেন, you hate me. তাই না?

রূপা বলল, না, তা না। তোমার ব্যাপারটা আমি বুঝিয়ে বলি। আমি সব মানুষের মধ্যে একটা রঙ দেখি। বাবার রঙ হচ্ছে কচি কলাপাতার রঙ। মলিনা মেয়েটা মেজেন্টা রাশেদ সাহেব লেমন ইয়েলো। তুমি গ্রে।আমি গ্রে?

হুঁ। তবে রঙ নিয়ে মন খারাপ করো না। একজন ভাল পেইন্টার কিন্তু গ্রে কালার দিয়েও চমৎকার ছবি আঁকতে পারেন।রাশেদ সাহেবটা কে? আছেন একজন। গুরুত্বপূর্ণ কেউ না। মা তোমার কথা কি শেষ হয়েছে? আরো কিছু বলবে? ফ্রান্সে যে স্কলারশিপ পেয়েছিস সেটা কি রকম স্কলারশিপ?

আলতু ফালতু টাইপ। পেটে ভাতে স্কলারশিপ বলতে পার। যা পাব তা দিয়ে কোনমতে দিন গুজরান হবে। ছুটির দিনে কফি শপে কফি খাওয়ার পয়সা জুটবে না।চল কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি। দুজন মিলে কফি খাই। তোর মুখে কফির কথা শুনে কফি খেতে ইচ্ছা করছে।অন্য আরেক দিন। আজ না কেন?

আমি একটা ছবি আঁকতে শুরু করেছি। আমার মন পড়ে আছে ছবিতে। সেকেন্ড ওয়াশ দেব।তোর বাবা নিজের বিয়ে নিয়ে লাফালাফি করছে, তোর বিয়ে নিয়ে ভাবছে না।আমার বিয়ে নিয়ে আমি ভাবব। বাবা কেন ভাববে? শায়লা বললেন, কি রকম ছেলে তোর পছন্দ?

যার ইনার কালার হবে ডার্ক বু! ঝগড়ায় তাকে পারদর্শী হতে হবে। তর্কে আমাকে হারানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। তার প্রচুর টাকা না থাকলেও চলবে। তবে সে বাবার মতো কৃপণ হতে পারবে না।এটা ভাল বলেছিস। কৃপণ পুরুষ আমারও অসহ্য। থ্যাংক গড়, টগরের বাবা কৃপণ না। ঐ দিন কি হয়েছে শোন। এক বিয়ে বাড়িতে যাব। টগরের বাবার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ে।

সোনার কিছু দিতে হবে। হঠাৎ কানের একজোড়া টপ দেখে আমার নিজের জন্যে পছন্দ হয়ে গেল। ডায়মন্ডের টপ। দাম এক লাখ পনেরো। টগরের বাবা বলল, এত যখন পছন্দ কিনে ফেল। দামের দিকে তাকানোর দরকার নেই।রূপা বলল, এই টপজোড়াই কি পরে আহু মা? হুঁ। সুন্দর না? অদ্ভুত সুন্দর, তবে তোমার উচিত এই টপ না পরা। এক্ষুণি খুলে ফেল।কেন?

তোমার কান দেখতে খুব খারাপ। ইঁদুরের কানের মতো কান। ডায়মন্ডের টপ পরার কারণে সবার চোখ যাবে কানের দিকে। তোমার বিশ্রী কান দেখবে। তোমার উচিত চুল দিয়ে বিশ্রী কান দুটা ঢেকে রাখা।শায়লা আহত চোখে তাকিয়ে রইলেন।রূপা বলল, মা তুমি কিছু মনে করো না। টপের ডায়মন্ড দুটা নকল। আমি অনেক কিছু বুঝতে পারি। এই ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। নিজের মেয়ের সঙ্গে ভান করার কিছু আছে? মা! অনেকক্ষণ বকবক করেছি এখন আমি যাব। ছবি আঁকব।

দুটা মিনিট বস। দুই মিনিটে তোর ছবি পালিয়ে যাবে না। বসলাম দুমিনিট। বল কি বলবে।শায়লা আবার ইনহেলার নিলেন। রূপা হাসল। শায়লা বললেন, হাসছিস কেন?রূপা বলল, ইনহেলার নিয়ে যে ঢঙটা তুমি কর তা দেখে হাসি। তুমি অসুস্থ। তোমার হাঁপানি এটা দেখানোর জন্যেই তোমার হাতে ঐ বস্তু থাকে।আমাকে তুই এতটা ছোট ভাবতে পারলি? তুমি তো ছোটই মা। ছোট কেন ভাবব না।আমি ছোট?

হ্যাঁ, তুমি ছোটবেলায় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছ যে বাবা তোমাকে শারীরিক নির্যাতন করত বলেই তুমি তাকে ছেড়ে চলে গেছ। একটা ভয়ংকর মিথ্যা তুমি তোমার মেয়ের মাথায় ঢুকানোর চেষ্টা করেছ। এটা অন্যায়। তুমি বলতে পারতে তোর বাবা ভয়ংকর বোকী। এই জন্যে তাকে ছেড়ে গেছ। আমি একসেপ্ট করতাম। মা এখন কি আমি যেতে পারি? শায়লী কিছু বললেন না।রূপা বলল, টগর কেমন আছে মা?

শায়লা বলল, টগরের প্রসঙ্গ থাক। ওকে নিয়ে বাইরের কারো সঙ্গে আমি কথা বলতে পছন্দ করি না। তুই গাড়ি থেকে নেমে যা ছবি শেষ কর।রূপা মুগ্ধ হয়ে তার ছবির দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথম ওয়াশের ফলাফল আশাতীত ভাল হয়েছে। ঘূর্ণনটা শেষপর্যন্ত আসে নি, তার বদলে ঢেউ খেলানো একটা ব্যাপার এসেছে। দ্বিতীয় ওয়াশের ফলাফল কি হবে কে জানে।

রূপা গাঢ় হলুদ রঙের সঙ্গে বালি মিশাল। দ্বিতীয় ওয়াশে বালি মেশানো থাকবে। ওয়াশের পর কাগজ খাড়া করে রাখবে তখন গ্রেভিটেশনের কারণে বালির কণাগুলি নিচে নামতে থাকবে। এতে সুন্দর কোনো টেক্সচার তৈরি হতে পারে। এটা রূপার নিজের আবিষ্কার না। ভেনিজুয়েলার ওয়াটার কালারের গ্রান্ডমাস্টার হানমুনের আবিষ্কার। তিনি তার বেশির ভাগ ওয়াটার কালারে বালির দানা ব্যবহার করে টেক্সচার তৈরি করেন।

আফা। অফা গো।রূপ চোখ না তুলেই বলল, বল কি ব্যাপার। হড়বড় করে এক গাদা কথা বলবে না।একটা মেয়ে আফনেরে বুলায়, তার নাম রুবিনা।চায় কি?জানি না।বসতে বল। আমি জরুরি কাজ করছি কাজ শেষ হলেই যাব। চা বানিয়ে দাও। বসে বসে চা খাক। খবরের কাগজ পড়ুক।বলছিলাম আফা! উনার নাকি বারোটা থাইকা ডিউটি। ডাক্তার মাইয়া। সময় মতো না গেলে রোগী মইরা ভূত হয়া যাবে। দোষ পড়বে উনার। দোষ ধরতে তো মানুষের সময় লাগে না।

রূপা উঠে দাড়াল। তার স্র সামান্য কুচকে আছে। এমন কি হতে পারে। তার বাবার বিজ্ঞাপনের কারণে ক্যান্ডিডেটরা সরাসরি ইন্টার দিতে চলে আসছে? ঘটনা এ রকম হলে ভাল ঝামেলা হবে। পাত্রীদের ইন্টারভ্য তাকেই নিতে হবে। অত্যন্ত অস্বস্তিকর অবস্থা। রূপা দোতলা থেকে নামল।বসার ঘরে অল্পবয়েসী মেয়ে বসে আছে। ডাক্তার বলে মনে হচ্ছে না। কলেজে পড়ে পর্যন্ত ঠিক আছে।রূপা বলল, আপনি আমার কাছে এসেছেন।আপনার নাম কি সিলভার? আমার নাম রূপা। তবে রূপা এবং সিলভার অবশ্যি একই। কেন বলুন তো?

আমি এ্যাপলো হসপিটালে কাজ করি। আমাদের একজন পেশেন্টের অত্যন্ত খারাপ অবস্থা। তিনি তাঁর কোনো আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ দিতে পারছিলেন না, যার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। এই বাড়ির ঠিকানাও কিন্তু তিনি দিতে পারেন নি। কিছুক্ষণের জন্যে তাঁর ঘোর কেটেছিল। তখন তিনি কলাবাগানের গাছপালায় ঢাকা দোতলা বাড়ির কথা বলেছেন। বলেছেন বাড়ির নাম সিলভার।তার নাম কি রাশেদ? জী। রাশেদ রহমান। তিনি আমেরিকান এক ইউনিভার্সিটিতে অঙ্কের লেকচারার। মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটি। আমি আজ চেষ্টা করব তাঁর ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।আপনি ডাক্তার?

জী। আমার নাম রুবিনা।রূপা বলল, রাশেদ সাহেবকে সেভাবে আমি চিনি না। তিনি ঠিকানা ভুল করে আমাদের বাড়িতে উঠেছিলেন। কিছুক্ষণ ছিলেন।সরি। সরি।সরি কেন হবেন? আপনি যে কাজটা করেছেন কতজন এটা করে? আমাকে পাঁচটা মিনিট সময় দিন। আমি আপনার সঙ্গেই যাব। এক কাপ চা দিতে বলি? বলুন।রাশেদ সাহেবের অবস্থা কতটা খারাপ?

বেশ খারাপ। সারভাইব নাও করতে পারেন। পরিচিত কেউ তার পাশে নেই। মানুষটা মারা যাচ্ছে। আমার খুব খারাপ লাগছিল।রূপা স্যান্ডেল খুঁজছে। দরজার আড়াল থেকে দেখছে মদিনা। চোখে চোখ পড়তেই সে সরে গেল। রূপা বলল, মদিনা কাছে আস।মদিনা ভীত মুখে সামনে এসে দাঁড়াল। যেন সে বড় কোনো অপরাধ করেছে। অপরাধের বিচার সভা বসেছে। অপরাধের কারণে তাঁর কঠিন শাস্তি হবে। রূপা বলল, আমি কোথায় যাচ্ছি তুমি জান?

মদিনা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।রূপা বলল, তুমি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক মেয়ে। আগেভাগে সব জেনে ফেলছে। এটা ঠিক না। এতে আমাদের পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়।মদিনা বলল, আমারে মাফ করে দেন আফা।মাফ দেয়ার মত কোনো অপরাধ তুমি করোনি, শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ কেন?

মদিনা ভয় পাচ্ছে কারণ সে আরো একটা ঘটনা জানে। যে ঘটনা ঘটে নি কিন্তু ঘটবে। ঘটনাটা সে রূপাকে বলার সাহস করে উঠতে পারছে না।নিজের উপর মাঝে মাঝে তার ভয়ংকর রাগ লাগে। সবাই এক রকম, সে আলাদা কেন? কেউ ভূত দেখে না সে কেন দেখে? এক শ্রাবণ মাসের দুপুরে সে যদি পুকুরের পাড়ে না যেত তাহলে হয়ত সে অন্য রকম হত না। স্বাভাবিক থাকতো।

তার যখন চার বছর বয়স সে স্কুল ঘরের সামনের দিঘিতে ড়ুবে গিয়েছিল। দিঘির পানি কি পরিস্কার! ড়ুবে যাবার পর মানুষ বাঁচার জন্যে ছটফট করে। সে কিছু করেনি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছিল। হঠাৎ কি যেন ঘটল। সে অবাক হয়ে দেখলো তার মুখের উপর একটা মুখ। এমন এক নারীর মুখ যা দেখে শান্তিতে মন ভরে যায়। সেই অদ্ভুত নারী ফিসফিস করে বলল, যা তোকে জিনিস দিলাম। অনেক বড় জিনিস দিলাম।

ততক্ষণে স্কুলের ছেলেরা ছুটে এসেছে, ড্রিল মাস্টার লাফ দিয়ে পানিতে পড়লেন। মদিনাকে টেনে তুললেন।কতদিন পার হয়েছে। মদিনার বয়স এখন এগারো। দিঘির পানির মেয়েটিকে মদিনা এখনো হঠাৎ হঠাৎ স্বপ্নে দেখে। মেয়েটি কোমল গলায় বলে, কি রে মনে আছে আমার কথা? মদিনার খুব ইচ্ছা এই মেয়েটির কথা সে রূপা আপাকে বলে।রূপী আপা রাগ করবেন। করলে করবেন। কাউকে তো বলতে হবে। তার যদি বড় ধরনের কোনো অসুখ হয়ে থাকে রূপা আপাই চিকিৎসা করবেন। তারা কত বড়লোক। তাদের তো আর টাকার অভাব নাই।

রূপা ডাকল, মদিনা।মদিনা বলল, কি আপা।তুমি কি আমার সঙ্গে হাসপাতালে যাবে? যদি যেতে চাও স্যান্ডেল পর।মদিনার খুব যেতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সে বলল, আফা আমি যাব না।রূপা বলল, রাশেদ নামের মানুষটা সম্পর্কে তুমি কি আরো কিছু জান? জানি। বলব? না।শায়লা মেয়েকে টেলিফোন করেছেন। রূপা বলল, একটু আগেই না তোমার সঙ্গে কথা হল।শায়লা বললেন, একটু আগে কথা হলে এখন কথা বলা যাবে না?

না, যাবে না। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি। হাসপাতাল থেকে ফিরে কথা হবে।হাসপাতালে কেন? এক ভদ্রলোক মারা যাচ্ছেন। মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে গোপন কিছু কথা বলতে চান।কি আশ্চর্য কথা, তার নাম কি? আমি কি যাব তোর সঙ্গে? তুমি কেন যাবে? তার গোপন কথা শুনতে? অন্যের গোপন কথা তুমি কেন শুনবে?

রূপা টেলিফোনের লাইন কেটে দিল।মদিনা ছাদে। চৌবাচ্চার পাশে বসে আছে। চৌবাচ্চার পানি স্কুল ঘরের সামনের দিঘির পানির মত পরিষ্কার। মদিনার ইচ্ছা করছে চৌবাচ্চার পানিতে শুয়ে তাকিয়ে থাকতে। পানির মেয়েটিকে অনেকদিন সে স্বপ্নে দেখে না। আজ খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।

রাশেদ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। তাঁর বাঁ পাশে ডিউটি ডাক্তারের চেয়ার টেবিল। দেয়ালে চারকোনা ঘড়ি। ঘড়ির সেকেন্ডের কাটা লাল। লাল কাটা লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। ঘড়িটাকে প্রাণশক্তিতে ভরপুর জীবন্ত প্রাণীর মতো লাগছে। সেই তুলনায় ডাক্তারকে সারা রাত জেগে থাকার কারণেই বোধহয় ক্লান্ত লাগছে। রাশেদ হাত উঁচু করল। ডাক্তার ছুটে এলেন। রাশেদের মনে হল ডাক্তারকে যতটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল তত ক্লান্ত তিনি না।ডাক্তার রাশেদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। রাশেদ বলল, আমি ভাল হয়ে গেছি। Good morning.

ডাক্তার কিছু না বলে রোগীর মাথার উপরের মনিটরের দিকে তাকালেন। তাঁকে খানিকটা বিস্মিত মনে হল। রাশেদ বলল, আমাকে অন্য কোনো ঘরে কি দেয়া যায়? যেখানে বড় জানালা আছে।ডাক্তার জবাব না দিয়ে রোগীর পালস দেখলেন। তার প্রয়োজন ছিল। মনিটরে পালস রেট উঠছে। তিনি প্রেসার মাপলেন। রাশেদ বলল, দুটা পূর্ণ সংখ্যা গুণ করে ৭ বানাতে পারবেন? আপনাকে প্রশ্নটা করলাম বোঝানোর জন্যে যে আমার মেন্টাল ফেকাল্টি এখন ঠিক আছে। পূর্ণ সংখ্যা একটা হল ১ অন্যটা ৭, ১X ৭ = ৭।

এক ঘণ্টা আগেও তো আপনার ভয়ংকর খারাপ অবস্থা ছিল। সাড়ে দশটার দিকে আপনাকে আর্টিফিসিয়াল রেসপিরেটারে দেবার কথা। আমি খুবই অবাক হচ্ছি। স্যারকে খবর দিচ্ছি। স্যার এসে আপনাকে দেখুক। ভাল বোধ করছেন? হ্যাঁ।নিঃশ্বাসের কষ্ট নাই? না।ক্ষুধা লেগেছে, কিছু খাবেন? হ্যাঁ! ঝাল মাংস দিয়ে পরোটা খেতে ইচ্ছা করছে।ডাক্তার বললেন, ভেরি সারপ্রাইজিং।রাশেদ বলল, তিনটি পূর্ণ সংখ্যা যোগ করলে যা হবে গুণ করলেও তাই হবে। বলতে পারবেন?

না। ১, ২ এবং ৩, এক যোেগ দুই যোগ তিন সমান ৬, আবার ১ গুণন ২ গুণন ৩ সমান ৬।প্রফেসর চলে এসেছেন। তিনি দ্বিতীয় দফা পরীক্ষা করলেন। আবারও পালস দেখা হল, আবারও প্রেসার মাপা হল। প্রফেসর বিড়বিড় করে বললেন, মিরাকুলাস রিকভারি।রাশেদ বলল, ডাক্তার সাহেব! মিরাকল প্রায়ই আমাদের জীবনে ঘটে। আমরা বুঝতে পারি না। আমাকে কি কেবিনে পাঠানো যাবে?

প্রফেসর বললেন, যাবে। অবশ্যই যাবে।এমন একটা কেবিন দিন যেখানে বড় জানালা আছে। তাকালেই আকাশ দেখা যায়।আমাদের সব কেবিন থেকেই আকাশ দেখা যায়।রাশেদ বলল, আমার আর হাসপাতালে থাকতে ভাল লাগছে না। যদি মনে করেন আমি মোটামুটির চেয়ে ভাল তাহলে আমাকে ছেড়ে দেবেন। প্লীজ।

রিপোর্টগুলি আগে আসুক।

সব রিপোর্ট ভাল পাবেন।

রাশেদকে কেবিনে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নার্স এসে একগাদা রক্ত নিয়ে গেছে, ইউরিন নিয়ে গেছে। আপাতত রুগীকে ভাল মনে হচ্ছে। তবে শরীরের ভেতরের অবস্থাটা জানতে হবে। ইলেকট্রলাইট ব্যালেন্সের অবস্থা, রক্তে সুগারের অবস্থা কিডনি ফাংশান সব পরীক্ষা হবে।রাশেদ শেভ করে শাওয়ার নিয়েছে। হট শাওয়ারের পর পরই তার মনে হল শরীরটা যতটা ভাল ছিল তারচেয়ে অনেকটা ভাল হয়েছে।

গোশত পরোটার ব্রেকফাস্ট হল না। তাকে হাসপাতালের ব্রেকফাস্ট করতে হল। দুধ, পাউরুটি, হাফবয়েলড ডিম, কলা।হাসপাতালের বিছানার সামনে রঙিন টিভি। সেখানে নাটক হচ্ছে। রাশেদ আগ্রহ নিয়ে নাটক দেখছে। অন্ধ নায়িকা এবং নায়ক পার্কে বসে আছে। নায়ক জানে না যে মেয়েটি অন্ধ। নায়ক বলল, এশা! দেখেছ কি সুন্দর ডালিয়া ফুটেছে।এশা বলল, হুঁ। আমাকে একটা ডালিয়া এনে দাও।নায়ক বলল, কোন রঙ আনব? লাল না হলুদ?

এশা বলল, আমার কাছে লাল এবং হলুদের কোনো আলাদা Identity নেই। আমার কাছে লালও যা, হলুদও তা।নায়ক টকটকে লাল রঙের ডালিয়া এনে দিল। নায়িকা সেই ফুল নাকের কাছে ধরে বলল, আহা কি গন্ধ! নায়কও সেই ফুলের গন্ধ শুকে মোহিত হয়ে বলল, ঠিক বলেছ, ভারি মিষ্টি গন্ধ।রাশেদ খানিকটা ভড়কে গেছে। ডালিয়া ফুলের গন্ধ নেই। এরা গন্ধ পাচ্ছে কেন?

না-কি এই ডালিয়া বিশেষ কোনো শংকর জাতের। হতেও পারে। ফুল নিয়ে নানান কর্মকাণ্ড হচ্ছে। জাপানি এক কোম্পানি নীল গোলাপ বের করেছে। এই কোম্পানির কিছু নীল গোলাপ পাওয়া গেলে সে রূপাকে দিত। রূপা গোলাপ দেখে চমকে উঠে বলত, নীল রঙের গোলাপ কোথায় পেলেন? সে বলতো… আসব? রাশেদ চমকে তাকালো। রূপা দাঁড়িয়ে আছে। বেশ সুন্দর লাগছে রূপাকে। রাশেদ আনন্দিত গলায় বলল, রূপা কেমন আছেন?

 

Read more

রূপা পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *